ক্যাম্পাস আয়োজিত সেমিনারে ড. আলমাস

প্রোএকটিভ মানুষ যেকোন পরিস্থিতিতে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা-ভাবনা করে
সিদ্ধান্ত নিতে পারে বলে তাদের সাফল্য সুনিশ্চিত

হতাশাগ্রস্ত ছাত্র-যুবক, ক্ষয়িষ্ণু সমাজ এবং পশ্চাৎপদ জাতিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে ক্যাম্পাস সমাজ উন্নয়ন কেন্দ্র (সিএসডিসি) -এর ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘ফ্রি সেমিনার অন প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড’। যুব সমাজকে সর্বদা ইতিবাচক মনোভাবে চাঙ্গা রাখা ও সকল ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জনে সহায়তার উদ্দেশ্যেই ক্যাম্পাস এ উদ্যোগ নিয়েছে এবং নিয়মিত এ সেমিনার আয়োজন করে আসছে। সে ধারাবাহিকতায় ১৪ মার্চ ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হল এর ৪র্থ সেমিনার। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এবং সিএসডিসি’র মহাসচিব এম হেলালের সঞ্চালনে এ সেমিনারে মুখ্য আলোচক ছিলেন বিশিষ্ট গবেষক-উপস্থাপক ড. আলমাসুর রহমান।
সেমিনারের শুরুতেই ড. আলমাস বলেন প্রোএকটিভ এটিচিউড নিয়ে বাংলাদেশে কোন আলোচনা হতো না, মাত্র কিছুদিন ধরে এ কনসেপ্ট প্রচার হচ্ছে। যারা এসব সেমিনারে অংশ নিচ্ছেন তাদের জীবনে দেখা দিচ্ছে অভাবনীয় পরিবর্তন। ইউনিভার্সিটির এক চঞ্চলা-মুখরা মেয়েকে হঠাৎ শান্ত-শিষ্ট হয়ে যেতে দেখে মা-বাবা চিন্তিত হয়ে পড়লেন। ভাবলেন, কোন অসুখ-বিসুখ হয়নি’ত! জিজ্ঞেস করে জানা গেল ক্যাম্পাস’র আয়োজনে প্রোএকটিভ সেমিনারে অংশগ্রহণের পর থেকে তার এ পরিবর্তন হয়েছে।
ড. আলমাস আরেকটি মজার ঘটনার কথা বললেন। চট্টগ্রামের এক নামকরা কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভার আগে কর্মকর্তারা গেলেন এক প্রোএকটিভ সেমিনারে। তারপর সভার সময় ঘটল অভূতপূর্ব ঘটনা। সে কোম্পানির কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার মোটামুটি সিদ্ধান্ত আগেই নেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রোএকটিভ সেমিনার থেকে আসার পর তারা কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারলেন না, কারণ তারা তখন প্রোএকটিভ।
বর্ণিল উপস্থাপনায় ড. আলমাসুর রহমান বলেন, প্রোএকটিভ এটিচিউডের মানুষ চূড়ান্তভাবে সফল হয়। যে কোন পরিবেশ-পরিস্থিতিতে তারা প্রোএকটিভ থাকে; উত্তেজিত না হয়ে, আবেগ-তাড়িত না হয়ে ঠান্ডা মাথায় চিন্তা-ভাবনা করে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা কেবলমাত্র প্রোএকটিভ মানুষেরই রয়েছে। যতই তাদের রাগানো হয় তারা রাগবে না, গালি দিলে গালি দেবে না, উত্তেজিত হবে না মারামারিত’ দূরের কথা। প্রোএকটিভ মানুষরা পরিস্থিতি নিজের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।
ড. আলমাস আরও বলেন পশুকে পশু হতে হয় না, সে এমনিতেই পশু। কিন্তু মানুষকে মানুষ হতে হয়। যার মধ্যে যত বেশি মানবিক গুণাবলীর সমাবেশ হয় সে তত বড় মানুষ। যে ইস্পাতে যত বেশি কার্বন থাকে সে ইস্পাত তত বেশি মজবুত। মাটির বুকে শিকড়ের বিস্তার ঘটিয়ে গাছ হয় শক্তিশালী, অর্জন করে ঝড়-তুফান প্রতিরোধে সক্ষমতা। তেমনি মায়া-মমতা, ভালবাসা, সৌজন্যবোধ প্রভৃতি গুণাবলী মানুষকে শক্তিশালী করে। মানুষ মাটির তৈরি। মাটির মধ্যে রয়েছে সকল গুণের সমাহার। মাটি পাহাড়-পর্বত, সাগর-নদী সব বুকের মধ্যে ধারণ করে; সব সম্পদ ধারণ করে থাকে বুকে। প্রোএকটিভ মানুষও মাটির গুণে গুণান্বিত। অপমান, তাচ্ছিল্যকে সে উড়িয়ে দেয়; মাটির মত সহ্য করার, লালন করার, বিলিয়ে দেয়ার ক্ষমতা তার রয়েছে। পাক-কোরানে আল্লাহ বলেছেন আমি মাটি থেকে মানুষ তৈরি করেছি, মাটিতে তাদের রাখছি এবং মাটি থেকেই তুলে আনবো। প্রোএকটিভের বিপরীতে হল রিএকটিভ। রিএকটিভ মানুষ রাগালে রাগে, ক্ষেপালে ক্ষেপে, আবার তোষামোদে খুশি হয়। তারা সফল হয় না, জনপ্রিয় হয় না। অন্যদিকে প্রোএকটিভ মানুষ যেমনি ভাল পরিবেশে খুশি থাকে, তেমনি বৈরী পরিবেশকেও নিজের অনুকূলে নিয়ে আসতে পারে।
ড. আলমাস বলেন, রিএকটিভ মানুষ আবেগকে বড় করে দেখে, ইমোশন দ্বারা চালিত হয়। রিএকটিভ মানুষের অনেক সমস্যা তারা অন্যের ওপর দোষ চাপায়, কোন কাজ করতে না পারলে অজুহাত দেখায়। এর বিপরীতে প্রোএকটিভ মানুষের রয়েছে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ, তার আবেগ নিয়ন্ত্রিত এবং বিবেক দিয়ে ঢাকা। প্রোএকটিভ মানুষ বিশ্লেষণ করে দেখে একজন লোক কেন তাকে বকলো বা গালি দিল নিশ্চয়ই তার কোন ত্রুটি আছে। দু’ধারার মানুষের মধ্যে তুলনা করে তিনি বলেন রিএকটিভ মানুষের কাছে থাকা কোন জিনিস চাইলে সে দেয় না, অন্যদিকে প্রোএকটিভ মানুষ বলে how can I help you?
প্রোএকটিভ মানুষের স্বতস্ফূর্ততার প্রসঙ্গ টেনে ড. আলমাস বলেন সৃষ্ট জীবের মধ্যে একমাত্র মানুষই হাসতে পারে। একটি হাসি দিয়ে পাহাড় সমান সমস্যার সমাধান করা যায়। হাস্যোজ্জ্বল মুখ সব কিছু জয় করতে পারে। তিনি আরও বলেন, মানুষ মন থেকে নেতিবাচক জিনিসগুলো সরিয়ে ইতিবাচক বিষয়গুলো স্থাপন করলে সাফল্যের শীর্ষে চলে যেতে পারে। তার ভাষ্যমতে চিন্তা যখন বীজ, কর্ম তখন ফসল; কর্ম যখন বীজ, অভ্যাস তখন ফসল; অভ্যাস যখন বীজ, চরিত্র তখন ফসল; চরিত্র যখন বীজ, লক্ষ্য তখন ফসল।
বিশ্বের ১০০জন সফল ব্যক্তির ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে যে, তাদের ৭টি গুণের কারণে তারা এ পর্যায়ে পৌঁছতে পেরেছেন। এ ৭টি গুণের মধ্যে সবচেয়ে বড় বা প্রথম যে গুণটি কাজ করেছে তা হল তাদের প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড। অন্যান্য গুণগুলো হল লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করার ক্ষমতা, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা, সকলকে নিয়ে কাজ করার মানসিকতা, নিজে বলার পাশাপাশি অন্যের কথা শোনার অভ্যাস, সকলকে নিয়ে সফল হওয়া এবং অন্যের অধিকারের প্রতি নজর রাখা। অনুষ্ঠানের সঞ্চালক এম হেলাল সকলকে প্রোএকটিভ থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন আজ থেকে, এখন থেকে আমরা প্রোএকটিভ থাকবো, হারিয়ে যাওয়া হাসিকে ফিরিয়ে আনবো, হাসতে হাসতে বিশ্ব জয় করবো। আজকের সেমিনারের পর আমরা রিএকটিভ থাকবো না। পৃথিবীর এমন কোন সমস্যা নেই যার সমাধান নেই। মেডিটেশনের মাধ্যমে প্রোএকটিভ হওয়া যায়, ক্যাম্পাস অফিসে তার সুযোগ রয়েছে। তিনি অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী সবাইকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। অনুষ্ঠান শেষে ক্যাম্পাস’র পক্ষ থেকে ড. আলমাসুর রহমানকে শুভেচ্ছা-পুরস্কারে ভূষিত করে ম্রাচিং মারমা। প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউডের পরবর্তী সেমিনার হবে ২১ জুলাই বিকাল ৫টায় ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে।