ফ্রি সেমিনার অন প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড

খুশি চাওয়ার বিষয় নয়, খুশি থাকার বিষয়; খুশি কোনো লক্ষ্য নয়, খুশি হচ্ছে যাত্রাপথ

হতাশাগ্রস্ত ছাত্র-যুবক, ক্ষয়িষ্ণু সমাজ ও পশ্চাৎপদ জাতিতে পজিটিভ এটিচিউড জাগ্রত করে প্রোএকটিভ বাংলাদেশ গড়তে ক্যাম্পাস’র ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘ফ্রি সেমিনার অন প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড’। রিএকটিভ না হয়ে যেকোনো পরিবেশে প্রোএকটিভ ও পজিটিভ থেকে সফল ও জনপ্রিয় হওয়ার গুণ ও কৌশল শেখানো হয় এসব সেমিনারে।
গত ১৯ জুন ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হলো প্রোএকটিভ সেমিনারের ১৪তম পর্ব। এবারের বিষয়বস্তু ছিল- How to control anger? সেমিনারে মূল বক্তা ছিলেন প্রোএকটিভ এটিচিউডের প্রবক্তা ও বিশিষ্ট গবেষক ড. আলমাসুর রহমান। সেমিনার সঞ্চালনায় ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এবং ক্যাম্পাস সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিএসডিসি) -এর মহাসচিব এম হেলাল।

ড. আলমাসুর রহমান
চৌকস উপস্থাপক ড. আলমাসুর রহমান বলেন- প্রোএকটিভ বিষয়টি এখন আমেরিকা, ইউরোপ, ভারত প্রভৃতি দেশেও বেশ জনপ্রিয়। আমেরিকার টেক্সাস স্টেডিয়ামে How to overcome anger এর ট্রেনিং হয়। পশ্চিমারা control বা নিয়ন্ত্রণ শব্দটি পছন্দ করে না, তারা এ শব্দটিকে নেগেটিভ মনে করে। তাদের যুক্তি- মানুষ স্বাধীন, সে কন্ট্রোলড্ বা নিয়ন্ত্রিত হতে চায় না।
ড. আলমাস বলেন, ইউরোপ-আমেরিকার মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রোএকটিভ। তবু তারা How to overcome anger এর ওপর সেমিনার করে, ট্রেনিংয়ে অংশ নেয়। কারণ তারা নিজেদের ভেতরকে আরো সুন্দর করতে চায়; নেগেটিভ, সাইকিক পজিশনকে পজিটিভ ইমোশনে আনতে চায়। তারা inner peace এবং inner beauty গড়ে তুলতে চায়। ভেতর সুন্দর না হলে বাইরেরটা সুন্দর করে কী লাভ? ভালো গাছের বীজ থেকে ভালো গাছই হয়। মনকে যখন সিল্কের মতো নরম, কাশফুলের মতো কোমল ও মসৃণ করতে পারবেন, তখন সবকিছুতেই সৌন্দর্য খুঁজে পাবেন, যা দেখবেন, তা-ই সুন্দর মনে হবে। মনকে যদি পাথরের মত শক্ত করে ফেলেন, তখন কোনো সৌন্দর্যই চোখে পড়বে না, সুন্দর জায়গায়ও আপনার ভালো লাগবে না। নায়েগ্রা জলপ্রপাত বা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতের অপরূপ প্রকৃতির মাঝেও আপনি শান্তি খুঁজে পাবেন না।
ড. আলমাস আরো বলেন- মনটাকে শিশুর মত করে গড়ে তুলুন; কারণ শিশুর মন সহজ-সরল; কাগজের উড়োজাহাজ বানিয়েই সে অপার আনন্দ লাভ করতে পারে। কিন্তু আমরা যারা মনকে শক্ত করে ফেলেছি, তাদের মনে শান্তি নেই। আমাদেরকে positive thought, positive feeling এবং positive attitude-এর পথে অগ্রসর হতে হবে। ভালো চিন্তা করলেই না ভালোবোধ করব। তখন বন্ধু কেমন আছ জানতে চাইলে সহজ-সচ্ছন্দে বলতে পারব- ভালো আছি! খারাপ চিন্তা, খারাপ ফিলিং এবং খারাপ এটিচিউডের মধ্যে থাকলেতো বলতে হবে- না, তেমন ভালো নেই!
ড. আলমাস বলেন, সারাদিনে মানুষের মাথায় ৬০ হাজার রকমের চিন্তা আসে। এরমধ্যে ৮০% চিন্তাই নেগেটিভ বা খারাপ। এরূপ চিন্তায় থাকলে সারাদিন খারাপবোধ করবেন, অন্যের সাথে খারাপ ব্যবহার করবেন। এতে গুরুতর শারীরিক সমস্যা হয়। গবেষণায় প্রমাণিত- ভালো চিন্তা থেকে সিক্রেশন করে ভালো হরমোন; খারাপ চিন্তা করলে বের হবে খারাপ হরমোন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে- হৃদরোগ, স্ট্রোক, টেনশন, এ্যাংজাইটি, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস -এসব রোগের প্রধান কারণ নিরানন্দ মন, হাসিহীন গোমড়া মুখ। এসব রোগ একটার পর একটা হতেই থাকবে। মার্কিন বিজ্ঞানীরা বলছেন- মানুষ যদি ১৫ সেকেন্ড হাসে, তাহলে তার আয়ু বেড়ে যায় দু’দিন।
রাগ নিয়ন্ত্রণ, হাসিখুশি থাকার গুরুত্ব তুলে ধরে ড. আলমাস কিছু ঘটনার উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ৯৫% মৃত্যুর সম্ভাবনা নিয়ে এক জাপানী বাসায় ফিরে এসে বিভিন্ন কমিক বই সংগ্রহ করে এগুলো পড়ার মধ্য দিয়ে সময় কাটাতে কাটাতে একসময় আশ্চর্যজনকভাবে সম্পূর্ণ আরোগ্য লাভ করে।
আলোচনা প্রসঙ্গে ড. আলমাস একটি ভিডিও চিত্র প্রদর্শন করেন। যেখানে জাপানের বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন যে- পানিকেও প্রশংসা বাক্যের মাধ্যমে পরিবর্তন করে দেয়া যায়। সাধারণ পানিকে প্রশংসা করে মাইনাস ২৫ ডিগ্রিতে ক্রিস্টালাইজড্ করা হলো। দেখা গেল সে পানি ফুল আকৃতির হয়ে আছে। অন্যদিকে আরেক বোতল পানিকে ঘৃণামিশ্রিত বাক্য ব্যবহার করে একই তাপমাত্রায় রাখা হলো। দেখা গেলো, সে পানিটা কুৎসিত রূপ ধারণ করেছে।
ড. আলমাস বলেন, আমাদের শরীরে ৯০% পানি। আমাদের সকল নেগেটিভ চিন্তার কারণে সে পানি বিকৃত হয়ে যায়। বাড়িতে রাঁধুনির যদি মন খারাপ থাকে, তাহলে সে রান্নাতে নেগেটিভ চিন্তার প্রতিফলন ঘটবে; তখন আমরা সবাই নেগেটিভ খাবারই খাব। আসলে রাগ করে কোনো লাভ নেই। অন্যকে ক্ষমা করা মানে নিজেকেই ক্ষমা করা। মানুষ যখন রেগে যায়, তখন বিবেক-বুদ্ধি-বিবেচনা কাজ করে না। কোনো জ্ঞানী, বুদ্ধিমান ব্যক্তি রাগেন না।
না রাগলে কাজ হয় না -এটি ভুল যুক্তি। ভালোভাবে বললে বা করলে কাজও ভালো হয়। ভালোবেসে যদি কোনো কাজ না হয়, তাহলে রাগ দিয়ে তা কী করে হবে? রাগ নিয়ন্ত্রণ করেই পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হয়, পরিস্থিতিকে নিজের নিয়ন্ত্রণে আনা যায়, জয়ী হওয়া যায়, লক্ষ্যে পৌঁছা যায়। ড. আলমাস বলেন, বিজ্ঞানীরা রাগকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করেছেন। মানুষ প্রথমে বিরক্ত হয়; এরপর হতাশা, রাগ, মারামারি বা পাগলামি দেখা যায়। রাগের পূর্বে বিরক্তি ও হতাশা -এ দু’টো ধাপকে ধ্বংস করতে পারলে মানুষ ঝামেলামুক্ত থাকতে পারে। আমরা যা আশা করি, তা না পেলেই আসে হতাশা। আমরা খুশিতে কেন থাকতে পারি না। খুশিতে থাকাতো আমাদের নিজস্ব ব্যাপার। অথচ আমরা আমাদের খুশি থাকাটা অন্যের কাছে প্রত্যাশা করি। জুনিয়ররা কাজ করলে, নিজের পাওনা টাকা পেলে, সকালে বৃষ্টি না হলে আমরা খুশি। এর বিপরীত কিছু ঘটলেই বেজার। অর্থাৎ আমার সকল খুশি নির্ভর করছে অন্যের ওপর; কিন্তু আমার খুশিতো আমার ওপর নির্ভর করা উচিৎ ছিল।
খুশি প্রত্যেকের ব্যক্তিগত সম্পদ। খুশি চাওয়ার বিষয় নয়, খুশি থাকার বিষয়। খুশি ফিল করতে হয়, অনুভব করতে হয়, খুশি থাকে ভেতরে। সারা দেহ-মন জুড়ে আছে খুশি আর Happiness is my own property.
ড. আলমাসুর রহমান বলেন, যে ব্যক্তি যে রংয়ের চশমা দিয়ে আপনার নতুন জামাটা দেখবে -সে সেই রকম মন্তব্যই করবে। যার যেমন চেতনা-দৃষ্টিভঙ্গি সে তেমনই দেখবে, এতে আপনার কিছু যায় আসে না। ভালো মানুষ কেউ যদি আপনার বদনাম করে তাতেও আপনার বিরক্ত হবার কিছু নেই। রাসুল (দঃ) এর ওপর বিধর্মীরা পশুর নাড়িভুড়ি চাপিয়ে দিতেন। বিধর্মীদের নেতা আবু জেহেল রাসুল (দঃ)কে বললেন, আপনি কুৎসিত। জবাবে রাসুল (দঃ) বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। সেখানে হযরত ওমর (রাঃ) ছিলেন, তিনি রাসুল (দঃ)কে লক্ষ্য করে বললেন, আপনি চাঁদের মতো সুন্দর। রাসুল (দঃ) বললেন, আপনি ঠিকই বলেছেন। রাসুল (দঃ) এর কাছে আবু বকর সিদ্দিক (রাঃ) জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি দু’টোই ঠিক আছে বললেন, ব্যাপারটা কী? রাসুল (দঃ) বললেন, প্রত্যেক মানুষ অন্যের মধ্যে নিজেকে দেখে। ড. আলমাস বলেন, অতীতকে নিয়ে ভাবনার মধ্যে খুশির কিছু নেই; ভবিষ্যতে খুশির কি হবে না হবে তার নিশ্চয়তা কী? কাজেই খুশির সন্ধান করতে হবে বর্তমানে, এখনই। How I feel now is happiness. Happiness is not a destiny, happiness is a journey. মনে রাখতে হবে- আজকের দিনটাই সেরা দিন, সফল দিন। মানুষকে সম্মান-শ্রদ্ধা দেখাবেন, সুন্দর ব্যবহার করবেন। দিনটা হবে সত্যিই সেরা। আজকের দিনটা সেরা হলে পরবর্তী দিনগুলোও সেরা হবে। যতটুকু আশা করবেন, তার চেয়ে বেশি মেনে নেবেন। যেকোনো ঘটনা বা বিষয়কে মনে করতে হবে part of life, তবেই পাবেন অপার শান্তি। Life is full of adjustment. সহজে accept করলেন, ব্যাপারটার সাথে দ্বিমত পোষণ করেও শান্তির স্বার্থে তা accept করলেন; এরপর একশনে গেলেন যাতে এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে। আর যদি পাওনাদারের কাছ থেকে পাওনা আদায় করতে গিয়ে রাগারাগি করে ফিরে আসেন, তাহলে পরে পাওয়ার সুযোগটাও নষ্ট হয়ে গেল। যদি accept করে নিতে পারতেন, বলতে পারতেন- পরবর্তী সুযোগে টাকাটা দিয়ে দিলে আমার উপকার হবে -তা হলে পাওনাদার একটু হলেও ভাবতো। কোনো অবস্থাতেই out-burst করা ঠিক নয়, silence is power -এ নীতি মেনে চলতে পারলে অনেক odd পরিস্থিতি এড়ানো যায়।
ড. আলমাস বলেন, মানুষ কেবল নিজেকেই বদলাতে পারে; তাই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে নিজেকেই; অন্য মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ইচ্ছাশক্তির জোরে একজন প্রতিবন্ধীও যে অসাধারণ কাজ করতে পারে তার একটি ভিডিও চিত্র এ সময় প্রজেক্টরে দেখানো হয়। Nick নামের হাত-পাহীন এক যুবক নিজের সম্পর্কে বলছে- ছোটবেলা থেকে উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি, হাত-পা নেই তাতে কী, যতটুকু আছে তাকেই কাজে লাগিয়েছি। আমি আশা ছাড়িনি, এ প্রচেষ্টার কোনো শেষ ছিল না; উঠতে গিয়ে কতবার পড়ে গিয়েছি, আবার চেষ্টা -এভাবে একসময় সফল হয়েছি। আমার যে হাত নাই, পা নাই -এটা আমি চিন্তাই করিনি। আমার যা আছে তাকেই কাজে লাগাবো। আমি পারবো না -এ ধারণা ভুল; আমার দ্বারা কিছু হবে না -এটিও ভুল। হাত-পা নাই তবু মানুষ কত খুশি। Soul এবং brain -এ দু’টো জিনিস থাকলে মানুষ খুশি হতে পারে। তাই খুশি না চেয়ে খুশি তৈরি করতে হবে।

এম হেলাল
সেমিনারের সঞ্চালক এম হেলাল উপস্থিত ছাত্র-যুবকদের সামনে প্রোএকটিভ এটিচিউডের প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা তুলে ধরেন। তিনি বলেন- আজকের সেমিনার থেকে ছাত্র-যুবকরা জানল যে, রাগী মানুষরা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে ভুল করেন। রেগে গেলেনত’ হেরে গেলেন। নবী-রাসুল-পীর-মাশায়েখ-ধর্মযাজক এরা বিরুদ্ধবাদীদের দ্বারা নিগৃহীত হয়ে, অপদস্থ হয়েও রাগ দেখাননি, কাউকে অভিশাপ দেননি। শেষ পর্যন্ত তাঁরাই জয়ী হয়েছেন। রাগ নিয়ন্ত্রণ করেই তাঁরা এ সাফল্য এনেছেন। আমাদেরও সে পদাঙ্ক অনুসরণ করতে হবে, তবেই সাফল্য আসবে।