বিশেষ খবর

বিশ্ব শিক্ষক দিবসঃ বিশিষ্টজনের অভিমত

ক্যাম্পাস ডেস্ক মতামত

মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকরা কেমন আছেন, কেমন থাকা উচিত, সামাজিক ও পেশাগত জীবনে তাঁদের কি সমস্যা সেগুলোর প্রতিকারের লক্ষ্যে ক্যাম্পাস পত্রিকার প্রতিনিধি গিয়াস উদ্দিন আহমেদ দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, শিক্ষাদ্যোক্তা এবং বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিত্বগণের সাথে একান্ত আলাপচারিতায় মিলিত হন।
আলাপচারিতার সময় তাঁদের যেসব প্রশ্ন করা হয়েছিল
- বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১০ লক্ষ শিক্ষক দায়িত্ব পালন করে থাকেন, অথচ যথাযোগ্য মর্যাদায় বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন হয় না। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখছেন?
- সফল ছাত্রজীবন শেষে অন্য পেশায় না গিয়ে শিক্ষকতা বেছে নিলেন কেন?
- স্বাধীনতার প্রায় ৪ দশক পূর্ণ হতে চললেও এখনও পর্যন্ত সার্ভিস রুলে শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা নির্ধারণ করা হয়নি। শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বলবেন কী?
- শিক্ষকতা পেশায় আসতে মেধাবীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আগ্রহী করতে কার কি করণীয়?
সেসব আলাপচারিতার উল্লেখযোগ্য অংশবিশেষ এখানে উপস্থাপন করা হলো।
শিক্ষান্নোয়ন, শিক্ষকের উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের সম্পর্কে আমাদের সচেতন করে বিশ্ব শিক্ষক দিবস
প্রফেসর ড. আতফুল হাই শিবলী
সাবেক সদস্য, ইউজিসি

বাংলাদেশে বিভিন্ন স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১০ লক্ষ শিক্ষক কর্মরত; অথচ এখানে যথাযথ মর্যাদায় বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালিত হয় না। শিক্ষকরা বিভিন্ন দাবি দাওয়া নিয়ে আন্দোলন করেন, বিশ্ব শিক্ষক দিবসকে কেন্দ্র করে শিক্ষক সমাজ কি ভূমিকা পালন করতে পারেন বলে মনে করেন? এমন প্রশ্নের জবাবে নিবেদিত শিক্ষক প্রফেসর আতফুল হাই শিবলী বলেন, বিশ্ব দিবস সম্পর্কে শিক্ষক সমাজের সবাই সচেতন। এই দিবসটি শিক্ষা উন্নয়ন, শিক্ষকদের উন্নয়ন, শিক্ষকদের মর্যাদা বৃদ্ধি এবং তাদের দাবি ও অধিকার সম্পর্কে আমাদের সচেতন করে।
তিনি বলেন, বিশ্ব শিক্ষক দিবস ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কে আরও গভীর করে তোলে, শিক্ষকদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান, মতবিনিময়কে অর্থবহ করে। ছাত্র-শিক্ষক মধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠা ছাড়া শিক্ষার বাণী ছড়িয়ে দেয়া যায় না, শিক্ষার মূলমন্ত্র শিক্ষার্থীর মরমে পৌঁছাতে পারে না। শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য সম্পর্কে আমরা সব সময় সচেতন, আমাদের একান্ত কামনা-বাংলাদেশের জনগণ শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারবে এবং এই বিশেষ দিবসটি যথাযথ মর্যাদা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে পালন করবে।
কোন প্রেরণায় উদ্ধুদ্ধ হয়ে আপনি শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন এবং মহান পেশায় স্থিত রয়েছেন- এমন প্রশ্নে কৃতী শিক্ষাবিদ প্রফেসর আতফুল হাই শিবলী বলেন, ছোটবেলা থেকে শিক্ষকের আদর্শ ও অনুকরণীয় জীবন যাপন লক্ষ্য করে আসছি। বড় হয়ে লক্ষ্য করছি - শিক্ষকতা একটি মহান পেশা; তখনই লক্ষ্য ঠিক করেছি -আমার কর্মজীবন হবে একজন আদর্শ শিক্ষকের জীবন।
এমন এক সময় ছিল যখন মেধাবী শিক্ষার্থীরাই শিক্ষকতা পেশা বেছে নিতেন, কিন্তু পরবর্তী সময়ে এ ধারা আর বজায় থাকেনি; মেধাবীরা অন্যান্য পেশায় চলে যান যেখানে থাকে অনেক সুযোগ-সুবিধার হাতছানি। কেউ কেউ শিক্ষকতা পেশায় যোগদান করে পরবর্তীতে ক্যাডার সার্ভিসে যুক্ত হন। এ ধরনের মানসিকতার কারণ কী এবং মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় কিভাবে ধরে রাখা যায়-এমন প্রশ্নের জবাবে প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ প্রফেসর আতফুল হাই শিবলী বলেন, শিক্ষকতা শুধু একটা দিক, এখন সমাজে অনেক এভেনিউ খুলে গেছে যেখান থেকে মানুষ সহজে জীবন-জীবিকার সহজ পথ খুঁজে নিতে পারেন। সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা শিক্ষকতা করছেন তাদের সবাই মেধাবী অভিজ্ঞ ডক্টরেট ডিগ্রিধারী। এরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠদান করে যাচ্ছেন, কেউ কেউ গবেষণায় নিযুক্ত রয়েছেন। মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসছেন না, এটা ঠিক নয়। তাদের কেউ কেউ প্রাপ্ত সুযোগের সদ্ব্যবহার করে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছে। শিক্ষকতা পেশায় কর্মজীবন শুরু করেও কেউ কেউ কিছুদিন পর অন্য পেশায় চলে যান।
জোর করে কাউকে আটকে রাখা যায় না ইচ্ছার বিরুদ্ধে শিক্ষকতা মহান পেশা-এ বোধ জাগলে শত প্রলোভনের হাতছানি একজন মেধাবীকে শিক্ষকতা পেশা থেকে বিরত রাখতে পারে না। তবে শিক্ষকতা পেশায় সুযোগ-সুবিধা একটু একটু করে বাড়ানোর প্রয়োজন আছে, যাতে একজন মেধাবী তরুণ আশান্বিত হতে পারেন- এখন না হলেও ভবিষ্যতে তা’ভোগ করার সুযোগ পাবেন। এজন্য শিক্ষকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধার দিকটা সরকারের দেখা উচিত। সরকার যদি শিক্ষক সমাজের আর্থিক সমস্যা সমাধানে সহযোগিতা করেন তা’হলে কোনো মেধাবী শিক্ষক শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে চলে যাবেন না।
গুণগত মানের শিক্ষক স্বল্পতা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সমস্যা সৃষ্টি করছে, এরফলে কোয়ালিটি শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠছে না- এ সমস্যা সমাধানে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় বলে মনে করেন- এমন প্রশ্নে নিবেদিত শিক্ষাবিদ প্রফেসর আতফুল হাই শিবলী বলেন, জ্ঞানের কোনো শেষসীমা নেই। শিক্ষক যখন নতুন যোগদান করেন তখন অদক্ষই থাকেন। তবে পাঠদান করতে করতে কিছুটা দক্ষতা অর্জন হয়, তবে পরিপূর্ণ দক্ষতা অর্জন করতে তাকে প্রশিক্ষণ দেয়া প্রযোজন। এ ক্ষেত্রে বিদেশে পঠিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে নতুন জ্ঞান ধারণ করে শিক্ষক নিজেকে সমৃদ্ধ করতে পারেন। তবে সব সময় বিদেশি ডিগ্রি নেয়ার সুযোগ থাকে না। দেশের অভ্যন্তরেই শিক্ষকের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দানের ব্যবস্থা করতে হবে। এখানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র আছে। যেখানে তারা তাদের দক্ষতা বৃদ্ধির সুযোগলাভ করেন। যাদের নিজস্ব ট্রেনিং সেন্টার নেই তারা সরকারি শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সহযোগিতা নিতে পারেন।
স্বাধীনতার এতবছর পরও শিক্ষকদের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স নির্ধারণ হয়নি, এ ব্যাপারে আপনার মতামত কী- এমন প্রশ্নের জবাবে ছাত্রবৎসল শিক্ষক প্রফেসর আতফুল হাই শিবলী বলেন, এ বিষয়টি নিয়ে আমি নিজেও ভাবিত। শিক্ষকরা ধন-দৌলত চাইছেন না, তারা চাইছেন একটু সম্মান। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে দেখা যায়-শিক্ষকদের লাইন ৩ কি ৪ এ। বিভিন্ন ক্যাটাগরির কর্মকর্তাগণ বিভিন্ন লাইনে স্থান পান। এতে শিক্ষকগণ কষ্ট পান। যিনি দেশের সর্বোচ্চ পদে অধিষ্ঠিত তিনিও একজন শিক্ষকের ছাত্র, সচিব-সিনিয়র সচিব তারাও শিক্ষকের ছাত্র। সেকথা খেয়ালে আনলে শিক্ষকদেরকে মর্যাদা দান করে সম্মানজনক আসনে যদি বসানো যায় তা’হলে কারো আপত্তি থাকার কথা নয়। শিক্ষকদের জন্য একটা আলাদা লাইন করে দেয়াই উত্তম বলে মনে করি। শিক্ষক সন্তুষ্ট হলে, সম্মানিতবোধ করলে সবাই খুশি হবেন বলে আমি মনে করি।
শিক্ষক সমাজের প্রতি পরামর্শ প্রদান প্রসঙ্গে বিদগ্ধ শিক্ষাবিদ প্রফেসর আতফুল হাই শিবলী বলেন, শিক্ষকতা মহান পেশা, এ পেশায় সম্পৃক্ত হতে পেরে আমরা গর্ব অনুভব করছি। আমাদের আর্থিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে, ভবিষ্যতে আরও হবে। তবে মর্যাদা রক্ষার ক্ষেত্রে আমাদেরকে আরও সচেতন হতে হবে।
শিক্ষকদের মান-মর্যাদা, সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির চেষ্টার মধ্যে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিহিত
সৈয়দ আবুল হোসেন
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, সাকো ইন্টারন্যাশনাল

দেশে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত ১০ লক্ষ শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন বলে যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায় তাতে বোঝা যায় কত বেশি মানুষ শিক্ষকতায় নিয়োজিত রয়েছেন। এ শিক্ষকদের সাথে আছেন কর্মকর্তা-কর্মচারী। সারা বিশ্বের মানুষ ৫ অক্টোবর শিক্ষকদের প্রতি মান-মর্যাদা প্রদর্শন করে বিশ্ব শিক্ষক দিবস হিসেবে পালন করে। আমাদের দেশে সার্বিক অর্থে শিক্ষককে গুরুত্ব দেয়া হয় না। শিক্ষকগণ শিক্ষাক্ষেত্রে অবহেলিত, উপেক্ষিত; তাদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া থেকে তারা বঞ্চিত। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হয়েছেন। আমরা আশা করি তারা শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের মধ্যে শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করবেন, শিক্ষকদের মান-মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের গুরুত্ব ও তাৎপর্যও সেখানে। ইউনেসকো কর্তৃক নির্ধারিত এ দিবসটি শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের জন্যই নয়, সারা বছরই শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা, মান-মর্যাদা বৃদ্ধির চেষ্টার মধ্যেই বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিহিত।
শিক্ষকতা একটি ব্যতিক্রমধর্মী পেশা। শিক্ষকতাকে অভিহিত করা হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ও মহানতম আদর্শ হিসেবে। বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (দঃ) বলতেন তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি মানব জাতির শিক্ষক। আপনার মানুষের পথ প্রদর্শক ও শিক্ষক এই পরিচয়েই পরিপিত হওয়ার অভিপ্রায় তিনি ব্যক্ত করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বিশ্ব কবি হয়ে সন্তুষ্ঠ থাকেননি। বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে তিনি নিজেকে একজন নিবেদিত প্রাণ আদর্শ শিক্ষকে রুপান্তরিত করার প্রয়াস পেয়েছিলেন। আধুনিক চীনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মাও সে তুং তার জীবদ্দশায় প্রায়ই বলতেন যে, তিনি একজন শিক্ষক মাত্র। তার জাতিকে জাগরণের মন্ত্রে দীক্ষিত, উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত করার শিক্ষাই তিনি দিয়ে গিয়েছেন। ব্যক্তিগত জীবনে চেয়ারম্যান মাও শিক্ষক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছিলেন। গ্রীক দার্শনিক ও রাষ্ট্রচিন্তাবিদ প্ল্যাটো শিক্ষাকে তুলনা করেছিলেন অন্ধকার গুহার মধ্যে অজ্ঞতার শিকলবদ্ধ মানুষের কাছে আলোকরশ্মির আকস্মিক বিকীরনের সাথে। সেই অর্থে শিক্ষকরা হচ্ছেন তিমির অভিসারী ও আলো বিতরণকারী। কেননা জ্ঞানই হচ্ছে প্রকৃত আলো। শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। মহা বীর আলেকজান্ডার বলেছিলেন, ‘আমার জীবনের জন্যে, আমার জন্মের জন্যে আমি আমার পিতা-মাতার কাছে ঋনী। কিন্তু আমার মনুষ্যত্বের জন্যে, কৃতিত্ব, বীরত্ব ও গৌরবের জন্য ঋনী হচ্ছি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক এরিসেটোটলের কাছে।’
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও দার্শনিক হোয়াইটহেড বলেছেন No System of education is better than a teacher। অর্থাৎ কোনো শিক্ষা ব্যবস্থাই শিক্ষকের চেয়ে উন্নত নয়। শিক্ষকই শিক্ষা ব্যবস্থার প্রাণ। চলতি বছর ৫ই অক্টোবর আন্তর্জাতিকভাবে যে বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপিত হয় তার মর্মবাণী ছিল -Teachers at the heart of the educational process। অর্থাৎ শিক্ষা প্রক্রিয়ার অন্তস্থলে শিক্ষকদের অবস্থান। দার্শনিক বাট্রান্ড রাসেলের কথায়- ‘শিক্ষক সমাজ হচ্ছেন প্রকৃতই সমাজ ও সভ্যতার বিবেক।’ এ জন্যে শিক্ষকদের বলা হয় ‘সোস্যাল ইঞ্জিনিয়ার’ বা সমাজ নির্মাণের স্থপতি।
শিক্ষকদেরকে যদি আমরা মান-মর্যদা দিতে না পারি, তাদেরকে যদি ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধার মধ্যে আনতে না পারি তাহলে শিক্ষার মান উন্নত হবে কীভাবে? আমাদের স্বাধীনতার ৪ দশক শেষ হয়েছে, এ সময়ের মধ্যে কতদিন গণতন্ত্রের চর্চা করেছি? জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যখন সরকারি কোষাগার প্রায় শূন্য, তখন ভঙ্গুর অর্থনীতির মাঝেও প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ করে হাজার হাজার শিক্ষকের বেতন-ভাতা দেয়ার সাহসিক পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে কুদরাৎ-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠন করে তিনি শিক্ষার উন্নয়ন এবং শিক্ষকদের মান-মর্যাদা বৃদ্ধির ব্যাপারেও পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। জাতির দুর্ভাগ্য যে, সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যার পর সে শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট আর আলোর মুখ দেখেনি, নয়া শাসকরা সেই গণমুখী শিক্ষা কমিশন রিপোর্টকে হিমাগারে পাঠিয়ে দেয়। সামরিক শাসন, স্বৈরশাসনের যাঁতাকলে পরিচালিত দেশে কোন কোন পেশায় থেকে অনেকে আখের গুছিয়ে নিয়েছেন, নিজেদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করেছেন, কিন্তু শিক্ষক সমাজের ভাগ্য যে তিমিরে ছিল সে তিমিরেই রয়ে গেছে। শিক্ষকরা গরীব হলেও আত্মমর্যাদাশীল, তারা এজন্যই হয়ত সুযোগ-সুবিধার পেছনে দৌড়াননি, তারা বঞ্চিতই থেকেছেন। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার শিক্ষকদের বহু সুযোগ-সুবিধা ইতোমধ্যে দিয়েছেন। ভবিষ্যতে এ ব্যাপারে আরো উদার হবেন। শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করার জন্য শিক্ষকদের আলাদা বেতন-স্কেল, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। তাদের মান-মর্যাদা বৃদ্ধির দিকেও নজর দিতে হবে। আজকের মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কর্পোরেট জগত দ্রুত উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা পাস করে বেরিয়ে ব্যাংক-বীমা বা বেসরকারি কোম্পানীতে চাকরির শুরুতে যে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পায় তার তুলনায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। সুতরাং একেবারেই যারা এ পেশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল তারাই এ পেশায় আসছেন। বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলে মেধাবীরা শিক্ষকতার প্রতি আকৃষ্ট হবে বলে আমি মনে করি। উন্নত দেশসমূহে দেখা যায় সেখানে অন্যান্য পেশার চেয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিতদের বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি। তারা বুঝতে পেরেছেন যে, দেশকে উন্নত করতে হলে শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে।
একজন শিক্ষকের প্রধান কাজ হলো পাঠদান। তিনি ক্লাসে পাঠদান করবেন, ক্লাসের বাইরেও পাঠদান করবেন। একজন শিক্ষক সবসময়ে শিক্ষক। তিনি শুধু ক্লাসে শিক্ষক নন, তিনি খেলার মাঠে, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও শিক্ষক। একজন শিক্ষকের পোশাক-পরিচ্ছদ, বাচনভঙ্গী, আচার-আচরণ এসব কিছুই শিক্ষার মাধ্যম। একজন ছাত্র শিক্ষককে দেখে শিখবে, তার বক্তব্য শুনে শিখবে, তার আচার-আচরণ লক্ষ্য করে শিখবে। এগুণগুলো শিক্ষকের গুণাবলী হওয়া বাঞ্ছনীয়। আমাদের শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নিয়ে যেতে হলে শিক্ষকের শিক্ষাদান পদ্ধতিকে সে মানে নিয়ে যেতে হবে, যা হবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। সে রকম গুণী ও বৈশিষ্ট্যমন্ডিত শিক্ষকই আমাদের প্রয়োজন। যেসব নিষ্ঠাবান দরদী শিক্ষক প্রাইমারী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় লেভেল পর্যন্ত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী তৈরি করে দেশ পরিচালনায় উপযুক্ত করে গড়ে তুলছেন, সেসব শিক্ষককে স্বীকৃতি দেয়ার জন্য পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা করা উচিত। বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের মাধ্যমে সারাদেশ থেকে গুণী শিক্ষকদের সম্মাননা দেয়া হলে তা শিক্ষকদের জন্য হবে প্রেরণাদায়ক, জাতির জন্য হবে গৌরবের।
বিদেশে অবস্থানরত মেধাবী শিক্ষকদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধা দিয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে
প্রফেসর ড. আবু ইউসুফ মোঃ আবদুল্লাহ
চেয়ারম্যান, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ

শিক্ষক দিবস পালনের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মতামত ব্যক্ত করে প্রফেসর আবু ইউসুফ মোঃ আবদুল্লাহ বলেন, শিক্ষাক্ষেত্রে মূল সমস্যা হল গুণগত মানের অভাব। এ গুণগত মান যদি আমরা বাড়াতে না পারি, তাহলে জাতি হিসেবে টিকে থাকা আমাদের পক্ষে দুরূহ হবে। গুণগত মান যারা নিশ্চিত করবেন, তারা হলেন শিক্ষক। কিন্তু আমাদের দেশে সার্বিক অর্থে শিক্ষককে গুরুত্ব দেয়া হয় না। শিক্ষকগণ শিক্ষাক্ষেত্রে অবহেলিত, উপেক্ষিত; নিজেদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া থেকে তারা বঞ্চিত। বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হয়েছেন। আমরা আশা করি, তারা শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষার প্রসার এবং শিক্ষকদের জন্য আকর্ষণীয় সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করবেন, শিক্ষকদের মান-মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের গুরুত্ব এবং তাৎপর্যও সেখানে। ইউনেসকো কর্তৃক নির্ধারিত এ দিবসটি শুধু আনুষ্ঠানিকভাবে পালনের জন্যই নয়, সারা বছরই শিক্ষকদের সুযোগ-সুবিধা, মান-মর্যাদা বৃদ্ধির চেষ্টার মধ্যেই বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য নিহিত রয়েছে বলে মনে করি। শিক্ষাক্ষেত্রে মেধাবীদের আকৃষ্ট করার বিষয়ে নিজ মতামত ব্যক্ত করে প্রফেসর ইউসুফ আবদুল্লাহ বলেন, শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট করার জন্য শিক্ষকদের আলাদা বেতন-স্কেল, বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। তাদের মান-মর্যাদা বৃদ্ধির দিকেও নজর দিতে হবে। আজকের মুক্তবাজার অর্থনীতিতে কর্পোরেট জগত দ্রুত উন্নতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরা পাস করে বেরিয়ে ব্যাংক-বীমা বা বেসরকারি কোম্পানীতে চাকরির শুরুতে যে বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পায় তার তুলনায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের বেতন ও সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। সুতরাং একেবারেই যারা এ পেশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল তারাই এ পেশায় আসছেন। বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো হলে মেধাবীরা শিক্ষকতার প্রতি আকৃষ্ট হবে বলে আমি মনে করি। তিনি আরও বলেন, উন্নত দেশসমূহে দেখা যায় সেখানে অন্যান্য পেশার চেয়ে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিতদের বেতনভাতা ও সুযোগ-সুবিধা অনেক বেশি। তারা বুঝতে পেরেছেন যে, দেশকে উন্নত করতে হলে শিক্ষার ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিতে হবে। আর সেজন্যই নর্দান ইউনিভার্সিটিতে আমরা একটি স্মল-স্কেল পদ্ধতি করেছি তা হলো শিক্ষকদের ইভ্যালুয়েশন করা। এর প্রেক্ষিতে কম্পিটেন্ট শিক্ষক ক্যাটাগরিতে আমরা বেশকিছু ভালো শিক্ষক বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিয়োগ দিয়েছি। আমরা অনুধাবন করেছি যে, কোয়ালিটি শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে দ্বিধান্বিত হলে আমরা পিছিয়ে যাব। এক্ষেত্রে আমাদের সিদ্ধান্ত সঠিক হয়েছে বলে প্রতীয়মান; কারণ গুণগত মানের শিক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে আমরা ইতিমধ্যে একটা ভালো অবস্থানে চলে এসেছি। শিক্ষাক্ষেত্রে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকের ভয়াবহ সংকট চলছে। এ সমস্যার মোকাবেলা করতে হলে চাকরিরত শিক্ষকদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে ব্যাপকভাবে। উচ্চ মাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয় লেভেলে দক্ষ শিক্ষকের স্বল্পতা লাঘব করতে চাইলে সরকারকে ক্রাশ-প্রোগ্রাম নিয়ে কাজ করতে হবে। যেসব মেধাবী ছাত্র বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিয়ে শিক্ষকতা করছেন, তাদের সাথে যোগাযোগ করে তাদেরকে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। আমরা যদি তাদের ফিরিয়ে আনা নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে আমরা শিক্ষার মানোন্নয়নে আশানুরূপ অগ্রগতি সাধন করতে পারব এটা দৃঢ়তার সাথেই বলা যায়। তাছাড়া শিক্ষকদের গুণগত প্রশিক্ষণ এবং গবেষণামূলক কর্মকান্ডে নিয়োজিত করার ব্যবস্থা করলে আমরা উচ্চশিক্ষার পথে এগিয়ে যাব। গুণগত শিক্ষার ক্ষেত্রে রহংঃরঃঁঃরড়হধষ সাপোর্ট দেয়া রাষ্ট্রের পক্ষে কোনো কঠিন বিষয় নয়। এ রকম একটি কঠিন প্রোগ্রাম যদি ২/৩ বছরের মধ্যে ম্যাটেরিয়েলাইজ করতে পারি, তাহলে শিক্ষাক্ষেত্রে সত্যি একটা বিপ্লব সাধিত হবে। ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স সম্পর্কে প্রফেসর আবদুল্লাহ বলেন, শিক্ষকরা সমাজের কাছ থেকে একটু সম্মান-মর্যাদা চান, এর বেশি কিছু নয়। শিক্ষাই জাতির আলো, শিক্ষাই জাতির ভবিষ্যৎ। জ্ঞানীর কলমের কালি শহীদের রক্তের চেয়েও পবিত্র। আল্লাহ এবং রাসুল শিক্ষকদের কত সম্মান-মর্যাদা দিয়েছেন। জ্ঞানীর এক মিনিটের চিন্তা হাজার বছরের ইবাদতের চেয়েও উত্তম। অথচ বাংলাদেশে ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্সে শিক্ষকের যথাযথ মর্যাদা না দেয়া দুঃখজনক। আমরা যদি শিক্ষার মানোন্নয়ন করতে চাই, মেধাবী, জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান, শিক্ষিত, মার্জিত সংস্কৃতিবান মানুষকে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে পেতে চাই তাহলে অবিলম্বে শিক্ষকের মর্যাদা কয়েক ধাপ ওপরে উঠিয়ে তাদের বিশেষ মর্যাদা দিতে হবে। তবেই সমাজে আসবে সত্যিকার পরিবর্তন। তখন মেধাবীরা স্বেচ্ছায় শিক্ষকতা পেশায় ফিরে আসতে শুরু করবে। একজন প্রাজ্ঞ শিক্ষক এবং আলোকিত অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের কাছে মূল্যবান পরামর্শ প্রদান প্রসঙ্গে প্রফেসর আবু ইউসুফ মোঃ আবদুল্লাহ বলেন, বাংলাদেশের শিক্ষকদের পরামর্শ দেয়ার মত জ্ঞান এবং ক্ষমতা আমার নেই। তাদেরকে বিনয়ের সাথে বলব জাতির উন্নতির জন্য, শিক্ষার প্রসারে আপনারা যে ত্যাগ স্বীকার করে চলেছেন এটি আপনাদের মহানুভবতা। আপনারা একটি অনন্য সম্মানীয় পেশায় আছেন, রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, সম্মান-মর্যাদা তেমন না থাকলেও আমরা সবাই মিলে শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি এটি বাংলাদেশের শিক্ষকদের একটি বড় অবদান। আমরা শিক্ষক প্রতিনিধি, মিডিয়ার সম্মানিত ব্যক্তি, সুশীল সমাজের লোকজন মিলে আসুন সরকারকে বোঝানোর চেষ্টা করি, শিক্ষকদের অবহেলা না করে তাদের দাবি-দাওয়াসমূহ সহানুভূতির সাথে বিবেচনা করা উচিত।
জাতিকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব দরকার
লায়ন ডাঃ আলমগীর মতি এমজেএফ
ফাউন্ডার এমডি, মডার্ণ হারবাল গ্রুপ

শিক্ষাদ্যোক্তা এবং বিশিষ্ট হারবাল গবেষক ও চিকিৎসক লায়ন ডাঃ আলমগীর মতি এমজেএফ বিশ্ব শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য সম্পর্কে বলেন, আমি ব্যক্তিগত উদ্যোগে ২/৩টি স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছি। এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করতে গিয়ে দেখেছি, আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে কর্মের প্রতি সততা-বিশ্বাস এবং আস্থার যেমন অভাব রয়েছে, তেমনি রয়েছে শিক্ষার্থীদের প্রতি ভালোবাসার অভাব। তাই তারা শিক্ষার্থীদের প্রতি মনোযোগী না হয়ে নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকতেই বেশি পছন্দ করেন। ফলে পাঠ্যপুস্তকের বাইরেও যে শিক্ষার্থীদের অনেক কিছু বলা বা জানানোর আছে তা তারা ভুলে যান। শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। তাই আমাদের শিক্ষা পদ্ধতিতে শিশু, কিশোর-কিশোরীদেরকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। কেজি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে মূল হাতিয়ার মনে করতে হবে। স্কুল-কলেজের বাচ্চাদের স্বাস্থ্যের প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে। তাদের চিনি বা মিষ্টি জাতীয় কোনো লজেন্স-ক্যান্ডি না খাওয়ার জন্যে অনুপ্রাণিত করতে হবে। কেননা এতে বাচ্চাদের দাঁত নষ্ট হয়ে যায়। মাংস বাচ্চাদের ক্ষতি করে। তাই বাচ্চাদের মাংস কম খাওয়ার জন্যে উৎসাহিত করতে হবে। আচার, ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটিসহ যেসব মুখরোচক খাবার বাচ্চাদের ক্ষতি করে তা স্কুল কলেজের সামনে বিক্রি নিষিদ্ধ করতে হবে। বাচ্চাদের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন না এনে তাদেরকে সুস্থ, সবল, নিরোগ করে গড়ে তোলা অসম্ভব। বাচ্চাদের মুখ দিয়েই দেহে রোগ জীবাণু প্রবেশ করে। মুখ যদি নিরাপদ না হয় তাহলে সর্বনাশ হয়ে যাবে। মুখে দুর্গন্ধ, পেটের অসুখ হয় অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণ ও অপরিষ্কার জীবন যাপনের কারণে। চিনি ১৫৯টি রোগ তৈরি করে। সর্দি-কাশি, পেটের পীড়া, গলা ব্যথাসহ অনেক রোগের জন্যই চিনি দায়ী। এসব কথা প্রতিনিয়তই তাদেরকে বলতে হবে।
বাংলাদেশ হোমিওপ্যাথিক বোর্ডের পক্ষ থেকে হ্যানিম্যান পদক প্রাপ্ত দেশবরেণ্য এই চিকিৎসক বলেন, আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার একটাই প্রেরণা, আমাদেরকে ১০০ ভাগ শিক্ষিত জাতি গড়ে তুলতে হবে।
আমাদের দেশে শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা এখনও আসতে চায়। কিছু শিক্ষক নিয়োগের সময় কে কত টাকা দিতে পারবে তা বিবেচনা করা হয়, মেধা নয়। ফলে মেধাবীরা চাকরী পায় না, পায় কম মেধাসম্পন্ন ধনীর ছেলেরা। যে ৮-১০ লক্ষ টাকা দিয়ে শিক্ষক হয়েছে সে ক্লাসে পড়ানো থেকে তেলবাজি করে প্রমোশন নিতেই বেশি ব্যস্ত থাকে। অথচ জাতিকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব দরকার। বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের অধিকারী সফল শিল্পপতি, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, শিক্ষানুরাগী এবং সমাজসেবক এ ব্যক্তিত্ব বলেন, শিক্ষায় সেদিনই পরিবর্তন আসবে যেদিন শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ভালোবেসে পড়াবে, পয়সার জন্য নয়। টিউশনী ও কোচিংয়ের অপেক্ষায় বসে থাকবে না। শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নিজের ছেলে-মেয়েদের মতো ভাবতে পারবে। আমি নিজে দেখেছি বিশ^বিদ্যালয়ে ফার্স্ট কাস ফাস্ট অথচ বাংলা লিখতে পারে না, ইংরেজিতে ১ পৃষ্টায় ২২টি ভুল করে। এসব সার্টিফিকেট-বাণিজ্য বন্ধ হতে হবে।
শিক্ষক যদি টাকা-পয়সার কথা ভাবেন, অভাব-অনটন-কষ্টের কথা ভাবেন, তাহলে তার পক্ষে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হওয়া সম্ভব হবে না।
অধ্যাপক মোঃ রুহুল আমিন
অধ্যক্ষ, নিউ মডেল ডিগ্রি কলেজ

বিশ্ব শিক্ষক দিবসের তাৎপর্য সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রফেসর রুহুল আমিন বলেন, শিক্ষকরা দেশের বিবেক এবং দেশে আলোকিত জাতি গঠন এবং মানবসম্পদ গড়ে তোলার কারিগর। শিক্ষকদের দায়িত্ব অপরিসীম, তাদের মর্যাদাও সেভাবেই নিরূপণ হওয়া উচিত। বিভিন্ন কারণে আমরা শিক্ষকদেরকে সেই মর্যাদাপূর্ণ আসনে অধিষ্ঠিত করতে পারিনি। দেশের সামাজিক অবস্থা, আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণে শিক্ষকদেরকে যতটুকু বেতন-ভাতা দেয়া উচিত তা আমরা দিতে পারি না। ভালো শিক্ষক পেতে হলে তাদেরকে ভালো রেমুনারেশন দিতে হবে। বেতন-ভাতা আরও আকর্ষণীয় পর্যায়ে নির্ধারণ করতে পারলে আমরা মেধাবী ছাত্রদেরকে শিক্ষকতা পেশায় সহজে আকৃষ্ট করতে পারব বলে মনে করি। বর্ণাঢ্য শিক্ষাজীবনের অধিকারী হয়েও শিক্ষাজীবন শেষে শিক্ষকতা জীবন কেন বেছে নিলেন এমন জিজ্ঞাসার জবাবে প্রফেসর রুহুল আমিন বলেন, শিক্ষকতার প্রতি আমার আকর্ষণ আগে থেকেই ছিল। আমি মনে করি, আজকে আমি যে অবস্থানে আসতে পেরেছি, তা শিক্ষকতা পেশাকে বেছে নেয়ার কারণেই সম্ভব হয়েছে।
মানসম্পন্ন দক্ষ শিক্ষকের অভাব মোকাবেলায় কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় এমন প্রশ্নের জবাবে রুহুল আমিন বলেন, দক্ষ শিক্ষক বলতে আমি সে শিক্ষককে মনে করি, যার দু’টি গুণ রয়েছে একটি হল তার কমিটমেন্ট টু টিচিং, শিক্ষাক্ষেত্রে তাকে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হতে হবে; সেখানে তিনি যদি টাকা-পয়সার কথা ভাবেন, অভাব-অনটন-কষ্টের কথা ভাবেন, তাহলে তার পক্ষে নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক হওয়া সম্ভব হবে না। আগেকার দিনে এ ধরনের অনেক শিক্ষক ছিলেন যারা ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ; সংসারের কোনো ঝুট-ঝামেলা নিয়ে তারা ভাববার অবকাশ পেতেন না। এর কারণ হল টাকা-পয়সা, অর্থ-বিত্তের প্রতি তাদের লোভ ছিল না। তখন সামর্থ্যবান পরিবার থেকেই তরুণরা আসতেন শিক্ষকতা পেশায়। তারা নির্লোভ ছিলেন, এজন্য শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নয়, নেশা হিসেবে নিতেন। এ চেতনা থাকলে একজন ভালো শিক্ষক পাওয়া যায়। পার্থিব সম্পদের প্রতি বেশি লোভ-লালসা থাকলে একজন শিক্ষক ভালো শিক্ষক হতে পারেন না। স্বাধীনতার এত বছর পরও শিক্ষকদের মর্যাদা নিরূপণ করা যায়নি, এটা কী করে সম্ভব এমন প্রশ্নের জবাবে প্রফেসর রুহুল আমিন বলেন, আমি মনে করি সরকার যদি সচেষ্ট হন, তাহলে এর একটা সুন্দর সমাধান হতে পারে।
বাংলাদেশে বিভিন্ন সেক্টরে যারা শিক্ষা সম্প্রসারণে নিয়োজিত রয়েছেন তাদের জন্য মূল্যবান পরামর্শের কথা বলতে গিয়ে প্রফেসর রুহুল আমিন বলেন এ পেশার প্রতি তারা যদি নিবেদিত হন, তাহলে এ পেশায় তারা টিকে থাকবেন। তিনি বলেন, শিক্ষকগণ শিক্ষকসুলভ আচরণ করতে হবে। হাফহার্টেডলি পড়ালে শিক্ষার্থীরা আপনার পাঠদানে আগ্রহবোধ করবে না। আগেকার দিনে শিক্ষার্থীদেরকে শারীরিক শাস্তি দেয়া হত, শিক্ষার্থীরা তা মেনেও নিত; এখন এ অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে, এখন এ ধরনের শাস্তিদান নিষিদ্ধ। এখন ছাত্রদের মন জয় করে পড়াতে হবে। শিক্ষকরা সে ধরনের আচরণ করলে তারা সম্মান পাবেন, সম্মানজনক অবস্থানে পৌঁছাতে পারবেন। শিক্ষকতা একটি নোবেল প্রফেশন; শিক্ষকদেরকে তাই নোবেল হতে হবে। তাকে সে রকম আচরণই করতে হবে, যে আচারণ তিনি অন্যদের কাছ থেকে আশা করেন।
যোগ্যতা অনুযায়ী মেধাবীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলে ছাত্র-ছাত্রীরা উপকৃত হবে, শিক্ষার মান বাড়বে, দেশ অনেকদূর এগিয়ে যাবে
প্রফেসর ড. ইঞ্জিঃ হুমায়ুন কবির
ভিসি, ইবাইস ইউনিভার্সিটি

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষ্যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ইবাইস ইউনিভার্সিটির ভাইস-চ্যান্সেলর (ডেজিগনেট) প্রফেসর ড. মোঃ হুমায়ুন কবির বলেন, শিক্ষকতা একটি মহান পেশা। আমাদের যারা সম্মানিত শিক্ষক তারা অনেক দায়িত্ব নিয়ে এ কাজটি করে থাকেন। আমি মনে করি শিক্ষক দিবসে শিক্ষকদের আরো বেশি তৎপর হওয়া উচিত। শিক্ষক দিবসটি অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে এখনও জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালিত হয় না। কারণ শিক্ষকতা যে একটি মহান পেশা এটা শিক্ষক সমাজও ভালভাবে বুঝতে সক্ষম নয় বলেই আমার মনে হয়। আমি মনে করি শিক্ষকতাকে মহান পেশা ভেবে দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে কারণ শিক্ষকরাই মানুষ তৈরির কারিগর।
টেকনোলজিক্যালি এখন অনেক এডভান্সড আমাদের শিক্ষার্থী, কিন্তু আমাদের শিক্ষকরা টেকনোলজিতে কতটুকু এডভান্সড তা ভেবে দেখার সময় এসেছে। আমাদের শিক্ষকদের উচিত নতুন নতুন টেকনোলজি ব্যবহার করে আরো আপগ্রেড হওয়া, নতুবা ক্লাসে ছাত্র-ছাত্রীরা বোরিং ফিল করবে, ক্লাসে মনযোগী হবে না। প্রতিনিয়ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নতুন নতুন ইনফরমেশন নিয়ে ক্লাসে উপস্থিত হতে হবে, কারণ ছাত্ররাও খুব দ্রুত আপগ্রেডেশনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, আর এ মূহূর্তে যদি শিক্ষকরা ছাত্রদের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে না পারে তাহলে শিক্ষকরা ক্লাসে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে ব্যর্থ হবে। জাতি হিসেবে আমরা অনেক দূর পিছিয়ে পড়ব এবং একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় আমরা শামিল হতে পারব না। তাই ইন্টারএকটিভ ক্লাস উপস্থাপনের মাধ্যমে শিক্ষকদের মান উন্নয়ন করা প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশে ১০ লক্ষ শিক্ষক এ পেশার সাথে জড়িত, আমি মনে করি সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে দেশে কোনো সমস্যাই থাকবে না।
‘টেকসই সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষকদের ভুমিকা’ জানতে চাইলে কৃতী শিক্ষা প্রশাসক প্রফেসর ড. মোঃ হুমায়ুন কবির বলেন, আমাদের শিক্ষকদের যুগোপযোগী হতে হবে। আমি যখন ছাত্র ছিলাম, সে সময় আমি আমার শিক্ষকদের কাছে যেভাবে পড়েছি এখন সেভাবে ছাত্ররা পড়তে চায় না, আমি গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা করেছি, সেখানে স্কুল ছুটির পরে স্যারের বাসায় গিয়ে পড়ার ফাঁকে স্যারের বিভিন্ন কাজে সহযোগিতা করতাম। আর নিজের বাড়িতেও সময় পেলে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতাম। কিন্তু এখন একটু অবসর সময় পেলেই মোবাইলের বিভিন্ন এপস্ নিয়ে ঘাঁটা-ঘাঁটি করে নতুন নতুন আইডিয়া ও শিক্ষার্থীর ইনফরমেশন নিয়ে নিজেদেরকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে। কিন্তু শিক্ষকরা প্রযুক্তির দিক থেকে পিছিয়ে থাকায় ছাত্র-ছাত্রীরা যে মানের ক্লাস চায় তা শিক্ষকরা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। তাই আমার মনে হয় শিক্ষকদেরকে টেকনোলজি ব্যবহারে অনেক বেশি আপগ্রেড হওয়া প্রয়োজন। তাহলে কোন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে তাদের বিভিন্ন বিষয়ে সঠিক পরামর্শ দিয়ে আন্তর্জাতিক মানের নাগরিক রূপে গড়ে তুলতে পারবে।
কোন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আপনি শিক্ষকতা পেশায় এসেছেন -এমন প্রশ্নের জবাবে খ্যাতিমান শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. মোঃ হুমায়ুন কবির বলেন, আমার ছোটবেলা থেকেই সখ ছিল শিক্ষকতা পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার; কারণ আমার আব্বাও ছিলেন শিক্ষক, সেই সুবাদে আমার এ পেশায় আসা। আমি স্কুল জীবনে সকল পরীক্ষায় ভাল রেজাল্ট করেছি, সে সুবাদে ক্লাসের দুর্বল ছাত্র-ছাত্রীদেরকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করেছি । কারণ নলেজ শেয়ারিং করা আমার কাছে নেশার মতো লাগতো। শিক্ষকতা পেশায় বেতন আকর্ষণীয় নয়, তবুও এখানে যে সম্মান পাওয়া যায় তা অন্য কোনো পেশায় পাওয়া যায় না। তাই এ পেশাকে আমি বেছে নিই। শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে করণীয় সম্পর্কে খ্যাতিমান শিক্ষক প্রফেসর ড. মোঃ হুমায়ুন কবির বলেন, আমি যখন সরকারি চাকরি করি তখন আমার একটি বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ হয়েছিল। যদিও বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ বলতে কিছু নেই। সেখানে শিখানো হয় কিভাবে ক্লাসে দাঁড়াতে হবে এবং কিভাবে ছাত্রদের সাথে কথা বলতে হবে। কারণ অনেক ধরনের ছাত্র থাকে ক্লাসে, তাদের কীভাবে হ্যান্ডেল করতে হবে সে বিষয়ে আমাদের প্রশিক্ষণ না থাকলে ক্লাসে ছাত্র কন্ট্রোল করা মুশকিল।
তাই আমার কথা হচ্ছে বেসরকারি বিশ্বদ্যিালয় যদি একটা ফান্ড তৈরি করে একটি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউশন গড়ে তোলে সেখানে আমরা যখন নতুন শিক্ষক নিয়োগ দিবো তখন নির্দিষ্ট ফি’এর বিনিময়ে ওখানে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারবে। শিক্ষক যদি কোয়ালিটি সম্পন্ন হয় তবে তাদের ডেলিভারি ভালো হবে, তাদের দ্বারা তৈরি প্রোডাক্টও ভালো হবে এবং আমাদের সন্তানরা বেশি উপকৃত হবে, আমাদের সমাজ আলোকিত হবে। সরকারি ক্যাডার সার্ভিসগুলিতে একটি বুনিয়াদি ট্রেনিং হয়। এরপর জয়েন্ট সেক্রেটারি হওয়ার পর আর একটা ট্রেনিংয়ে পাঠানো হয়। আমাদের এখানেও লেকচারার হওয়ার আগে যদি একটি ট্রেনিং দেয়া হয় এবং প্রফেসর হওয়ার আগে যদি আরেকটি ট্রেনিং দেয়া যায় তবে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসবে। এটা করতে হলে বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে উদ্যোগ নিতে হবে। তবে সবচেয়ে ভাল হয় যদি সরকার উদ্যোগ নেয়, সেক্ষেত্রে আমরা একজন শিক্ষকের জন্য ছয়মাসের অথবা তিনমাসের ফি দিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে পারব। এতে আমাদেরও সুবিধা সরকারেরও সুবিধা; দেশের জন্য এটি বড় সমস্যা নিয়ে আসবে।
আমরা যদি পোশাক শিল্পের দিকে তাকাই তবে দেখতে পাব ওখানে বেশি বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। সেটা কিন্তু প্রাইভেট সেক্টেরের অবদান। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি যদি এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেয় তবেই এটা সম্ভব হবে বলে আমার বিশ্বাস। প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে আমাদের নতুন শিক্ষকরা নির্দিষ্ট ফি দিয়ে ট্রেনিং নিয়ে আসবে। এ ক্ষেত্রে নিজের বেনিফিটের কথা ভাবলে হবে না, দেশের কথাও ভাবতে হবে ।
তিনি আরও বলেন, জাতিগতভাবে যদি আমরা একটি ভদ্র ও সুশীল সমাজ চাই, সুন্দর একটি পরিবেশ চাই তবে শিক্ষককে সম্মান করতে হবে। আজকের এবং ভবিষ্যতের সমাজ পরিবর্তনে শিক্ষকদের বিরাট ভূমিকা আছে। সমাজে আজকে যে অস্থিরতা বিরাজ করছে এটা নির্মূল করতে হলেও শিক্ষকদের অবদান অনস্বীকার্য। তারা ক্লাসে প্রতিদিন কিছু সময় মোটিভেশন দেবেন এবং অনিয়ম ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ছাত্রদের উৎসাহিত করবেন। প্রতিদিন আমাদের শিক্ষকরা ক্লাসে যাচ্ছেন। তাদের সাথে ছাত্রদের প্রতিদিন আলাপ-আলোচনা হয়, বিভিন্ন বিষয়ে, শিক্ষকদের কথা তারা শ্রবণ করে। তাই শিক্ষকরা যদি সুন্দর মেসেজ দিতে পারেন জাতির স্বার্থে তা বাস্তবায়ন হবে। শিক্ষকরা যদি সঠিক মেসেজ দিতে পারে তবে সমাজ থেকে অনিয়ম, দুর্নীতি, অন্ধকারের করাল ছায়া কেটে যাবে। সমাজ হবে সভ্য, পুত ও পবিত্র। এখন হচ্ছে বিশ্বায়নের যুগ, বিশ্বায়নের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের যুগোপযোগী প্রডাক্ট বের করতে হবে, এটাই হবে আমাদের এ দিবসের প্রত্যাশা।
শিক্ষকদের মধ্যে প্রফেশনালিজম গড়ে উঠছে না বলে তারা খোলা মন নিয়ে বিশ্বশিক্ষক দিবস পালন করতে পারছে না
প্রফেসর ড. এম হারুনুর রশিদ
সাবেক ভাইস-চ্যান্সেলর
চেয়ারম্যান, ব্যাক ইন্টারন্যাশনাল

বিশ্ব শিক্ষক দিবসকে ঘিরে অনুভূতির কথা জানতে চাইলে প্রবুদ্ধ শিক্ষক এবং কোয়ালিটি শিক্ষা আন্দোলনে নিবেদিত শিক্ষা-সংগঠক প্রফেসর ড. এম হারুনুর রশিদ বলেন, বিশ্ব শিক্ষক দিবস অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে এখনও পালিত হয় না। এর কারণ হলো শিক্ষকতার পেশাটি এখন সংকটময় পরিস্থিতির আবর্তে পড়েছে বলে আমি মনে করি। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় যেমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তেমনি ব্যক্তি উদ্যোগেও গড়ে উঠেছে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শিক্ষা যে একটি পেশা তা’এখনও সামাজিকভাবে স্বীকৃত নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়া হচ্ছে সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে, কিন্তু শিক্ষকের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। শিক্ষা একটি দায়বদ্ধ পেশা তা এখনো বলা যায় না। এখানে স্বীকৃত মানদন্ড বা জবাবদিহির মাপকাঠি নেই; যে কেউ ইচ্ছা করলে শিক্ষক হতে পারে! বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মসংস্থানে ব্যর্থ হয়েছে এমন কর্মক্ষম যুবকরা শিক্ষকতাকে জীবিকা অর্জনের উপায় হিসেবে বেছে নিচ্ছে। যার নেই কোন গতি সে-ই পড়ে হোমিওপ্যাথি- ধরনের কথার মতো। প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত লক্ষ্য করলে দেখা যাবে-অন্য কোনো জায়গায় চাকরি না পেয়েই তারা শিক্ষকতায় এসেছে।
অন্যদিকে মেধাবী শিক্ষার্থী যারা শিক্ষাজীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে মেধার অনন্য স্বাক্ষর রেখে শিক্ষাজীবন শেষ করে কর্মজীবনে শিক্ষকতা পেশা বেছে নিয়েছেন, তারাও অন্য পেশায় ভালো সুযোগ পেলেই শিক্ষকতা ছেড়ে চলে যান। ব্যাংক, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর এক্সিকিউটিভ কিংবা প্রশাসন-ক্যাডারে যোগদানের সুযোগ আসে বলে তাদেরকে ধরে রাখা সম্ভব হয় না। অনেকেই শিক্ষকতা পেশাকে অন্য আকর্ষণীয় পেশায় যাওয়ার জন্য একটা ধাপ হিসেবে ব্যবহার করে, কারণ তারা পেশার প্রতি একনিষ্ঠ হতে পারেন না, একে মনে-প্রাণে গ্রহণ করার মানসিকতা তারা তৈরি করতে পারছে না। দশ লক্ষ শিক্ষক কর্মরত-এদের মধ্যে শতকরা কতজন শিক্ষকতা পেশাকে মনে প্রাণে গ্রহণ, এ পেশায় একনিষ্ঠ হবার মন-মানসিকতা, মননশীলতা অর্জন করে শিক্ষকতায় এসেছে তা’ নির্ণয় করা সত্যি কঠিন। শিক্ষকদের মধ্যে প্রফেশনালিজম গড়ে উঠছে না বলেই শিক্ষক দিবস তারা খোলামন নিয়ে, আন্তরিকতার সাথে পালন করতে পারছেন না। তিনি বলেন, শিক্ষকগণ বিশ্বশিক্ষক দিবসটি পালনের জন্যই পালন করছেন। কিন্তু সর্বান্তকরণে তারা এ দিবস উদযাপন করছেন না।
মেধাবী ছাত্ররা শিক্ষকতায় আসছেন, কিন্তু এ পেশায় স্থিত হতে পাছেন না, আকর্ষণীয় বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধার আকর্ষণে তারা শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে চলে যাচ্ছেন, এর কারণ সম্পর্কে নিজ মতামত ব্যক্ত করে বিদগ্ধ শিক্ষক প্রফেসর এম হারুনুর রশিদ বলেন, একটু আগেই বলেছি শিক্ষক হবার জন্য কোনো প্রস্তুতি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা-কিছুরই দরকার হয় না। প্রাইমারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কোনো লেভেলে শিক্ষক হবার কোনো মানদন্ডের প্রয়োজন হয় না। একমাত্র মাধ্যম হলো পরীক্ষার ফলাফল এবং তদ্বির বা প্রভাব। শিক্ষকতায় কর্মসংস্থানের প্রাপ্তির সাথে প্রশিক্ষণ, মনমানসিকতার উন্নয়নের যোগসূত্র গড়ে উঠছে না। এর ফলে শিক্ষক যে কাজটি করছেন তাতে মানদন্ড নেই। শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং জবাবদিহির সাথে সেতুবন্ধন না হবার কারণে মানোন্নত শিক্ষক তৈরি হচ্ছে না। শিক্ষকতা পেশা এবং শিক্ষক-দু’য়ের মধ্যে সেতুবন্ধন সৃষ্টি না হওয়ায় কোয়ালিটি শিক্ষা গড়ে উঠছে না। শিক্ষান্নোয়নে কাঙ্খিত ফল লাভ করা সম্ভব হচ্ছে না।
সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দক্ষ ও গুণগত মানের শিক্ষকের স্বল্পতা রয়েছে। এর ফলে মানোন্নত শিক্ষা গড়ে উঠছে না, যা জাতীয় উন্নয়নে বাধাস্বরূপ। দক্ষ ও গুণী শিক্ষক-স্বল্পতা কিভাবে পূরণ করা যায়, কিংবা দক্ষ শিক্ষক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে কি ব্যবস্থা নেয়া যায়- এমন প্রশ্নে প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ প্রফেসর এম হারুনুর রশিদ বলেন, যোগ্য শিক্ষকের অভাব সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয়। যে কোনো পেশার মানোন্নয়নের জন্য থাকতে হবে অব্যাহত প্রচেষ্টা। উন্নয়ন-প্রচেষ্টা ছাড়া কোনো পেশাকে কাঙ্খিত উন্নয়নের স্তরে নিয়ে যাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে বিশেষ কোনো উদ্যোগও দেখা যায় না। সরকারের টিসার্চ ট্রেনিং সেন্টার যে ক’টি আছে সেগুলো এ ক্ষেত্রে কার্যকর নয়, এগুলোর মাধ্যমে কাঙ্খিত ফলাফল সম্ভব হচ্ছে না। বেসরকারি পর্যায়েও প্রাইমারি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত গুণগত মানের শিক্ষক তৈরির চিন্তাই নেই। এর ফলে শিক্ষকের পদোন্নতি, পেশার মানোন্নয়ন বেতন-ভাতা নির্ধারণের কোনো মানদন্ড অনুসরণ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে না নিয়ে এটাকে বাণিজ্যিক রূপ দেয়া হচ্ছে। আরেকটি মারাত্মক বিষয় হচ্ছে- একজন শিক্ষক ক্লাসেও পড়ান, আবার সে ছাত্র-ছাত্রীকে বাসায় গিয়েও প্রাইভেট পড়ান। তাহলে তিনি ক্লাসে কি পড়াচ্ছেন ? কোচিং- বাণিজ্য এভাবেই প্রসারলাভ করছে। অন্যদিকে দেখা যায়- সরকারি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অসংকোচে পড়াচ্ছেন, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দক্ষ শিক্ষকের অভাব কিছুটা মেটাতে পারলেও নিজেদের প্রতিষ্ঠানে দক্ষ শিক্ষক গড়ার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে না। অর্থাৎ এ ব্যাপারে বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারছে না। শিক্ষকরা এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যাচ্ছেন। স্থিতি না থাকায় তারা গবেষণার দিকেও মনোনিবেশ করতে পারছেন না। এর মানে কাঙ্খিত গুণগত মানের শিক্ষাও গড়ে উঠছে না। কারণ, শিক্ষান্নোয়নের ক্ষেত্রে গবেষণা একটি অপরিহার্য বিষয়। গবেষণা না থাকার ফলে বছর গুনে প্রমোশন হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ে একবার লেকচারার হিসেবে ঢুকতে পারলে প্রফেসর হিসেবে এক সময় তিনি বেরিয়ে যেতে পারছেন, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। শিক্ষক নির্দিষ্ট সময়ান্তে একটি পজিশনে পৌছে যেতে পারবেন- এটি প্রায় স্থির নিশ্চিত। কাজেই সেখানে উন্নয়ন-প্রচেষ্টা গৌণ হয়ে পড়ে। শিক্ষার মানোন্নয়নের অগ্রগতি এখানে হোঁচট খাচ্ছে। শিক্ষা ক্ষেত্রে মানোন্নয়ন নেই বলে বিশ্ব পরিসরে সেই মান যাচাইযোগ্য হচ্ছে না। তাদের কার্যক্রম, প্রচেষ্টা, শিক্ষাদান পদ্ধতি কোনোটার প্রভাবই ছাত্রদের উপর পড়ে না। শিক্ষকরা প্রবল আগ্রহ নিয়ে গবেষণায় আত্মনিয়োগ করছেন না, বিশ্ব পরিসরে তাদের স্বীকৃতি নেই। বিশ্ব রেংকিংয়ে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নেই।
কোন্ প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আপনি শিক্ষকতা পেশায় আসলেন- এ প্রশ্নের জবাবে আত্মপ্রত্যয়ী প্রাজ্ঞ শিক্ষাবিদ প্রফেসর এম হারুনুর রশিদ বলেন, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হলেও মেধার গুণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হিসেবে অধ্যয়নের সুযোগ লাভ করি, পরবর্তীতে মেধাবী ছাত্র হিসেবে, ভালো ফলাফলকারী ছাত্র হিসেবে অধ্যাপনারও সুযোগ পাই। কোনো বিবেচনা থেকে নয়, এটাই প্রথম সুযোগ- ছাত্রজীবন শেষ হবার সাথে সাথেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করি। ঐ সময় আমার শিক্ষকদের কাছ থেকে অনুপ্রেরণা পেয়েছি, তাদের সাহায্য -সহযোগিতা পেয়েছি, তাঁদের অনুপ্রেরণায় শিক্ষকতা পেশায় নিবিষ্ট হয়েছি, অন্যকোনো পেশায় যাওয়ার চিন্তা করিনি- শিক্ষকতায় থেকে গেছি।
তিনি বলেন, আমাদের দেশের শিক্ষার উন্নয়ন করতে হলে এর ব্যাপক সংস্কারের প্রয়োজন। দক্ষ শিক্ষক গড়া, যোগ্য শিক্ষা-প্রশাসক তৈরি করা এবং শিক্ষার গুণগত মানের দিকে সবচেয়ে বেশি নজর দিতে হবে। এ তিনটি ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক দুর্বল। দীর্ঘ ৪৫ বছরের শিক্ষকতা জীবনে দেখেছি শিক্ষার মান দিনে দিনে হ্রাস পাচ্ছে। বিশ্বায়নের এ যুগে অন্যান্য উন্নত দেশের দিকে তাকিয়ে নতুন পদ্ধতিকে ব্যাক এ প্রয়োগ করে এর প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছি। দূরদর্শী শিক্ষাবিদ প্রফেসর হারুন বলেন, ক্রস বর্ডার এডুকেশনের মাধ্যমে কারিকুলামের মান, শিক্ষার মান এবং শিক্ষকদের মান বৃদ্ধির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। এ ৩টি বিষয়কে প্রতিষ্ঠিত করার জন্যই আমাদের আন্দোলন। এ আন্দোলন শিক্ষক সমাজ, সরকার এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের যদি সমর্থন পাই-তা’হলে আমরা একটি নজির স্থাপন করতে পারবো, মডেল স্থাপন করতে পারবো। ব্যাক প্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্ররা পাস করে বেরিয়ে সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনে ভালো স্থান লাভ করেছে। আমরা প্রথম ১০ জন ছাত্র নিয়ে শুরু করেছিলাম, সে ১০ জনের মধ্যে ৪ জন আইনজীবী হিসেবে বারের কাজকর্মে দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। আমরা অল্প সময়ের মধ্যে মেধাবী ছাত্রদের সঠিক পরিচর্যার মাধ্যমে বিকশিত হবার সুযোগ দিয়েছি। এ প্রক্রিয়াকে আমরা আন্দোলন হিসেবে গ্রহণ করেছি। এটা একটা মডেল হিসেবে দাঁড়াবে। আমরা হয়ত শেষ করতে পারবো না, কিন্তু শুরুতো করে দিয়ে গেলাম। জাতি যেন এর ভালো দিকটা গ্রহণ করে।
প্রফেসর হারুন বলেন, ব্যাক একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। শিক্ষকদেরকে ট্রেনিং দিয়ে দক্ষ করে গড়ে তোলার লক্ষ্যে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এতে প্রত্যেক শিক্ষককে প্রতি দু’মাস অন্তর বাই রোটেশন ক্লাস নিতে হয়। যিনি ক্লাস নেবেন তিনি শিক্ষক এবং তার সহকর্মী শিক্ষকরা তার ছাত্র। তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়- আপনার দায়িত্ব অতটুকু, এর মধ্যে এটি সীমাবদ্ধ, এটুকুর উন্নয়নই আপনার কাজ। এটা তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয় যে, আপনি যেখান থেকে শুরু করেছিলেন সেখানে আপনার কি উন্নতি হয়েছে। এ ছাড়া যেখানে আটকা পড়ে যায় সেখানে বলা হয়, আপনি এতটুকুর উন্নয়ন করুন, আপনার উন্নতির চাকা ঘুরতে থাকবে। মানুষ উন্নয়নের প্রত্যাশী, যদি দেখা যায় যে, একজন বিশেষ জায়গায় এসে শক্তভাবে আটকে গেছে, সেখানে আমরা তাকে উৎসাহিত করে, নির্দেশনা দিয়ে তার দুর্বলতা কাটিয়ে তুলি। আর যিনি উন্নয়ন করতে পারছেন না শত চেষ্টা সত্ত্বেও তাকে বলা হয়- আপনি অপারগতার কথা লিখিতভাবে উল্লেখ করুন।
আমাদের এ পদ্ধতি নতুনভাবে প্রয়োগ করছি। এর মাধ্যমে একজন দুর্বল শিক্ষককে তার সহকর্মীদের সামনে একবার দু’বার, তিনবার উপস্থাপন করা হয়। এরপরও যদি তিনি ব্যর্থ হন, তাহলে নিজেই সিদ্ধান্ত নেন- এখন তিনি কি করবেন। আমাদের ক্লাসগুলোকে নিবিড়ভাবে মনিটর করা হয়। এখানে যারা ভালো ডেলিভারেশন দেন সেটি যেমন ফুটে ওঠে, তেমনি দুর্বল পারফরমেন্সও ধরা পড়ে। এ পদ্ধতি দক্ষ শিক্ষক গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অসাধারণ ভূমিকা রাখছে। শিক্ষকদের প্রতি পরামর্শদান প্রসঙ্গে শিক্ষাভুবনে শিক্ষাগুরুর মর্যাদায় ভূষিত মেধাবী শিক্ষক প্রফেসর এম হারুনুর রশিদ বলেন, শিক্ষার প্রতি এবং শিক্ষকদের প্রতি সম্মান রেখে বলছি- শিক্ষার কোনো শেষ নেই। আগ্রহ থাকলে সমাজের যে কোনো অঙ্গন থেকে আমরা জ্ঞান আহরণ করতে পারি। আহরণের স্পৃহা বেশি থাকলে আমরা বেশি জানতে পারবো। আমাদের কাছে শিক্ষার যে আলো প্রজ্জ্বলিত আছে তার আলোয় আমরা প্রতিনিয়ত নতুন জ্ঞান আহরণ করতে পারবো, সেই জ্ঞান শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে পারবো। কারিকুলামের সাথে মিল রেখে সেই জ্ঞান পরদিন ছাত্র- ছাত্রীদের মাঝে কিভাবে বিতরণ করবো তা’ আগে থেকে ভেবে রাখতে হবে। এ ধারা বজায় রাখতে পারলে একজন সার্থক শিক্ষক হিসেবে, সমাজ-সচেতন মানুষ হিসেবে এবং জাতির বিবেক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে।
যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী কর্মজীবনে অর্থবিত্তের স্বপ্ন দেখেন, তাদের শিক্ষকতা পেশায় না আসাই ভালো
প্রফেসর ড. মোঃ গোলাম সামদানী ফকির
ভিসি, গ্রীন ইউনিভার্সিটি

বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপন উপলক্ষ্যে মতামত ব্যক্ত করে প্রফেসর মোঃ গোলাম সামদানী ফকির বলেন, দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বাংলাদেশে এ দিবসটি যেভাবে পালন করা উচিত আমরা সেভাবে পালন করি না। দেশের শিশু-কিশোর তরুণদের সুনাগরিক, দেশপ্রেমী ও মানবপ্রেমী মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অবদান অপরিসীম। তারা সত্যিকার অর্থে মানুষ গড়ার কারিগর। তারা সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে যথাযথ মর্যাদার দাবি রাখে, জীবিকার নিশ্চয়তা চায়। আমাদের দেশে প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য ইনস্টিটিউট আছে, মাধ্যমিকের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের জন্য টিচার্স ট্রেনিং কলেজ আছে, কিন্তু প্রাইভেট বা পাবলিক ইউনিভার্সিটির শিক্ষকদের জন্য ট্রেনিং ইন্সটিটিউট নেই বললেই চলে। যা মেনে নেয়া কষ্টকর, সেজন্য আমি যখন ব্রাক ইউনিভার্সিটির প্রো-ভিসি ছিলাম, তখন সেখানকার শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছিলাম। গ্রীন ইউনিভার্সিটিতে এসেও আমি সে ধারা অব্যাহত রেখেছি। এখানে নতুন শিক্ষকদের প্রথম ধাপে ৪ দিন নিবিড়ভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়; দ্বিতীয় ধাপে পুরো এক সিমেস্টার ব্যাপী (সপ্তাহে ১ দিন) প্রশিক্ষণ চলতে থাকে। কোর্স শেষে তাদেরকে সার্টিফিকেট দেয়া হয়। এই সার্টিফিকেট কোর্সের আদলে আমি বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের শিক্ষকতা পেশার মানোন্নয়নের জন্য একটি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার বিষয়ে ২০১৫ সালে একটি আলোচনা সভার আয়োজন করেছিলাম, এতে ২৫জন ভাইস-চ্যান্সেলর, প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক উপস্থিত ছিলেন। সেখানে টিচারদের টিচিং ক্যাপাসিটি বাড়ানো এবং আস্থার সাথে পাঠদান পদ্ধতি আয়ত্তে আনার লক্ষ্যে ৯ সদস্য বিশিষ্ট স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়। এরপর স্টিয়ারিং কমিটির ৯জন ভাইস চ্যান্সেলর প্রতিমাসে পর্যায়ক্রমে শিক্ষকদের ক্যাপাসিটি উন্নয়নের জন্য একটি সংগঠন গড়ে তোলা নিয়ে আলোচনা করেন। গত জুলাই মাসে একটি ফাউন্ডেশন রেজিট্রেশনের উদ্যোগ গ্রহণ করি; এর নামকরণ করা হয়- Foundation for Learning, Teaching and Research (fLTR). উক্ত ফাউন্ডেশনের চেয়ারপার্সন প্রফেসর জামিলুর রেজা চৌধুরী। এ সংগঠনের লক্ষ্য হলো ইউনিভার্সিটি লেভেলে যারা শিক্ষকতায় নিয়োজিত তাদের টিচিং এন্ড রিসার্চ ক্যাপাসিটি বিল্ড আপ করা। আমরা যখন এ সংগঠনের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু করবো, তখন থেকে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণও আমাদের সদস্য হবার জন্য আবেদন করতে পারবেন। এতে institution membership ছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে মেম্বার হিসেবে যুক্ত হতে পারবেন। যদিও এটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিকে বেইজ করে গড়ে উঠেছে তবুও পরবর্তীতে পাবলিক ইউনিভার্সিটিও এর সদস্য হতে পারবে।
কোন্ প্রেরণায়, উদ্বুদ্ধ হয়ে শিক্ষকতা পেশায় এসেছেন- এমন প্রশ্নে প্রাজ্ঞ শিক্ষক প্রফেসার গোলাম সামদানী ফকির বলেন, শিক্ষাজীবনে পড়ালেখা ছাড়া অন্য কোনোদিকে মন দেইনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স এবং মাস্টার্স করার পর রোমানিয়ার Academy De Studii Economice থেকে পিএইচডি করেছি। আমেরিকাতে কিছুদিন একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে কাজ করার পর ১৯৮৪ সালে ব্র্যাকে এবং ২০০৯ সালে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করি। তখন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে সেন্টার ফর টিচিং এন্ড লিডারশিপ এর মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আয়োজন করি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও আমাকে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ওপর কাজ করার দায়িত্ব দিলেন। সে সুবাদে টিচিং লাইনের প্রতি আমার আকর্ষণ তীব্র হয়ে ওঠে। প্রতিটি প্রফেশনই মূল্যবান, তবে যেখানে মানুষ গড়ার বিষয়টি সম্পৃক্ত, সেটির গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অনেক বেশি। সেই চিন্তা-চেতনা থেকে শিক্ষকতা পেশায় স্থায়িভাবে জড়িয়ে গিয়েছি। শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীরা আগের চেয়ে কম আসছেন, কিংবা টিকে থাকছেন না কেন? - এমন প্রশ্নে দূরদর্শী শিক্ষাবিদ প্রফেসর গোলাম সামদানি ফকির বলেন, এ সমস্যাটা প্রাইমারি লেভেল থেকে শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত বিরাজ করছে। তাই বলব, যেসব মেধাবী শিক্ষার্থী কর্মজীবনে অর্থসম্পদ গড়ার স্বপ্ন দেখেন তাদের শিক্ষকতা পেশায় না আসাই ভালো, যারা শিক্ষকতাকে মহান পেশা হিসেবে গ্রহণ করার মন-মানসিকতা রাখেন, সেসব মেধাবীদের স্থান হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। খেয়ে-পরে ভদ্রভাবে জীবনযাপনের ব্যবস্থা শিক্ষকতায় আছে, কিন্তু বিলাসী জীবনযাপন, অর্থের পেছনে ছোটার মানসিকতা যাদের মাথায় চাপবে-শিক্ষকতা পেশা তাদেরকে স্বস্তি দিতে পারবে না। তারা একনিষ্ঠভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। তাই শিক্ষকতা তাদের জন্য নয়।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষকতা পেশার বাইরে আমরা যারা অভিভাবক হিসেবে আছি, তারা কি শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা দিই? বিষয়টি ভেবে দেখা দরকার। ফিনল্যান্ডে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিক্ষকের মর্যাদার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়, সেখানে সেরা ছাত্ররাই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্তির জন্য আবেদন করতে পারে। এটি শুধু ইউনিভার্সিটি লেভেলে নয়, প্রাইমারি শিক্ষা পর্যন্ত তারা এ নীতি অনুসরণ করে। আমাদের দেশেও এ লক্ষ্যে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ আছে। এখানে কলেজ পর্যায় থেকে ট্যালেন্ট অনুসন্ধান করে মেধাবী শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে আগামীর মেধাবী শিক্ষক বাছাই করা যেতে পারে। সেক্ষেত্রে মেধাবী শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে প্রস্তুত হয়েই কর্মজীবনে প্রবেশ করবে, তাদের খুব কম সংখ্যকই শিক্ষাকতা পেশা ছেড়ে অন্যপেশায় যাবে। এখানে যে বিষয়টি কাজ করবে তা হলো- যারা শিক্ষকতায় আসবে তারা মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই আসবে, তাদেরকে সহজভাবে বরণ করে নেয়া হবে। এ ছাড়া সামাজিকভাবে ও রাষ্ট্রীয়ভাবে দেখতে হবে শিক্ষকদের প্রতি যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা দেয়া হচ্ছে কি না, তাদের বেতন ভাতা অন্য সাধারণ পেশা থেকে দ্বিগুণ কিনা ইত্যাদি। এক সময় উপযুক্ত বেতন-ভাতা বৃদ্ধির জন্যও শিক্ষকসমাজ আন্দোলন করেছেন। এখন তারা সন্তুষ্ট।এখন আশা করা যায় যে, বেশি সংখ্যায় মেধাবী শিক্ষার্থী শিক্ষকতা পেশায় আসবে এবং এ পেশায় টিকে থাকবে।
বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দক্ষ শিক্ষকের অভাবে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়- এ সমস্যা সমাধানে কি ব্যবস্থা নেয়া যায় এমন প্রশ্নে প্রবুদ্ধ শিক্ষাবিদ প্রফেসার গোলাম সামদানি ফকির বলেন, দক্ষশিক্ষকের অভাবে শুধু শিক্ষাদান ব্যাহত হয় না, কোয়ালিটি শিক্ষা ব্যবস্থাও গড়ে ওঠে না।এর জন্য শিক্ষকদের মধ্য থেকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিতে হবে- সেখানে কোর্স কারিকুলাম থাকবে উন্নত মানের, আধুনিক ও গুণগত মানের শিক্ষাপদ্ধতির নির্দেশনা থাকবে। শুধু নলেজ অর্জন করলে হবে না, স্কিলও ডেভেলপ করতে হবে। এ জন্য আমাদের শিক্ষা কারিকুলামগুলো এমনভাবে তৈরি করতে হবে যাতে এটি সবার জন্য প্রযোজ্য হয়। তিনি আরো বলেন, উন্নত কোর্স কারিকুলাম, ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট বিষয়গুলো জরুরি ভিত্তিতে গ্রহণ করা হলে শিক্ষার উন্নয়ন, গবেষণা কাজ, কোয়ালিটি শিক্ষার প্রসার হবে। আমাদের বর্তমান জিডিপি-তে শিক্ষাখাতে ২%খরচ হয়, সেক্ষেত্রে হওয়া উচিত কমপক্ষে শতকরা ৪ ভাগ। কারণ আর্থিক উন্নতির জন্য প্রয়োজন কোয়ালিটি শিক্ষার উন্নতি।
শিক্ষাকতা পেশার উন্নয়ন এবং শিক্ষক সমাজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পের্কে আপাদমস্তক একজন শিক্ষক প্রফেসর গোলাম সামদানী ফকির বলেন, শিক্ষকতা পেশা হবে by choice, not by chance, কারন by choice না হলে teaching পেশায় তারা টিকে থাকতে পারবে না। শিক্ষকতা পেশায় প্রচুর পরিশ্রম করতে হয়, এখানে আরাম-আয়েশের সুয়োগ নেই। কারণ ছাত্রদের চেয়েও বেশি পড়ালেখা করতে হবে শিক্ষকদের। শিক্ষকদের এ পেশায় এসে আত্মসন্তুষ্টির দিকে যদি দেখতে হয় তাহলে পেশার প্রতি তা হবে অবহেলা; তাদের দ্বারা পেশার উন্নয়নতো হবেই না, বরং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদানও ব্যাহত হবে।
শিক্ষকগণ তাঁদের ঐতিহ্যবাহী আদর্শ বজায় রাখতে পারলে, মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন মানুষ গড়ার কারিগর হতে পারলে তাঁদের মর্যাদার আসন অক্ষুন্ন থাকবে
আনোয়ার হোসেন চৌধুরী সাবেক চেয়ারম্যান, ইস্টার্ণ ইউনিভার্সিটি

কোন প্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন, ইস্টার্ণ ইউনিভার্সিটির মত স্বনামধন্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন- একজন সফল শিক্ষাদ্যোক্তা হিসেবে এ সম্পর্কে আমাদেরকে জানাবেন কী- এমন প্রশ্নের জবাবে শিক্ষাপ্রেমী উদারপ্রাণ ব্যক্তিত্ব আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, গড় শিক্ষার দিক থেকে অন্যান্য দেশের তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। শিক্ষাক্ষেত্রে অবকাঠামো উন্নয়ন তেমন উল্লেখযোগ্য নয়, যা শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উচ্চশিক্ষার প্রতি মানুষের আগ্রহ অনেক বেড়েছে। অভিভাবকগণ সন্তানের উচ্চশিক্ষার জন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যায়গুলোতে পাঠায়, কিন্তু বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী সীমিত আসনের কারণে সেখানে ভর্তি হতে পারে না। শেষে বেসরকারি উদ্যোক্তারা ঠিক করলেন যে, তারা সরকারের অনুমতি নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করবেন। সেই লক্ষ্য ও ভাবধারা থেকেই আমি সমমনাদের নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছি।
শিক্ষা উন্নয়ন ও প্রসারের জন্য আপনারা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তুলেছেন, কিন্তু গরিব-মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার পথ সুগম করতে আপনার বিশ্ববিদ্যালয় কি ব্যবস্থা নিয়েছে এমন জিজ্ঞাসার জবাবে শিক্ষাদ্যোক্তা সমাজসেবী ব্যক্তিত্ব আনোয়র হোসেন চৌধুরী বলেন, গরিব-মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য আমরা বৃত্তির ব্যবস্থা করেছি। বিভিন্ন ক্যাটাগরির মেধাবীদের পূর্ণ-অর্ধ-সিকিভাগ বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে।
মানসম্মত শিক্ষা প্রচলনের ক্ষেত্রে কী নীতি প্রয়োগ করা হয় জানতে চাইলে শিক্ষান্নোয়নে আশাবাদী ব্যক্তিত্ব আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, দেশে অভিজ্ঞ শিক্ষকের অভাব প্রকট, আমরাও এ সমস্যার বাইরে নই। বাইরে থেকে অভিজ্ঞ শিক্ষক আনার চেষ্টা করছি, কর্মরত শিক্ষকদেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করছি। আশা করি, তাদের সহযোগিতায় কোয়ালিটি এডুকেশন গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষিত করে তোলার ক্ষেত্রে আপনারা কোন পদ্ধতি অবলম্বন করেন-এমন প্রশ্নে আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, যারা সিনিয়র শিক্ষক এবং অভিজ্ঞ, জুনিয়র শিক্ষকগণ তাদের সাথে বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন, কাউন্সেলিং করেন, নিজেদের দুর্বলতাগুলো অকপটে তুলে ধরেন। এর ফলে জুনিয়র শিক্ষকগণ তাদের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে, নিজেদেরকে শিক্ষাদান ক্ষেত্রে যোগ্য করে তুলতে পারে।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস পৃথিবীব্যাপী মর্যাদার সাথে পালিত হয়ে থাকে। আপনারা দিবসটিকে কিভাবে পালন করেছেন; দিবসটির তাৎপর্য সম্পর্কে আমাদেরকে জানাবেন কী- এমন প্রশ্নে মর্যাদাশীল শিক্ষাব্রতী ব্যক্তিত্ব আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বলেন, আগে শিক্ষকরা শিক্ষকতা পেশা গ্রহণ করতেন জ্ঞান বিতরণে আত্মনিবেদিত হয়ে; অন্য কোনো লোভনীয় পেশার প্রতি তারা নজর দিতেন না। যার ফলে শিক্ষাঙ্গনে গড়ে উঠতো মেধাবী শিক্ষার্থী- যারা কর্মজীবনে পরিচালনা করতেন দেশকে, সমাজকে। দেশের কান্ডারি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে শিক্ষকের অবদান ছিল অনুকরণীয়। শিক্ষকগণ যদি তাঁদের ঐতিহ্যবাহী আদর্শ বজায় রাখতে পারেন, মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন মানুষ তৈরির কারিগর হতে পারেন তাহলে সমাজে তাঁদের মর্যাদাপূর্ণ আসন বজায় থাকবে।
শিক্ষাঙ্গনে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে শিক্ষক দিবস গুরুত্ব সহকারে পালন করা উচিত। ক্যামব্রিয়ান শিক্ষা এবং শিক্ষকের মানোন্নয়নে কাজ করছে
লায়ন এম কে বাশার পিএমজেএফ
চেয়ারম্যান, বিএসবি এডুকেশন গ্রুপ
লায়ন্স গভর্ণর, জেলা ৩১৫ এ২

শ্রেষ্ঠ শিক্ষক, শ্রেষ্ঠ শিক্ষাদ্যোক্তা এবং সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সম্মাননা প্রদানের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থাপনাকে আরও মহিমান্বিত করার উদ্যোগই হলো বিশ্ব শিক্ষক দিবস উদযাপনের লক্ষ্য। আমি বিশ্বাস করি, শিক্ষকদের যদি উৎসাহিত করা হয় তাহলে তারা এ অঙ্গনে আরও সফল হবেন। মাত্র শতকরা ১০ ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকারি, দেশের বাকি ৯০ ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন কোনো বেসরকারি ব্যক্তি বা সংগঠন। যাঁরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাদেরকে আমরা শিক্ষা-উদ্যোক্তা বলি। দেশের সকল শিক্ষা উদ্যোক্তাদের যদি আমরা যোগ্য সম্মান দিয়ে আরও উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করতে পারি, সম্মাননা দিতে পারি, তাহলে অন্যরাও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য, শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য। এজন্য বিশ্ব শিক্ষক দিবসে সেরা শিক্ষকদের পাশাপাশি সেরা শিক্ষা উদ্যোক্তাদের সম্মাননা দেয়ার উদ্যোগ নিতে হবে।
১৯৬৬ সালের ৫ অক্টোবর এডুকেশন ইন্টারন্যাশনালের আহ্বানে ইউনেস্কো স্ট্যাটাস অব টিচার্স নামের ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের ঘোষণা দেন। সেই থেকে প্রতিবছর ১টি করে স্লোগান নিয়ে বিশ্বের ১০০টি দেশে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হচ্ছে। আমাদের দেশে বিশ্ব মা-দিবস, বিশ্ব বাবা দিবস পালন হয় ঘটা করে। সেক্ষেত্রে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালনে শৈথিল্য দুঃখজনক। ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবসের অনুষ্ঠানে আমরা সেরা শিক্ষক এবং সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রধানদের আমন্ত্রণ জানাই। কারণ, যারা বেসরকারি শিক্ষাদ্যোক্তা তারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন বলেই তাঁদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেশ ও সমাজ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে, রাখতে পেরেছে কৃতিত্বের স্বাক্ষর। শিক্ষার্থীদের যত্নসহকারে পাঠদান না করালে কখনোই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হতো না, সেজন্যেই শিক্ষকরা সম্মান-মর্যাদার দাবিদার। তাদের অবদানকে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করা উচিত। আমি মনে করি, জাতীয়ভাবে বিশ্ব শিক্ষক দিবস পালন করা হলে এর গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পাবে, এতে শিক্ষকরা মর্যাদাবান হবেন। শিক্ষকদের মর্যাদা দিতে প্রতি বছর ক্যামব্রিয়ান বর্ণাঢ্য আয়োজন করে থাকে। কারণ, এ দেশে বিশ্ব শিক্ষক দিবসকে আমরা নতুনভাবে সাজাতে চেষ্টা করেছি। আমরা প্রাইমারি, মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা শিক্ষকদের সামনে নিয়ে আসছি। বেস্ট শিক্ষক বাছাই করার ক্ষেত্রে উপজেলা পর্যায় পর্যন্ত আমাদের টিম কাজ করে, তারা শিক্ষা কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে। বিভিন্নভাবে যাচাই-বাছাই করে নির্বাচন করেন সেরা শিক্ষক। এখানে আমাদের কোনো স্বার্থ নেই, কিংবা কোনো দলের পক্ষ হয়ে কাজ করি না। ফলে, আমাদের কার্যক্রমে কোনো পক্ষপাতিত্ব নেই। কাজেই আমরা সত্যিকারের বেস্ট টিচার বাছাই করতে সক্ষম হই।
ছাত্রজীবন থেকেই শিক্ষা নিয়ে আছি, শিক্ষার সাথে সম্পৃক্ত থাকছি এর বাইরে কোনো কাজ করিনি। বিএসবি প্রতিষ্ঠার সুবাদে প্রায় ৪০-৫০টি দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করার সুযোগ হয়েছে। বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের ভর্তি করতে গিয়ে আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা হয়েছে যে, আমাদের সিলেবাস, কারিকুলাম এবং শিক্ষামান কোনটাই আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ডের নয়। তাই আমাদের দুর্বলতাগুলো দূর করতে হলে অবশ্যই পরিবর্তন আনতে হবে আর এজন্যেই দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আমি ক্যামব্রিয়ান এডুকেশন গ্রুপ গড়ে তুলেছি। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হলে শিক্ষান্নোয়নে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, আর নিরক্ষরতা দূর করার পাশাপাশি কোয়ালিটি শিক্ষা প্রসারের মাধ্যমে গড়ে তুলতে হবে দক্ষ জনশক্তি। দক্ষ জনশক্তি যেকোনো দেশের জন্যই মূল্যবান সম্পদ। আর এ সম্পদ যাদের বেশি আছে, তারাই বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়ে থাকে।
ক্যামব্রিয়ান এডুকেশন গ্রুপ সব ধরনের অন্ধকার দূর করে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত হতে চায়। আর সেজন্যই আমরা প্রতীক হিসেবে কালো রঙের পোশাক বাছাই করেছি। যতদিন দেশ ও সমাজ থেকে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অন্ধকার দূর না হবে ততদিন আমরা এ প্রতীক ধারণ করে সামাজিক আন্দোলন পরিচালনা করে যাব। বেসরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা সাধারণতঃ সরকারি নিয়মে পেনশন, গ্র্যাচুইটি বা ফান্ডের সুবিধা পায় না, ক্যামব্রিয়ান এ ব্যাপারে কিছু ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এখানে যারা শিক্ষকতা করেন তাদের সন্তানরা হয়ত সাধারণ কলেজে পড়ত, সেক্ষেত্রে তাদের সন্তানদের ক্যামব্রিয়ান কলেজে নামমাত্র বেতনে পড়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে। শিক্ষক যদি চাকরিরত অবস্থায় দুর্ঘটনার শিকার হন, তাহলে তার চিকিৎসা-ব্যয়ের জন্য একটা বড় অংকের ফান্ড গড়ে তুলেছি। তাদের ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থা করেছি। তাদের মর্যাদা এবং আর্থিক চাহিদা মেটানোর সম্ভাব্য ব্যবস্থা আমরা করেছি। এর ফলে ফার্স্ট-ক্লাস পাওয়া ছাত্ররা অন্য প্রফেশনে না গিয়ে শিক্ষকতায় ফিরে আসছে। সুযোগ-সুবিধার সাথে যথাযোগ্য মর্যাদা পেলে মেধাবীরা আবার শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হবে ক্যামব্রিয়ানের শিক্ষকদের দেখে আমার এ বিশ্বাস জন্মেছে।
আমাদের দেশের শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেতে হলে তাদের শিক্ষামান বাড়াতে হবে, তাদের প্রচুর পড়ালেখা করতে হবে। বর্তমানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে পৃথিবীর সবকিছুই শেখা যায়। আমাদের ১০ লক্ষ শিক্ষকের মধ্যে ৯ লক্ষেরই কম্পিউটার জ্ঞান নেই, তাদের ই-মেইল ধারণা নেই। দশ ভাগের ৯ ভাগই যেখানে তথ্য-প্রযুক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন সেখানে তাদের দিয়ে বিরাট কিছু করা সম্ভব নয়। তাই প্রত্যেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যুতের আওতায় এনে ডিজিটাল তথ্য প্রযুক্তি সমৃদ্ধ করতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষককে ডিজিটাল প্রযুক্তি জ্ঞান সম্পন্ন করতে ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করতে হবে। যাতে তারা পরবর্তীতে শিক্ষার্থীদের যে বিষয়ে দক্ষ করে গড়ে তুলতে পারে।
শিক্ষকের মর্যাদা সম্পর্কে লায়ন এম কে বাশার মতামত ব্যক্ত করে বলেন, শিক্ষকের মর্যাদা সবার উপরে। আমরা যদি তাদেরকে মযার্দাবান করে তুলতে পারি তা’হলে তাদের হাতে তৈরি মেধাবী শিক্ষার্থীরা একদিন সঠিকভাবে দেশ পরিচালনায় সাফল্যের স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হবে। আজকের প্রজন্ম যদি শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদা দেয়, তাদের নির্দেশিত পথে চলে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্ম শিক্ষকের মর্যাদা দানের প্রশ্নে শৈথিল্য দেখাবে না। তাই ক্যামব্রিয়ানে আমরা শিক্ষার মানোন্নয়ন, শিক্ষকের মানোন্নয়ন প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছি।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ