বিশেষ খবর

শিক্ষাবিদ, মুক্তিযোদ্ধা ও গ্রন্থকার হাজেরা নজরুল এর জীবনযুদ্ধ নিয়ে বিশেষ সেমিনার

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ প্রতিবেদন

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ইসফেনদিয়ার জাহেদ হাসান মিলনায়তনে সম্প্রতি ‘মুক্তিযুদ্ধ জীবনযুদ্ধ ও হাজেরা নজরুলের গল্প’ শীর্ষক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেমিনারের আয়োজন করে ‘উৎসঙ্গ সৃজন চিন্তন’ নামে একটি সংগঠন। কবি আল মুজাহিদীর সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন তরুণ গবেষক, সাংবাদিক ও কবি আহমদ বাসির। বিশেষ অতিথি ছিলেন সাবেক সচিব ও শিল্পানুরাগী সৈয়দ মার্গুব মোরশেদ, মুক্তিযুদ্ধ গবেষক মফিদুল হক। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন সাবেক সচিব ও লেখক জাফর আহমেদ চৌধুরী, সাবেক সচিব ও নাট্যকার শেখ আকরাম আলী, কবি আবদুল হাই শিকদার, কথাশিল্পী দিলারা মেজবাহ, ডাঃ আমিন উল কাদের মির্জা, ড. ফজলুল হক তুহিন, কবি তাহমিনা কোরাইশি, সাংবাদিক কাদের গণি চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার আশরাফ উদ্দিন বকুল, সংসদ সদস্য নাভানা আক্তার প্রমুখ। সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য রাখেন আয়োজক সংগঠনের যুগ্ম-পরিচালক কবি আফসার নিজাম।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রফেসর ড. এমাজউদ্দীন আহমদ বলেন, হাজেরা নজরুল লেখালেখি করেন পরিবর্তনের জন্য। এই পরিবর্তন আমরা চাই। ইউরোপে যেমন লেখকরা দীর্ঘদিন ধরে লেখালেখি করে রেনেসাঁস সৃষ্টি করেছিলেন, আমাদেরও সেরকম লেখা উপহার দিতে হবে। তিনি বলেন যারা আমাদের শাসন করছেন, তারা সর্বজ্ঞ নন; সবকিছু তারা জানেন না। তাদের জানানো ও শেখানোর দায়িত্ব লেখক, সাহিত্যিক, কবি, দার্শনিক ও নাট্যকারদের।
এমাজউদ্দীন বলেন, বুদ্ধিবৃত্তি ও নৈতিক মূল্যবোধ অর্জন করা ছাড়া আলোকিত সমাজ নির্মিত হয় না। সে ধরনের সমাজ বিনির্মাণের কাজে হাজেরা নজরুলসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
কবি আল মুজাহিদী বলেন, আমি বার বার জেলখাটা একজন মুক্তিযোদ্ধা। হাজেরা নজরুলও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন সরাসরি। এ যুদ্ধে তিনি তাঁর স্বামীকে উৎসর্গ করেছেন। এজন্য তিনি বা তাঁর স্বামী এখনও বিশেষ কোনো সম্মান পাননি। একজন একুশে পদকপ্রাপ্ত কবি হিসেবে এ ব্যাপারে জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলে জানান কবি আল মুজাহিদী।
সেমিনারে পঠিত মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দীর্ঘ ছয় দশক জুড়ে হাজেরা নজরুলের গল্প নিয়ে বিদগ্ধজন নানারকম মূল্যায়ন করেছেন। কিন্তু এসব মূল্যায়নের অধিকাংশই হয়েছে বিছিন্নভাবে তাঁর বিভিন্ন গ্রন্থ, বিশেষ করে ছোটগল্প নিয়ে। সামগ্রিকভাবে তাঁর সৃষ্টিকর্মের মূল্যায়ন এখনো সেভাবে হয়নি বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। প্রবন্ধকার বলেন হাজেরা নজরুলের গল্প পড়ে আমরা তাঁকে একজন সৎ, সাহসী, অপকট, আবেগময়, নিরাবরণ শিল্পী হিসেবে দেখতে পাই। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় অবক্ষয় তাঁর অধিকাংশ গল্পের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ বিষয়বস্তু।
কথাশিল্পী হাজেরা নজরুল তাঁর বক্তব্যে বলেন, জীবনে খুব বড় কণ্ঠশিল্পী হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম; হতে পারিনি। সেজন্য অতৃপ্তি আছে। তবে আমার প্রিয় রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে শিল্পকলা একাডেমিতে কনিকা বন্দোপাধ্যয়ের প্রশংসা পেয়েছি, আবার বিদেশের মাটিতেও দেশের গান গেয়ে ‘বাংলার নাইটিঙ্গেল’ উপাধি পেয়েছি। তবুও কণ্ঠশিল্পী হতে পারিনি, হয়েছি কথাশিল্পী। তিনি বলেন, আমার শহীদ স্বামীর চিঠিগুলি সম্প্রতি খুলে আবারও পড়লাম। এক জায়গায় দেখলাম, লেখা আছে ‘তুমি আমাকে দেশের জন্য উৎসর্গ করো।’ তিনি দেশের জন্য উৎসর্গিত হয়েছেন। কিন্তু আমরা যেমন দেশ চেয়েছি, তেমন আজও পাইনি। এটাই আমার বড় অতৃপ্তি। যতোদিন বেঁচে থাকবেন, পরিবর্তনের আশায় লিখে যাবার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন দৃঢ়চেতা এ কথাশিল্পী।
কথাসাহিত্যিক ও মুক্তিযোদ্ধা হাজেরা নজরুলের অবদানের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সেমিনারের আলোচকগণ বলেন, তাঁর অবদানের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। শুধু কথাসাহিত্য ও মুক্তিযুদ্ধই নয়; শিক্ষা, প্রশাসনিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও তিনি অবদান রেখেছেন সমান তালে। সেমিনারের মুক্ত আলোচনা পর্বে অংশ নেন আরও অনেকে। এসব আলোচনায় উঠে আসে প্রবীণ এ কথাশিল্পীর জীবন ও সাহিত্যে অবদানের বিভিন্ন দিক।
অধ্যক্ষা হাজেরা নজরুল সম্পর্কে সাহিত্য জগতে একটি সুপরিচিত নাম হাজেরা নজরুল। বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী হাজেরা নজরুল ১৯৪২ সালের ২০ নভেম্বর রাজবাড়ীর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্কুলজীবন হতেই তাঁর লেখক জীবনের শুরু। অধ্যাপক মুহম্মদ মনসুরউদ্দীন তাঁর মামা এবং বিশিষ্ট শিশু চিকিৎসক আবদুল মুত্তালিব জেষ্ঠ্য ভ্রাতা। পিতা মরহুম ময়েনউদ্দিন আহমেদ।
নাট্যকার, কবি, গল্পকার ও ঔপন্যাসিক হাজেরা নজরুল ১৯৬২ সালে বায়োকেমিস্ট্রিতে মাস্টার্স করেন এবং ১৯৭৪ সালে যুক্তরাজ্য হতে বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষার ওপর ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। সায়েন্স ল্যাবরেটরীতে গবেষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু। ১৯৬৪ সাল থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত বায়োকেমিস্ট্রির বিভাগীয় প্রধান হিসেবে গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজে অধ্যাপনা, ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৪ পর্যন্ত বদরুন্নেসা কলেজে, ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত সরকারি বাংলা কলেজ, ১৯৯৬ হতে ১৯৯৮ পর্যন্ত খুলনা সরকারি মহিলা কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে এবং ১৯৯৮ সালে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যুগ্মসচিব হিসেবে যোগদান করেন।
উল্লেখ্য, মুক্তিযুদ্ধে হাজেরা নজরুল সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। তিনি তাঁর স্বামী প্রকৌশলী নজরুল ইসলামের সাথে ঢাকার ৫টি পাওয়ার স্টেশন বিধ্বংসের কাজে সক্রিয় সহযোগিতা করেন। তিনি ভূমি জরিপ অধিদপ্তর হতে অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে বাংলাদেশ ব্লু-প্রিন্ট সংগ্রহ করে ২নং সেক্টরে পাঠিয়ে দেন। তাঁর স্বামীকে ২নং সেক্টরের Advisor on electric and power matters পদে সম্মানিত করা হয়। পরে তাঁর স্বামী প্রকৌশলী নজরুল ইসলাম মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। বর্তমানে হাজেরা নজরুল অবসর যাপন করছেন এবং লেখাকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আঁকড়ে থাকতে চান। তিনি ৩ পুত্র ও ১ কন্যার জননী। তিনি জীবনের বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সৌদি আরব, নেপাল, সিঙ্গাপুর, ভারত, পাকিস্তান, চীন, হংকং ও থাইল্যান্ডসহ নানা দেশ ভ্রমণ করেছেন।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ