Planets Sun Sun Sun Sun

গত ২১ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় ক্যাম্পাস পরিচালিত ফ্রি সেমিনার অন প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড এর ২৯তম পর্ব। ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে আয়োজিত উক্ত সেমিনারের বিষয় ছিল Happy Marriage Life: Husband-wife Relationship. ব্যক্তিসত্তার যথার্থ বিকাশ, মানবিক মূল্যবোধ ও আত্মশক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে জ্ঞানভিত্তিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং আলোকিত জাতি গঠনের প্রক্রিয়া হিসেবে ক্যাম্পাস সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিএসডিসি) নিয়মিত পরিচালনা করে ফ্রি প্রোএকটিভ সেমিনার।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এবং সিএসডিসি’র মহাসচিব ড. এম হেলালের সঞ্চালনায় উক্ত সেমিনারে মূল বক্তা ছিলেন প্রোএকটিভ এটিচিউডের ক্যারিশমেটিক উপস্থাপক ড. আলমাসুর রহমান।
ড. আলমাসুর রহমান
প্রোএকটিভ এন্ড পজেটিভ এটিচিউড আন্দোলনের প্রাণপুরুষ ড. আলমাসুর রহমান বলেন- ভিন্ন পরিবেশ থেকে আসা দু’জন ছেলে-মেয়ে সারাজীবন সুখে থাকার জন্য, একসাথে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করার জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। কিন্তু এরপরও দেখা যায়, দাম্পত্য জীবনে ঝগড়া-বিবাদ-কলহ লেগেই থাকে। এর কারণ সুখী দাম্পত্যজীবন সম্পর্কে মানুষের প্রশিক্ষণের অভাব। এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ না নিয়েই মানুষ বিয়ে-পর্ব সেরে ফেলে। অথচ এ বিষয়ের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রশিক্ষণ দরকার।
স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। Marriage is not an emotion, it is a feeling, it is a decision, it is a dream, it is a commitment. এটা ছেলেখেলা নয়। জগতে সবচেয়ে বড় দলিল হলো বিয়ের দলিল। এ আসরে কাজী থাকে, উকিল থাকে, উকিল-বাবা থাকে, স্বাক্ষী-সাবুদ থাকে। যাকে চিনি না, জানি না; যার সম্পর্কে পূর্বধারণা নেই -এমন মানুষকেই স্বামী বা স্ত্রী হিসেবে বরণ করা হয়। কারণ মানুষ সুখী হবার জন্য বিয়ে করে। তাই কীভাবে সংসার জীবনে সুখী হওয়া যায়, তা সংসার জীবনের শুরুতেই জানতে হবে।
স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ, মনোমালিন্য থাকলে তার প্রভাব সন্তানের ওপর পড়ে। উদাহরণস্বরূপ- পরিবারের ক্লাস নাইনে পড়া মেয়ে ঘরে থাকতে ভালো লাগে না, বাইরে বাইরে থাকতে সে পছন্দ করে; এতে মা-বাবা দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। পরে কাউন্সিলিং করে জানা যায় ঘরে বাবা-মা’র দুঃসহ আচরণ মেয়েকে বহির্মুখী করে তুলেছে। ঘরকে এখন সে নরক বলে মনে করে। পিতা-মাতার জন্য এটি একটি সতর্কবাণী।
গবেষক আলমাসুর রহমান বলেন- আমার মেয়ে বাইরে থেকে আসলে আমি দরজা খুলে দিয়ে তার হাতের ব্যাগটা নিয়ে নিই, তার কাছে জানতে চাই- পথে কোনো অসুবিধা হয়নি তো? এখনকার বাবা-মা’রা ছেলে-মেয়েদের সাথে কথা বলে না, ভালোবাসা প্রকাশ করে না; ফলে বাবা-মা ও সন্তানদের মধ্যে তৈরি হয় দূরত্ব। বাবা বাইরে থেকে আসলে সন্তান অন্যদিকে চলে যায়, এগিয়ে গিয়ে বাবার ব্যাগটা নেয় না। বাবা যেন একটা আতংক। বাবা আসলে সন্তান বলে না, আব্বু আজ তোমার দেরি কেন? সন্তান উল্টোভাবে- বাবা দেরি করে আসলেই ভালো। যেখানে দ্বিধা, সেখানে দূরত্ব। যেখানে ভয়, সেখানে ভালোবাসার অভাব। ড. আলমাস বলেন- এখনকার জেনারেশন গড়ে উঠছে ঠিকই, কিন্তু মানুষ হয়ে উঠছে না। ছেলে-মেয়েদের জন্য খেলাধুলার ব্যবস্থা নেই, সংগীতচর্চা নেই, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান তাদের নাগালের বাইরে, বিতর্ক অনুষ্ঠানে তারা নিজেদেরকে উজাড় করে উপস্থাপন করতে পারে না। তাদের জন্য আছে ল্যাপটপ, মোবাইল; এগুলো টিপাটিপি করতে করতে একসময় তাদের চোখ ঝাপসা হয়ে আসে, চিন্তায় জট ধরে।
তিনি বলেন, শয়তান সর্বক্ষণই মানুষের ক্ষতি করে। শয়তান তার সাগরেদদের একেক জনকে একেক কাজের দায়িত্ব দেয়। কাজ শেষে রিপোর্ট করতে আসলে কাউকে বলে গুড, কাউকে বলে ভেরি গুড, আর কাউকে বলে সাবাশ; কিন্তু কোনো সাগরেদ স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নষ্ট করে দিয়ে আসলে শয়তান বলে এক্সিলেন্ট, সবচেয়ে ভালো কাজটা তুমি করেছ!
ড. আলমাস বলেন, তিনটি ‘C’ এর কারণে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নষ্ট হয়। এগুলো হলো- Complain, Compare and Condemnation. উদাহরণস্বরূপ- স্বামী স্ত্রীকে একটি ছোট কাজ করতে দিলো, কিন্তু কোনো কারণে স্ত্রী সেটা করতে পারল না। অমনি রেগে টং; সাধারণ একটা কাজ তুমি করতে পারলে না; তোমাকে দিয়ে কোনো কাজ হবে না। স্ত্রী এতে হতাশত’ হলেনই, নিজেকে খুব ছোট মনে করলেন।
অন্য কারো তুলনাও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ- পাশের বাড়ির ভাবি কত ভালো রান্না করে, আর তুমি! এতে স্ত্রীর মনে দারুণ ক্ষোভের সৃষ্টি হয়, মনে হতাশা দানা বাঁধে। এ ধরনের Compare বা তুলনা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট করে দেয়।
তৃতীয় যে বিষয় স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার সম্পর্ক নষ্ট করতে ভূমিকা রাখে, তা হলো Condemn বা অপমান। মানুষ সবচেয়ে বেশি কষ্ট পায় যখন সে অপমানিত হয়। পরিবারে এ ধরনের অবস্থা বিরাজ করলে সন্তানদের সর্বনাশ হয়, তারা ভালো মানুষ হয়ে গড়ে উঠতে পারে না।
ড. আলমাস পরামর্শমূলক বক্তব্য দিয়ে বলেন, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যকার পারিবারিক সমস্যা নিরসন করতে হলে পরস্পরকে Study করতে হবে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পর্ক তখন ভালো হবে, যখন তারা পরস্পরকে Study করবে। স্ত্রীকে কী বললে রাগ করে, কী বললে খুশি হয় -এটা স্বামীকে জানতে হবে। অনুরূপভাবে স্ত্রীকেও স্বামী সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা রাখতে হবে।
ড. আলমাস আরও বলেন- পরস্পরের প্রশংসা বা Appreciation এবং Recognition স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ককে মধুর করে তোলে। এছাড়া পরস্পরের সাথে কথা বলতে হবে; প্রতিদিন অন্তত ১০/১৫ মিনিট কথা বলা প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপঃ আপনি অফিস থেকে স্ত্রীকে ফোন করে বলবেন- হঠাৎ মনে পড়ে গেল, তাই ফোন করলাম। এতে স্ত্রী অনেক Impressed হবেন। এই একট কথার মূল্য কোটি টাকার চেয়েও অনেক বেশি। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কথা যত বলা হবে, সম্পর্ক তত ভালো হবে।
ড. আলমাসুর রহমান বলেন- আমরা বিজনেস পার্টনারের সাথে কত কথা বলি, সুন্দর সুন্দর বাক্য ব্যবহার করি, অথচ লাইফ পার্টনারের সাথে কথা বলতে যত কার্পণ্য।
ড. এম হেলাল
সেমিনারে সঞ্চালক, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক ও সিএসডিসি’র মহাসচিব ড. এম হেলাল বলেন- পরিবারে, সমাজে ও জাতিতে আমাদের একতাবদ্ধ থাকতে হবে, হতে হবে দৃঢ়চিত্ত। তিনি বলেন, United we stand devided we fall. মানসিক শক্তির কারণে আমরা গুলশান ট্রাজেডি সাফল্যের সাথে মোকাবেলা করতে পেরেছি। আমাদের দৃঢ়তা দেখে গুলশান রেষ্টুরেন্টে যেসব দেশের লোক নিহত হয়েছে, সেসব দেশ আরো দৃঢ়ভাবে আমাদের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে। তাদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হয়নি বরং আরো জোরদার হয়েছে।
ড. হেলাল বলেন, প্রতিটি পরিবারের অভ্যন্তর থেকে শুরু হয় সম্পর্ক। স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের যে আলো ছড়িয়ে পড়বে তা পরিবার, সমাজ ও জাতিকে আলোকিত করবে। তিনি বলেন, আজকের এ সেমিনারের Concept নিয়ে নিজ নিজ অঙ্গনে আপনারা সবাই আলোচনা করবেন; এতে পরিবার আলোকিত হবে, পরিবার থেকে সমাজ ও জাতি আলোকিত হবে। এভাবে আমাদের জাতিকে প্রোএকটিভ ও পজিটিভ করে গড়ে তুলতে হবে। বাংলাদেশকে একসময় তলাবিহীন ঝুড়ি বলে কটুক্তি করা হয়েছিল, সেই বাংলাদেশ এখন নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর মতো সুবিশাল প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে, নির্ধারিত সময়ে শেষও করবে ইনশাল্লাহ। প্রোএকটিভ এটিচিউড ধারণ করে বাঙালি বিশ্বে গৌরবময় আসন দখল করে নেবে। যারা প্রোএকটিভ এন্ড পজেটিভ থট লালন করেন, তারা যাবেন স্বর্গের দিকে; আর যারা নেগেটিভ চিন্তা করবেন, তাদের পথ হবে নরকের দিকে।
ক্যাম্পাস’র পরবর্তী প্রোএকটিভ সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে ১ নভেম্বর মঙ্গলবার বিকাল ৫টায়। সেমিনারের বিষয়- How to Create Positive Thought?