বিশেষ খবর

লালবাগ মডেল কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর জাহাঙ্গীর আলম এর বিদায় অনুষ্ঠান

ক্যাম্পাস ডেস্ক শিক্ষা সংবাদ
img

চাকরিতে মানুষের যোগদান ও চাকুরি শেষে অবসরে যাওয়া এটা একটা নিয়মতান্ত্রিক বিষয়। তবুও কারো কারো বেলায় এ নিয়ম মানতে ইচ্ছে করে না; কোথায় যেন একটা ধাক্কা লাগে। প্রফেসর জাহাঙ্গীর আলম ১৫ জুন ২০১০ সালে লালবাগ মডেল স্কুল এন্ড কলেজে অধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন। তখন তিনি সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। ২০১৩ এর গোড়ার দিকেই সম্ভবত তিনি প্রফেসর হয়েছেন।
একটি অন্ধকার প্রতিষ্ঠানকে কিভাবে তিনি আলোকিত করলেন ভাবতে অবাক লাগে। আমার চোখের সামনে ৬টি বছর কখন যে শেষ হয়ে গেল টের পেলাম না। সামনের গেইটে ঢুকে প্রতিষ্ঠানটির প্রবেশদ্বারে ছিল বিরাট একটি গর্ত। সব সময় পানি জমে থাকত। পেছনের গেইট কোনদিন কেউ খুলেছিল কিনা বোঝা যায়নি।
প্রতিষ্ঠানের ভিতরে-বাইরে ময়লা আবর্জনা ও ধ্বংসস্তুপ ছিল। ফুল, ফুলগাছ এসবের নান্দনিক ছোঁয়া লাগেনি কখনো। ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকের মধ্যে ছিল যুদ্ধের পরিবেশ। পূর্বের অধ্যক্ষ ভোলানাথ প্রাণভয়ে আবেদন দিয়ে শিক্ষা অধিদপ্তরে ওএসডি হয়ে চলে গেছেন। আসলেন বর্তমান বিদায়ী অধ্যক্ষ প্রফেসর জাহাঙ্গীর আলম। চাকরির বয়স শেষ তবুও কেউ তাকে বিদায় দিতে চায় না। ছাত্র, শিক্ষক অভিভাবক কেউ না। সবাইকে যেন যাদু করে ফেলেছেন। কলেজের প্রবেশ গেইটে সেই গর্ত নেই; পেছনের গেইট খুলে গেছে। পেছনের গেইট দিয়ে শিক্ষার্থীরা প্রবেশ করে; সামনের গেইট দিয়ে বের হয়। ফুলে ফুলে ভরা প্রতিষ্ঠানের সর্বত্র।
অল্প জায়গায় যে মনোরম দৃশ্য নান্দনিকতা সৃষ্টি করেছে তা দেখে দর্শক মাত্রই অভিভূত হয়। শ্রেণিকক্ষের শৃঙ্খলা, শিক্ষার মান, অধ্যক্ষের কর্ম চাঞ্চল্য সবাইকে মুগ্ধ করে। কি চমৎকারভাবে শিক্ষক, শিক্ষার্থী অভিভাবকদের আপন করে আগলে রেখেছেন; সেটা যেন যাদুমন্ত্র।
১ জানুয়ারি পুস্তক বিতরণ উৎসব থেকে শুরু করে ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস পর্যন্ত যতগুলি অনুষ্ঠান এ প্রতিষ্ঠানে হয়েছে বাংলাদেশের আর কোথাও আছে কিনা আমার জানা নেই। শিক্ষায় তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহার দেখে খোদ শিক্ষামন্ত্রী পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে অর্থমন্ত্রীকে বলেছিলেন ‘ডিজিটালাইজেশন কাকে বলে লালবাগ মডেলে গিয়ে দেখুন’। গত ৬ বছরে ১ টাকা সরকারি অনুদান ছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে ১ টা ফ্লোর মাল্টিমিডিয়া করা, নতুন গাড়ি, ফটো মেশিন, সিসি ক্যামেরা, বায়োমেট্রিকসহ বহু কর্মকান্ড সাধিত হয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী এ প্রতিষ্ঠানে এসেছেন ২ বার। খেলাধুলায় জাতীয় চ্যাম্পিয়ান পুরস্কার নায়েমের অডিটরিয়ামে নিজ হাতে অধ্যক্ষকে তুলে দিয়েছেন ৩ বার।
শিক্ষামন্ত্রীর আস্থাভাজন হয়ে ৯ মডেলের শিক্ষকদের একত্রিত করে শিক্ষামন্ত্রণালয়ের কনফারেন্স রুমে শিক্ষকদের সাথে মন্ত্রীকে নিয়ে ২ ঘন্টা আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন প্রফেসর জাহাঙ্গীর আলম। শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবকদের প্রাণের দাবি জাতীয়করণের চেষ্টার আশ্বাস আদায় করেন মন্ত্রীর কাছ থেকে। একটি প্রতিষ্ঠান প্রধানের মাধ্যমে ৯টি প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণের এ ধরনের উদ্যোগ দেশে এক বিরল ঘটনা। তাছাড়া সারা বাংলাদেশে তিনিই সম্ভবত একমাত্র অধ্যাপক যাকে অধ্যাপক হওয়ার সাড়ে ৩ বছর পর পর্যন্ত ইন্টারমিডিয়েট লেভেলের একটি ছোট স্কুলের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। কর্তৃপক্ষের এহেন অবহেলায়ও তার মধ্যে কোনো অতৃপ্তি বা কাজে অনাগ্রহ দেখা যায়নি। অধ্যক্ষের লেখা একটা খোলা চিঠিতে জানলাম প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা সচিব, ডিজিসহ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি বিশেষ করে তার প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রতি তার বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার কথা।
অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর ৪ ডিসেম্বর ১৯৫৭ তারিখে লক্ষ্মীপুর জেলার সদর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন। ১ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখে মাউশি অধিদপ্তর থেকে চজখ জীবন শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ২ সন্তানের জনক। ইতোমধ্যে তিনি পুত্র কন্যা ২ জনেরই বিবাহ সম্পন্ন করেন। তার কন্যা ও পুত্রবধূ যথাক্রমে গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজের প্রভাষক এবং মেডিকেল অফিসার।
জামাতা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের মেডিকেল অফিসার, পুত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার্স শেষ পর্বের সংগীতের ছাত্র ও ঈগল মিউজিকের প্রধান সংগীত পরিচালক। ২০১৭ সেশনে তিনি কানাডার আলবাটা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে সঙ্গীতে আরো উচ্চ পর্যায়ে পড়াশুনা করতে যাচ্ছেন।
অধ্যক্ষ জাহাঙ্গীর আলম একজন নিরহংকারী মানুষ। ঋণদান ও ঋণ গ্রহণ তার ভীষণ অপছন্দ। ভালোবাসেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার প্রত্যয়ে তিনি বাকি জীবনও কাজ করার আশা রাখেন। তবে তার কথা হচ্ছে যে, যেখানে যে কাজের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সে তার কাজ যথাযথ ও নিষ্ঠার সাথে পালন করলেই বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন স্বার্থক হবে। এর জন্য মিটিং-মিছিল, সভা-সমিতি, যুদ্ধ বিগ্রহের কোনো প্রয়োজন নেই।
সর্বশেষ তিনি আশাবাদী লালবাগ মডেলে একদিন অনেক রবীন্দ্র, নজরুল, হুমায়ুন আহম্মেদ ও লাখো দেশপ্রেমিক সূর্য সন্তানের জন্ম দেবে। তিনি লালবাগের মানুষের কাছে, শিক্ষক শিক্ষার্থীদের কাছে কৃতজ্ঞ ও দোয়া প্রার্থী।
-সাজেদা চৌধুরী, প্রভাষক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ লালবাগ মডেল স্কুল এন্ড কলেজ


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ