বিশেষ খবর

জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডিঃ একটি ইতিহাস

ক্যাম্পাস ডেস্ক মতামত
img

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম আবাসিক হল জগন্নাথ হল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধারণ করে আছে জগন্নাথ হল। এ হলের ছাত্ররা গণতান্ত্রিক আন্দোলনে যেমন ভূমিকা রেখেছে তেমনি এর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডও উজ্জ্বল। ১৯৮৫ সালে আনন্দঘন পরিবেশের মধ্যে হঠাৎ নেমে আসে বিষাদের ছায়া। হলের ছাদ ভেঙ্গে পড়ে টিভিরুমের দর্শকদের মাথার ওপর। আকস্মিক এ দুর্ঘটনায় ৩৯ জন তরুণের জীবন শেষ হলো। তাদের স্মরণে প্রতিবছর ১৫ অক্টোবর পালন করা হয় জগন্নাথ হল ট্র্যাজেডি দিবস। বেগম মমতাজ হোসেনের এ লেখাটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার ৩য় সংখ্যায় ১৯৮৫ সালের অক্টোবর মাসে প্রকাশিত হয়, যা এখানে পুনঃমুদ্রিত হলো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের দুর্ঘটনায় কতগুলো অমূল্য প্রাণের অকাল মৃত্যু দেশবাসীকে নাড়া দিয়ে গেল। সবার মনে কত প্রশ্ন। এমন দুর্ঘটনা কেন ঘটলো? কেন অকালে ঝরে গেল উঠতি বয়সের কতগুলো তাজা তরুণ? প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা অন্য কোনো গোলযোগ নয়। ছাদ ধসে পড়ার কারণে এধরনের মৃত্যু অত্যন্ত দুঃখের ব্যাপার।
এই দুঃখের জন্য গোটা দেশ তিনদিনব্যাপী শোক প্রকাশ করেছে। খবরের কাগজের পাতা ভরে গিয়েছে আহতদের ছবি দিয়ে, রেডিওর মাধ্যমে গোটা বিশ্বে এ সংবাদ ছড়িয়ে গেছে। টেলিভিশনে প্রচার করা হয়েছে হৃদয় বিদারক ঘটনার নানা চিত্র। আর গঠন করা হয়েছে তদন্ত কমিটি। কিন্তু এসব দিয়ে সন্তানহারা পিতামাতার হৃদয়ে কি শান্তির প্রলেপ দেয়া গেছে? যা হারায় তা আর ফিরে আসে না, এ হলো মানব জীবন। তাই জগন্নাথ হলের সম্ভাবনাময় কতগুলো ছাত্র চিরতরে বিদায় নিল এ-জগৎ থেকে।
জগন্নাথ হল এককালে এসেম্বলী হাউস নামে পরিচিত- যেখানে বেশ কয়েকটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটেছিল, সে খবর সবাই জানে না, আর জানবেই বা কি করে? এই যে পনের বছর আগে এত বড় রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল, সে কথা আমাদের বর্তমান শিশু-কিশোরেরা ভালো করে জানে না আর জানতেও চাইবে না, তার কারণ আমরা তাদের জন্য এমন কিছু রেখে যাওয়ার চেষ্টা করিনি যার মাধ্যমে এদের মাঝে স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও চেতনাবোধের জন্ম নিবে। জগন্নাথ হলের দুর্ঘটনা নিয়ে কিছু লেখার আগে জগন্নাথ হলের সামনে অন্দরে আরো কত লোমহর্ষক ঘটনা ঘটেছিল সে সম্পর্কে কিছু লিখতে হয়।
সময়টা ছিল ১৯৪৮। ভারতবর্ষ ইংরেজদের হাত থেকে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে নেয়ার এক বছর পর। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে অসন্তোষ ও বিক্ষোভের আগুন জ্বলে উঠলো ১৯৪৭ সনের শেষ দিকে। রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে এর বিরূদ্ধে রুকে দাঁড়ালো তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের তরুণ ছাত্রদের দল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবাদ মুখর হয়ে ১৯৪৮ সনের ১০ই মার্চ মিছিল করে জমায়েত হয়েছিল জগন্নাথ হলেরই সামনে। এদের মুখ বন্ধ করে দেয়ার জন্য পাকিস্তান সরকারের গুলি চলেছিল নির্বিচারে। জগন্নাথ হলের সামনে সুরকির রাস্তা লাল হয়ে গিয়েছিল আহত ছাত্রদের রক্তে। আর টিয়ার গ্যাসের দৌলতে পথটি সিক্ত হয়েছিল ছাত্রদেরই চোখের জলে। তারপর ১৯৫২ সনের ২১শে ফেব্রুয়ারির স্মরণীয় ইতিহাস। বিশ্বদ্যিালয়ের প্রাঙ্গণে জমায়েত হয়েছিল অগণিত ছাত্রছাত্রী।
রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ক’টি স্মারকলিপি মিছিল করে পৌঁছে দেবে এসেমবলী হাউসে। ১৯৫২ সনের ২১শে ফেব্রুয়ারী ১৪৪ ধারাভঙ্গ করে ছাত্রদের মিছিলটা যাচ্ছিল ঐ এসেম্বলী হাউসেরই পথে, কিন্তু না, মিছিল তো গন্তব্যস্থলে পৌঁছালো না। আবার পাকিস্তান সরকারের কড়া হুকুম- টিয়ার গ্যাস, গুলি। ঢাকার রাজপথ ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত হলো। আজ সেখানে শহীদ মিনার মাথা উচুঁ করে দাঁড়িয়ে থেকেও মাথা নীচু করে ছেলে হারানোর কথা মনে করিয়ে দেয়।
তারপর ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চের কাল রাত্রি। জগন্নাথ হলের মাঠে জড়ো করা হয়েছিল ছাত্র শিক্ষকদের। নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল এই হলেরই মাঠে। তারপর গর্ত করে মাটি চাপা দিয়ে সৃষ্টি করলো গণ কবরের। এইসব ঘটনার নিরব সাক্ষী জগন্নাথ হল। একটার পর একটা নির্মম ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়েছিল বহু বছরের এই ইমারতটি। প্রাণহীন নিরেট প্রাসাদটির দেহটিতে এ বেদনারই ঘুণ ধরেছিল বহু বছর আগেই। অন্যায় অত্যচার অকালমৃত্যু, নির্মম হত্যা, অবহেলা এসব যেন সহ্য করতে পারলো না।
১৯৮৫ সনের ১৫ই অক্টোবর বহুদিনের অবহেলিত প্রাসাদটি ধসে পড়লো আর তারই তলায় চাপা পড়লো কতগুলো তরুণ, যারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন উজ্জ্বল ও সম্ভাবনার প্রতিশ্রুতি। আমরা সবাই ভাবছি কেন এমন হলো? কি অপরাধ ছিল এই নিষ্পাপ তরুণদের? কেন তাদের এভাবে মরতে হলো?এখন তো দেশে সেই আগের মত আন্দোলন, বিক্ষোভ নেই? জগন্নাথ হলের টিভিটা কেন সরানো হলো না? কেন ছাত্রদের সাবধান করা হলো না? এই অবহেলার জন্য কে দায়ী? অনেক প্রশ্ন অনেক প্রতিবেদন পত্রিকার অবয়বে ছাপার অক্ষরে প্রকাশিত হয়েছিল, তারপর সব চুপচাপ। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো- বাংলাদেশ টিভির সিরিজ নাটক শুকতারা নিয়ে হৈ চৈ।
শুকতারা Ÿন্ধ করা হোক- কারণ হলো, শুকতারা দেখলেই জগন্নাথ হলের মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কথা মনে করিয়ে দেয়। আবার শুকতারা নাটকের একটি চরিত্র নাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভাবমূর্তি নষ্ট করে দিচ্ছে।
তা’হলে সরাসরি ভাবতে হবে জগন্নাথ হলের এ দুর্ঘটনাকে কেউ মনে রাখতে চায় না? অকালে ঝরে যাওয়া ছাত্রদের কেউ মনে রাখতে চায় না? নাটকের একটি চরিত্র বর্তমান সামাজিক ব্যাধির শিকার তাতে সব ছাত্রছাত্রীদের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে কেন? বিশ্বদ্যিালয়ে কত অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে যাচ্ছে তার অর্থ এই নয় যে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্রছাত্রী এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য দায়ী?
একজন লেখক সমাজের ব্যাধিগুলো তুলে ধরে সাবধান করার জন্য যদি কোন চরিত্রের সৃষ্টি করে তার জন্য ছাত্রদের ক্ষোভ প্রকাশ করা কি ঠিক হবে? শিক্ষাঙ্গনে আজ যে অবক্ষয় সেগুলোকে তুলে ধরে সমাধানের পথ দেখানো একজন লেখকের নৈতিক কর্তব্য। কেন না শিক্ষা ছাড়া বর্তমান সমাজের অবনতি, অর্থনৈতিক বিপর্যয়কে ঠেকানো যাবে না। ছাত্রদের তাই লক্ষ্য করা উচিত ছিল, একাজের পরিণতি কী? এবং সে পথ ধরে কিভাবে জীবনের কঠিন সমস্যাগুলোর সমাধান করছে? শুকতারার মতোই সেই হতভাগ্য ছাত্ররা ত্যাগ ও গৌরবের আলোয় আলোকিত হবে সেদিন, যেদিন বিশ্ববিদ্রালয় হলগুলোতে সংস্কার সাধিত হবে।
স্বাধিকার আন্দোলনে রক্ত দিয়ে স্বাধীনতার বীজ বপন করেছিল আবার মুক্তিযুদ্ধে যোদ্ধার ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশকে শত্রুর কবল থেকে মুক্ত করেছিল। ঘুরে ফিরে সেই ছাত্র সমাজ। এখনও এরা সমাজের কল্যাণের জন্য আন্দোলন করে, অনশন করে, বিক্ষোভ করে কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এরা কখনো নিজের মাথার উপর যে ছাদ নেই এজন্য আন্দোলন করলো না। এদের পায়ের নীচে যে মাটি নেই, সেজন্য অনশনও করলো না, বিক্ষোভও জানালো না। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা নয়, দেশের অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নড়বড়ে। ইট খসে যাওয়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা এখন কর্তৃপক্ষ ভাবতে শুরু করেছেন তাই বহু পুরোনো দালানের সংস্কারের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
এই সংস্কারের পর আবার নতুন ভবন হবে, নিশ্চিন্তে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশুনা করবে। জগন্নাথ হলের যে ছাত্ররা প্রাণ দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দিয়ে গেল তাদের কথা কি স্মৃতির ফলকে খোদাই করা থাকবে? এদের নিয়ে কি ইতিহাস লেখা হবে? মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও গ্রামের গরিব পিতামাতার হারানো সন্তানদের জন্য কি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলবে এদেশের মানুষ? কে মনে রাখবে জগন্নাথ হলের সে ছাত্রদের কথা? যারা পড়াশুনার অবসরে টিউশনী করতো, রাতে পত্রিকা অফিসে চাকরি করতো, কিংবা কোন সংগঠনের অফিসে দু’ থেকে তিন ঘন্টা কাজ করে নিজের খরচ চালিয়ে বাবা-মাকেও সাহায্য করতো।
মা-বাবার কত স্বপ্ন কত আশা। আমাদের দেশের মানুষের অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতাই জীবনের সচচেয়ে আশা। দু’বেলা দু’মুঠো মোটা ভাত আর মোটা কাপড় পেলে দেশের নব্বই ভাগ মানুষই তৃপ্ত, তাই সে আশায় কষ্টেসৃষ্টে সন্তান মানুষ করে কেবল তাদের সন্তান যেন খেয়েপরে ভালো থাকতে পারে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের সাথে তুলনা করলে দেখা যাবে এদেশের মানুষের চাওয়া কত সামান্য। কিন্তু এই সামান্য আশা আকাঙ্খা যখন এক নিমেষে ধ্বংস হয়ে যায় তখন নিয়তির দোহাই দিয়ে বিলাপ করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না। আমাদের দেশে দুর্যেগের অভাব নেই, তাই প্রতি নিয়তই এ দেশের মানুষের আশা আকাঙ্খা ধূলোয় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। তাই বলছিলাম, জগন্নআথ হল কাজের স্বাক্ষী। প্রাণহীন নিরেট বস্তু যদি কথা বলতে জানতো কিংবা লিখতে জানতো তাহলে জগন্নাথ হল কালের যে ইতিহাস রচনা করতো তার আকার হতো অনেক বড়।
কিন্তু ইতিহাস তো রচনা হবে না, তবে আগামী দিনের ছাত্রদের জন্য পাকাপোক্ত আবাসিক হল হবে এটাই সান্ত¡না। কিন্তু এ সান্ত¡নায় আবার চিরকালের যন্ত্রণা রয়েছে। সেদিন দেখলাম জগন্নাথ হলের গেটের সামনে একজন মা, লাল টকটকে সিঁদুর সিঁথিতে, কপালে সিঁদুরের টিপ জলজল করছে। সাথে একজন প্রৌঢ় হয়তো কোনো বাবা হবেন। রিকশা থেকে নেমে দু’জন গেলেন সেই অডিটোরিয়ামের সামনে।
দারোয়ান ধরা গলায় যখন বললো আর কি দেখবেন? সব শ্যাষ। মা হঠাৎ চিৎকার করে উঠলেন, তারপর অডিটোরিয়ামের রাস্তায় গড়াগড়ি দিতে লাগলেন। ‘আহারে আমার পুত। আহারে আমার কেমনে মরছিল? আহারে দম বন্ধ হইয়া পুতে আমার না জানি কত কষ্ট পাইছে। মার বিলাপে ভীড় জমে গেল।বাবা যেন স্তব্ধ নির্বাক একটা পাথরের মূর্তি।
ভীড় থেকে মায়ের কাছে গেলাম। মনে হলো ক্রন্দনরতা মায়ের কপালে জ্বলজ্বলে সিঁদুর লেপ্টে গিয়ে পথের ধূলাকে লালে লাল করে দিয়েছে। আকাশে বাতাসে মায়ের বুক ফাটা হাহাকার ভেসে বেড়াতে লাগলো। কয়েকজন ছাত্র মাকে তুলে রিকশায বসার চেষ্টা করলো কিন্তু মা কে তোলা গেল না। হলের সামনে সিঁড়িটা আঁকড়ে ধরলো। ‘আমার বাবারে। বাবারে আমার কোথায় পাই? তোরে থুইয়া আমি কেমনে ঘরে থাকি।’ বাবা তখন কেবল বিড়বিড় করছে, ‘আহারে না জানি কত কষ্ট পাইয়া মরছে’। আকাশে বাতাসে-বাবার করুণ আর্তনাদ ভেসে বেড়াতে লাগলো। এ আর্তনাদে জগন্নাথ হলের হৃৎপিন্ড হয়তো কেঁপে উঠেছে। ব্যাকুল কন্ঠে হয়তো বলছে- ‘আর কতবার এমন করে মৃত্যুর স্বাক্ষী হতে হবে? আর কত বেদনার কাহিনী আমার বুকে লেখা হবে।’ সংস্কারের পরে জগন্নাথ হলের অডিটোরিয়ামটি আবার মুখরিত হয়ে উঠবে ছাত্রদের কোলাহলে। প্রতি বছর নতুন ছাত্রদের আগমন ও পুরোন ছাত্রদের বিদায়। এরই সুখ ও বেদনার সুরের আমেজে দিনগুলো এগিয়ে যায় সামনের দিকে। জগন্নাথ হল কালের স্বাক্ষী, ইতিহাসের স্বাক্ষী, আর স্বাক্ষী সন্তানহারা দীর্ঘনিঃশ্বাস ও চোখের জলের।
-লেখকঃ বেগম মমতাজ হোসেন


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ