বিশেষ খবর



Upcoming Event

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া কেমন চলছে!

ক্যাম্পাস ডেস্ক মতামত
img

২৩ জুলাই একটি দৈনিক পত্রিকায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ে একজন কলাম লেখকের পর্যবেক্ষণ নিয়ে একটি লেখা ছাপা হয়েছিল। সেখানে লেখক দুটি প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেছিলেন। প্রথমটি হচ্ছে, সম্প্রতি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ৭ শতাংশ ভ্যাট বা বাড়তি করারোপ, যা প্রকারান্তরে শিক্ষার্থীদেরই প্রদান করতে হবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের ভ্যাট বা বাড়তি করারোপ অন্যায়। দ্বিতীয় বক্তব্য হচ্ছে, অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা হয় বেশি অর্থাৎ বেশিরভাগ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ভালোই হচ্ছে।
আমি লেখকের লেখার প্রথম বক্তব্যের সঙ্গে একেবারেই একমত। শিক্ষা পণ্য নয়, কাজেই শিক্ষা গ্রহণের জন্য শিক্ষার্থীর কাছ থেকে এ ধরনের ভ্যাট আদায় একেবারেই অন্যায়। সরকারকে এ বিষয়ে নতুন করে ভাবতে অনুরোধ করছি। অন্তত শিক্ষার্থীদের অর্থনৈতিক চাপ থেকে মুক্তি দিন। তবে তার দ্বিতীয় বক্তব্যের সঙ্গে একেবারেই ভিন্নমত পোষণ করি। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ভালো হয় বলে তিনি যা বুঝিয়েছেন, আমি তা মানতে রাজি নই। আমার অভিজ্ঞতা ও ক্ষুদ্র জ্ঞানে কিছু যুক্তি ও প্রসঙ্গ উপস্থাপন করতে চাই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে সমাজে ঢালাও কিছু নেতিবাচক ধারণা আছে এবং এই ধারণা যে ঠিক নয় সে বিষয়টি প্রমাণ করার জন্য তিনি কয়েকটি প্রসঙ্গ উপস্থাপন করেছেন; এর মধ্যে রয়েছে যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পান না তারাই শুধু নয়, যারা চান্স পান তারাও এখানে পড়েন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাঁকিবাজ শিক্ষকও এখানে সিরিয়াস বা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ দিয়ে (স্যুট-কোট) সহশিক্ষা কার্যক্রমও যে চলছে সে যুক্তি দেখিয়েছেন, সেখানে রবীন্দ্রগীতিনাট্য ও মানবাধিকার দিবস পালন হয়, বিখ্যাত মানুষদের এনে বক্তৃতা করানো হয় প্রভৃতি। লেখক আসিফ নজরুলের সঙ্গে আমিও একমত, সীমিত পর্যায়ে হলেও হাতেগোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব কার্যক্রম চালু আছে। কিন্তু এগুলোকে কোনোক্রমেই ভালো পড়াশোনা হচ্ছে তার নমুনা বা প্যারামিটার হিসেবে উপস্থাপন করা চলে না। শুধু কি এগুলো, আমি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার পরিবেশ বিষয়ে আরও কিছু দৃষ্টান্ত দিচ্ছি- শ্রেণিকক্ষে টাইলস ফ্লোর, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য আলাদা চেয়ার এমনকি ল্যাপটপও, মালটিমিডিয়া ক্লাসরুম, ক্যাম্পাস ওয়াই-ফাই, নেই রাজনৈতিক কর্মসূচি বা ধর্মঘট; এগুলো সবই তো ইতিবাচক। তার পরও সেখানে কতটা পড়াশোনা হয় সে বিষয়ে মন্তব্য করতে হলে শিক্ষার্থীদের জ্ঞান স্পৃহা ও অর্জিত জ্ঞান যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু পরীক্ষার ফল দেখলে চলবে না, সেখানে আমার-আপনার মতো কিছু শিক্ষকই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষার্থী খাতায় যা লেখে ৫০ নম্বর পায় সেটা ওখানে ৮০ হয়ে যায় অবলীলায়। তাই `বি`র যোগ্যতা নিয়ে `এ` পায় ভূরি ভূরি। হ্যাঁ, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ পেয়েও যে ক`জন শিক্ষার্থী ওখানে যায় তাদের শতকরা হার একও হবে না, কাজেই এ প্রসঙ্গ না তোলাই ভালো। পড়াশোনা তখনই ভালো হবে যখন শিক্ষার্থীর মধ্যে গ্রহণ বা জানার আগ্রহ তৈরি হবে। সেইসঙ্গে চাকরির বাজারে ঢোকার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রস্তুতিও গুরুত্বপূর্ণ। এখানেই পার্থক্য তৈরি হয় সরকারি-বেসরকারির মধ্যে। আবাসিক হলে শিক্ষার্থীদের একত্রে বসবাস ও সহশিক্ষা কার্যক্রমও উভয়ের মধ্যে পার্থক্য তৈরি করে দেয়। বলবেন কি, কয়টা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে খেলার মাঠ আছে? বিষয়টি স্পষ্ট করতে দুটি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গ্রন্থাগারে শিক্ষার্থীরা অপেক্ষা করে কখন একটি আসন খালি হবে আর দেখুন কয়টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো গ্রন্থাগার আছে বা সেখানে কোনো আসন খালি নেই? যারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভালো পড়াশোনা হচ্ছে বলে মনে করেন, আমি তাদেরকে অনুরোধ করব, আপনি যে কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কালই গিয়ে শিক্ষার্থীদের তিনটি সাধারণ প্রশ্ন করুন- এক. টেকনাফ কোথায় অবস্থিত? দুই. বাংলা বারো মাসের নাম লিখতে পারে কে কে? তিন. কয়জন আজকের কোনো একটি সংবাদপত্র পড়ে এসেছে? আমি নিশ্চিত যে আপনি হতাশ হবেন। এমনকি পাঠ্যপুস্তকের বাইরে গত তিন মাসে কেউ একটি বই পড়েছে কি-না? তাছাড়া প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরীক্ষা যেমন বিসিএসের কথাই ধরুন, সেখানে কতজন আসে বা সুযোগ পায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে?
আগ্রহ তো বটেই, শিক্ষা শেষে উপার্জনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হওয়ার সামাজিক, ব্যক্তিগত ও পারিবারিক চাপের কারণেও সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়াশোনা হয়। হ্যাঁ, আপনি একমত হন বা না হন গত দেড় যুগের অভিজ্ঞতা এবং দু`একটি নামকরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদানের সূত্র থেকে বলছি, বাংলাদেশের প্রায় ৮০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে একেবারেই হাতের আঙুলে গোনা কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুটা পড়াশোনা হয়, বাকিদের অবস্থা ভয়ানক খারাপ- বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের ভাষায় সার্টিফিকেট বিক্রি করছে বলা যায়। এর জন্য অবশ্যই শিক্ষার্থী বা অভিভাবকরা দায়ী নন, দায়ী আমাদের সমাজ ও শিক্ষা ব্যবস্থা। সেই সুযোগ নিয়ে শিক্ষাকে পণ্য করে অনেক রাজনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীই সাবান কারখানার মতো খুলে বসেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান নিয়ে মঞ্জুরি কমিশন যতই চিৎকার করুক না কেন, তার সীমিত লোকবল ও সামর্থ্য এবং রাজনৈতিক তদবির সংস্কৃতির কাছে পরাজিত হচ্ছে বারবার।
হাতে দামি ফোন, মাথার চুলে জেল, সারাক্ষণ ফেসবুকে ছটফট নয়, জ্ঞানস্পৃহা ও একুশ শতকের বাজার অর্থনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকে থাকার বাসনা জাগাতে না পারলে খুব অল্প দিনেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় জাতির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে- তার আগেই আমাদের সাবধান হওয়া উচিত।
- সৌরভ শিকদার
অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ