ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে প্রো-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানকে নিয়োগ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য মো. আবদুল হামিদ।
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে উপাচার্য নিয়োগসংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ২৪ আগস্ট উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কাজ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার স্বার্থে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ ১৯৭৩-এর ১১ (২) ধারা অনুযায়ী মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও আচার্য ইসলামের ইতিহাস এবং সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ও প্রো-উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানকে সাময়িকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের দায়িত্ব অর্পণ করেন।
দায়িত্বগ্রহণের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবনিযুক্ত উপাচার্য প্রফেসর ড. আখতারুজ্জামান তাঁর প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে ক্যাম্পাস প্রতিনিধিকে বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সুপারিশে মহামান্য রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজ্যুলেশন অনুযায়ী আমাকে উপাচার্যের দায়িত্ব দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার মাধ্যমে, একটি ধারাবাহিক কর্মপ্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে পরিচালিত হয়। এখানে উপাচার্য এককভাবে কিছু করেন না।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের সবার উপর দায়িত্ব রয়েছে, সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করেন। দায়িত্ব সুচারুরূপে সম্পন্ন হলে এর ফলাফল হয় সাফল্যমন্ডিত। আমি নিজে হাউজ-টিউটর, চেয়ারম্যান, প্রভোস্ট, ডিন, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর ছিলাম। সব অবস্থানে আমি নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করার চেষ্টা করেছি। স্বার্থকতা ও ব্যর্থতা অন্যরা বিচার করবেন।
তিনি আরো বলেন, আমাদের আসল পরিচয় হলো আমরা শিক্ষক। কোয়ালিটি শিক্ষার প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত শিক্ষক; শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে সহায়ক শক্তি। আমার উপর নতুন দায়িত্ব এসেছে, সব কাজের সমন্বয়ই এখন প্রধান লক্ষ্য। সবার সহযোগিতায় প্রশাসন পরিচালনা করবো। আমিতো এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক। অনেক শিক্ষক আমার সহকর্মী, কেউ কেউ আবার আমার শিক্ষক সমতূল্য। তাঁরা আমাকে দীর্ঘদিন থেকে চেনেন, ঘনিষ্টভাবে দেখেছেন, কাছে পেয়েছেন। অতীতে তাদের সাথে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনে কাজ করেছি। আমরা সবাই সবার সহযোগী।
ভবিষ্যতে বিশ্ববিদ্যালয়ে কি কি কর্মসূচি পালন করবেন এমন জিজ্ঞাসার জবাবে প্রফেসর ড. আখতারুজ্জামান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়। যারা অতীতে দায়িত্বে ছিলেন তাদের দক্ষতা, যোগ্যতা ও মেধা দিয়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে রেখেছেন। এগুলো চলমান প্রক্রিয়া। এর ধারাবাহিকতা বজায় রাখা আমার দায়িত্ব ও কর্তব্য। আজকে বিশ্ববিদ্যালয় যে পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে তার পেছনে সাবেক উপাচার্যদের অবদান অসামান্য। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে কর্মের অনেক ক্ষেত্র আছে। আমরা এখন সেগুলো একের পর এক করবো। যে ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত হয়েছে সেগুলোকে সম্প্রসারিত করবো। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠিত এ বিশ্ববিদ্যালয় উন্নয়ন-অগ্রগতির ধারাবাহিকতা বজায় রেখে চলেছে। আমরাও সেই ধারাবাহিকতায় সম্পৃক্ত।
দায়িত্ব নিয়ে ঐক্যের ডাক দেয়া ঢাবি উপাচার্য বলেন, আমার মূল কাজই হবে সবাইকে ধারণ করা। এখানে কে কোন পন্থি, তা উপাচার্যের বিবেচ্য বিষয় নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সবাইকে নিয়ে কাজ করতে হবে। প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য ও মর্যাদার ব্যাপারে সবাই যেন আমরা সচেতন থাকি, সকলের দায়িত্ব যেন যথাযথ পালন করি, সেটাই চাইব। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের একটি কথা আছে, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’ -আমরা যেন এই নীতিটি অক্ষুণœ রাখি।
এ সময় উপাচার্য বলেন, আমাদের অনেকগুলো সমস্যা আছে, সেগুলো সমাধানের জন্য আগের উপাচার্যদের পদক্ষেপগুলো সামনের দিকে এগিয়ে নিতে হবে।
এক প্রশ্নের জবাবে উপাচার্য বলেন, ডাকসু’র বিষয়টি একক কোনো সিদ্ধান্তে হয় না। এটি ব্যাপক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক অংশীজনের সিদ্ধান্তের বিষয়। তারপরও এ ব্যাপারে আলোচনার সূত্রপাঠ ঘটাবো। আমরা হয়তো সবার সঙ্গে একটা সমন্বয়কের ভূমিকা রাখব।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে মো. আখতারুজ্জামান বলেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের গবেষণা যেভাবে এগোনোর কথা, সেভাবে হয়তো হয়নি। তার কারণ আমাদের সীমিত পুঁজি। আমাদের বাজেটের সবচেয়ে বড় অংশটা আসে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের মাধ্যমে। ফলে গবেষণার ক্ষেত্রে সাহসী বড় বাজেট লাগবে। যেমনিভাবে বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মাসেতু নির্মাণ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে জাতীয়করণ ও বিনামূল্যে পুস্তক বিতরণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন।
উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার আগে প্রো-উপাচার্য (প্রশাসন) কক্ষে বসেন গত বছর থেকে এই পদে দায়িত্ব পালন করে আসা ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের এই শিক্ষক।
পরে উপাচার্য কার্যালয়ে গিয়ে ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. এনামউজ্জামানের কাছ থেকে যোগদানপত্র নিয়ে তাতে স্বাক্ষর করেন অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান।
দায়িত্ব নেয়ার পর উপাচার্য কার্যালয়ের পাশে পুরাতন সিনেট ভবনে (সম্মেলন কক্ষ) উপস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের সঙ্গে দেখা করেন তিনি। ভোট ছাড়াই উপাচার্য প্যানেল চূড়ান্ত করা নিয়ে সমালোচনা এবং কয়েকজন রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েটের করা মামলায় ওই প্যানেলের কার্যক্রম স্থগিত হয়ে যাওয়ার এক মাসের মাথায় অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামানকে সাময়িকভাবে উপাচার্যের দায়িত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ।
নবনিযুক্ত ভিসি অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, শিক্ষা ও গবেষণার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষা ও ভাবমূর্তি বৃদ্ধিতে কাজ করবো। ছাত্র-শিক্ষক অধিকার সুরক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিকসহ সার্বিক কর্মকান্ডে আরো গতিশীলতা আনাই হবে অগ্রাধিকার।
বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নিতে সকলের কাছে সহযোগিতা চান তিনি।
নতুন ভিসির
সংক্ষিপ্ত জীবনী
যুক্তরাষ্ট্রের বোস্টন কলেজে ফুলব্রাইট স্কলার হিসেবে গবেষণা করেছেন। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব বার্মিংহামে ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ড. মো. আখতারুজ্জামান বরগুনার পাথরঘাটায় ১৯৬৪ সালের ১ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। বরগুনার কালমেঘা মুসলিম হাই স্কুল ও বরগুনা সরকারি কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে লেখাপড়া শেষে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবং তার আবাসিক হল ছিলো মাস্টারদা সূর্যসেন হল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে ১ম স্থান অর্জন করে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি ফারসি ভাষায় পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ডিপ্লোমা এবং ভারতের আলিগড় থেকে ইতিহাস বিষয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৯০ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগ দেন। ২০০৪ সালে তিনি প্রফেসর হন। একই বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে ২০০৮ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন এবং মাদ্রাসার ছাত্র না হয়েও পরবর্তীতে আরবি বিভাগের চেয়ারম্যান হিসেবে ২০১৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। কলা অনুষদের ডিন হিসেবে ২০১৪ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন ড. আখতারুজ্জামান। তার মোট ৪২টি গবেষণাপত্র বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত পুস্তকের মধ্যে রয়েছে- মুসলিম ইতিহাসতত্ত্ব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২০০৮); বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধঃ প্রেক্ষাপট ও ঘটনা (সম্পাদিত), বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ, ঢাকা (২০০৯); ঝড়পরবঃু ধহফ টৎনধহরুধঃরড়হ রহ গবফরবাধষ ইবহমধষ, অংরধঃরপ ঝড়পরবঃু ড়ভ ইধহমষধফবংয (২০০৯); অ ছঁবংঃ ভড়ৎ ওংষধসরপ খবধৎহরহম : ঊংংধুং রহ গবসড়ৎু ড়ভ চৎড়ভবংংড়ৎ ঝবৎধলঁষ ঐধয়ঁব (বফরঃবফ), অংরধঃরপ ঝড়পরবঃু ড়ভ ইধহমষধফবংয (২০১১); প্রবন্ধ সংকলন (সম্পাদিত), ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (২০১১)। অনন্য সাধারণ গবেষণার জন্য ২০০৮ সালে তিনি ‘বিচারপতি ইব্রাহিম স্বর্ণপদক’ লাভ করেন।
আওয়ামী লীগ সমর্থিত শিক্ষকদের নীল দলের প্যানেল থেকে ২০০৪, ২০০৫ ও ২০০৬ মেয়াদে তিন দফা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক এবং ২০০৯ ও ২০১১ সালে সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট, সিন্ডিকেট, একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। কবি জসীমউদ্দীন হলের প্রাধ্যক্ষও ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদের সাধারণ সম্পাদক; পাঠ্যপুস্তক সংকট নিরসন জাতীয় কমিটি ২০০৮ এর আহবায়ক; পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণ পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শদান জাতীয় কমিটি (২০০৯-১০) এর আহবায়ক; ২০১০ সালের জাতীয় শিক্ষানীতি বাস্তবায়ন কমিটির সদস্য; ন্যাশনাল কারিকুলাম কো-অর্ডিনেশন কমিটির (এনসিসিসি) সদস্য এবং বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ট্রাস্ট এর সদস্য হিসেবেও আছেন।
২০১৬ সালের ২২ জুন থেকে ঢাবি’র প্রো-উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন এই শিক্ষাবিদ ও গবেষক অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান।