প্রাইম ইউনিভার্সিটিতে ক্যাম্পাস’র উদ্যোগে সেমিনার

প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার উদ্যোগে প্রাইম ইউনিভার্সিটিতে এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় গত ২৯ এপ্রিল। সফল ও জনপ্রিয় মানুষের প্রথম গুণঃ প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড শীর্ষক এ সেমিনারে প্রধান বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে প্রোএকটিভ এটিচিউড কনসেপ্টের প্রবক্তা, গবেষক ও সুনিপুণ উপস্থাপক ড. আলমাসুর রহমান; মডারেটর ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এম হেলাল, স্বাগত বক্তব্য রাখেন প্রাইম ইউনিভার্সিটির প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর মীর শাহাবুদ্দিন।
সামাজিক হতাশা, ভারসাম্যহীনতা ও অস্থিরতা কাটিয়ে উচ্ছল উজ্জ্বল জাতি তথা প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউডের জাতি গড়ে তুলতে ক্যাম্পাস আয়োজন করে আসছে রেগুলার ফ্রি সেমিনার অন প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড। ক্যাম্পাস পত্রিকার অডিটোরিয়ামে নিয়মিত আয়োজিত হয় এ সেমিনার; পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজেও ক্যাম্পাস পত্রিকার উদ্যোগে এরূপ সেমিনার আয়োজিত হয়। হতাশাগ্রস্ত ছাত্র-যুবক, ক্ষয়িষ্ণু সমাজ ও পশ্চাৎপদ জাতিতে ইতিবাচক চিন্তা-ভাবনার পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্যেই এ আয়োজন। সে ধারাবাহিকতায়ই প্রাইম ইউনিভার্সিটির অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হল উক্ত সেমিনার।

প্রো-ভিসি মীর শাহাবুদ্দিনঃ
সেমিনারের সূচনা বক্তৃতায় প্রাইম ইউনিভার্সিটির ফাউন্ডার প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ও সরকারের সাবেক সচিব এবং শিক্ষাব্রতী ও কল্যাণকামী ব্যক্তিত্ব মীর শাহাবুদ্দিন বলেন আজকের সেমিনার আয়োজনে প্রাইম ইউনিভার্সিটিকে আন্তরিক সহযোগিতার জন্য ক্যাম্পাস’র প্রতি আমরা অত্যন্ত কৃতজ্ঞ, তাদের জানাচ্ছি প্রাণঢালা অভিনন্দন। প্রোএকটিভ জাতি গড়ে তুলতে ড. আলমাস ও ক্যাম্পাস পত্রিকা যে নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, নিশ্চয়ই তার মর্ম বুঝবে দেশ ও জাতি। আজকের সেমিনার থেকে সুধীজন, বিশেষ করে তরুণ শিক্ষার্থীরা যে শিক্ষা ও চেতনা নিয়ে যাবেন, তা আগামীতে তাদেরকে চলার পথে দিক নির্দেশনা দিবে। জনাব শাহাবুদ্দিন ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এম হেলাল এবং ড. আলমাসুর রহমানকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জ্ঞাপন করেন।

এম হেলালঃ
সেমিনারের মডারেটর ও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এবং ক্যাম্পাস সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিএসডিসি) -এর মহাসচিব এম হেলাল বলেন প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড চেতনাকে জনপ্রিয় করা, একে ব্যাপক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার আন্দোলনে সম্পৃক্ত ক্যাম্পাস। প্রাইম ইউনিভার্সিটি অঙ্গনে ক্যাম্পাস পত্রিকার উদ্যোগে এ সেমিনার আয়োজনে সহযোগিতার জন্য ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষকে বিশেষ ধন্যবাদ। উপস্থিত সুধীজন ও ছাত্র-যুবকদের কাছে এ সেমিনার অত্যন্ত আকর্ষণীয় ও হৃদয়গ্রাহী হবে। আজকের সেমিনার থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজ জীবনে তা প্রতিফলিত করতে ছাত্র-যুবকদের প্রতি রইল উদাত্ত আহ্বান।

ড. আলমাসুর রহমানঃ
চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনায় ড. আলমাসুর রহমান আরও বলেন আপনাদের দেখে আমার খুব ভাল লাগছে। পৃথিবীতে কত জাতি, কত ভাষা। এক জাতির ভাষা আরেক জাতি বোঝে না। একমাত্র একটি ভাষাই আছে, যা সবাই বোঝে; তা হচ্ছে হাসি। আপনি হাজার চেষ্টা করে, হাজার কসরৎ করেও যে কথা বোঝাতে পারছেন না, তা সহজে বোঝাতে পারেন একটি হাসির মাধ্যমে। মানুষ যখন হাসে তখন তার মধ্যে সৌন্দর্য-সুষমা বিকশিত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন মানুষ যখন আনন্দ-বঞ্চিত হয় অর্থাৎ নিঃসঙ্গ থাকে, তখনই অসুস্থ হয়; সুখী হবার একমাত্র উপায় হলো নিজেকে সুখী মনে করা। মানুষ যখন গোমড়া মুখে থাকে, হাসিমুখে কারো সাথে আলাপ করতে চায় না তখন সে বিষণতায় আচ্ছন্ন থাকে; আবার মানুষ যখন হাসিমুখে থাকে তখন তার ভেতর আনন্দ, ভালবাসা, সম্প্রীতি এবং কল্যাণ চিন্তা ক্রীয়াশীল থাকে।
মানুষ যখন হাস্যোজ্জ্বল থাকে তখন তার ভেতর কোন দুশ্চিন্তা থাকে না, তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়, তাকে ডাক্তারের কাছেও যেতে হয় না। মানুষ যখন হাসে তখন তার ভেতর থেকে এমনই সৌন্দর্য, ভালোবাসা ও আন্তরিকতার বিচ্ছুরণ হয়, যা দিয়ে সে সহজেই অন্যকে জয় করতে পারে, অনেক অসাধ্য সাধন করতে পারে। সে তখন মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিতে পারে। নিজের হাসি দিয়ে সে অন্যকে আলোকিত করতে পারে, অন্যের মনের অন্ধকার দূর করে, তাকেও টানতে পারে হাসির মিছিলে, আনন্দের জগতে।
ড. আলমাস বলেন, পৃথিবীতে যত প্রাণি আছে একমাত্র মানুষ ছাড়া কেউ হাসতে পারে না। হাসতে পারাটা মানুষের একটা গুণ। এ গুণটা মানুষকেই অর্জন করতে হয়। সে যদি সব সময় হাসি-আনন্দের মধ্যে থাকে তাহলে সে সফল হয়ে যাবে, সেরা হয়ে যাবে। মানুষ যদি সফল হতে চায়, স্বীকৃতি পেতে চায় তাহলে হাসিই হল তার অন্যতম উপায়।
মানুষের বদনাম করা, গীবত করা, অহেতুক সমালোচনা করা এগুলো খারাপ অভ্যাস। এগুলো পরিত্যাগ করতে না পারলে মানুষের ভালবাসা পাওয়া যায় না, সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করা যায় না। শ্রেষ্ঠ মানুষ অন্যের ভেতর শ্রেষ্ঠ গুণের সন্ধান করে। প্রসঙ্গক্রমে ড. আলমাস বলেন ইসলাম ও রাসুল বিরোধী আবু লাহাব একবার বলেছিলেন, হযরত মুহম্মদ অত্যন্ত কুৎসিত। একথা শুনে সাহাবাগণ ক্ষুদ্ধ হন। হযরত আবু বকর এর প্রতিবাদ না করে নবীজীকে বললেন ইয়া রাসুলুল্লাহ, আপনি পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও সুন্দর। রাসুলুল্লাহ (সঃ) বললেন আবু বকর, তুমি ঠিকই বলেছ। আসলে প্রতিটি মানুষ অন্যের মধ্যে নিজেকে দেখতে পায়। একজন সুন্দর মানুষ, আলোকিত মানুষ অন্যের ভেতর সুন্দর-আলোকিত মন দেখে, আর প্রতারক অন্যের মাঝে দেখে প্রতারণা।
প্রতিটি মানুষের দু’টি ক্ষুধা আছে একটি পেটের ক্ষুধা, অন্যটি মনের ক্ষুধা। পেটের ক্ষুধা মেটানোর জন্য মানুষ চাকরি-বাকরি করে, ব্যবসা-বাণিজ্য করে, সময়-শ্রম ব্যয় করে। পাশাপাশি মানুষ তার মনের ক্ষুধা মেটাতেও কম তৎপর নয়। মানুষ চায় অন্যরা তাকে ভাল বলুক, ভালবাসুক, সম্মান-শ্রদ্ধা করুক, স্নেহ-মমতা দেখাক, তাকে গুরুত্ব দিক অর্থাৎ স্বীকৃতি দিক। সৃষ্টিকর্তা প্রত্যেকটি মানুষের মাঝে অন্যের মনের ক্ষুধা মেটানোর ক্ষমতা দিয়েছেন। ক্ষুধা মেটানোর সে ক্ষমতা যত বেশি কাজে লাগানো হবে, ততবেশি সে ঔজ্জ্বল্যে ভরে উঠবে; ক্ষমতা আরও বেড়ে যাবে। আপনি যত ভালবাসা দেবেন বিনিময়ে তত ভালবাসা পাবেন, যত স্নেহ-মমতা দেবেন, তত স্নেহ-ভালবাসা পাবেন, মানুষকে যত সম্মান জানাবেন আপনিও তত সম্মান পাবেন মানুষের কাছ থেকে। আপনি মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার করুন, তার সাথে আন্তরিকতার সাথে কথা বলুন, সুন্দর করে তার দিকে তাকান, তার সুন্দর চেহারার কথা বলুন, ব্যক্তিত্বের কথা বলুন, তার প্রশংসা করুন দেখবেন সে তখন অন্য মানুষ। আপনার সম্পর্কে সে আর নেতিবাচক কথা বলবে না, নেগেটিভ চিন্তাধারার মানুষ হলেও তার ভেতর পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করবে।
ড. আলমাস আরও বলেন, এ শতাব্দীতে মানুষের শ্রেষ্ঠ এচিভমেন্ট বা আবিষ্কার হলো মানুষ তার মন থেকে নেগেটিভ আচরণ দূর করে তদস্থলে পজিটিভ আচরণ স্থাপন করতে পেরেছে। নেগেটিভ এটিচিউড থেকে পজিটিভ এটিচিউডে নিজেকে পরিবর্তন করতে অনেকখানি মানসিক শক্তির প্রয়োজন। এটি প্রমাণিত সত্য যে রকেট স্বাভাবিক গতিতে ভূপৃষ্ঠ থেকে মহাশূন্যে যেতে পারে না, তার জন্য দরকার হয় প্রচ- শক্তি। সে শক্তিবলেই রকেট মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ভেদ করে মহাশূন্যে যেতে সক্ষম হয়। মানুষকেও তার দীর্ঘদিনের লালিত নেগেটিভ এটিচিউড ত্যাগ করে পজিটিভ এটিচিউডে আসতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। তবে এ শক্তি অর্জনে তাকে সাধনা করতে হবে। এক সময় সে শক্তি জয়লাভ করবেই এবং লক্ষ্য অর্জনে সমর্থ হবে।
মানুষকে প্রশংসা করতে হয়, নেগেটিভ কথাবার্তাগুলো একপাশে রেখে পজিটিভ দিকগুলো তুলে ধরতে হয়; এতে অসাধারণ ফল পাওয়া যায়। উদাহরণস্বরূপ, আমেরিকার দু’বন্ধু পার্টনারশীপে ব্যবসা করতেন। একবার এক বন্ধু ব্যবসা-প্রতিযোগিতায় কোম্পানির ৬০% ক্ষতি করে ফেলেন। তিনি মহাচিন্তায় পড়লেন বন্ধুকে গিয়ে কি বলবেন, কোম্পানির এত বড় একটা ক্ষতির কি কৈফিয়ত দেবেন! ভাবতে ভাবতে শংকিত মনে তিনি বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেলেন। ২য় বন্ধু ক্ষতির বিষয়টি আগে থেকেই অবগত। ১ম বন্ধু কিছু বলার আগেই পার্টনার-বন্ধু উচ্ছ্বসিত হয়ে বলে উঠলেন তুমি বলেই কোম্পানির ৪০% সম্পদ রক্ষা করতে পেরেছ। ক্ষতির প্রসঙ্গ না এনে ৪০ ভাগ রক্ষা পেয়েছে, এজন্য বন্ধুর প্রশংসা করলেন উচ্ছ্বসিত হয়ে। এভাবেই মানুষের মন জয় করতে হয়, মানুষকে আপন করে নিতে হয়।
সফল ও জনপ্রিয় মানুষ হতে হলে নিম্নোক্ত ৭টি গুণ থাকা প্রয়োজন। গুণগুলো হল ১। নিজেকে রিসার্চ করা অর্থাৎ জ্ঞানের পরিধি বাড়ানো; ২। একাকী নয়, সবাইকে নিয়ে কাজ করার বা বড় হবার উদার মনোভাব থাকা; ৩। অন্যের সাথে সামঞ্জস্য বা সধঃপয করার ক্ষমতা অর্জন; ৪। নিজেই শুধু বলব না, অন্যের কথাও শুনবো; বরং অন্যের কথা বেশি শুনবো -এ নীতিতে বিশ্বাসী হওয়া; ৫। আমি জিতবো, কিন্তু তুমি হারবে না, অর্থাৎ আমি জিতবো তুমিও জিতবে -এ মনোভাব পোষণ করা; ৬। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করার অভ্যাস এবং লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করার ক্ষমতা; ৭। ১ম গুণ অর্থাৎ সবচেয়ে বড় গুণ প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড।
ক্যাম্পাস আয়োজিত এ সেমিনারে প্রাইম ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ছাত্র-ছাত্রীরা উপস্থিত ছিলেন। প্রো-একটিভ এটিচিউডের পরবর্তী সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে ২১ জুলাই বুধবার বিকাল ৫টায় ক্যাম্পাস পত্রিকার অডিটোরিয়ামে।