বিশেষ খবর



উপাচার্যের চেয়ারে কী মধু! ড. মো. আবুল কালাম আজাদ অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

ক্যাম্পাস ডেস্ক প্রতিবেদন

বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মিশন-ভিশন হলো শিক্ষা, নতুন নতুন ধারণার উদ্ভাবন এবং তা মানবকল্যাণে ছড়িয়ে দেয়া। সেটি সাসটেইনেবল করার জন্য আমরা গ্র্যাজুয়েট তৈরি করি, যেখানে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকে সেই গ্র্যাজুয়েট যেন আপাদমস্তক একজন দেশপ্রেমিক মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠে। সে জন্য প্রথমে দরকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের নৈতিক সততা। একজন শিক্ষকের এই জিনিসটা না থাকলে তাঁর যত বড় একাডেমিক এক্সিলেন্স থাকুক; সেটা দিয়ে সৎ, যোগ্য, মেধাবী এবং দেশপ্রেমিক শিক্ষিত প্রজন্ম গড়া অসম্ভব। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, কোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সাধারণত সিনিয়র গ্রেডের একজন শিক্ষক হয়ে থাকেন, যিনি তাঁর ফ্যাকাল্টির অপরাপর শিক্ষকের তুলনায় সবদিক দিয়ে জনপ্রিয় থাকেন। তিনি ক্লাসে বা অন্য আয়োজনে সুন্দর সুন্দর কথা বলেন দেশ ও জাতি উদ্ধারে! তিনিই যখন তাঁর বা অন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার শীর্ষ পদে বসেন, তখন তাঁর ভেতরে এক, বাইরে অন্য রূপ দেখতে হয় কেন? তাহলে কি আমরা জেনেশুনে একজন মুখোশধারী শিক্ষাবিদকে এমন উচ্চ আসনে বসাচ্ছি? অথবা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভিসি উৎপাদনের অবাধ কারখানা বানাচ্ছি! আমাদের মতো ছোট্ট একটি দেশে সাধারণ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, কৃষি, মেডিকেল, প্রকৌশলসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৫৫টি। নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে আরও আছে ১০৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। এসব বিশ্ববিদ্যালয় দেখভাল করার জন্য রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)। সার্কভুক্ত দেশগুলোর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের আইনি সক্ষমতা, জনবল এবং কার্যপরিধি ব্যাপক এবং সমন্বিত থাকায় ওই সব দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলররা জাতীয় পত্রিকার হেডলাইন হয়েছেন, তা বের করতে ইলেকট্রনিক মাইক্রোস্কোপ লাগবে। গত ১৭ বছরে এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় পাওয়া যাবে না, ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির অপকর্ম পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। অথচ একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় শিক্ষক, যাঁর ঝুড়িতে আছে বিশ্বের নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি, প্রশাসনিক দক্ষতা (সরকারদলীয় নেতা হিসেবে) এবং সামাজিক অবস্থান, তিনি কেন তাঁর চার বছরের ভিসির দায়িত্ব শেষ করার আগেই হয়ে যান পত্রিকার হেডলাইন! বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এক সময় ছিল চিন্তার দুর্গ। আজ সেই দুর্গের ভেতরেই প্রশ্ন উঠেছে- নেতৃত্ব কি জ্ঞানের হাতে, নাকি ক্ষমতার? সাম্প্রতিক সময়ের একটি তথ্য আমাদের বেশ অস্বস্তিতে ফেলতে যথেষ্ট। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ২০ জন সাবেক উপাচার্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে অনুসন্ধান বা তদন্ত চালাচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। এ সংখ্যা আরও দীর্ঘায়িত হবে গত ১৭ মাসের নতুন ভিসিদের নাম সংযুক্ত হওয়ার পর। ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেকে ‘রাজা’ বা ‘জমিদার’ বা একনায়কতান্ত্রিক মনমানসিকতা বা ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) ও জবাবদিহির অভাব এ জন্য দায়ী? নাকি অন্য কিছু? স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলে পুলিশ যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নির্বিচারে গুলি ও হামলা চালাল, তার প্রতিবাদে ১৯৮৩ সালে ঢাবির ভিসি অধ্যাপক ফজলুল হালিম চৌধুরী পদত্যাগ করেছিলেন। এরপর গত ৪৩ বছরেও কেন ভিসি হালিম সাহেবের মতো দৃঢ় গার্টস ও আত্মসম্মানবোধের অধিকারী ভিসি পেলাম না? আমাদের কেন দেখতে হলো ভিসি কলিমউল্লাহ, ভিসি শিরীন, ভিসি মীজান, ভিসি সোবহান, ভিসি রফিক, ভিসি শহীদুর রহমান, ভিসি নাসির, ভিসি মঈন, ভিসি কামাল, ভিসি আহসানসহ অসংখ্য তারকাখচিত মানুষকে? বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আশপাশের মানুষের অভিব্যক্তি- ভিসি হলেন সেকেন্ড ‘গড’ এবং যদি কোনো শিক্ষকের ভেতর এই মনমানসিকতা বিল্ট-ইন হয়, তাহলে তিনি স্বৈরাচারী হতে বাধ্য। তারই প্রতিফলন ঘটেছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বিগত বা সমসাময়িক সময়ে। বিশ্বাস করুন, পৃথিবীর সেরা কেমব্রিজ বা হার্ভার্ড কিংবা এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু শিক্ষার্থী বা শিক্ষক তাদের ভিসিকে চেনে না। আপনি এমন একটি বিশ্ববিদ্যালয় দেখাতে ­পারবেন না যেখানে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিকে তাঁর সব ফ্যাকাল্টি বা বিভাগের শিক্ষক নিয়োগ বা পদোন্নতিতে ভূমিকা রাখতে হয়। আমাদের দেশে কি তাহলে সব ভিসিই আইনস্টাইন! আরেকটি বিষয়, যেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ, ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা খাত আছে, সেখানে স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহারে অনিয়ম ও আর্থিক কেলেংকারি অবধারিত। আমাদের পাল্লা দিতে হবে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকার সঙ্গে, পূর্ব এশিয়ার সঙ্গে। আমাদের এমন সমাজ গড়তে হবে, যে সমাজ দক্ষ কর্মজীবী ও সৃজনশীল নাগরিক তৈরি করবে। দলদাস, বাটপার, লুটেরা কিংবা গোঁয়ার-গোবিন্দ মব তৈরি করবে না। ইতিহাস চেয়ারকে নয়, চরিত্রকে মনে রাখে। আজকে প্রশ্নটা শুধু কিছু সাবেক ভিসি ঘিরে নয়। প্রশ্নটা আমাদের, আমরা কি এমন বিশ্ববিদ্যালয় চাই যেখানে জ্ঞান নেতৃত্ব দেয়, নাকি এমন বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে ক্ষমতা জ্ঞানের ভাষা নির্ধারণ করে? কারণ শেষ পর্যন্ত চেয়ার কাউকে বড় করে না; মানুষই চেয়ারকে বড় করে। আর যদি মানুষ ছোট হয়ে যায় তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়াল যত উঁচুই হোক, ভেতরের চিন্তা ছোট হয়ে যায়। ৫৯ শতাংশ জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে এবং ১ হাজার ৪০০ ছাত্র-জনতার আত্মাহুতির মিলিত প্রয়াসে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি কি সেই পুরোনো মডেল ফিরিয়ে আনবে? নাকি একটি আধুনিক, গণতান্ত্রিক, সুশাসন ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ার কারিগর তৈরিতে ভিসি হালিম বা ভিসি এমাজউদ্দীন মডেল ফলো করবে, তা ভাববার এখনই উপযুক্ত সময়।


বিশ্ববিদ্যালয় কম্পাস পত্রিকার সংখ্যা সমূহ

আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img