ক্যাম্পাস আয়োজিত ফ্রি সেমিনার অন প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড

রাগ কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায় রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন
এবং সর্বক্ষেত্রে বিজয়ী হোন

ক্যাম্পাস সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্র (সিএসডিসি) পরিচালিত আত্মোন্নয়নমূলক নিয়মিত কর্মসূচি ফ্রি সেমিনার অন প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড। ব্যক্তিসত্তার যথার্থ বিকাশ, মানবিক মূল্যবোধ এবং আত্মশক্তি বৃদ্ধির প্রক্রিয়া হিসেবে নিয়মিত আয়োজিত হয় এ সেমিনার। সে ধারাবাহিকতায় ২০ অক্টোবর ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় প্রোএকটিভ সেমিনারের ৭ম পর্ব। এবারের বিষয় ছিল How to control anger অর্থাৎ রাগ কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।
সেমিনারে প্রধান বক্তা ছিলেন প্রোএকটিভ এটিচিউডের জনপ্রিয় প্রবক্তা, গবেষক ও সুবক্তা ড. আলমাসুর রহমান। সেমিনার পরিচালনা করেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এবং ক্যাম্পাস সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্র (সিএসডিসি) -এর মহাসচিব এম হেলাল।

ড. আলমাসুর রহমান
বিনয়ের মাধ্যমে স্বর্গের চেয়েও দামি জিনিস অর্জন করা সম্ভব এমনই কথার মধ্য দিয়ে বক্তব্য শুরু করেন ড. আলমাসুর রহমান। তিনি বলেন আত্মোন্নয়ন, কর্মশক্তি এবং কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টিতে বিনয়ের বিকল্প নেই। বিনয় মানুষকে প্রকৃত মানুষ হতে সাহায্য করে। তাই বিনয়ী হওয়া ছাড়া আত্মোন্নয়ন কোনভাবেই সম্ভব নয়। আত্মচেতনায় উজ্জীবিত যুবকই পারে সমাজকে বদলে দিতে। তাই বিনয়ের মাধ্যমে মানবিক গুণাবলী অর্জন সবার প্রয়োজন।
মানুষের মৌলিক মানবিক গুণাবলীর উল্লেখ করে ড. আলমাস বলেন, প্রকৃত মানুষ হতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সৃষ্টির সেবা করা। সৃষ্টির সেবার মধ্য দিয়েই মানুষ উন্নত চরিত্রের গুণাবলী অর্জন করে। আর উন্নত চরিত্র অর্জন হলেই মানুষ প্রকৃত অর্থে আদর্শিক হয়ে ওঠে। এরপর আছে অহংকার ও লোভ পরিহারের বিষয়। অহংকার মানুষের নৈতিকতা নষ্ট করে, আর লোভ মানুষকে পাপাচারী বানায়। তাই প্রকৃত মানুষ হতে হলে অহংকার ও লোভ বর্জন করতে হবে। এসবের পাশাপাশি আন্তরিকতার গুরুত্বও কম নয়। আন্তরিকতা না থাকলে কোন কিছুতেই পূর্ণতা পাওয়া যায় না। অপূর্ণাঙ্গ কাজ কারও পছন্দ নয়। তাই আন্তরিকতার মাধ্যমে কঠিন কাজও সহজ হয়ে যায়। উপরোক্ত বিষয়গুলো অর্জনের মধ্য দিয়ে সাধারণ মানুষও হয়ে উঠতে পারে আদর্শিক ও প্রোএকটিভ। এরপর যে বিষয়টি রয়েছে, তা হল- রাগ। রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে; রাগ যদি অনিয়ন্ত্রিত হয়ে যায়, তবে কোনভাবেই সফলতা আসে না বরং অনেক উচ্ছৃংখল ও ধ্বংসলীলায় নিপতিত হতে হয়। তাই সফল মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারা। কারণ রাগ হল এমন এক জিনিস, যা মানুষের সকল ভাল কাজ ধ্বংস করে দেয়। রাগের ফলে সমাজে নানাবিধ জটিলতার সৃষ্টি হয়। আত্মহত্যা, হত্যা, চুরি, ডাকাতি ইত্যাকার আত্মহননের মত ঘটনাগুলো একমাত্র রাগের কারণেই সংঘটিত হয়। সমাজে হানাহানি কিংবা বিশৃঙ্খলার সূত্রপাতও কিন্তু এই রাগের কারণে হয়ে থাকে। তাই রাগকে নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।
রাগের কারণে সৃষ্ট সংকটের উদাহরণস্বরূপ ড. আলমাস বলেন খবরের কাগজে প্রতিদিনই থাকছে আত্মহত্যা, হত্যা, খুনের খবর। প্রেমিকের কাছে ছ্যাঁকা খেয়ে প্রেমিকার আত্মহত্যা, রাগের মাথায় স্বামী কর্তৃক স্ত্রী হত্যা বা স্ত্রী কর্তৃক স্বামী খুন, ছেলের হাতে বাবা হত্যা এসব সংবাদ এখন দৈনন্দিন। এসব ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা গিয়েছে যে, সামান্য বা তুচ্ছ কোন বিষয়কে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয় এসব মহা তুঘলকি কান্ড। ক্ষণিকের খানিক রাগ নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার কারণেই সৃষ্টি হয় বড় বড় দুর্ঘটনা ও অমানবিক-পৈশাচিক কর্মকান্ড।
ড. আলমাস রাগ নিয়ন্ত্রণের সহজ পন্থা তুলে ধরে বলেন রাগ নিয়ন্ত্রণের সহজ পথ হল হাসি। আপনি কাজের মধ্যে হাসি ধরে রাখুন, দেখবেন- আপনার কাজ দ্রুত এবং সহজ উপায়ে সম্পন্ন হচ্ছে। হাসি মানুষের কষ্ট দূর করে, মনের মধ্যে হতাশা জন্মাতে দেয় না। হতাশা সৃষ্টি না হলে কোন বিশৃঙ্খলা ঘটারও সম্ভাবনা থাকে না। তাই আপনি হাসির মাধ্যমেই পৃথিবী জয় করতে পারেন। হাসি মানুষের মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করে, সেই সাথে আত্মচেতনা বাড়িয়ে দেয়। সুতরাং নিজের মধ্যে হাসি ধরে রাখুন এবং হতাশামুক্ত জীবন কাটান।
তাছাড়া রাগ, কষ্ট এগুলো কেউ কাউকে দেয় না। মানুষ নিজেই নিজের ভেতর রাগ, কষ্ট ও ক্ষোভ তৈরি করে। রাগ থেকে আসে কষ্ট, কষ্টের মাধ্যমেই সৃষ্টি হয় হতাশা, হতাশা থেকে তৈরি হয় ক্ষোভ, আর ক্ষোভ থেকেই সৃষ্টি সকল ধ্বংসের। তাই ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচতে হলে কোনভাবেই নিজের ভেতর ক্ষোভ তৈরি করা যাবে না, হতাশা থেকে থাকতে হবে মুক্ত। আর হতাশা-মুক্তির জন্য প্রয়োজন মানসিক কষ্ট তৈরি না করা, রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখা। অন্যের কথায় বা কাজের কারণে তথা অন্যের প্ররোচনায় পড়ে নিজের ভেতর ক্ষোভ, অসন্তোষ, রাগ, কষ্ট তৈরি করে বোকারা। আর এসব বোকারা রাগের মাথায় কত্তরকম বোকামিই না করে!
এ প্রসঙ্গে ড. আলমাস বলেন গত নববর্ষে এক বাবা তার ছোট মেয়েকে নিয়ে মেলায় গেলেন। বাসায় রেখে গেলেন বড় মেয়েকে। বড় মেয়ে ভাবল বাবা তাকে ভালবাসে না, ছোট বোনকেই বেশি ভালবাসে; তাই তাকে নিয়ে মেলায় গেছে...। এসব ভাবতে ভাবতে তার রাগ চরমে পৌঁছে, যার সাথে যোগ হয় পূর্বের ছোটখাট ঘটনার স্মৃতি কবে বাবা তাকে একটু গালমন্দ করেছিল, কিছু দেবার সময় তাকে হয়ত একটু কম দিয়েছিল ইত্যাদি। এত্তসব ভেবে তার রাগ আরও বাড়তে থাকল। রাগ থেকে কষ্ট, ক্ষোভ, হতাশা এবং এক পর্যায়ে সে নিজকে ঝুলিয়ে দেয় সিলিং ফ্যানে। অথচ মেয়েটি একবারও ভাবল না যে বাবা তাকে কত গুরুত্ব দিয়েছে, তাকে কত দায়িত্বশীল মনে করেছে; বাবা তাকে যোগ্য মনে করেই পুরো বাসার দায়িত্ব তার ওপর দিয়ে বেড়াতে গেছে। এভাবে যেকোন ঘটনা বা বিষয়ের নেগেটিভ দিকগুলো না খুঁজে পজিটিভ দিকগুলো খুঁজলে তা মানুষকে ধ্বংসের পথে যাওয়া থেকে বিরত রাখে। তাই আমরা প্রোএকটিভ এটিচিউডের মাধ্যমে যুক্তি দিয়ে, বুদ্ধি দিয়ে, আন্তরিকতা ও বিনয় দিয়ে সকল পরিবেশ জয় করব। সকলের প্রতি আহ্বান নিজকে যদি আপনি ভালবাসেন, তাহলে অবশ্যই রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন। মনে রাখবেন, I am the powerful being and I am the master of every situation.
ড. আলমাস আরো বলেন আপনি যদি প্রকৃত যোদ্ধা হয়ে থাকেন, তবে আপনার রাগকে নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং সর্বক্ষেত্রে বিজয়ী হোন। রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে আপনাকে অবশ্যই ধৈর্যশীল হতে হবে। আর ধৈর্য ধারণের সহজ মাধ্যম হল বিনয়। আপনি বিনয়ী হোন, বিনয় আপনাকে ধৈর্য ধারণে সাহায্য করবে। আর ধৈর্যশীল ব্যক্তি কখনও রাগতে পারে না। তাই রাগ নিয়ন্ত্রণ করুন এবং সুখি ব্যক্তিদের একজন হোন।
প্রোএকটিভ এটিচিউডের বর্ণনা করে ড. আলমাস বলেন, প্রোএকটিভ মানুষের মাঝে প্রচুর ধৈর্যশক্তি থাকতে হয়। সকল ভাল চিন্তার সামষ্টিক প্রকাশই হচ্ছে প্রোএকটিভ এটিচিউড। অর্থাৎ আদর্শিক আচরণই আপনাকে প্রোএকটিভ হতে সাহায্য করবে। ধৈর্য ধরে থাকুন, প্রোএকটিভ হোন, সফলতা আসবেই আসবে।

এম হেলাল
সেমিনারের সঞ্চালক এম হেলাল বলেন, ২০২০ সালের মধ্যে একটি জ্ঞানভিত্তিক ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং আলোকিত জাতি তৈরি করার লক্ষ্যে ক্যাম্পাস কাজ করে যাচ্ছে। আর সেজন্য দরকার প্রোএকটিভ এটিচিউডের বিনয়ী মানুষ, যারা কোন পরিবেশেই হার মানে না, হতাশ হয় না। এরূপ মনোবল ও আত্মশক্তি অর্জনেই ক্যাম্পাস প্রোএকটিভ মানুষ সৃষ্টি করছে, পরিচালনা করছে এ ধরনের ফ্রি সেমিনার।
উল্লেখ্য, প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউডের পরবর্তী সেমিনার ২২ ডিসেম্বর বিকাল ৪টায় ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে।