বিশেষ খবর

পুলিশের সাবেক চৌকস ডিআইজি, ডিসি-ডিবি এবং এনএসআই এর পরিচালক সফিক উল্লাহ’র লেখা এক পুলিশের ডায়েরি

ক্যাম্পাস ডেস্ক প্রতিবেদন
img

পুলিশ কর্মকর্তাদের পেশাগত জীবন নানা বৈচিত্র্য ও অভিজ্ঞতায় ভরা। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে তাদেরকে অনেক বাস্তব ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়। নিজেদের প্রজ্ঞা ও পেশাদারিত্বের মাধ্যমে পুলিশ কর্মকর্তাদেরকে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান করতে হয়। আর এসব বিষয়ই উঠে এসেছে সাবেক ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা সফিক উল্লাহর লেখা ‘এক পুলিশের ডায়েরি’ বইটিতে। বইটি অত্যন্ত উঁচুমানের। পাঠক এ বই পড়ে বাংলাদেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মহান মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ড এবং তৎপরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ইত্যাদি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাবেন। বইটিতে উল্লেখ আছে- বঙ্গবন্ধু হত্যার পর সামরিক শাসকদের কথা, দেশের আর্থ-সামাজিক রাজনীতির প্রসঙ্গ, বঙ্গবন্ধুর সুনাম নষ্ট করতে বিভিন্ন সময় সামরিক শাসকদের নানা প্রচেষ্টা, চরম প্রতিকূল পরিবেশে সামরিক শাসকদের চাপে পড়ে পুলিশ কিভাবে কাজ করেছেন ইত্যাদি। দশটি অধ্যায়ে লেখা ৩৫২ পৃষ্ঠার এ বইটি প্রকাশ করেছে শিল্পতরু প্রকাশনী, প্রকাশকঃ তাইমুর রশীদ। মূল্য চারশ টাকা। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম সংস্করণ আর মার্চে দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়।
নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে বইটির লেখক পুলিশের সাবেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সফিক উল্লাহ বলেন, ‘পুলিশের চাকরি আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অধ্যায়। বিচিত্র পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই কেটেছে আমার পেশাগত জীবন। ৩০ বছরের পুলিশ জীবনের নানা ঘটনা ও অভিজ্ঞতা নিজের মতো করে তুলে ধরতে বইটি লেখা হয়েছে। চাকরিরত অবস্থায় পুলিশ জীবনের নানা বিষয় এবং আমার দেখা রাজনীতি ও চাক্ষুষ ঘটনা নিয়ে রচিত বই ‘এক পুলিশের ডায়েরি’। এ বই পাঠের ফলে পুলিশ সর্ম্পকে জনগণের নেতিবাচক ধারণা বদলাতে শুরু করবে। আর বর্তমান প্রজন্মের পুলিশ কর্মকর্তারা বইটি পাঠ করলে তাদের পেশাগত জ্ঞানের উৎকর্ষ সাধন হবে।’ বইয়ের ভূমিকাতে লেখক লিখেছেন, ‘আমি আমার পুলিশ জীবনের কথা লিখতে চেয়েছি। কিন্তু কোনো জীবনই তো তার পারিপার্শ্বিকতাকে বাদ দিয়ে হয় না। তাই এই লেখায় সেই সময়ে আশেপাশে সংঘটিত রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, সামাজিক ঘটনাবলিও এসে গেছে। সেসব নিয়ে কিছু বিশ্লেষণও আছে এই লেখায়।’
বইটিতে জীবন আছে, জীবনের প্রবাহ আছে। এটি একটি সার্থক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। এর প্রমাণ বইটির শুরুতেই স্পষ্ট হওয়া যায়। লেখকের বর্ণনায় -‘আমি হতে চেয়েছিলাম শিক্ষক। চাকরি জীবনের শুরুটাও করেছিলাম শিক্ষকতা দিয়েই। কিন্তু পরে হয়ে গেলাম পুলিশ’। এমন চমৎকারভাবেই ডায়েরি শুরু করেছেন প্রাক্তন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা জনাব সফিক উল্লাহ। Pen is mightier than the Sword. এই কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও সময়ের প্রয়োজনে, জীবনের তাগিদে জনাব সফিক উল্লাহ সাহেবকে কলম ছেড়ে ধরতে হয়েছিল অস্ত্র, একবার নয়, বারবার। প্রথম জীবনে বিমান বাহিনীতে যোগ দিলেও, শিক্ষক হওয়ার অদম্য ইচ্ছা সবসময়ই ছিল বুকের ভিতর। এমন সময় মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন মুক্তিযুদ্ধে। স্বাধীনতার পর যোগ দেন বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীতে, যখন বিশৃঙ্খলা চলছিল চারদিকে।
আমাদের দেশে কথা বলার মানুষ আছে অনেক, কিন্তু লেখার মানুষের বড় অভাব; লেখার ব্যাপারে প্রচন্ড অনীহা। বিশেষত পেশাজীবী বা সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে এই অনীহা আরো প্রকট। এর ফলে জাতীয় জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাই সাধারণ মানুষের কাছে অজানা থেকে যায়। ফলশ্রুতিতে গুজব ডালপালা বিস্তার করে এবং একসময় মিথ্যাই সত্যের জায়গা দখল করে নেয়। এক সময় বাস্তবতার চেয়ে শ্রুতিই বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে বেশিরভাগ মানুষের কাছে। হয়তো এই জন্যই একসময় আমাদের দেশের ইতিহাস বিকৃত করার চেষ্টা শুরু করেছিল বিশেষ একটি মহল, যদিও সেটি হালে পানি পায়নি। এমতাবস্থায় ‘এক পুলিশের ডায়েরি’ প্রচলিত বা প্রথাগত নেতিবাচক ধ্যান-ধারণার বিপরীতে একটি শুভ ও ইতিবাচক পদক্ষেপ বলে বিবেচিত।
যে কোনো মনোযোগী পাঠকই উপলব্ধি করবেন -‘এক পুলিশের ডায়েরি’ মূলত এক পুলিশ অফিসারের যাপিত জীবনের কথা। লেখক বিশ্বস্ততার সাথে লিপিবদ্ধ করেছেন অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা; যা তিনি খুব কাছে থেকে দেখেছেন বা যার সাথে তিনি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। যেসব চাঞ্চল্যকর ঘটনা আমরা দৈনিক পত্রিকায় প্রায়শই দেখি, দেখে শিহরিত হই, আতঙ্কিত হই, সেগুলোরই পেছনের কথা বলেছেন তিনি নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতায়। এই ডায়েরি পড়ার পরে জানতে পারলাম যে, লেখকই দেশের আলোচিত অনেক ঘটনার নেপথ্য নায়ক। এই বইয়ের পরিশিষ্টে থাকা ছবি এবং তথ্য-উপাত্ত থেকেও জানা যায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস।
এই ডায়েরির শুরু মূলত ১৯৭৩ সালে লেখকের পুলিশ সার্ভিসে যোগদানের পর থেকেই। চাকরির প্রথম জীবনে গণবাহিনী আর নকশালদের ধ্বংসাত্মক কার্যকালাপের সময় যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা ফুটে উঠেছে এর পাতায় পাতায়। রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী মানিকগঞ্জে ছিল গণবাহিনী, সর্বহারা আর চরমপন্থীদের উৎপাত। সেই সব অস্থির দিনগুলির বর্ণনা আবার জীবন্ত হয়ে উঠেছে লেখকের কলমে। স্বাধীনতা পরবর্তী সময় এবং ৭৫ পরবর্তী সামরিক শাসনকালের অনেক তথ্য পাওয়া যায় এই ডায়েরিতে। পাওয়া যায় মেজর আখতার আর মেজর সাঈদ ইস্কান্দার সম্পর্কে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি চট্টগ্রামে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে পুলিশের গুলিতে মারা যান কমপক্ষে ২৬ জন। এর ফলশ্রুতিতে পরদিন ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিলে শেখ হাসিনা এবং খালেদা জিয়ার উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও শেখ হাসিনা পরে আর যাননি। এই নিয়ে সেই সময় প্রচন্ড বিভ্রান্তি এবং গুজবের সৃষ্টি হয়। সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আমরা পাই, সেই সময়ের দায়িত্ব পালনকারী এই পুলিশ কর্মকর্তার কাছে। তাই এই বইটিকে ডায়েরি না বলে, দলিলও বলা যেতে পারে। এ রকম আরও অনেক ঘটনার না জানা কারণ পাওয়া যায় লেখকের বাস্তব অভিজ্ঞতার সাবলীল বর্ণনার মধ্যে।
স্বৈরশাসক এরশাদের শাসনামলের অনেক অজানা এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও রয়েছে এই বইয়ে। যেমন ফ্রিডম পার্টির জন্মের উদ্দেশ্য এবং কাজী জাফরের আচরণ ও কর্মকান্ড। আর আছে স্বৈরাচারের পতনের বিশদ বর্ণনা। মূলত স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সারদা পুলিশ একাডেমী থেকে শুরু করে ২১ আগস্টের কুখ্যাত গ্রেনেড হামলা পর্যন্ত অনেক ঘটনার বিবরণ আছে এই বইয়ে। শৈশবে কুয়াশা, দস্যু বনহুর, কিরিটী রায় আর মাসুদ রানা’ই ছিল আমাদের রোমাঞ্চ এবং গোয়েন্দাজ্ঞানের নির্ভরযোগ্য(?) উৎস। তারুণ্যে কিংবা বৃদ্ধ বয়সেও এই বই পড়লে সেই ছোটবেলায় গোয়েন্দা সিরিজ পড়ে অনুভূত হওয়া শিহরণ পাওয়া যাবে। এক সময় গোয়েন্দা বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা লেখক উৎসাহী পাঠককে নিয়ে যান উত্তরবঙ্গ থেকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে, গাইডেড ট্যুর এর মতো। বই পড়তে পড়তে পাঠকের চোখের সামনে ভেসে উঠবে সব চাঞ্চল্যকর ঘটনা আর লোমহর্ষক অভিযানের কথা।
প্রতিদিন ঢাকার রাস্তায় দেখি কর্মরত পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সম্পর্কে প্রায় সবাই ঢালাও বিরূপ মন্তব্য করে। তাই দেখে একদিন একজনকে চ্যালেঞ্জ করেছিলাম ‘ধুলাবালি, ধোঁয়া, শব্দদূষণ আর বিশৃঙ্খল যানবাহনের বিশ্ব-রাজধানী এই ঢাকার রাস্তার মধ্যে (যেমন- বিমান বন্দরের সামনের গোলচত্বরে) কিছু করতে হবে না, আপনি কি দশ মিনিট ট্রাফিকের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকতে পারবেন?’ যা যে কোনো সাধারণ মানুষের জন্য প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। এই পরিস্থিতিতে আমাদের পুলিশরা ঘন্টার পর ঘন্টা জীবন হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন, অনেকে মারাও যান। তারপরও সাধারণ মানুষের মধ্যে এই রকম বিরূপ ধারণা কেন আমাদের পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে? পুলিশ বাহিনীর ইমেজ সংকটের এই ব্যাপারটির কারণ সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন লেখক। লেখকের ভাষায়, দুর্নীতি অনেকেই করে, অথচ ‘পরিমাণে নগণ্য হওয়া সত্ত্বেও পুলিশের দুর্নীতিতে প্রতিক্রিয়াটি হয় বেশি। মুখে মুখে তা ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। আর পুলিশ যেহেতু সারাদেশেই ছড়িয়ে আছে, তাই সেটা দ্রুত চাউর হয়ে যায় দেশজুড়ে। চাকরি করতে গিয়ে একজন পুলিশকে যে কত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে পড়তে হয় সেটা সাধারণ মানুষ চিন্তাও করতে পারবে না।’
লেখক সাধারণ মানুষের মন জয় করার উপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েই থেমে থাকেননি। তিনি সাধারণ মানুষের মন জয় করার উপায় সম্পর্কে সহজ ফরমুলাও দিয়ে দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা সাধারণ মানুষের মন জয় করা। সেটা পুলিশের চাকরি করে যত সহজে করা যায়, তা অন্য কোনো পেশায় চিন্তাও করা যায় না। বিপদে পড়ে যদি কেউ পুলিশের শরণাপন্ন হয়, তাকে যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ একটু হাসি মুখে গ্রহণ করে, শান্তভাবে গুরুত্ব সহকারে তার কথা শোনে, তা হলেই হয়’। এই ধরনের পরামর্শ, দিক-নির্দেশনা অবশ্যই পুলিশের ইমেজ ভালো করতে সহায়ক হবে। তিনি পুলিশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, আপনারা আত্ম-সমালোচনা করেন, কেন মানুষ আপনাদের নিয়ে নেতিবাচক সমালোচনা করে। সত্যিই এটি জাতির অনেক বড় খেদমত যে, অবসর জীবনে রাইফেল ছেড়ে আবার কলম ধরেছেন লেখক। লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন কর্মজীবনের সব অভিজ্ঞতা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ‘বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর জন্য’। প্রচন্ড রাজনৈতিক সচেতন হলেও তিনি পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক কারণে ব্যবহারের বিরূপ ফলাফল তুলে ধরেছেন। পুলিশের রাজনীতিকরণ তার কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক মনে হয়েছে। পুলিশ বাহিনীর সব কর্মকর্তার তো বটেই, সব সদস্যেরও অবশ্যপাঠ্য হওয়া উচিত বিশ্লেষণধর্মী এই আত্মজীবনীটি। যা সবাইকে দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। পুলিশ বাহিনীর অনেক সদস্যই ভবিষ্যতে বই বা ডায়েরি লিখতে উদ্বুদ্ধ হবেন এই বই পড়ে। কারণ পুলিশের ইমেজ বৃদ্ধি করা এবং তাদের অভিজ্ঞতা ভাগ করাও তাদের নৈতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, প্রাক্তন অনেক সামরিক কর্মকর্তা অবশ্য এই লেখালেখির ব্যাপারে (বিশেষত মুক্তিযুদ্ধের বিষয়ে) বেশ সক্রিয় এবং এর সুফল তারা পেয়েছেন এবং পাচ্ছেন। তারা প্রমাণ করেছেন, Pen is mightier than the Sword। এর ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটা ভ্রান্ত ধারণা জন্মেছে যে সেনাবাহিনীই বুঝি কেবল মুক্তিযুদ্ধ করেছে, মরেছে। আর সাধারণ ছাত্র-জনতা শুধু সাইড লাইনে বসে যুদ্ধ দেখেছে। অথচ বাস্তবতা কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। সামরিক বাহিনীর সংখ্যার চেয়ে কমপক্ষে বিশগুণ বেশি মুক্তিবাহিনীর সদস্য জীবন দিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। যেহেতু অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তাদেরকে পদক বঞ্চিত করা হয়েছিল এবং তাদের বীরত্বগাঁথাও লিপিবদ্ধ করা হয় নাই, তাই আজ মুক্তিযুদ্ধের সত্যিকারের বীরদের আত্মত্যাগ আর বীরত্ব নির্বাসিত। একইভাবে উপেক্ষিত হয়ে চলেছে ‘রাজারবাগের বীরত্বগাঁথা এবং মুক্তিযুদ্ধে পুলিশের আত্মত্যাগ’। খুব কম মানুষই জানেন যে, মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে সবচেয়ে বেশি আত্মত্যাগ করেছিল এই পুলিশ বাহিনীর রাজারবাগের সদস্যরা। দুঃখজনক হলেও সত্যি, এই আত্মত্যাগের গৌরবময় ইতিহাস অজানাই রয়ে গেছে দেশের মানুষের কাছে। রাজারবাগের পুলিশের বীরেরা পায়নি কোনো পদক বা সম্মান। এমতাবস্থায় এই বই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত এবং নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
এই বইয়ে অসংখ্য ঘটনার উল্লেখ আছে, যেমন আছে সময় ও পরিস্থিতি বুঝে বিভিন্ন রকম কৌশল প্রয়োগের কথা, প্রাপ্ত সাফল্যের কথা, আলোচনার মাধ্যমে বা ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের মাধ্যমে কঠিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার উদাহরণ; তেমনি কোনো কোনো জায়গায় ধরা পড়েছে ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের কারণে লেখকের সীমাবদ্ধতার কথা। প্রতিটি ঘটনা থেকে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পুলিশ বাহিনী দিক-নির্দেশনা অবশ্যই পাবেন। ভবিষ্যতে অনেক পুলিশ কর্মকর্তা ও সদস্য উদ্বুদ্ধ হবেন এই ডায়েরি থেকে। লিখবেন তাদের অভিজ্ঞতার কথা আর পুলিশ বাহিনীর অবদানের কথা। যা জনগণের মধ্যে পুলিশ বাহিনী সম্পর্কে এক নতুন চিন্তার খোরাক যোগাবে, আর দূরত্ব কমিয়ে দিবে পুলিশ আর জনগণের মধ্যে।
একুশে পদকপ্রাপ্ত বিশিষ্ট নাট্যকার ও নাট্যজন আতাউর রহমান বইটি সম্পর্কে বলেছেন,‘জীবনে আমি একটানে তিনটি আত্মজৈবনিক গ্রন্থ পড়েছি। এর মধ্যে প্রথম দু’টি: সত্যাজিৎ রায়ের ‘মাই ইয়ার্স উইথ অপু’ এবং ভারতের ১১তম রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালামের ‘উইংস অফ ফায়ার’। তৃতীয় বইটি হচ্ছে সফিক উল্লাহ এর ‘এক পুলিশের ডায়েরি’। সাড়ে তিনশ’ পৃষ্ঠার এই বইটি পড়তে আমাকে একবারও থামতে হয়নি, কখনো কিছুমাত্র ক্লান্ত লাগেনি। অসাধারণ ঝরঝরে ভাষা, তরতর করে এগিয়ে যেতে পেরেছি। বইটিতে লেখক যেমন তার পেশাগত জীবনের সাফল্যের কথা বলেছেন, তেমনি অকপটে স্বীকার করেছেন অনেক ব্যর্থতা আর সীমাবদ্ধতার কথা। বইটিতে জীবন আছে, জীবনের প্রবাহ আছে। এটি একটি সার্থক আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। ’
একাত্তর টেলিভিশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল বাবু বইটি সম্পর্কে বলেছেন, ‘বইটিকে বাংলাদেশের গত ৪৫ বছরের মোটামুটি একটা রাজনৈতিক ইতিহাস বলা যায়। জিয়ার ক্ষমতা দখল, জিয়ার মৃত্যু, মন্ত্রীর বাড়ি থেকে সন্ত্রাসী ইমদুকে গ্রেফতার, এরশাদের ক্ষমতা দখল, নয় বছরের শাসন ও পতন -এই সব বিষয়ই আছে এই বইয়ে। সে সময়ের অনেক কথা আমরা পত্রিকায় পড়েছি, কিন্তু অনেকেই জানি না ঘটনাগুলোর পিছনে কি ঘটেছে। নিজ জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে সেই সব পিছনের খুঁটিনাটি ঘটনা লেখক তুলে ধরেছেন এই বইয়ে। এতো এনেকডটসে ভরা বই জীবনে আমি খুব বেশি পড়িনি। লেখকের গদ্য অত্যন্ত সাবলীল, স্বতঃস্ফূর্ত। লেখায় কোনো ভান নেই, কৌশল নেই।’
বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সঈেক্টর জেনারেল এ কে এম শহীদুল হক বইটি সম্পর্কে বলেছেন, ‘যদিও বইটির নাম ‘এক পুলিশের ডায়েরি’, কিন্তু আমি মনে করি এটি কোনো একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত ডায়েরি নয়, নয় কেবল একজন পুলিশ কর্মকর্তার ডায়েরি; বরং এটি বাংলাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি, সমাজ এবং ঐতিহ্যের ডায়েরি। এই বইটি পড়লে পুলিশ সদস্যরা উপকৃত হবেন। তারা জানতে পারবেন চরম প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও কিভাবে দায়িত্ব পালন করতে হয়। তারা একজন পুলিশ কর্মকর্তার পেশাগত দক্ষতা, বিভিন্ন ঘটনা এবং এর সমাধান, জনগণের সাথে পুলিশের যোগাযোগ ইত্যাদি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করতে পারবেন, যা তাদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াবে। শুধু পুলিশ নয়, সাধারণ পাঠকের কাছেও বইটি সুখপাঠ্য হবে। বইটির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- এটি একবার পড়া শুরু করলে শেষ না করে উঠতে পারবেন না।’
‘এক পুলিশের ডায়েরি’ মূলত সফিক উল্লাহর বর্ণাঢ্য সেই পেশাজীবনের অভিজ্ঞতার বিবরণ। বইটি পড়লে কেবল একজন পুলিশ কর্মকর্তার কর্মকা- সম্পর্কেই জানা যাবে-তা নয়, একই সঙ্গে এই ভূখন্ডে সংঘটিত অনেক আলোচিত ঘটনার পিছনের কথা সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে। জানা যাবে সেই সময়ের নানা কুশীলবের ভূমিকার বিষয়েও। সেই অর্থে ‘এক পুলিশের ডায়েরি’ বাংলাদেশের অতি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের একটি দলিলও বটে। শেষ অধ্যায়ে লেখক লিখেছেন, ‘২০০২ সালে বাধ্যতামূলক অবসরপ্রাপ্তির মাধ্যমে শেষ হলো আমার পুলিশের জীবন। তখন থেকেই একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির সাথে কাজ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করি। এর ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ি।’ পুলিশ জীবনের উপলব্ধির ব্যাপারে তিনি লিখেন,‘ পেশাগতভাবে আমি ভালো-মন্দ দুই ধরনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই গিয়েছি। অনেক কাজ করেই প্রশংসিত হয়েছি। জীবনের ঝুঁকি নিয়েছি, কিন্তু সাফল্য যখন এসেছে, প্রশংসা যখন পেয়েছি, তখন আর ওই ঝুঁকির কথাটা মনে থাকেনি। আবার এমন অনেক কাজ করেছি, যেগুলো করতে মন সায় দেয়নি, কিন্তু তারপরও করতে হয়েছে। অনেক সময় রাজনৈতিক কারণে করতে হয়েছে, কখনো বা পেশাগত অস্তিত্বের স্বার্থেই করতে হয়েছে।’
তিনি লিখেছেন, ‘আমার বিবেচনায় সবচেয়ে বড় কথা সাধারণ মানুষের মন জয় করা। সেটা পুলিশে চাকরি করে যত সহজে করা যায়, অন্য কোনো পেশায় তা চিন্তাও করা যায় না। বিপদে পড়ে যদি কেউ পুলিশের শরণাপন্ন হয়, তাকে যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ একটু হাসিমুখে গ্রহণ করে, শান্তভাবে গুরুত্ব সহকারে তার কথাটা শোনে, তা হলেই হয়। তা হলেই অনেক ঝামেলা কমে যায়।’ পুলিশের ইতিবাচক ইমেজ আরো বাড়বে এমন প্রত্যাশায় তিনি লিখেন,‘সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশ বিভাগে যে বিষয়টি আমার কাছে সবচেয়ে বেদনাদায়ক মনে হয়েছে, তা হলো-পুলিশের রাজনীতিকরণ, পুলিশ নিয়ে রাজনীতি করা। এটা একটা শৃঙ্খলা বাহিনী, এখানে রাজনীতি ঢুকে পড়লে রাজনীতিরও ক্ষতি হয়, পুলিশেরও বদনাম হয়। কিন্তু রাজনীতিবিদরা এই বিষয়টা প্রায়ই বুঝতে চান না। কাজেই তাদের মুখের দিকে তাকিয়ে না থেকে বরং পুলিশই এ বিষয়ে ভূমিকা নিতে পারে। আমার বিবেচনায়, পুলিশকে সব সময় সচেতন থাকতে হবে যেন রাজনীতি তাদেরকে অপব্যবহার করতে না পারে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ