ক্যাম্পাস আয়োজিত প্রোএকটিভ ও পজিটিভ এটিচিউড সেমিনার

রিএকটিভ হবার কারণে মানুষের অনেক সাফল্য হাতছাড়া হয়ে যায়

১৪ অক্টোবর পড়ন্ত বিকেলে ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হলো প্রোএকটিভ এটিচিউড কর্মসূচির ২য় সেমিনার। ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এবং ক্যাম্পাস সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিএসডিসি) -এর মহাসচিব এম হেলালের সঞ্চালনে অনুষ্ঠিত উক্ত সেমিনারে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে প্রোএকটিভ এটিচিউডের অগ্রদূত, সুবক্তা ও সুনিপুণ উপস্থাপক জনাব আলমাসুর রহমান।
সূচনা বক্তব্যে জনাব আলমাসুর রহমান বলেন আমাদের আত্ম-উন্নয়ন করতে হবে অন্যের উন্নয়নের জন্য। আর এ আত্মোন্নয়নের জন্য আমাদের অবশ্যই কিছু বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলী অর্জন করতে হবে। জীবনে সফল, জনপ্রিয় ও সেরা হতে হলে সর্বাগ্রে যে গুণটি আত্মস্থ করা দরকার, তা ‘প্রোএকটিভ এটিচিউড’। প্রোএকটিভ এটিচিউড হল সেই এটিচিউড যা মানুষকে সকল পরিবেশে সহজ, সুন্দর, সাবলীল ও স্বতস্ফূর্ত রাখে। অর্থাৎ পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত নয় বরং ব্যক্তি কর্তৃক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণ। আর এর বিপরীত হল রিএকটিভ এটিচিউড, যেখানে মানুষের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। রিএকটিভ হবার কারণে মানুষের জীবনের অনেক সাফল্য হাতছাড়া হয়ে যায়।
ক্যারিসম্যাটিক বক্তৃতায় জনাব আলমাস সফলতার জন্য অত্যাবশ্যকীয় কিছু গুণাবলীর অবতারণা করেন। তার মধ্যে রয়েছে প্রাণখোলা হাসি, অপরের প্রশংসা করার অভ্যাস, অন্যের কথা শোনা প্রভৃতি। হাসি মানুষের একটি বড় গুণ। সৃষ্ট জীবের মধ্যে কেবল মানুষই হাসতে পারে। হাসির মাধ্যমে নিরসন করতে পারে পাহাড় সমান সমস্যা, এক হাসির মাধ্যমে দূর হতে পারে সারা বছরের টেনশন। আমেরিকার একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের এক সেলসম্যানের বেতন ছিল প্রতি সপ্তাহে ৭ হাজার ডলার। কৌতুহলী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে সে সেলসম্যান বলে যে হাসির কারণেই ক্রেতার নিকট তার গ্রহণযোগ্যতা বেশি, তাই তার এ সাফল্য। হাসি দিয়েই সে সবাইকে চার্মড করতে পারে। হাসার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও না হাসাটা হলো কোটি টাকা ব্যাংকে থাকা অবস্থায় চেকবই না থাকার সমান। একটি নির্মল হাসির মাঝে রয়েছে অনেক ইতিবাচক মেসেজ।
জনাব আলমাস বলেন একটি পশু জন্মগতভাবেই পশু, কিন্তু মানুষকে ‘মানুষ’ হতে হয় অনেক চেষ্টা ও সাধনার মাধ্যমে। যার মধ্যে যত বেশি গুণের সমাবেশ হবে সে তত বড় মানুষ। যে ইস্পাতে যত বেশি কার্বণ সে ইস্পাত তত বেশি মজবুত হয়। বিশ্ব সুন্দরী প্রতিযোগিতায় এখন আর কেবল বাহ্যিক রূপ-লাবণ্যই দেখা হয় না, মানবিক গুণাবলীর ওপরও সমধিক জোর দেয়া হয়।
জনাব রহমান আরও বলেন, বিশ্বে ২০০ জন সফল ও জনপ্রিয় মানুষকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এ সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয়েছে যে, প্রত্যেক সফল ও জনপ্রিয় মানুষের ৭টি গুণ রয়েছে। এর মধ্যে ৭ম গুণটি হল নিজকে রিসার্চ করা অর্থাৎ আত্ম-অনুসন্ধানের মাধ্যমে জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি করা। এর পূর্বের গুণগুলো হল সবাইকে নিয়ে কাজ করার অভ্যাস ও অনুরূপ মানসিকতা তৈরি; অন্যকে বলার সুযোগ দেয়া; আমি জিতব কিন্তু তোমার ক্ষতি হবে না অর্থাৎ আমি জিতব, তুমিও জিতবে এ দৃষ্টিভঙ্গি; কি করতে চাই বা কি করব সে লক্ষ্য সঠিকভাবে নির্ধারণ; কাজের অগ্রাধিকার নির্বাচন তথা সর্বদা অগ্রাধিকারভিত্তিতে কাজ করা। সফল ও জনপ্রিয় মানুষের ১ম গুণ হল Proactive attitude.
যে কোন অবস্থায়, যে কোন পরিস্থিতিতে উত্তেজিত না হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা রয়েছে প্রোএকটিভ মানুষের। প্রোএকটিভ মানুষের বৈশিষ্ট্য হলো তিনি কোন অবস্থা বা পরিস্থিতিতে রাগবেন না, উত্তেজিত হবেন না, ক্ষেপবেন না, সীন ক্রিয়েট করবেন না। সর্বংসহা মাটির সাথে প্রোএকটিভ মানুষের গুণের সামঞ্জস্যের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি বলেন মাটি সবকিছু সহ্য করে, সবকিছু গ্রহণ করে, মাটি বুক থেকে সব উজাড় করে দেয়। প্রোএকটিভ মানুষ বোঝে মাটির গুণ। প্রোএকটিভ মানুষ তার আবেগকে ধারণ করে রাখে, গালি দিলেও উত্তেজিত হয়ে পাল্টা গালি দেয় না। অপমান করলেও তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখায় না।
এর উল্টো হচ্ছে reactive মানুষ। তারা রাগালে রাগে, ক্ষেপালে ক্ষেপে। রিএকটিভ মানুষ সব কিছুতে রিএক্ট করে। তাদের কেউ গালি দিলে সেও গালি দেয়। সর্বদা পরিবেশ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় বলে তারা জীবনে সফল হতে পারে না। সফল মানুষের গুণের কথা বলতে গিয়ে জনাব আলমাস আরও বলেন, শোনার অভ্যাসও মানুষের একটি বড় গুণ। শিশুও কথা শোনাতে চায়, তাকেও উপেক্ষা করা যায় না। কথায় আছে, words make you win, words make you ruin. মানুষের নেতিবাচক দিক হলো, অযথা অন্যের সমালোচনা করা। কাউকে নিচু করতে হলে, ছোট করতে হলে নিজেকেই যে প্রথমে ছোট হতে হয় তা আমরা বুঝি না। একজন উদার মনের মানুষ অন্যকেও উদার মনে করে। বড়ত্বের লক্ষণ অন্যের মাঝে বড়ত্ব দেখা।
জনাব আলমাস বলেন, মানুষের পেটের ক্ষুধার পাশাপাশি মনের ক্ষুধাও কম নয়। মানুষ প্রশংসা চায়। মানুষের গুণের প্রশংসা করে বলতে হয় তুমি কত সুন্দর করে হাসতে পারো, তাকাতে পারো। হাসির প্রশংসা করা হলো মানুষের বিরাট সম্পদ। প্রশংসার মধ্যে লুকিয়ে আছে সাফল্যের রহস্য। যেকোন পরিস্থিতি কঠিন হলেও প্রশংসা করতে পারার মাধ্যমে সফল হওয়া যায়। তিনি আরও বলেন, শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার হলো মানুষ তার নেগেটিভ এটিচিউড দূর করতে Positive এটিচিউড প্রতিস্থাপন করতে শিখেছে। সে যদি চায় তাহলে অভ্যাসও পরিবর্তন করতে পারবে।
একটি উদাহরণ টেনে জনাব আলমাস বলেন আমেরিকার দুই শিল্পপতি পার্টনারের একজন বিদেশে নতুন বিনিয়োগে ৬০% লস দিয়ে ফিরে আসেন মনে দুশ্চিন্তা নিয়ে, পার্টনারের কাছে কি জবাবদিহি করবে, পার্টনারশীপ ভেঙ্গে যাবে কি না ইত্যাদি। কিন্তু অবাক কান্ড ঘটলো, পার্টনার তার কথা শুনে বললো congratulation, একমাত্র তুমি বলেই কোম্পানীর ৪০% সম্পদ রক্ষা করতে পেরেছো।
মানুষকে জয় করতে হলে এভাবেই প্রশংসা করতে হয়। হযরত মুহম্মদ (দঃ)- এর চলার পথে যে বুড়ি কাঁটা বিছিয়ে রাখতো সে বুড়ির অসুখের সময় তাকে দেখতে গিয়েছিলেন দয়াল নবী। পরবর্তীতে সেই বুড়ি নবী (দঃ)-এর পথে আর কাঁটা বিছাতো না। প্রতিটি মহান মানুষের গুণ হলো Proactive attitude. নিজেকে সফল করতে চাইলে মানুষের ৩টি করণীয় কাজের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন জনাব আলমাস। আর তা হল এখন থেকে নতুন মানুষ হবো, কারো তিরষ্কারে রাগ করবো না এবং মহান মানুষের মহান গুণ ধারণ করবো। এ ৩টি বিষয় চিন্তা-চেতনায় রাখলে Proactive হবার পথে এগিয়ে যাওয়া সহজ হবে।
জনাব আলমাসুর রহমানের পরামর্শ ভাষা প্রয়োগেও মানুষকে Proactive হতে হবে। যেকোন মানুষের অতীত জীবনের কথা চিন্তা করলে বোঝা যাবে, তার জীবনে কোন না কোনভাবে সাফল্য আসার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, কিন্তু reactive হওয়ার কারণে সে সাফল্য হাতছাড়া হয়ে যায়। তাঁর মতে মানুষ আগুনের তৈরি জীন বা নূরের ফেরেশতা থেকে শক্তিশালী এবং মর্যাদাশীল। প্রভুভক্ত হিসেবে অনেক প্রাণীর কাহিনী আমরা জানি। কিন্তু মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। মানুষের ভালবাসা, মানুষের ব্যবহার হবে সকল জীবের সেরা এটাই স্বাভাবিক।
প্রোএকটিভ সেমিনারের আয়োজক-সঞ্চালক এম হেলাল তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন হাসি দিয়ে আমরা বিশ্বজয় করবো, হাসি দিয়ে মুক্তো ঝরাবো। আজ থেকে আমাদের প্রস্তুতি প্রোএকটিভ হবার, এখন থেকেই শুরু হবে এর বাস্তবায়ন। প্রোএকটিভ হতে হলে রিএকটিভ এটিচিউড পরিহার করতে হবে। মেডিটেশনকে তিনি রিএকিটভ এটিচিউড পরিহারের অন্যতম পন্থা বলে সকলকে ক্যাম্পাস অফিসে প্রতি শনিবার মেডিটেশন ও ইয়োগা চর্চায় আমন্ত্রণ জানান। পিনপতন নিরবতার প্রোএকটিভ সেমিনার শেষে উপস্থাপক অংশগ্রহণকারীদের জিজ্ঞাসার জবাব দেন। পরবর্তী প্রোএকটিভ সেমিনার হবে ১৩ ডিসেম্বর রবিবার বিকাল ৪-৩০ মি. ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে।