ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠানে কাজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি

ফ্রি কম্পিউটার ট্রেনিং নেয়ার সুবাদেই আমার প্রথম ক্যাম্পাস-এ আসা। ট্রেনিং করাকালীন একদিন জানলাম ক্যাম্পাস’র সমাজ সচেতনতা কার্যক্রম সম্পর্কে, যেখানে ছাত্র-যুবকরাও কাজ করতে পারে। এর আগে এ ধরনের কাজে অংশগ্রহণ করিনি বলে এটা আমার কাছে বিরাট সুযোগ মনে হল। কাজ করতে পারব কি না -এ নিয়ে মনে যথেষ্ট সন্দেহ থাকলেও একরকম জোর করেই এ কাজে অংশ নিলাম। জীবনে বড় অভিজ্ঞতা হল এই ক্যাম্পেইন করতে গিয়ে। মানুষের সাথে চলা-বলা, নিয়ম-শৃঙ্খলা মানা, কর্মে টিকে থাকার দৃঢ় মানসিকতা এবং পারস্পরিক মেলামেশা ও বন্ধুত্বের মাঝে কাজের আনন্দ -এ সবই ক্যাম্পেইন করতে গিয়ে শিখেছি।

ক্যাম্পাস’র এ ক্যাম্পেইনের মূল কাজ হল মানুষের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টি করা। দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে ক্যালেন্ডার, লিফলেট, ডেস্কস্লিপ, পোস্টার প্রকাশ করে এবং বিনামূল্যে দেশব্যাপী বিতরণ ও প্রচার করে ক্যাম্পাস। তারই অংশ হিসেবে আমরা গেলাম সরকারি-বেসরকারি অফিস-আদালতে। এসব প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতনদের রুমে গিয়ে সৌজন্যমূলক কথা বলা, তাদেরকে ক্যালেন্ডার-স্টিকার-কার্ড দেয়া, রুম থেকে ভদ্রভাবে বিদায় নিয়ে আসা -নতুন অবস্থায় এসবই ছিল একরকম চ্যালেঞ্জ।

প্রথমে কাজগুলো আমার খুব কঠিন লাগত। অসম্ভব জড়তা কাজ করত, নার্ভাস ফিল করতাম। তাছাড়া কাজের শেষে পারফরমেন্সের ওপর সমালোচনাও করা হত। সবার সামনে নিজের ত্রুটি শুনতে কার ভাল লাগে? কিন্তু অবাক করার বিষয় হচ্ছে, খুব স্বচ্ছতার সাথে একজন আরেকজনের কাজের সমালোচনা করত এবং ব্যক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে কেউ কাউকে আক্রমণ করত না। তাছাড়া ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক এম হেলাল স্যার যখন ভুলগুলোকে শুধরে নেবার সুযোগ দিতেন এবং সংশোধনের পথ দেখিয়ে দিতেন, তখন খুব ভাল লাগত। এভাবেই আমি সাহস পেতে লাগলাম এবং বার বার ভুল হওয়ার পরও চেষ্টা করতে থাকলাম। স্বীকার করতেই হবে, আমার সহকর্মীরা আমাকে যথেষ্ট সাহায্য করেছে।

ক্যাম্পেইনের সুবাদে কতরকম প্রতিষ্ঠানে যে যাওয়ার সুযোগ হল! যেমন- বিসিএস প্রশাসন ভবন, ঢাকা জজ কোর্ট, সরকারি বেসরকারি ব্যাংকসমূহ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং দেশের নামকরা স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে। এছাড়া ঢাকার বাইরে সিলেট, গাজীপুর, নরসিংদী,মানিকগঞ্জেও কাজ করার সুযোগ হয়। ঢাকার বাইরে কাজ করার মধ্যে আমি এক ধরনের charm feel করি।

ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাও ক্যাম্পেইনে অংশ নেন। কাজের বেলায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখলাম- তারা খুব আন্তরিক, সহজ-সরল, অনাড়ম্বর এবং কর্মপ্রিয়। তারা সংস্থার প্রয়োজনে যেকোন কাজ করতে দ্বিধা করে না এবং দায়িত্ব নিয়ে শৃঙ্খলার সাথে কাজটি সম্পন্ন করে। কাজের সময় তারা সিনিয়রের ভূমিকা পালন করে। আর কাজটি শেষ হয়ে গেলে বন্ধুর মতো আচরণ করে। তাদের এই সহজ-সরল প্রগতিশীল মানসিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে।

এসব কারণে আমি ক্যাম্পেইনের কাজ সম্পূর্ণভাবে বুঝতে পারি এবং করতে সক্ষম হই। এতে আমার আত্মবিশ্বাস এত বৃদ্ধি পেয়েছে যে, এখন মনে হয় চেষ্টা করলে যেকোন কাজ করতে পারব। কাজের জন্য আসলে প্রয়োজন আন্তরিকতা এবং উদ্দীপনা। ক্যাম্পেইনকালীন সমাজের সাধারণ মানুষদের খুব কাছ থেকে দেখেছি। মানুষ যে সত্যিকার অর্থেই ভাল এবং ভাল কিছুকে সহজেই গ্রহণ করে -এটা আমার কাছে পরিষ্কার। ক্যাম্পাস’র স্টিকার বা ক্যালেন্ডারের ভাল ভাল কথাগুলো, যেমন- “অন্যায় বলবে না, অন্যায় শুনবে না, অন্যায় করবে না;” “অন্যকে সাহায্য করতে থাকুন, আপনার সমস্যাও কেটে যাবে” এগুলো তারা পছন্দ করত এবং প্রশংসাও করত।

ক্যাম্পেইনের কাজ করতে গিয়ে ক্যাম্পাস থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি। যেমন- শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, সকল পরিবেশে নিজেকে adjust করার মানসিকতা, constructive way অবলম্বন করে স্বাধীনভাবে কাজ করার উপায়, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার দৃঢ়তা, নিজেকে জানা ও আত্মোন্নয়ন, দক্ষতা অর্জনের কৌশল, প্রতিকূল পরিবেশেও proactive হয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়া, world standard কাজ করা এবং গতিশীল বিশ্বের সাথে নিজেকে dynamic করার কৌশল... আরও কত কী!

ক্যাম্পাস-এ সকল কিছুর সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ করা হয়। মানুষ কর্তৃক সৃষ্টির সেবাই যে স্রষ্টার ইচ্ছা, তা সব সময় স্মরণ করিয়ে দেয়া হয়। কারও প্রতি অনাচার করলে প্রাকৃতিকভাবেই সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তা বার বার বলা হয়। ক্যাম্পাস প্রাকৃত হওয়ার ওপর গুরুত্ব দেয়। ক্যাম্পাস বিশ্বাস করে, প্রকৃতিগতভাবে সমৃদ্ধ মানুষ চারপাশকে আলোকিত করতে সক্ষম। অনুভূতির কথা যদি বলি, ক্যাম্পাসকে আমার কাছে মনে হয়েছে মানুষ গড়ার কারখানা। এখানে ব্যক্তিগত ত্রুটিকে বড় করে না দেখে ব্যক্তিকে বড় করে দেখা হয়। মানুষকে প্রকৃতিগতভাবে গড়ে তোলার জন্য নিবেদিতপ্রাণ এই প্রতিষ্ঠানটিকে এখন আমার নিজের পরিবারের মতো মনে হয়। ক্যাম্পেইনের সময় ব্যক্তিগত একটা অনুভূতির কথা বলি। বাবা চাইতেন, আমি ম্যাজিষ্ট্রেট হব। আমি তা হতে পারিনি। কিন্তু এজলাস জায়গাটির প্রতি আমার দুর্বলতা রয়ে গেছে। এজলাসকে মনে হত খুব পবিত্র এবং মর্যাদাপূর্ণ। ক্যাম্পেইনের কারণে এজলাসে ওঠার সুযোগ হয় আমার। আমি যখন ঐ জায়গাটায় পা দেই, তখন সে কয়েক মুহূর্ত ছিল আমার কাছে বিস্ময়কর। ক্যাম্পাস-এ না এলে এই অভিজ্ঞতা আমার কখনই হত না। এসব অনুভবের স্মৃতি আমার জীবনে চির অম্লান হয়ে থাকবে।

পরিবার ও সমাজ থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার সুযোগ হয় না। ক্যাম্পাসে এসে আমি যা শিখেছি, তা আমার জীবনের মূলধন। পৃথিবীতে অনেক কিছুই করার আছে। আমরা বহু কিছু আশা করি। তার কোনটি পূরণ হয়, কোনটি হয় না। ক্যাম্পাস আমাকে শিখিয়েছে পাওয়া বা অর্জনের প্রকৃত অর্থ। ক্যাম্পাস মনে করে, মানুষ জীবনে যা কিছু ভাল করে তা-ই তার পাওয়া, তা-ই তার অর্জন। আর এই ভাল কিছু অর্জন করতে হলে চাই মহান সৃষ্টিকর্তার ওপর আস্থা ও বিশ্বাস, মনের একাগ্রতা আর অদম্য ইচ্ছা।

ক্যাম্পাস-এ কাজের সুযোগ পেয়ে এখন নিজেকে অনেক সমৃদ্ধ মনে হয়। এই প্রতিষ্ঠান আমাকে ব্যক্তিগত-প্রাতিষ্ঠানিক উভয় ক্ষেত্রে lackings overcome করার সুযোগ দিয়েছে, যার ফলে আমি সাহস পেয়েছি এবং কাজের চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি সবসময় দোয়া করি, পৃথিবীর স্থায়িত্বকাল অবধি ক্যাম্পাস নিজ পরিচয়ে কাজ করে যাক। যে স্বপ্ন ক্যাম্পাস লালন করে,“জ্ঞানভিত্তিক সমাজ ও আলোকিত জাতি গঠন”- এর সার্থক বাস্তবায়ন হোক।

পরিশেষে এটুকুই বলব, সৃষ্টিকর্তা যদি ভাল কিছু করার জন্য পৃথিবীতে আমাকে পাঠিয়ে থাকেন, তবে তিনি যেন আমাকে ক্যাম্পাস-এ কাজ করে যাবার অবারিত সুযোগ দেন। কারণ ক্যাম্পাস আমাকে শিখিয়েছে- “আমি পারি”, “আমি পারব”। আর এই বিশ্বাসই আমার জন্য যথেষ্ট। সৃষ্টিকর্তা আমাদের সকল ভাল প্রয়াস সফল করুক। আমিন।