শরীয়াহভিত্তিক দুর্বল পাঁচ ব্যাংক একীভূত করে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম চলমান থাকবে। খেলাপি ঋণ আদায়ের যত পদক্ষেপ আছে তা নিতে হবে। এসব ব্যাংকের তহবিল তছরুপের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করবে সরকার। পাঁচ ব্যাংকে নিয়োগ দেয়া প্রশাসক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের নিয়ে বৈঠক করে এমন বার্তা দিয়েছেন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। গভর্নর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ বৈঠকে বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, বৈঠকে গভর্নর সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে প্রশাসকদের বিভিন্ন দিকনির্দেশনা দেন। শিগগিরই এই ব্যাংকের এমডি নিয়োগ সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি যথাযথ নিয়মে পরিচালনা পর্ষদ ও প্রশাসকদের কাজ চালিয়ে যেতে বলেছেন। এছাড়া পাঁচ ব্যাংকের বিনিয়োগ নিয়ে পরিচালিত যেসব কারখানার অস্তিত্ব রয়েছে, তা বন্ধ হয়ে থাকলে চালুর উদ্যোগ নিতে বলা হয়েছে। কর্মসংস্থান বিবেচনায় এ উদ্যোগ নিতে হবে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের বিদেশি বকেয়া থাকলে তা পরিশোধের উদ্যোগ নেয়া হবে বলে জানা গেছে। আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারায় বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে এক্সিম, সোশ্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক মিলে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি গঠন করা হয়। গত বছরের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেন প্রশাসকরা। এসব ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক পরিচালিত হতো নাসা গ্রুপের কর্ণধার নজরুল ইসলাম মজুমদারের নেতৃত্বে। বাকি চার ব্যাংক চলত এস আলমের কর্তৃত্বে। ব্যাংক একীভূতকরণ শুরুর পর থেকেই এ নিয়ে নানা বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়। তবে সংস্কার এগিয়ে নিতে অন্তর্বর্তী সরকার তাতে কান না দিয়ে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ব্যাংকটিকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নিয়েছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক ৩৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন নিয়ে যাত্রা শুরু করে। এর মধ্যে সরকার দিয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। আর আমানতকারীদের বাকি ১৫ হাজার কোটি টাকার শেয়ার দেয়া হবে। পাঁচ ব্যাংকে বর্তমানে ৭৫ লাখ আমানতকারী রয়েছে। এসব আমানতকারীর প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা জমা আছে। এর বিপরীতে ঋণ রয়েছে ১ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এই ঋণের ৭৭ শতাংশ খেলাপি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ১৬ ফেব্রুয়ারি চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে আকস্মিকভাবে সংবাদ সম্মেলন করেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তা। সেখানে বিভিন্ন বিষয়ের পাশাপাশি দুর্বল ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংককে একীভূতকরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলা হয়, এক্সিম ব্যাংকের ৪৮ শতাংশ এবং সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের ৬৩ শতাংশ ঋণ খেলাপি। ৯০ শতাংশের বেশি খেলাপি ব্যাংকের সঙ্গে এই ব্যাংক একীভূত করার বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। তৎকালীন গভর্নর ড. আহসান মনসুর ‘স্বৈরাচার’ ও তিনি খেয়ালি বক্তব্য দিচ্ছেন বলেও মন্তব্য করা হয় সংবাদ সম্মেলনে। ওই সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীল দলের সাধারণ সম্পাদক নওশাদ মোস্তফা, নীল দল থেকে নির্বাচিত বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি একেএম মাসুম বিল্লাহ এবং সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণ। এভাবে বক্তব্য দেয়ায় তিন কর্মকর্তাকে প্রথমে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয় ও পরে ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার এ ধরনের বক্তব্যের পর সামাজিক মাধ্যমসহ বিভিন্ন জায়গায় নতুন করে আলোচনা শুরু হয় একীভূতকরণ আর এগোবে কিনা। এর মধ্যে কিছু কর্মকর্তার বিক্ষোভ ও মবের মুখে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ড. আহসান এইচ মনসুরকে সরিয়ে নতুন গভর্নর নিয়োগ দেয় সরকার। এরপর সেই আলোচনা আরও জোরালো হয়। যদিও নতুন গভর্নর ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীদের এক বৈঠকে পরিষ্কার করেন- ব্যাংক সংস্কার অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক নিয়ম মেনে বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে পাঁচ ব্যাংক একীভূত হয়েছে। সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নিয়ে একটি পক্ষ অহেতুক বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে। এই ব্যাংক আর এগোবে না -এমন প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে গ্রাহকদের আতঙ্কিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে প্রশাসকদের বৈঠকে নতুন গভর্নরের এই বার্তা আতঙ্ক দূর করবে। ব্যাংকটি শক্তিশালী অবস্থানে যাওয়ার ক্ষেত্রে যা সহায়ক হবে।