ক্যাম্পাস পরিচালিত ফ্রি সেমিনার অন প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড

যিনি নিজের অবস্থানকে অন্যের উপরে দেখতে চান, তাকে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে

ক্যাম্পাস পরিচালিত ফ্রি সেমিনার অন প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড এর ২১তম পর্ব গত ৩ এপ্রিল ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারে আলোচ্য বিষয় ছিল ‘How to control Anger’ অর্থাৎ কীভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এবং ক্যাম্পাস সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিএসডিসি) এর মহাসচিব এম হেলালের সঞ্চালনায় উক্ত সেমিনারে মূল বক্তা ছিলেন প্রোএকটিভ এটিচিউডের ক্যারিশমেটিক উপস্থাপক ড. আলমাসুর রহমান।
ছাত্র-তরুণরা দেশের ভবিষ্যৎ; দেশকে সমৃদ্ধির পথে, অগ্রগতির পথে নিয়ে যেতে হলে তারাই হবে ভরসা। অথচ নানা কারণে তাদের মনে বাসা বাঁধে হতাশা, নেতিবাচক চিন্তা। দেশের উন্নয়ন কর্মযজ্ঞে গতি সঞ্চার করতে হলে তাদের মন থেকে দূর করতে হবে নেতিবাচক চিন্তা; তাদেরকে উজ্জীবিত করতে হবে হতাশামুক্ত সোনার বাংলা গড়ার সৃষ্টি সুখের উল্লাসে। সে লক্ষ্যে ক্যাম্পাস নিয়মিত পরিচালনা করে ফ্রি প্রোএকটিভ সেমিনার।

ড. আলমাসুর রহমান
মানুষের মনে রাগের উৎপত্তি এবং এর ক্ষতিকর দিকের ওপর আলোকপাত করে প্রোএকটিভ এটিচিউড কনসেপ্টের প্রবক্তা ড. আলমাসুর রহমান বলেন, রাগ মানুষের মনের অত্যন্ত ক্ষতিকর আবেগ। বিভিন্ন কারণে শরীরে স্ট্রেস বা চাপ সৃষ্টি হয়। এগুলো বের করে দিতে না পারলে মানুষের মেন্টাল প্রেসার বেড়ে যায়। এ প্রেসার থেকে ডায়বেটিস, ক্যান্সারসহ বিভিন্ন জটিল রোগের সৃষ্টি হয়। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে রাগারাগি কিংবা ঝগড়াঝাটির এক পর্যায়ে বেসামাল হয়ে নিজের সন্তানকে নিজেই আছাড় দিয়ে মেরে ফেলার মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটতে দেখা যায়।
তিনি বলেন- নবী-রাসূল বা মহামানবগণ রাগ করতেন না; যুক্তি, বুদ্ধি-বিবেচনায় মহামানবগণ রাগ নিয়ন্ত্রণে রাখতেন সর্বক্ষণ। যাদের বুদ্ধি নাই, বিবেচনা নাই অর্থাৎ বোকা বা সাধারণরাই রাগ করে। আপনি যদি সাধারণের ওপরের লেভেলে থাকতে চান, তাহলে রাগ করা যাবে না। ড. আলমাস বলেন- আপনি যদি শ্রেষ্ঠ মানুষ হন, তাহলে অন্যের সাথে রাগ দেখিয়ে আপনার ব্যক্তিত্বকে খাটো করতে পারেন না। মনে রাখবেন- যিনি নিজের অবস্থানকে অন্যের ওপরে দেখতে চান, তাকে রাগ নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে।
হাদিসের কথা উল্লেখ করে ড. আলমাস বলেন- যে আপনার সাথে ভালো ব্যবহার করে, তার সাথেই আপনি ভালো ব্যবহার করবেন -এটি নৈতিকতা নয়; নৈতিকতা হচ্ছে- আপনার সাথে ভালো ব্যবহার করুক বা না করুক, আপনি সবার সাথে ভালো ব্যবহার করবেন। নবী করিম (দঃ) বলেছেন- সে পালোয়ান নয়, যে অন্যকে হারায়; বরং সে-ই প্রকৃত পালোয়ান, যে রাগকে হারাতে পারে।
মানুষ সৃষ্টির পটভূমি উল্লেখ করে ড. আলমাস বলেন, স্রষ্টা জ্বীনকে আগুন দিয়ে তৈরি করেছেন আর মানুষ সৃষ্টি করেছেন মাটি দিয়ে। কারণ মাটি শান্ত, নরম-কোমল, সহনশীল, ক্ষমাশীল; আত্মস্থ করার ক্ষমতা বেশি, Pure এবং Perfect. তাই মানুষ মাটির মতোই হবে, মাটির মতো Cool থাকবে।
তিনি আরও বলেন- মানুষ পবিত্র হয়ে জন্মে, পরবর্তীতে পরিবেশ-পরিস্থিতির প্রভাবে সে Reactive হয়ে যায়। তবে আপনি শ্রেষ্ঠ হবেন কিনা, তা আপনাকেই নির্ধারণ করতে হবে; আপনার মন সুন্দর করতে হবে। কেননা সুন্দর মনের মানুষ রাগ করতে পারে না। তিনি বলেন, একবার রাসূল (দঃ) মক্কায় বসে আলাপ করছিলেন কয়েকজনকে নিয়ে। এমন সময় আবু জেহেল এসে বললেন, মুহম্মদ তুমি বড়ই কুৎসিত। নবীজি বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। বৈঠকে উপস্থিত হজরত ওমর (রাঃ) বললেন- ইয়ারাসূলুল্লাহ, ইয়া হাবীবআল্লাহ- আপনি চাঁদের মতো সুন্দর। নবী (দঃ) বললেন, ওমর তুমিও ঠিকই বলেছ। এরপর হজরত আবু বকর (রাঃ) নবীজিকে বললেন, আপনি দু’জনের মতকেই সঠিক বললেন কেন? জবাবে নবীজি বললেন, যে যেমন সে তেমনই মূল্যায়ন করবে; আমার এতে রাগ করা বা উত্তেজিত হবার কিছু নেই।
ড. আলমাস বলেন- পৃথিবীতে কেউ কাউকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না, শুধু নিজেই নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। তাই অন্যের কথায় বা কাজে রাগ না করে নিজকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। নিজে যদি নিজকেই নিয়ন্ত্রণ না করে, তাহলে দেখা যাবে সিকিউরিটি গার্ডের মুডের ওপর মালিকের মুড নির্ভর করছে। অর্থাৎ আমার সুইচ অন্যের হাতে; অন্যে সুইচ অন করলে আমি অন হই, অফ করলে আমি অফ হই। এটিতো হওয়ার কথা না, আমার নিয়ন্ত্রণ থাকবে আমার কাছে। তিনি আরও বলেন- মানুষ মানুষকে বদলাতে পারে না, সবার আগে নিজেকে বদলাতে হবে। মহামানবগণ প্রথমে নিজেদেরকেই বদলিয়ে তারপর অন্যদের বদলানোর কাজ করেছেন হেদায়েতের বাণী নিয়ে। আল্লাহ তাঁর প্রিয় রাসুল (দঃ) কে বলেছেন- আপনি মানুষকে ঈমান আনতে বাধ্য করতে পারেন না; আপনি তাদের দাওয়াত দিয়ে যান, হেদায়েতের দায়িত্বতো আমার।
তিনি বলেন- স্বল্পস্থায়ী জীবন নিয়ে পৃথিবীতে আমাদের আসা; আমরা কেউ একশ’ বছর আগে ছিলাম না, আবার কেউ একশ’ বছর পরও থাকব না। আল্লাহ বলেছেন, জন্ম ও মৃত্যু -এ দু’য়ের মধ্যে ভালো কাজ করার জন্য আমি মানুষকে দুনিয়ায় পাঠিয়েছি। আমরা কেউ চিরদিন থাকব না; কিন্তু আমাদের ভালো কাজগুলো থাকবে, সুকীর্তি থাকবে। তাই আমাদেরকে সর্বদা ভালো কাজ করতে হবে।
রাগ নিয়ন্ত্রণের উপায় সম্পর্কে ড. আলমাস বলেন- রাগ হলো Negative energy, চেপে রাখলে তা ক্ষতিকরভাবে বেরুবে। তাই রাগের কুফল থেকে নিজেকে রক্ষা করার সহজ উপায় হলো রাগ না করা। তারপরও কোনো কারণে যদি রাগ এসেই যায়, তাহলে সহজভাবে Stress বের করে দেয়াই ভালো। বিদেশে মানুষের রাগ আসলে তারা কুস্তি শেখার বস্তার ওপর ঘুসি মারতে থাকে, এতে রাগ প্রশমিত হয়। এরূপ সহজ কোনো উপায়ে Stress বের করে দিতে হবে, যেন বড় ধরনের কোনো ক্ষতি আপনার দ্বারা না ঘটে।
আসলে Life is full of adjustment. এখানে সহজে Accept করতে হবে, কোনো ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করলেও শান্তির স্বার্থে তা Accept করে নিতে হয়। এরপরে একশনে যাওয়া যায় যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। কোনো অবস্থাতেই Out-burst করা ঠিক নয়, Silence is power-এ নীতি মেনে চলতে পারলে অনেক Odd পরিস্থিতি এড়ানো যায়; রাগ করার প্রয়োজন হয় না।

এম হেলাল
সেমিনারের সঞ্চালক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এবং সিএসডিসি’র মহাসচিব এম হেলাল বলেন, মানুষের দু’টি Attitude থাকে- Proactive & Negative. Proactive attitude দিয়েই আমরা বিশেষ মানুষে পরিণত হব। Proactive & Positive attitude মানুষের জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রয়োজন, এজন্যই ক্যাম্পাস এ ধরনের সেমিনারের আয়োজন করে। ক্যাম্পাস’র এ ধরনের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করলে যে কারুর মন-মানসিকতার পরিবর্তন হবে।
তিনি বলেন- পৃথিবীতে এমন কোনো সমস্যা নেই, যার সমাধান নাই। সবসময় ব্রেন Cool রাখার চেষ্টা করবেন, স্রষ্টার সান্নিধ্যের জন্য এবং রহমত-বরকত পাবার জন্যও ব্রেন ঠান্ডা রাখা প্রয়োজন। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করবেন- আমি Imbalanced হব না, যুক্তি দিয়ে বুদ্ধি দিয়ে কাজ করব; তাহলে সাফল্য ধরা দেবেই।
ক্যাম্পাস’র পরবর্তী প্রোএকটিভ সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে ১৪ আগস্ট বৃহস্পতিবার বিকাল ৪-৩০ মিনিটে। সেমিনারের বিষয়- Happy Marriage Life, Husband-Wife Relationship.