ক্যাম্পাস পরিচালিত ফ্রি সেমিনার অন প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড

মানুষের মাঝেই জয়ী হবার শক্তি আছে
So you are not victim, you are the victor

হতাশা, নেতিবাচক চিন্তা, আত্মবিশ্বাসের অভাব আমাদের যুব সমাজকে পেছনের দিকে টেনে রাখছে। অথচ তারাই দেশের প্রাণ ও ভবিষ্যতের আশা-ভরসা। ছাত্র-তরুণ তথা যুব সমাজকে জাগাতে না পারলে দেশের উন্নয়নে গতিসঞ্চার হবে না; দেশ কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারবে না। এ সার কথাটিই ক্যাম্পাস’র চিন্তা-চেতনায় অনুরণন তুলেছে, ক্যাম্পাসকে উদ্দীপ্ত করেছে আলোকিত জাতি গঠনে নিবেদিত হতে। সে লক্ষ্যে ক্যাম্পাস’র সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ ফ্রি সেমিনার অন প্রোএকটিভ এন্ড পজিটিভ এটিচিউড।
গত ১১ ডিসেম্বর ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় এ সেমিনারের ২০তম পর্ব; আলোচ্য বিষয় ছিল- Key to Success. সিএসডিসি’র মহাসচিব এম হেলালের সঞ্চালনায় উক্ত সেমিনারে মূল বক্তা ছিলেন প্রোএকটিভ এটিচিউডের প্রবক্তা, গবেষক ও চিত্তাকর্ষক উপস্থাপক ড. আলমাসুর রহমান।

ড. আলমাসুর রহমান
জনপ্রিয় উপস্থাপক ড. আলমাসুর রহমান বলেন, Key to Success অর্থাৎ সফলতার চাবিকাঠি। সফলতার চাবি পেতে হলে আমাদেরকে IQ এর চেয়ে EQ বেশি বাড়াতে হবে। তিনি বলেন- সফল নেতৃত্বগুণে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও জাতীয় ক্ষেত্রে সাফল্য আসে। সমাজে দেখা যায় অনেকের পড়ালেখা আছে, টাকা-পয়সাও যথেষ্ট -অথচ তার সফলতা নেই; কোথায় যেন আটকে গেছে সফলতার তালা। আবার আরেকজন সম্পদহীন ব্যক্তি- তার কাছেই সফলতা ধরা দেয় তার ধৈর্য, সহনশীলতা ও দৃঢ় প্রত্যয়ের জন্য।
তিনি বলেন- সবাই সেরা হতে চায়, সফল হতে চায়। মানুষ সফল হবার জন্যেই পৃথিবীতে এসেছে, ব্যর্থ হবার জন্যে নয়। You are not victim, you are the victor. মানুষের মধ্যেই জয়ী হবার শক্তি আছে, কিন্তু সে তা কাজে লাগাতে পারছে না কেন? সেটিই ভাবতে হবে; অনুসন্ধান করে বের করতে হবে এর প্রতিকার। নিজের ওপর দৃঢ় আস্থা থাকতে হবে -এটি আমার দ্বারা সম্ভব। মানুষ যখন চাঁদে যাবার স্বপ্ন দেখেছে, এ নিয়ে চিন্তা করেছে, তখনই সে সফল হয়েছে। মানুষ চাঁদে প্রথিত করে এসেছে বিজয়ের পতাকা।
ড. আলমাস বলেন, পশু-পাখি স্বপ্ন দেখতে জানে না বলে তাদের মধ্যে পরিবর্তন নেই; একই ধাঁচে চলছে তাদের জীবন-প্রণালী। বাবুই পাখি একই প্যাটার্নে বাসা তৈরি করছে লাখ লাখ বছর ধরে। একমাত্র মানুষই কল্পনা বা চিন্তা করতে পারে পরিবর্তনের, মানুষই সৃষ্টি করতে পারে। মানুষের মধ্যেই সৃষ্টিশীলতার গুণ আছে। আর সৃষ্টিশীলতাকে ভর করেই আসে সফলতা। মানুষ কোনোকিছু সম্ভব মনে করলেই তা সম্ভব হবে। মানুষ চাঁদে যেতে না চাইলে কখনো চাঁদে যেতে পারত না। কালামে পাকে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন- আমি আমার জ্ঞানের ক্ষুদ্র একটা অংশ মানুষকে দিয়েছি। সাধনার মাধ্যমে সে জ্ঞান লাভ করে মানুষ কত কিছুই না সৃষ্টি করছে!
ড. আলমাস বলেন- যে মানুষ বড় হবার কল্পনা করে না, সফল হতে চায় না -সে ভিক্ষা করবে, পরের কাছে হাত পাতবে, পথে পথে ঘুরে বেড়াবে; অবস্থার পরিবর্তনের চিন্তা তার মাথায় আসবে না; ভাবতে পারবে না মহাজন বাক্য It is possible. উদাহরণ টেনে ড. আলমাস বলেন - একসময় এটি স্বতঃসিদ্ধ ছিল যে, মানুষ দৌড়ে ৪ মিনিটের কমে ১ মাইল দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে না। বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়ে বিজ্ঞানীরাও দেখালেন- মানুষের পক্ষে তা সম্ভব নয়। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে ভেঙে দিলেন রবার্ট ব্ল্যাক। তিনি ৪ মিনিটের কম সময়ে একই দূরত্ব অতিক্রম করলেন ১৯৫৩ সালে। সেই থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে ২০ হাজার মানুষ সেই রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এতে মানুষের মনে প্রত্যয় জেগেছে যে- রবার্ট ব্ল্যাক যখন পেরেছে, আমরাও পারব; It is possible.
পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃংগ এভারেস্ট বিজয়ের কথা উল্লেখ করে ড. আলমাস বলেন, এডমন্ড হিলারী ১৯৫৩ সালে প্রথম হিমালয়ের এভারেস্ট চূড়ায় পৌঁছে মানুষের বিজয় পতাকা উড়িয়ে দিয়েছিলেন। আগের বছর তিনি এভারেস্ট শৃংগে পৌঁছার চেষ্টা করেন, কিন্তু কাছাকাছি গিয়েও বৈরী আবহাওয়া ও প্রতিবন্ধকতার জন্য ফিরে আসেন। সাংবাদিকরা ব্যর্থতার কারণ জানতে চাইলে হিলারী বললেন, হে এভারেস্ট- তুমি যতটুকু বড় হবার হয়ে গেছ; কিন্তু আমার মনের শক্তি ক্ষণে ক্ষণে বড় থেকে আরও বড় হচ্ছে, আমি তোমাকে পরাজিত করবই। সাংবাদিকরা তখন তাঁকে প্রশ্ন করেন, আপনার কাছে তখন কোনটাকে সবচেয়ে শক্ত কাজ বলে মনে হয়েছে- জবাবে হিলারী বলেন, পর্বত জয় করা আমার কাছে কঠিন মনে হয়নি, আমার কাছে সবচেয়ে কঠিন মনে হয়েছে- মনকে বোঝানো যে, এভারেস্ট চূড়ায় পৌঁছা আমার পক্ষে সম্ভব। মনে যাতে কোনো দ্বিধা বা দুর্বলতা না আসে, সেটি ঠিক রাখাই ছিল কঠিন কাজ।
ড. আলমাস আরও বলেন- নিজেই যদি নিজেকে ছোট ভাবেন, তাহলে বড় হবেন কীভাবে! সৃষ্টির সেরা থাকার জন্যই স্রষ্টা মানুষ সৃষ্টি করেছেন। নিজেকে নিকৃষ্ট কেন ভাববেন; কেন বলবেন আমার দ্বারা সম্ভব হবে না; আমি সেরা নই, আমার পড়াশোনা তেমন নেই, আমি একটা ফালতু! এসব নেগেটিভ ধারণা ও অন্তর্দাহ মানুষকে ছোট করে ফেলে। সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজেকে খারাপ ভাবলে, দুর্বল ভাবলে সারাদিন আপনি তা-ই থাকবেন। অসুস্থ বলে ঘোষণা দিলে ব্রেন সে ইনফরমেশন সারা অঙ্গে পৌঁছে দেয়, ফলে আপনি সত্যি সত্যি অসুস্থ হয়ে পড়বেন। অথচ সত্যিকার অর্থে অসুস্থ নন, মনের দ্বিধা-দ্বন্দ্ব আপনাকে অসুস্থ করে তুলেছে; আপনি নিজেকে নিজে ছোট করছেন। কিন্তু আপনিতো পরাজিত হবার জন্য জন্মাননি, আপনি জন্মেছেন জয়ী হবার জন্যই। আপনি ঘুম থেকে উঠেই ভাববেন- I am handsome, I am great, আমি সুন্দর, আমি নায়ক; এ রকম ভাবলে দিনটা আপনার ভালো যাবে, সব কাজে সফল হবেন। সকালে উঠে ব্রেনকে ভালো ইনফরমেশন দিলে সবকাজে সফল হবেন।
সফলতার জন্য ড. আলমাস ADA শব্দের ৩টি অর্থবোধক অক্ষরের দিকে লক্ষ্য রাখতে বলেন। সেগুলো হলো A- Signifies Ambition (আকাঙ্খা); D- Decision (সিদ্ধান্ত); A- Action (কাজে লাগা)। যেমন ক্যাম্পাস এ আসার আকাঙ্খা বা ইচ্ছা আপনাদের ছিল, এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং এসে পৌঁছে কাজে লেগে গেছেন।
ড. আলমাসুর রহমান বলেন, পৃথিবীর সেরা ধনী বিল গেটসকে জিজ্ঞাস করা হয়েছিল- এত ধনীর মধ্যে আপনি এত দ্রুত কীভাবে বিশ্বসেরা হলেন; জবাবে তিনি বললেন, I was in right way in right time. আমার উদ্দেশ্য ছিল, পরিকল্পনা ছিল -যা ওদের ছিল না। অনেকের পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু তাদের সঙ্গে আমার পার্থক্য ছিল- আমি প্রচন্ড শক্তিতে কাজে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম আমার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে। প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসই আমাকে শীর্ষে পৌঁছে দিয়েছে। অন্যদের পরিকল্পনা থাকলেও এর বাস্তবায়নে ক্ষীপ্রতা ছিল না।
ড. আলমাস বলেন, ভবিষ্যৎ আপনার হাতে; অতীত নিয়ে ভাববেন না। সর্বদা Confidence বৃদ্ধি করুন, পজিটিভ চিন্তাশক্তি বাড়ান, Relation গড়ে তুলুন। তিনি বলেন, বস্তিতে থাকার সিদ্ধান্ত নিলে ১০ তলা ভবনে থাকবেন কীভাবে? পথে পথে ঘুরে বেড়ালে দশতলা না হয়ে ঠিকানা হবে গাছতলা। ভিক্ষুক থাকতে চাইলে স্রষ্টা ৭০ দরজা খুলে দেন, আবার সফলতা চাইলে সে দরজাও খুলে যাবে। মানুষ যদি নিজের ভাগ্য পরিবর্তনের চেষ্টা না করে, তাহলে আল্লাহতালা সহায় হন না।
ড. আলমাসুর রহমান তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে সফল লোকের কথা তুলে ধরেন, যারা সাফল্যের চাবিকাঠি হাতে পেয়েছেন। এর মধ্যে আজাদ প্রোডাক্টের মালিকও রয়েছেন। ড. আলমাস বলেন, আমি একদিন আজাদ প্রোডাক্টে গেলে আজাদ সাহেব আমাকে বললেন- আপনাকে ভালোভাবে বসতে দিতে পারলাম না বলে দুঃখিত। এখানে যেদিন ২৫ তলা ভবন নির্মাণ করব, সেদিন আয়েশ করে বসবেন। আজাদ প্রোডাক্টের মালিক মতিঝিলে ২৫ তলা হোটেল ভবন নির্মাণ করেছেন। ২৭ বছর আগে তিনি যে আকাংখা ব্যক্ত করে ২৫ তলা ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে তিনি এ্যাকশনে অর্থাৎ কাজে লেগে গিয়েছিলেন সিরিয়াসলি; তাতে তার সাফল্য আসে এবং জীবনের মোড় ঘুরে যায়। আরেকজন সফল লোকের উদাহরণ তুলে ধরে ড. আলমাস বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে সেই সময়কার একজন ক্লিনিকের মালিককে দেখেছি রমরমা ব্যবসা করছেন। মালিকের ছেলে পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়ে টেকনিশিয়ানদের দ্বারা ব্যবসা পরিচালনা করছিলেন। মালিকের ছেলের আরও বড় ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ছিল না, এ নিয়ে তিনি ভাবনা-চিন্তাও করেননি। তার ক্লিনিক যেমনটি ছিল তেমনটিই রয়ে গেছে। অন্যদিকে তার কর্মচারী টেকনিশিয়ান স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, তিনি এর চেয়েও বড় ক্লিনিকের মালিক হবেন। বাস্তবেও তিনি তা-ই হয়েছেন। আপনি কত বড় হবেন, তা আপনার হাতেই। গায়ের রং বদলানোর ক্ষমতা আপনার নেই, কিন্তু জীবনকে বদলে দিতে পারেন সাফল্যের চমকে। We can’t change our past, but we can change our future, then make a right choice.

এম হেলাল
অনুষ্ঠানের সঞ্চালক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এবং সিএসডিসি’র মহাসচিব এম হেলাল বলেন, জগদ্বিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিস বলেছেন- It is possible. আমরা পারি। ক্যাম্পাস তার বহুমুখী কার্যক্রমের মাধ্যমে ছাত্র-যুবকদের এই শিক্ষাই দিচ্ছে - Impossible is a word, we don’t beleive.
এম হেলাল বলেন, ব্রেনকে আমরা নানাভাবে জগাখিচুড়ি করে ফেলি। এতে ব্রেন Hang হয়ে যায়, ফলে আউটপুট আসে না, আসলেও সে আউটপুট হয় Negative. ব্রেনকে সবসময় Positive রাখতে হবে; সহজ-সরল, Creative & Constructive চিন্তা করতে হবে। Proactive & Positive চিন্তার ভুবনে নিজেকে সবসময় নিবিষ্ট রাখলে সফলতা অবশ্যই ধরা দেবে। আর এই সফলদের নিয়ে আমাদের দেশও কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। পরবর্তী প্রোএকটিভ সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে ৩ এপ্রিল, বিকেল সাড়ে ৪ টায়, ক্যাম্পাস অডিটোরিয়ামে। সেমিনারের বিষয় How to Control Anger. অর্থাৎ কীভাবে রাগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়।