ক্যাম্পাস আয়োজিত প্রোএকটিভ ও পজিটিভ এটিচিউড সেমিনার

বিশেষ মানুষ হতে হলে প্রোএকটিভ এটিচিউড তৈরি করতে হবে

১৩ ডিসেম্বর পৌষের সোনাঝরা বিকেলে ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হল প্রোএকটিভ এটিচিউড কর্মসূচির ৩য় সেমিনার। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এবং ক্যাম্পাস সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিএসডিসি) -এর মহাসচিব এম হেলালের সঞ্চালনে অনুষ্ঠিত সেমিনারে মুখ্য বক্তা ছিলেন প্রোএকটিভ এটিচিউডের প্রসারে নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিত্ব ড. আলমাসুর রহমান। চিত্তাকর্ষক উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে তিনি সম্মোহিত করে রাখেন শ্রোতাদের। অডিটোরিয়ামে ছিল পিন-পতন নীরবতা।
বক্তব্যের শুরুতে জনাব আলমাসুর রহমান বলেন মানুষকে মানুষ হতে হয় অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, অনেক সাধনা করে। যে মানুষের মধ্যে যতবেশি মানবিক গুণের সমাবেশ হয়েছে, সে তত বড় মানুষ। সেই ইস্পাতই মজবুত, যার মধ্যে বেশি পরিমাণ কার্বন রয়েছে। গাছের শিকড় যতবেশি মাটির গভীরে প্রোথিত, গাছ ততবেশি ঝড়-তুফান প্রতিরোধে সক্ষম। নম্রতা, ভদ্রতা, দয়া-মায়া, সৌন্দর্যবোধ মানুষকে মানুষে রূপান্তরিত করে।
বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতার প্রসঙ্গ টেনে জনাব আলমাসুর রহমান বলেন, প্রতিযোগিতার জুরিগণ সুন্দরীদের প্রশ্ন করে করে তাদের ভেতরের মানবিক গুণাবলীর পরিমাপ করেন। সুন্দরী প্রতিযোগিতায় এখন আর গায়ের রং কিংবা অঙ্গ সৌষ্ঠব প্রধান বিষয় নয়; সুন্দর মনের মানুষই প্রকৃত সুন্দর। মানুষ নিজ সাধনা বলে হতে পারে মহামানুষ; এ সাধনার গুণগত পরিমানের উপর নির্ভর করেই হওয়া যায় মানুষ, আধা মানুষ, সিকি মানুষ ইত্যাদি। আমরা কখনও কখনও মানুষকে পশুর সাথে তুলনা করি। কারণ, সেসব মানুষের মাঝে থাকে না মানবিক গুণ।
জনাব আলমাস বলেন আপনারা হয়ত শুনেছেন, জাহাজ থেকে একটি শিশু সমুদ্রে পড়ে গেলে মাছ তাকে ততক্ষণ পর্যন্ত উঁচিয়ে রাখে, যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ তাকে উদ্ধার না করে। মানব-বান্ধব সে মাছ ঐ শিশুটিকে অন্যান্য হিংস্র ও রাক্ষুসে মাছদের আক্রমণ থেকেও রক্ষা করে। অন্য একটি উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, বাঘের ভয়ে পলায়নপর গর্ভবতী হরিণী বাচ্চা প্রসব করলে বাঘ তা দেখে থেমে যায়, নবজাতক শাবককে পা দিয়ে একটু নাড়াচাড়া করে ফিরে যায়, হরিণীকেও আর তাড়া করে না, তার বাচ্চাকেও খায় না। কোথায় গেল তার হিংস্রতা, কোথায় পেল সে এই গুণ?
সফল ও জনপ্রিয় মানুষের গুণের উল্লেখ করে জনাব আলমাস বলেন মার্কিন দার্শনিক ড. কোপেক ২০০ জন সফল মানুষের ওপর গবেষণা করে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে, এদের প্রত্যেকের মধ্যে ৭টি বিশেষ গুণ ছিল। গুণগুলো হলো -
৭। তারা নিজেকে নিয়ে রিসার্চ করেছেন, জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে চেষ্টা করেছেন;
৬। একাকী নয়, সবাইকে নিয়ে কাজ করার বা বড় হবার উদার মনোভাব ছিল তাঁদের;
৫। নিজেই শুধু বলবো না, অন্যের কথাও শুনবো -এ নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন তাঁরা;
৪। আমি জিতবো, কিন্তু তুমি হারবে না। অর্থাৎ আমিও জিতবো, তুমিও জিতবে- এ মনোভাব ছিল তাঁদের;
৩। তাঁদের ছিল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করার অভ্যাস;
২। কোথায় যেতে চাই অর্থাৎ লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করার ক্ষমতা ছিল তাঁদের;
১। ১ম গুণ অর্থাৎ সবচেয়ে বড় গুণ ছিল Proactive attitude.
জনাব আলমাস বলেন, Proactive attitude-এর মানুষ সকল অবস্থায় সহজ ও স্বাভাবিক থাকে। কোন পরিস্থিতিতে রি-একটিভ হয় না, উত্তেজিত হয় না, আবেগ-তাড়িত হয় না। ঠান্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা তার রয়েছে। নবী-রাসুল, পীর-ফকির, সন্ন্যাসী -এঁরা প্রোএকটিভ মানুষ। এঁরা কোন অবস্থায় রাগেনি, হতাশ হয়নি, প্রচন্ড বাধাদানকারীকেও অভিশাপ দেয়নি।
তিনি বলেন, প্রোএকটিভের বিপরীত মেরুতে রয়েছে রিএকটিভ মানুষ। এরা আবেগ-উচ্ছ্বাস, রাগ-বিরাগ, তোষামোদ ইত্যাদি দ্বারা তাড়িত হয়; বৈরী পরিবেশে নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারে না। অথচ প্রোএকটিভ মানুষ সব অবস্থায় নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে।
জনাব আলমাস আরও বলেন, বিধাতা মানুষকে মাটি দিয়ে তৈরি করেছেন। মানুষ সৃষ্টির সেরা; অথচ স্রষ্টা তাকে মাটি দিয়ে তৈরি করলেন। এর কারণ হলো- মাটির মধ্যে রয়েছে সব সেরা গুণ। সব ময়লা-আবর্জনা মাটি টেনে নেয়, পরিষ্কার করে; পাহাড়-পর্বত ধারণ ক’রে ভূমি রক্ষা করে; উজাড় করে দেয় বুকের ভেতরকার মূল্যবান খনিজ সম্পদ। মাটি অগ্নিগিরিকে যেমন লালন করে তেমনি ধরে রাখে সাগরকে। আমাদের আদর্শ হবে আমরা মাটির মানুষ হবো, মাটির মত সব কিছু সহ্য করবো, লালন করবো, বিলিয়ে দেবো।
জনাব আলমাস উদাহরণ দিয়ে বলেন, একটি বলকে যত জোরে দেয়ালের দিকে ছুড়ে মারা হয় ততজোরে এটি ফিরে আসে; রিএকটিভ মানুষও তেমনই হয়ে থাকে। তারা আবেগের ওপর ভর করে চলে। এর বিপরীতে প্রোএকটিভ মানুষ তার আবেগকে বিবেক দিয়ে ঢেকে রাখে। গালি দিলে বলে- সে ভুল করে বলেছে, ঠিক হয়ে যাবে। কারো ধাক্কায় পড়ে গিয়েও বলে- আমি ঠিক আছি, আপনি ব্যাথা পাননি তো! response ability আছে বলে প্রোএকটিভ মানুষের রয়েছে responsibility. তারা ইতিবাচক সাড়া দিতে পারে।
সেমিনার-বক্তা আলমাসুর রহমান বলেন মানুষ হতে চায় মানুষ, মানবিক গুণ অর্জন করতে চায়। শ্রেষ্ঠ মানুষ হতে হলে তার হাসতে পারার গুণ থাকতে হবে। সৃষ্টজীবের মধ্যে মানুষই কেবল হাসতে পারে। কিন্তু দুঃখজনক যে, মানুষ হাসতে ভুলে গেছে। একটি হাসির জাদু দিয়ে মানুষ পাহাড়-প্রমাণ সমস্যার সমাধান করতে পারে। একটি হাসি লক্ষ কথার চেয়েও শক্তিশালী। হাসির সময় মানুষের ব্রেনে টেনশন থাকে না। সুখী হবার একমাত্র উপায় নিজেকে সুখী মনে করা।
জনাব আলমাস বলেন, মানুষের একটি নেগিটিভ দিক হলো অন্যের কথা না শোনা। অন্যের কথা শোনার অভ্যাস একটি বড় গুণ। শিশুও নিজের কথা অন্যকে শোনাতে চায়। যারা সফলতার শীর্ষে উঠেছে তারা মানুষের কথা শোনার অভ্যাস করেছে। তিনি বলেন, মানুষের গুণের প্রশংসা একটা বড় কাজ। সফল মানুষরা তা পারে। একজন মানুষকে নিচে নামাতে হলে নিজেকেই নিচে নামতে হয়। একজন প্রশংসিত মানুষ অন্যের প্রশংসা করতে পারে। পেটের ক্ষুধা আর মনের ক্ষুধা কোনটাই উপেক্ষণীয় নয়। পেটের ক্ষুধা মিটালে মানুষ খুশি হয় এটা স্বাভাবিক। কিন্তু এর পাশাপাশি মানুষের আরেকটি চাওয়া অন্যরা তাকে ভালোবাসুক, গুরুত্ব দিক, তার প্রশংসা করুক মনের এ ক্ষুধাকেও সে কম গুরুত্ব দেয় না। মনের ক্ষুধা মিটলে মানুষের আনন্দের সীমা-পরিসীমা থাকে না।
রসালো উপস্থাপনায় জনাব আলমাস বলেন, তুমি কি সুন্দর করে তাকাও, তোমার চোখ কি সুন্দর- এমন প্রশংসা-বাক্য যদি কোন তন্বী-তরুণীকে বলা হয়, তাহলে সে যতটা খুশি হবে, লক্ষ টাকা দিলেও সে তত খুশি হবে না। কারণ গুণের প্রশংসা করলে মানুষ খুশি হয়। মানুষের গুণের প্রশংসা করুন, দেখবেন পৃথিবীর সবচে’ বড় পুরস্কার আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
তিনি আরও বলেন মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ডিঙ্গিয়ে মহাশূন্যে যেতে নভোযানের প্রয়োজন হয় অনেক শক্তির, সেরূপ নেগেটিভ থেকে পজিটিভ এটিচিউডে আসতে হলেও প্রবল ইচ্ছাশক্তির প্রয়োজন হয়। লক্ষ্য থাকতে হবে আমি সফল হতে চাই, শীর্ষে পৌঁছুতে চাই।
জনাব আলমাসুর রহমান বক্তব্য শেষ করেন এই বলে লক্ষ্য স্থির করে আমাদেরকে ৪টি কাজ করার জন্য আজ এই মুহূর্ত থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। সেগুলো হলো
* সেরা মানুষের সেরা গুণ প্রোএকটিভ এটিচিউড -এই বিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে ধৈর্য ধরে থাকবো, ভাষা ব্যবহারেও সংযত হবো।
* আমি সফলতার শীর্ষে যেতে চাই, নিজের ভেতর সব সময় এই মনোভাব চাঙ্গা রাখবো।
* আশেপাশের মানুষকে আইডেন্টিফাই করবো, রিএকটিভ মানুষদের সম্পর্কে জানবো। তারা কেন নিজেদের বদলাতে পারছে না -তা ভেবে দেখবো।
* অতীত জীবনের দিকে তাকাবো। অতীত জীবনে কত সাফল্য হাতছাড়া হয়ে গেছে, রিএকটিভ থাকার কারণে! ধৈর্য ধরলে কত ওপরে যেতে পারতাম। এখন নতুন করে ভাবতে হবে ভবিষ্যতের আশায়।
সেমিনারের আয়োজক ও সঞ্চালক এম হেলাল বলেন, প্রোএকটিভ ও পজিটিভ এটিচিউড আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা সমাজে Superior human being গড়ার চেষ্টা করছি। কিছুদিন আগে ভিয়েতনাম ও শ্রীলংকা সফরের সময় সেসব দেশের মানুষের এটিচিউড লক্ষ্য করেছি। অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে এসব দেশ এককালে আমাদের পেছনে থাকলেও আজ তারা অনেক এগিয়ে। এখন তারা আমাদের চেয়েও উন্নত জাতি। এর অন্যতম কারণ, তাদের প্রোএকটিভ ও পজিটিভ এটিচিউড। আমাদের মন অহমিকাপূর্ণ, অথচ আমাদের রয়েছে প্রোএকটিভ গুণের অভাব। আমাদের লক্ষ্য হবে এখন থেকে আমরা প্রোএকটিভ হবো। জনাব আলমাসুর রহমান আমাদের মাঝে এসেছেন মনের আনন্দে, সমাজ উন্নয়নের তাগিদে, ছাত্র-যুবকদের উদ্বুদ্ধ করতে। আমাদের আরও ডেভেলপ করতে হবে। বড় বড় দেশগুলো আকার-আয়তনে বড় হয়নি, তারা বড় হয়েছে মানুষের তথা জাতির গুণে। আমাদের অগ্রগতি আছে, কিন্তু গতি খুব ধীর, উন্নত দেশের গতি জেট বিমানের মত। আমাদের সে গতি অর্জনের চেষ্টা করতে হবে। জনাব হেলাল আরও বলেন, প্রোএকটিভ এটিচিউডের মানুষ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমাদের দৃঢ়প্রত্যয়ী হতে হবে। প্রোএকটিভ এটিচিউডের পরবর্তী সেমিনার ক্যাম্পাস অডিটেরিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে ১৪ মার্চ ২০১০, রোববার, বিকেল ৪টায় এবং তৎপরবর্তী সেমিনার হবে ২১ জুলাই বুধবার বিকাল ৫টায়।