আত্মশুদ্ধির অন্যতম উপায়, Sorry বলা

জাতিগতভাবে আমরা অনেক গুণের অধিকারী। আমাদের রয়েছে মাত্র নয় মাসে দেশ স্বাধীন করার গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। পাশাপাশি এই আমাদেরই কিছু অভ্যাস ও দুর্বলতার কারণে ভবিষ্যত নিয়ে মাঝে মাঝে তৈরি হয় শঙ্কা। ব্যাখ্যার অনেক কিছু থাকলেও আজ কেবল একটি বিষয় নিয়েই বলব; আর তা হল- আমাদের Sorry বলার অভ্যাস।

Sorry শব্দের আভিধানিক অর্থ দুঃখিত হওয়া, ব্যথিত হওয়া, অনুতপ্ত হওয়া, অনুশোচনা বোধ করা প্রভৃতি। অপারগতার জন্য দুঃখ প্রকাশে ব্যবহৃত হয় Sorry অর্থাৎ কোন ভুল বা অন্যায় হয়ে গেলে আমরা বলি, Sorry । এই Sorry -টা বলতে আমাদের যে অনীহা, তা সত্যিই বিস্ময়কর। বর্তমান অবস্থা যা-ই হোক না কেন অতীত ঐতিহ্যে ভাস্বর উচ্চ নাসিকার বাঙালি জাতির Sorry বলতে খুব অনীহা। কিন্তু কেউ যদি একটু ঠান্ডা মাথায় Sorry’র গভীরে যেত, তাহলে তার আর Sorry বলতে কোন অসুবিধা হত না বলেই আমার বিশ্বাস। আমাদের বড় সমস্যা যে, আমরা নিজেদের দোষ দেখি না। আর সেজন্যই আমাদের Sorry বলতে অসুবিধা হয়।

একজন মানুষ যখন নিজের ভুল বুঝতে পারে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সে লজ্জিত হয়। আর লজ্জিত হলে সে মনে মনে বলে- আমি এরকম একটা ভুল করলাম, আমারতো বোঝা উচিত ছিল, Sorry! এই Sorry শব্দটা তখন অটোমেটিক তার ভেতর থেকে উচ্চারিত হয়; এবং একজন বুঝদার মানুষ একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই বুঝতে পারবেন যে- Sorryটা আসলে তিনি নিজেকেই বলেন, অন্যকে নয়। এই Sorry বলার মধ্য দিয়ে তিনি লজ্জিত হন, তার ভদ্রতাবোধ প্রকাশ পায়, তার ভুল স্বীকার করে নেন; আর ভুল স্বীকার করলেই ভুল শোধরানোর প্রসঙ্গ আসে...।

কিন্তু আমরা বাঙালিরা এসব ক্ষেত্রে অন্যকিছু ভাবি। আমরা মনে করি- ভুল হয়েছে তো কি হয়েছে? কেন আরেকজনকে Sorry বলব? ওর বুঝি কোন ভুল হয় না? একটু ভুল হলে কি হয়? এ সকল প্রশ্ন বা চিন্তা তাৎক্ষণিক মনে চলে আসে বলে Sorry আর বলা হয় না। ব্রেন তখন নিজের ভুল স্বীকার করা বাদ দিয়ে অন্যের ত্রুটি খোঁজায় ব্যস্ত হয়ে ওঠে। যে ব্রেন অন্যের দোষ-ত্রুটি নিয়ে গবেষণায় মেতে ওঠে সে ব্রেন নিজের ত্রুটি দেখতে পায় না, তাই Sorry বলার প্রশ্নই ওঠে না। আর Sorry বলা হয় না বলেই ভুলগুলোও শুধরানো হয় না। ব্যক্তি ক্রমেই হয়ে ওঠে ছিদ্রান্বেষী, জটিল থেকে জটিলতর।

একজন মানুষ যখন বুঝতে পারে আমার একটা ভুল হয়েছে, ভুলটা করা আমার উচিত হয়নি, আমার বোঝা উচিত ছিল -তখন তার ভেতর একটা ভাল মন কাজ করে। আর সেই ভাল মন থেকেই তখন সে বলে- Sorry । এই Sorry বলার মধ্য দিয়ে তার মাথা নত হয় না, বরং সে তার মাথা আরও উঁচু করে নেয়। বিবেকবান ও আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন কোন মানুষ দিনের পর দিন Sorry বলে যেতে পারে না। সে মনে করে, আজ এই ভুলটা করেছি; পরবর্তীতে সে এই জাতীয় কাজের সময় এ ধরনের ভুলের ব্যাপারে সতর্ক থাকে। যার ফলে তার কাজটা সুন্দর ও সুচারুভাবে সম্পন্ন হয়। ফলে তাকে আর কারও কাছে Sorry বলতে হয় না। অর্থাৎ একদিনের একটি ছোট্ট Sorry, ভবিষ্যতের অনেক Sorry বলা থেকে তাকে রক্ষা করে। তাই আমার দৃষ্টিতে Sorry বলা মানে, নিজেকে শুদ্ধ করা। একজন মানুষ একই ভুল কয়বার করতে পারে? একবার, দু’বার, তিনবার -এর বেশি না, যদি সে মানুষ হয়; এবং একজন মানুষ কখনই এমন কাজ করে না, যার জন্য তাকে অন্যের কাছে ছোট হতে হয়, লজ্জিত হতে হয়। আর এজন্যই যখন একজন মানুষ কোন ভুল করে Sorry বলে, তার ব্রেন সেটা রেকর্ড করে। পরবর্তীতে ব্রেন তাকে শোনায় যে- তুমি ভুল করেছ, তাই তুমি অন্যের কাছে Sorry বলেছ, কেন তোমার অন্যকে Sorry বলতে হবে?

ব্রেনের এই রেকর্ড শুনে শুনে এক সময় সে ভাবে- সত্যিতো, আমি কেন অন্যকে Sorry বলব। এরপর সে তার কাজের ব্যাপারে আরও সতর্ক হয়; তার ভুলের সংখ্যা কমতে থাকে। সে হয়ে ওঠে কর্মদক্ষ ও নিখুঁত ব্যক্তি; ব্যক্তি থেকে ক্রমেই গড়ে ওঠে ব্যক্তিত্ব। একটু খেয়াল করলেই বোঝা যাবে যে- তার এ চৌকস ব্যক্তিত্ব অর্জনের পেছনে কাজ করেছে ছোট্ট একটি শব্দ, Sorry.

আমার পরিবারের একজন সদস্য একদিন বাইরে থেকে ঘরে ফিরে গল্প শুরু করে দেন। গল্পের তোড়ে তিনি ভুলেই গেলেন যে- তিনি রিকশা দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, ভাড়া দেননি। অনেকটা সময় পর ঐ রিকশাওয়ালা আমার ৪তলা বাসার দরজায় নক করল। দরজা খুলে বিত্তান্ত শুনে আমি তাকে বললাম- Sorry, Sorry. এরপর আমি তাকে তার প্রাপ্য ভাড়ার দ্বিগুণ টাকা দিয়ে দিলাম এবং আবারও বললাম Sorry. আমার এত Sorry বলা দেখে পরিবারের আরেক সদস্য হাসতে হাসতে আমাকে বললেন- রিকশাওয়ালাকে এত Sorry বলছ, রিকশাওয়ালা কি তোমার ঐ Sorry বোঝে? আমি বললাম- রিকশাওয়ালা Sorry না বুঝতে পারুক, আমিতো বুঝি। আমারতো বোঝা উচিত ছিল, এরকম ঘটনাও ঘটতে পারে। রিকশাওয়ালাকে Sorry বলায় আমার সম্মান কমেছে বলে আমি মনে করি না; বরং এ অভিজ্ঞতা আমাকে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি থেকে রক্ষা করবে -এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

ক্যাম্পাস অফিসে কাজ করার সুবাদে এমন কিছু শিক্ষা পেয়েছি, যা আসলে পয়সা খরচ করেও অন্যত্র পাওয়া যায় না। এখানে শেখানো হয় উন্নততর মানুষ হবার কৌশল, যার একটি হচ্ছে- thanks বলা এবং Sorry বলা। প্রথম প্রথম এ চর্চা করতে অসুবিধাই হত, প্রায়ই ভুলে যেতাম। কিন্তু যেহেতু করব বলে ঠিক করেছি, তাই এখন খুব সহজ হয়ে গেছে। সারাদিনে কত অসংখ্যবার যে thanks এবং Sorry বলি! কই, একটুওতো খারাপ লাগছে না।

আমাদের বড় আজব স্বভাব- আমরা ভুল করলে লজ্জিত হই না, কিন্তু Sorry বলতে লজ্জা পাই। কি অদ্ভূত আমাদের লজ্জা পাওয়ার ধরন! আমরা মনে করি, Sorry বলা মানে বোধহয় হেরে যাওয়া; তাই আমাদের মুখে অনেক বচন আসে, যুক্তি আসে, তর্ক আসে, চোখে-মুখে মুহুর্মুহু ভাবের বদল হয় কিন্তু Sorry আর আসে না। আমরা বীরের জাতি- যুদ্ধ বুঝি, শান্তি বুঝি না। তাই আমরা সামান্য বিষয় নিয়ে বিশাল গলদ সৃষ্টি করতে পারি, কিন্তু Sorry বলে বিশাল গলদকে থামিয়ে দিতে পারি না। ভুল বা অন্যায় করলে আমাদের লজ্জা লাগে না কিন্তু Sorry বলতে আমাদের বড়ই লজ্জা।

যেকোন বাক-বিতন্ডায় Sorry হতে পারে খুব সুন্দর সমাধানের উপায়। তর্ক করা, কথা বাড়ানো, এক পর্যায়ে মারামারি-হাতাহাতিতে চলে যাওয়া খুব সহজ। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলছি- Sorry আমাদের অনেক কথা থেকে রক্ষা করে, আমাদের সময় বাঁচায়, আমাদের সম্পর্ক নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে, ভবিষ্যত সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যায়, নিজের আত্মশুদ্ধি ও আত্মোন্নয়ন ঘটায়, দক্ষতা বৃদ্ধি করে আরও কত কি...। সর্বোপরি Sorry যে আমাদের সার্বিক উন্নতির দিকে নিয়ে যায় -এটা আমরা ক’জন বুঝতে পারি?

তাই আসুন, এখন থেকে যেকোন ভুলের জন্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে Sorry বলতে শিখি, নিজেকে শুদ্ধ করি। কেবল বলার জন্যই বললে কিন্তু কাজ হবে না -এটাও মনে রাখতে হবে। বলতে হবে মন থেকে, নিজেকেই।

-usrony@yahoo.com