বিশেষ খবর

চউক’র যুগশ্রেষ্ঠ ডায়নামিক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম এর সাক্ষাৎকার

ক্যাম্পাস ডেস্ক প্রিয় মানুষের মুখোমুখি
img

গর্ব করতে পারে বাংলাদেশ। গর্ব করার মতো আমাদের অনেক কিছু আছে। রাজনীতির অনাকাক্সিক্ষত ও অনিশ্চিত অভিযাত্রা, আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির বহুক্ষেত্রে অনগ্রসরতার দুঃসহ উপস্থিতি সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্ব অর্থনীতির চরম মন্দার মধ্যে বাংলাদেশ মাথা উঁচু করে জানান দিতে পারে তার গৌরবোজ্জ্বল অস্তিত্বের কথা। হাজারো নেতিবাচক ঘটনা দৃষ্টান্ত আর অযাচিত অর্জনের বেড়াজালে আবদ্ধ থেকেও আমাদের ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, গণতন্ত্রের লড়াই, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, কৃষ্টি তথা আমাদের মূল্যবোধকে নিয়ে গর্ব করতে পারি। বাংলাদেশের আছে নিজস্ব কিছু অর্জন; আছে একেবারেই কিছু স্বাতন্ত্র্য; আর আছে গর্ব করার মতো কিছু দীপ্তিমান মানুষ -যাঁরা কর্ম আর ব্যক্তিত্বের দীপ্তিময় বিশালতায় নিজকে নিয়ে গেছেন আকাশচুম্বী উচ্চতায়। তেমনি এক আলোকিত মানুষ আবদুচ ছালাম। আত্মপ্রত্যয়ী বিজনেস ম্যাগনেট ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আবদুচ ছালাম একটি সাধারণ নাম নয়, বরং একটি সংগ্রাম ও একটি ইতিহাস। দেশের নেতৃস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ওয়েল গ্রুপ-এর প্রতিষ্ঠাতা, চেয়ারম্যান ও প্রাণপুরুষ। তাঁর জীবন রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সামাজিক দায়বদ্ধতার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। ছাত্র জীবনেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ষাটের দশকে যখন পাকিস্তানি রাষ্ট্র কাঠামোয় বাঙালি জাতির সার্বিক বিকাশ রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছিল এবং বাঙালি জাতিসত্তার আত্মপ্রকাশ ও প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তির সংগ্রাম দানা বেঁধে উঠছিল তখন মেধা, দূরদর্শিতা, গতিশীলতা, পরিচ্ছন্নতা, একাগ্রতা, সততা, ত্যাগ ও নিষ্ঠার সমাহারে গড়া এই নেতৃত্ব স্বতন্ত্র মর্যাদায় চিহ্নিত হয়ে সুশীল সমাজের আস্থাভাজন হয়েছেন তিনি।
বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলন একাত্তরে সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের রূপ নিলে তিনি তাতে সক্রিয়ভাবে সহযোগিতা করেন। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আহ্বানে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে আত্মনিয়োগ করেন। গত শতাব্দীর ’৯০ দশকের শুরু থেকে স্বীয় এলাকা মোহরা ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগকে সংগঠিত ও শক্তিশালী করার দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন স্বতঃপ্রবৃত্ত হয়ে। তিনি শ্রেষ্ঠ সমাজসেবক হিসেবে জাতীয় দরগাহ মাজার সংস্কার সংরক্ষণ কমিটি কর্তৃক স্বর্ণপদক প্রাপ্ত হন।
চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালামকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান হিসেবে নিযুক্ত করেন। উক্ত পদে আসীন হওয়ার পর থেকে তিনি চট্টগ্রামের উন্নয়নের জন্য ব্যাপক কাজ করে যাচ্ছেন। বেশ কয়েকবার সিডিএ’র চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করে তিনি পরিণত হয়েছেন উন্নয়নের প্রতীক হিসেবে। চট্টগ্রামের উন্নয়ন ও নানা প্রাসঙ্গিক বিষয়ে হাস্যোজ্জ্বল ও চিরসবুজ এই চৌকস মানুষটির সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন ক্যাম্পাস পত্রিকার প্রতিনিধি গিয়াস উদ্দিন আহমেদ, আর অনুলিখনে আনিসুর রহমান এরশাদ। সাক্ষাৎকারটির অংশবিশেষ এখানে উপস্থাপন করা হলো।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকাঃ আপনার শৈশব- কৈশোর সম্পর্কে বলবেন কী?
আবদুচ ছালাম ঃ ১৯৫১ সালের ৯ই সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম জেলার চান্দগাঁও থানার মোহরা গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে আমার জন্ম। আমার পিতা আবদুর রশিদ একজন ধর্মপ্রাণ, সৎ ব্যবসায়ী ও বিশিষ্ট সমাজসেবক ছিলেন। আব্বা ৮ বছর আগে মারা গেছেন। আম্মা এখনও বেঁচে আছেন। তাদের দোয়া নিয়েই আমি ভালো আছি।
আমার বয়স এখন ৬৫ বছর। আমি পরিবারের সবচেয়ে বড় ছেলে। ৬ ভাই ও ৪ বোনের মধ্যে এক বোনের ছোট আমি। সবচেয়ে ছোট ভাইটা আমার ২৭ বছরের ছোট। শৈশব থেকেই পরিবারের সবার প্রতি আমার খেয়াল ছিলো। নিজে বড় হওয়ার সাথে সাথে বড় করে তুলেছি পরিবারের সবাইকে। লেখাপড়া শিখিয়েছি ছোট ভাইবোনদের। এখনো আমার নিজস্ব বলতে কিছু নেই। যা কিছু আছে তা ‘আমাদের’। সবার। ব্যক্তিকেন্দ্রিক উজ্জ্বলতাকে খুব অপছন্দ করি আমি। একা একা বড় (প্রতিষ্ঠিত) হয়ে কোনো আনন্দ নেই। আপনি একা হয়ে যাবেন। বড় হবেন সবাইকে নিয়ে- তখন দেখবেন- আপনার আশে-পাশে সবাই আছে। আমরা ভাইবোন সবাই উচ্চশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত। ভাইয়েরা সবাই একসাথেই বসবাস করি, একই রান্নাঘরে রান্না হয়, একই ডাইনিং টেবিলে বসে খাই। সুখ-শান্তি-সম্মানে ভরপুর আমার পরিবার, আমাদের জীবন। আমি যদি ১ টাকার মালিক হই, আমার ৫ ভাই সমান টাকার মালিক। আমি যদি ১ কাঠার মালিক হই, আমার ৫ ভাইও ১ কাঠা করে জমির মালিক। এই উদাহারণ কোথাও আছে বলে আমার মনে হয় না। এটা ¯্রষ্টার অপার রহমত, আমাদের পরিবার সুখ-শান্তিতে ভরপুর একটি যৌথ পরিবার।
বি ক্যাঃ আপনার শিক্ষাজীবন সম্পর্কে জানতে চাই?
আবদুচ ছালাম ঃ ১৯৬৭ সালে মেট্রিক পাস করি। তখন পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। মধ্যবিত্ত বিশাল পরিবারের ছেলে আমি। আমাকে নিয়ে পরিবারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল মেকানিক বানানোর। কারণ পরিবারের ভরণ-পোষণের জন্য দ্রুত আয়-রোজগারের সাথে যুক্ত হওয়া দরকার ছিল। সেই সিদ্ধান্তের আলোকে পলিটেকনিকে ভর্তির প্রক্রিয়া চলতে থাকে। কিন্তু আমার গর্ভধারিণী মা বলেছিলেন, ভিক্ষা করে হলেও ছেলেকে কলেজে পড়াবেন। মায়ের সেই সিদ্ধান্ত আল্লাহ কবুল করলেন। আমি কলেজে ভর্তি হলাম। কলেজে ভর্তি হয়েই সিদ্ধান্ত নিলাম মা-বাবাকে আর কষ্ট দিব না। আমি নিজের পায়ে নিজে দাঁড়াবার চেষ্টা করবো। লজিং থাকা শুরু করলাম। লজিংয়ে থেকেই সিটি কলেজ থেকে পড়াশুনা শেষ করেছি। যে বাড়িতে লজিং ছিলাম, তারা আমার দূরসম্পর্কের আত্মীয় ছিলেন। প্রতিদিন আমাকে আট আনা দিতেন। উনাদেরও বোধহয় লজ্জা হতো, আমার হাতে না দিয়ে টেবিলে রেখে চলে যেতেন। বাস থেকে নেমে ১০ পয়সা সেভ করার জন্য আমি অনেক পথ পায়ে হেঁটে যেতাম। সেই ১০ পয়সা দিয়ে বাকরখানি খেতাম। ৫০ পয়সা থেকে ভাড়া দিতাম ২০ পয়সা, ১০ পয়সা দিয়ে বাকরখানি কিনতাম আর ২০ পয়সা সঞ্চয় করতাম। এই সঞ্চয়ের অর্থে সপ্তাহান্তে বাড়িতে যাবার সময় ছোট ভাইবোনদের জন্য কিছু নিয়ে যেতাম। কিছুদিন পর মেট্রিক এবং ইন্টারমিডিয়েটের শিক্ষার্থীদের অল্প টাকায় পড়ানো শুরু করলাম। একটি পরিবারের যে কয়জনই থাকুক সবাইকে পড়ালে পাওয়া যেতো ৫ টাকা। বন্ধু-বান্ধব অনেকে টাকাই দেয়নি। তবু পড়াতাম। একটা নেশা হয়ে গিয়েছিল। ১৯৬৯ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করলাম। সিটি কলেজে ডিগ্রিতে পাস কোর্সে ভর্তি হলাম। লজিং ও টিউশনি চলছিল। ডিগ্রিতে পড়াকালীন ডিগ্রিরই শিক্ষার্থীদের পড়াতাম। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের কারণে আমাদের ডিগ্রি পরীক্ষা বন্ধ হয়ে গেল। যুদ্ধের পরে পরীক্ষা দিয়ে সম্মিলিত মেধা তালিকায় ১১তম স্থান অধিকার করলাম। ১৯৭৩ সালে ২০তম স্থান অধিকার করে হিসাব বিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করি।
বি ক্যাঃ আপনার জীবনে কার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ?
আবদুচ ছালাম ঃ আমার জীবনে আমার মা ও একজন শিক্ষকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। মায়ের জন্যই আজ আমি ও আমার ভাইয়েরা প্রতিষ্ঠিত। মেট্টিক পাসের পর ভর্তি হতে গিয়েছিলাম পলিকেটনিকে। কিন্তু তাতে বাধ সাধলেন আমার মা। তিনি বলতেন, উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে বড় মানুষ হও তোমরা। মায়ের কথা রাখতে গিয়ে সিটি কলেজ থেকে ১৯৭৩ সালে এম.কম পাস করি।
এছাড়া আমার আদর্শ শিক্ষাগুরু হিসেবে আমার হৃদয়ে এখনো আসন পেতে বসে আছেন আমার সিটি কলেজের শিক্ষক অধ্যাপক নুরুল বারী চৌধুরী। তাঁর অনুপ্রেরণাতেই ১৯৭৩ সালে ব্যবসায়ে আসি। এরপর আমাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। স্যার বলতেন, কষ্ট করলে কেষ্ট মিলবে। আমি কষ্ট করেছি। খেয়ে না খেয়ে। কোনো কোনো দিন আধাপেট খেয়ে আমি আজকের- আব্দুচ ছালাম।
বি ক্যাঃ মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়কালীন কোনো স্মৃতি মনে পড়ে কী?
আবদুচ ছালাম ঃ ২৫ শে মার্চ আমি কমার্স কলেজে ছিলাম। এক ছেলেকে পড়াতে গিয়েছিলাম। রাতে সে বললো, আপনি আজকে থেকে যান, বাইরের পরিস্থিতি খারাপ। সেইদিন রাতে হানাদার বাহিনী ঢুকলে আমরা সবাই বের হয়ে ব্যারিকেড দিলাম। ইট, বালি, সিমেন্ট যা পেলাম তা দিয়েই ব্যারিকেড দিলাম। হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট আব্দুর রহিম আমাদেরকে অনেক বকাবকি করে রাস্তা থেকে নিয়ে আসলেন। পরে যখন বাড়ির দিকে রওয়ানা হলাম, কোনো গাড়ি নেই। তখন আমার মায়ের হাতে আমার জমানো মাত্র ৮০০ টাকা ছিল। বাবার ছোট বিজনেস ছিল। মায়ের সাথে বসে হিসাব করলাম ৮০০ টাকা দিয়ে ৪ মাস চলবে।
এমন অভাবের মাঝেও মুক্তিযোদ্ধাদের বস্ত্র, খানার বন্দোবস্ত করার জন্য কাজ করেছি। তখন জিয়াউর রহমানের সাথে আমার পরিচয় হয়। উনি অত্যন্ত ভাগ্যবান ছিলেন। উনি চাকরির খাতিরেই চট্টগ্রামে ছিলেন। এছাড়া তৎকালীন চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দ এম এ হান্নান, সোবহান চৌধুরী, এম এ আজিজ, এম আর সিদ্দিকী তাদের আদেশটা উনি পালন করছিলেন। তাদের আদেশটা ছিল বঙ্গবন্ধুর ঘোষিত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র রেডিওর মাধ্যমে পাঠ করা। সে আদেশ উনি পালন করেছিলেন এজন্য উনি ভাগ্যবান। অনেক সেক্টর কমান্ডার কর্নেল ছিলেন অথচ উনাকেই ডেপুটি আর্মি চীফ বানিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। উনাকে মূল্যায়ন করা হয়েছিল, কারণ চট্টগ্রামের আওয়ামীলীগ নেতৃবৃন্দের আদেশ উনি পালন করেছিলেন। বি ক্যাঃ আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের কোন দিকটি আপনাকে বেশি নাড়া দিয়েছিল?
আবদুচ ছালাম ঃ তৎকালীন সময়ে ৭ কোটি মানুষের মধ্যে ১ কোটি শরণার্থী হিসেবে চলে গিয়েছিল। আমাদের পরিবারে জমানো ৮০০ টাকা চারমাসে খরচ হয়ে যায়। পরে এক প্রবাস ফেরৎ আত্মীয়ের কাছ থেকে ১ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলাম। আমার আব্বা তখন শহরে বসবাসরত ঐ আত্মীয়কে আমার ব্যাপারে বললেন, সুযোগ থাকলে শহরে নিয়ে তার বাড়িতে রাখতে, তার বিনিময়ে আমি তার সন্তানদের পড়াতে পারবো। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। তখন আমি যাদের বাড়িতে লজিং ছিলাম, সেই চাচা বললেন- আপনিতো বসেই আছেন, তাহলে দোকানে সময় দিলে ভালো হবে। আমি দোকানে বসতাম, বাসায় ফিরে আবার বাচ্চাদের পড়াতাম। দোকানে বসার সুযোগে দেখেছি, তখন রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকবাহিনী যা ইচ্ছে তা করছিল। সবখানে হরিলুট চলছিল। দোকানে টাকা না দিয়েই মালামাল নিয়ে যেতো। মিলিশিয়া বাহিনী, আলবদর, রাজাকার, আলশামসরা ছিল জঘন্য। মিলিশিয়ারা ছুরি দেখিয়ে ভয় দেখাতো। তবে আশার কথা এর মধ্যে মুক্তিবাহিনী আসতে শুরু করলো।
এত তাড়াতাড়ি দেশ স্বাধীন করতে পারব এটা তখন কল্পনাও করতে পারিনি। ভারত সরকারের সহযোগিতার জন্য আমরা কৃতজ্ঞ। তারা ১ কোটি শরণার্থীর থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। সরাসরি যুদ্ধে অস্ত্র দিয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে, সৈন্যবাহিনী পাঠিয়ে সহযোগিতা করেছিলেন। তখন মুক্তিযোদ্ধারা নিজের জীবনের কোনো মায়া করেনি। বঙ্গবন্ধু যখন যে নির্দেশনা দিয়েছেন অকপটে তা মেনে নিয়েছেন। কোনো সংকোচ ছিল না। ফলে পাক বাহিনী পরাজিত হয়েছে, দেশ স্বাধীন হয়েছে।
বি ক্যাঃ আপনার কর্মজীবন কীভাবে শুরু হয়েছিল?
আবদুচ ছালামঃ ডিগ্রি পরীক্ষার ফলাফল বের হবার পরে আমার প্রিয় এক স্যার আমাকে বললেন, তুমি কী করবে? তুমি যদি চাকরি করতে চাও তবে আইসিএমএ ভর্তি হয়ে যাও। উনি খুবই সৎ ও আন্তরিক শিক্ষক ছিলেন। ম্যানেজমেন্ট ও একাউন্টিং বিষয়ে উনার লেখা চারটি বই ছিল। ২টি ইন্টারমিডিয়েটের আর ২টি ডিগ্রির। আমি উনাকে অনেক কষ্ট দিতাম, পড়ালেখা সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বাসায় যেতাম। উনি যে আমাকে খুব পছন্দ করতেন এটা আমি জানতাম না। একদিন স্যার আমাকে বললেন ২০ হাজার টাকা ম্যানেজ করো। ব্যবসায় লাভ হলে অর্ধেক আমার আর অর্ধেক তোমার। আর লস হলে পুরোটাই আমার। আমি যে বাড়িতে লজিং ছিলাম উনাকে বললাম স্যারের কথা, তিনি ড্রয়ার খুলে আমাকে ২০ হাজার টাকা দিয়ে দিলেন। আমি টাকা নিয়ে স্যারের হাতে দিলাম। তিনি পরদিন সকালে যেতে বললেন। যাওয়ার পর স্যারের নির্দেশনা অনুযায়ী কর্ণফুলী পেপার মিলের ডিও কাটলাম। কাগজ চলে আসল। সে কাগজ বিক্রি করে ২০ হাজার টাকা লাভ হল। পরে আমি লোন পরিশোধ করে লাভের টাকা দিয়ে স্যারের পরামর্শ ও নির্দেশনা অনুযায়ী পণ্য ক্রয়-বিক্রয় করতে লাগলাম।
সিদ্ধান্ত নিলাম সুতার ব্যবসা করব। কিন্তু নিজস্ব কারখানা ছাড়া বিকেএমসিএ সুতার লাইসেন্স দেয় না। তাই সাইনবোর্ডসহ একটা মেশিন ২৫ হাজার টাকা দিয়ে কিনলাম। খুব ছোট্ট পরিসরে কাজ শুরু হলো। আমি নিজেই সেলস এর কাজও করেছি। কিন্তু দোকানগুলো আমার সুতা নিতে চায়নি। তাই আমি মফস্বলে গিয়ে খুচরা বিক্রিও শুরু করি। একবছর যেতে না যেতেই বেশ চাহিদা বাড়লো। তাই ইন্টার ডিস্ট্রিক্ট সেলস শুরু করে দিলাম। মাসের পর মাস এক জেলা থেকে আরেক জেলায় সুতা বিক্রির জন্য ঘুরে বেড়িয়েছি, অর্ডার নিয়েছি। এভাবে ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৮ পর্যন্ত চললো। যখন চাহিদা বেড়ে গেল তখন বন্ধ থাকা একটি কারখানার মেশিন ভাড়া নিয়েও কাজ করেছি। একদিন আমার কারখানার মালিক আমাকে বললেন তারা কলিকাতা থেকে মালামাল আনতেন কিন্তু পাকিস্তান হবার পর তা’ বন্ধ হয়ে যায়। আরও অনেক গল্প করার পর তিনি আমাকে বললেন, আমার বিশ্বাস হচ্ছে -আপনি একদিন একটি গ্রুপের চেয়ারম্যান হবেন। সেদিন থেকে আমার মানসিক শক্তি আরও বেড়ে গেল।
বি ক্যাঃ একজন রাজনৈতিক নেতা, ব্যবসায়ী এবং সিডিএ’র চেয়ারম্যান- কোন্ পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন?
আবদুচ ছালাম ঃ রাজনীতি করি বলেই চট্টগ্রামের উন্নয়ন করতে পেরেছি। এই পরিচয়ে আমি গর্ববোধ করি। তবে সিডিএ’র চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালনকালে দলীয় বিষয়টি মাথায় রাখিনা। গরিবের সন্তান হিসেবে আমি গরিবের দুঃখ-কষ্ট হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করি। সম্পদের মালিক হয়ে আমি গরিব-অসহায় মানুষের জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিলাম। কিন্তু যথাযথভাবে সহায়তা বণ্টন করতে পারছিলাম না। পরে এই সমস্যার সমাধানে রাজনীতি শুরু করলাম। রাজনীতির মাধ্যমে সেবা দেয়ার জন্য আগ্রহ সৃষ্টি হয়, সেবা নেয়ার জন্য আগ্রহী লোকের সমাগম ঘটে। মানুষের সেবা করা, এলাকার উন্নয়ন করা, সমাজের কল্যাণ করার পথ সুগম হয়েছে।
বি ক্যাঃ আপনার রাজনৈতিক জীবন সম্পর্কে জানতে চাই?
আবদুচ ছালামঃ আমি মহিউদ্দিন চৌধুরীর মাধ্যমে মহানগরীর রাজনীতিতে এসেছি। আমার মেধা, প্রজ্ঞা, দক্ষতা, কমিটমেন্ট এর কারণে অবিশ্বাস্যভাবে আমাকে না জানিয়ে মহানগরের ট্রেজারারের দায়িত্ব দেন তিনি। আমার এজেন্ডা একটাই কল্যাণ করা। দেশ, জাতি, এলাকার কল্যাণ করা। ইতিপূর্বে আমি ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছি। আমার সাংগঠনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্ব বিশেষ করে বর্তমানে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও তখনকার সিটি মেয়র এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী’র দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাঁরই একান্ত আগ্রহ ও ইচ্ছায় মহানগর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে অভিষিক্ত হই আমি। আমাকে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ সর্বসম্মতিক্রমে কার্যকরি কমিটিতে কোষাধ্যক্ষ পদে অন্তর্ভুক্ত করেন।
মানবসেবা ও জনকল্যাণ আমার জীবনের ব্রত এবং দেশ, জাতি ও জনগণের স্বার্থে নিজেকে নিবেদিত করার সদিচ্ছা থেকেই আমি রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেছি। তাই রাজনীতি আমার কাছে পবিত্র ইবাদত স্বরূপ। দলীয় নেতৃবৃন্দ এবং মাঠ পর্যায়ের কর্মী সংগঠকদের সাথে আমার সম্পর্ক অত্যন্ত সুগভীর ও আন্তরিক। এলাকার প্রতিটি নেতা-কর্মীর সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিবিড় ও মধুর, সাধারণ জনগণের কাছেও রয়েছে গ্রহণযোগ্যতা। ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর যখন দলীয় মনোনয়নের প্রশ্ন আসল এবং আওয়ামী লীগ তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের মতামতের ভিত্তিতে প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করল, তখন চট্টগ্রাম-৭ আসন থেকে সর্বাধিক ভোট পেয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হই। তৃণমূলের এই রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি বোর্ড চট্টগ্রাম-৭ আসন থেকে আমাকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়। কিন্তু মহাজোটের কারণে সেটি আমি ত্যাগ করলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমার ত্যাগকে মূল্যায়ন করে সিডিএ’র চেয়ারম্যান বানিয়েছেন। আজকে যে সুখ-শান্তি-সম্পদে ভরপুর জীবন, এর পিছনে রয়েছে কঠোর পরিশ্রম। আমার মনে হয় আমার মায়ের দোয়া আল্লাহ এমনভাবে কবুল করেছেন যে, অবিশ্বাস্যভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে সিডিএ’র চেয়ারম্যান করে দিয়েছেন।
বি ক্যাঃ চট্টগ্রামের উন্নয়নে আপনার ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাই?
আবদুচ ছালামঃ ২০০৯ সালের এপ্রিল মাসে চউকের (সিডিএ) চেয়ারম্যান হিসেবে যোগ দেয়ার পর থেকে আমার ভূমিকার স্বীকৃতি স্বরূপ চউক চেয়ারম্যন হিসেবে মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে চারবার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার আমার কাজে সন্তুষ্ট হয়েই আমাকে এই দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি চেষ্টা করছি- এই নগরীর প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। আমার জীবনের লক্ষ্যও তাই। তাই দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে চট্টগ্রাম উন্নয়নের পালে ধীরগতির যে হাওয়া ছিলো- আমি সিডিএ’র দায়িত্ব নেয়ার পর তা ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। আমি দেখিয়ে দিয়েছি সততা, আন্তরিকতা আর মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলে সত্যিকার অর্থেই উন্নয়ন সম্ভব।
উন্নয়নের ব্যাপারে বলতে চাই- মাহাথির মোহাম্মদকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, হোয়াট ইজ দি রিজন বিহাইন্ড দি ডেভেলপমেন্ট অব মালয়েশিয়া? উনি দু’টি শব্দ আমাকে বলেছিলেন, অপরচুনিটি এন্ড দেয়ার অনেস্টি। আমি আমার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা দিয়ে মানুষের পাশে থাকার এবং মানুষের কল্যাণে নিবেদিত হবার চেষ্টা করেছি। কতটুকু করতে পেরেছি সেটি চট্টগ্রামবাসীই বলবেন, আমার বলার কিছু নেই। আমি দায়িত্ব নিয়ে এমন পদক্ষেপ নিয়েছি যে, চট্টগ্রামের চেহারা পাল্টে গেছে। অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষার উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন তথা বহুমুখী উন্নয়ন হয়েছে। চট্টগ্রামের উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং চট্টগ্রামবাসীর সহযোগিতা ও সমর্থন আমাকে দুঃসাহসী করে তুলেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার আশীর্বাদে আগামী পাঁচ বছরে চট্টগ্রাম নতুন এক উচ্চতায় পৌঁছাবে ইনশাআল্লাহ। ৬০ লক্ষ মানুষের ভালোবাসা নিয়ে চট্টগ্রামের উন্নয়নে নিজেকে নিয়োজিত করেছি। মহানগরীর বহু সড়ক সম্প্রসারণ করেছি। আগে যে দূরত্ব যেতে লাগতো এক ঘণ্টা এখন রাস্তা সম্প্রসারণের কারণে সেখানে লাগে ২০ মিনিট।
বি ক্যাঃ অতীত অভিজ্ঞতার আলাকে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতির ব্যাপারে আপনার মূল্যায়ন জানতে চাই?
আবদুচ ছালামঃ শিক্ষাজীবন শেষ না করেই ব্যবসাকে আমার পেশা হিসেবে বেছে নিতে হয়েছিল। সততা ও কঠোর পরিশ্রমকে পুঁজি করেই বর্তমানে ওয়েল গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ গড়ে তুলেছি। ইতোমধ্যেই শিল্পখাতে অবদানের জন্য নবাব স্যার সলিমুল্লাহ স্বর্ণপদক লাভ করেছি। আমার এখন ১৮টি শিল্প প্রতিষ্ঠান, ১৮ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী। টেক্সটাইল, স্পিনিং থেকে শুরু করে ডাইং, কার্টন, লেভেল, ইলাস্ট্রি থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা রয়েছে। আমার অতীত অভিজ্ঞতা ও বর্তমান অবস্থা থেকে আমি বলতে পারি, এই বাংলাদেশকে আর কেউ দাবায়ে রাখতে পারবে না। এখন আমাদের সামনের দিকেই এগিয়ে যাবার পালা।
দেশ যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, ইনশাআল্লাহ নেত্রী যে ভিশন ২০২১ এর কথা বলেছেন তার আগেই দেশ মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হবে। আর ২০৪১ এর আগেই আমরা বিশ্বকে দেখিয়ে দিব আমরা শ্রেষ্ঠ জাতি। একসময় কেউ চিন্তাও করেনি ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের যোগান দিয়ে খাদ্য রপ্তানি করবে, ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু করবে। ৩০ বিলিয়ন ডলারের এক্সপোর্ট করবে, ৩০ বিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ হবে এটা চিন্তাও করেনি। আমরা মৌলিক চাহিদা পূরণ করেছি, এখন শুধুই সামনের দিকে যাওয়ার পালা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববাসীকে দেখিয়ে দিয়েছেন, এখন আর এই জাতিকে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই। তিনি কথা দিয়ে নয় কাজের মাধ্যমেই তা’ প্রমাণ করে দিতে সক্ষম হয়েছেন। এই দেশের ভাবমূর্তি বহির্বিশ্বে উজ্জ্বল হয়েছে, জাতির মর্যাদা-সম্মান বৃদ্ধি পেয়েছে।
বি ক্যাঃ দেশ-জাতির উন্নতি-অগ্রগতির অন্তরায় কী বলে আপনি মনে করেন?
আবদুচ ছালামঃ ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০ এর নির্বাচন, ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে সমস্ত অর্জনের পিছনেও ষড়যন্ত্র ছিল। ষড়যন্ত্রকারীরা বারবার ষড়যন্ত্র করে পরাজিত হয়েছে। এখনও ষড়যন্ত্র আছে, ষড়যন্ত্রকারীরা আছে- তারাও পরাজয় বরণ করবে।
বি ক্যাঃ আপনার সামাজিক কর্মকান্ড সম্পর্কে জানতে চাই?
আবদুচ ছালামঃ সরকার বিনামূল্যে বই দেয়ার আগে আমি ৬ষ্ঠ, ৭ম ও ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত ৫ হাজার ছেলেমেয়েকে প্রতিবছর বিনামূল্যে পাঠ্যবই দিতাম। সরকার বিনামূল্যে বই দেয়া শুরু করার পর আমি তা’ বন্ধ করে দিয়েছি। আমি এখন ২০০ ছেলেমেয়েকে বিনামূল্যে লেখাপড়া করাই। এছাড়া বছরে পাঁচ হাজার গরিব রোগীকে বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয় আমার দাতব্য চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান থেকে। প্রতিবছরই দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত দু’একজন গরিব রোগীর দায়িত্ব নিয়ে তাদের বিদেশে পাঠিয়ে চিকিৎসা করাই। প্রতিবছর নিজ খরচে গ্রামের বাড়িতে ৪০০ একর আবাদি জমির ধান গরিবের মাঝে দান করি। এসব আমার সামাজিক কর্মকান্ড। আর রাজনীতির সাথে যুক্ত হবার পর সারা চট্টগ্রামেই মসজিদ, মাদরাসা, স্কুল, গরিব মেয়েদের বিয়ে দিতে আর্থিক সহায়তা করি। সৎভাবে, স্বচ্ছভাবে, সুন্দরভাবে রাজনীতি করতে পারলেই সত্যিকারে মানুষের বৃহত্তর কল্যাণ সাধন সম্ভব। রাজনীতিকে যদি আমরা দূষিত হওয়া থেকে রক্ষা করতে পারি, শুদ্ধ রাখতে পারি তাহলে দেশ ও জাতির প্রকৃত কল্যাণ হওয়া সম্ভব। অবশ্য যেকোনো মানবিক দুর্যোগে মানুষের পাশে থাকা আমাদের পারিবারিক প্রথা। আমরা চাই- মানুষকে মানুষের মূল্য দেয়া হোক জীবনের প্রতিটি স্তরে।
বি ক্যাঃ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) এর কর্মকান্ড সম্পর্কে বিস্তারত জানতে চাই?
আবদুচ ছালাম ঃ চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার জন্য একটি সংবিধিবদ্ধ পরিকল্পনা এবং উন্নয়ন প্রণয়নমূলক কর্তৃপক্ষ, যা ১৯৫৯ সালে চউক অধ্যাদেশ-১৯৫৯ এর আলোকে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, যার মূল লক্ষ্য ছিল চট্টগ্রাম শহর ও এর আওতাধীন এলাকার পরিকল্পিত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়ন। ভৌগলিক ও অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানের কারণে চট্টগ্রামের উন্নয়ন বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রাচীন এই নগরীর নগরায়নের ক্রমবর্ধমান ধারার প্রতি দৃষ্টি রেখে নগরায়নের ধারাকে পরিকল্পিত এবং টেকসই করার লক্ষ্যে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) কাজ করে যাচ্ছে।
চউক এর প্রধান ভূমিকা হচ্ছে- পরিকল্পিত উন্নয়ন ও অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ, উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং উন্নয়নের অনুমোদন। চউকের মূল কাজসমূহ হচ্ছে- চট্টগ্রাম শহর ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকার জন্য একটি উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা তৈরি করা এবং তার নিয়মিত উন্নয়ন, চট্টগ্রাম শহরের উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়ন। এই পরিকল্পনার আওতায় রয়েছে নতুন রাস্তা নির্মাণ, শহরের প্রধান সড়কসমূহ প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন, বাণিজ্যিক বিতান নির্মাণ, শিল্প, আবাসিক এলাকার উন্নয়ন এবং বাণিজ্যিক প্লটসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন, সরকার অনুমোদিত চট্টগ্রাম শহরের মহাপরিকল্পনা (গধংঃবৎ চষধহ) এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অধ্যাদেশের আলোকে স্ট্রাকচার প্ল্যান অনুযায়ী পরিকল্পনা নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন, বাংলাদেশ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা- ১৯৫২ ও তৎপরবর্তী সংশোধনী অনুযায়ী অপরিকল্পিত উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ।
চউক নিয়ন্ত্রিত এলাকা হচ্ছে- স্ট্রাকচার প্ল্যান-১৯৯৫ অনুযায়ী ১১৫২ বর্গ কিঃ মিঃ চউক সীমানা। উত্তরে: সীতাকুন্ডের বাঁশবাড়ীয়া, দক্ষিণে: সাংগু নদী, পূর্বে: রাংগুনীয়ার ইছাখালী, পশ্চিমে: বঙ্গোপসাগর।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন মাস্টার প্ল্যান সর্বপ্রথম ১৯৬১ সালে প্রণয়ন করা হয়। পরবর্তীতে টঘউচ ও টঘঈঐঝ এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় ১৯৯৫ সালে মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়, যা ১৯৯১ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়। উল্লেখিত মহাপরিকল্পনার আওতায় স্ট্রাকচার প্ল্যান (১৯৯৫-২০১৫), আরবান ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (১৯৯৫-২০০৫), ট্রান্সপরটেশন মাস্টার প্ল্যান (১৯৯৫-২০১৫), ড্রেনেইজ মাস্টার প্ল্যান (১৯৯৫-২০১৫) করা হয়। পরবর্তীতে উক্ত মাস্টার প্ল্যান -১৯৯৫ এর নির্দেশনা অনুযায়ী ২০০৭ সালে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (উবঃধরষবফ অৎবধ চষধহ) প্রস্তুত করা হয়।
স্ট্রাকচার প্ল্যান (১৯৯৫-২০১৫) প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- চউক নিয়ন্ত্রিত ১১৫২ বর্গ কিঃ মিঃ এলাকার কৌশলগত পরিকল্পনা, ভূমি ব্যবহার সংক্রান্ত নির্দেশনা, আঞ্চলিক গ্রোথ সেন্টারসমূহের উন্নয়ন সংক্রান্ত নির্দেশনা, জনসংখ্যা, অর্থনীতি, যাতায়াত, ভূমি উন্নয়ন, আবাসন ইত্যাদি ক্ষেত্রে সর্বমোট ৭৬টি কৌশলগত নির্দেশনা আরবান ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (১৯৯৫-২০০৫)। এর প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- শহরের ২৫৯ বর্গ কিঃ মিঃ এলাকার উন্নয়ন সংক্রান্ত নির্দেশনা, ভূমি ব্যবহার সংক্রান্ত অঞ্চল বিভাজন ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান (সরকারি অনুদানে) প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- গণমুখী পরিকল্পনা, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন এলাকার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ, উন্নয়ন ও পরিকল্পনায় এওঝ ডাটাবেইজ এর ব্যবহার, নির্দিষ্ট এলাকাসমূহের বিশদ পরিকল্পনা, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমন্ডিত স্থানসমূহ যেমন, পাহাড়, উন্মুক্ত স্থান, জলাশয় /জলাধার ইত্যাদি চিহ্নিতকরণ ও রক্ষণাবেক্ষণ, বিবিধ ভূমি ব্যবহার যেমন, আবাসিক/ বাণিজ্যিক/ শিল্পসহ সড়ক, ড্রেনেইজ, ইউটিলিটিজ ইত্যাদি বিষয়ে বিস্তারিত উন্নয়ন পরিকল্পনা।
চউক কর্তৃক গৃহীত/বাস্তবায়িত/বাস্তবায়নাধীন খাত ভিত্তিক বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনার সার-সংক্ষেপ হচ্ছে- ক্রমবর্ধমান যানজট নিরসনের জন্য প্রাইমারি, সেকেন্ডারি, টারশিয়ারি রোড নির্মাণ যেমন সিডিএ এভিনিউ, চিটাগং আউটার রিং রোড, সদরঘাট-ফিরিঙ্গিবাজার রোড, নবাব সিরাজদ্দৌলা রোড ইত্যাদি।
চউক চট্টগ্রামের আবাসন সমস্যা নিরসনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে, ইতোমধ্যে ৭০০০ এর অধিক প্লট বিভিন্ন পেশা/শ্রেণির জনগণের মাঝে বরাদ্দ প্রদান করা হয়েছে। এ সকল আবাসিক এলাকায় উন্মুক্ত শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিক মানের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, যেমন এপোলো হসপিটাল, দিল্লী পাবলিক স্কুল ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানকে তাদের কার্যক্রম শুরু করার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এছাড়াও আবাসিক সমস্যা নিরসন এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারণের জন্য চউক ইতোমধ্যে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যেমন: বিশতলা বিশিষ্ট আবাসিক কাম বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ (কাজির দেউরী কাঁচা বাজার এলাকা), ইএগঊঅ ও ঈউঅ এর যৌথ উদ্যোগে গার্মেন্টস শ্রমিকদের জন্য ডরমেটরি নির্মাণ এবং স্বল্প আয়ের জনসাধারণের জন্য ২৫, ২২, ২০ তলা বিশিষ্ট তিনটি (প্রায় ১৯৬টি ফ্ল্যাট) আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য চউক ইতোমধ্যে বেশ কিছু বাণিজ্যিক শিল্প এলাকার উন্নয়ন সাধন করেছে। যেমন, পাঠানটুলী মার্কেট, কর্ণফুলী মার্কেট, নিউমার্কেট, ষোলশহর মার্কেট, কালুরঘাট শিল্প এলাকা, ফৌজদারহাট শিল্প এলাকা ইত্যাদি।
চট্টগ্রামের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে কাজে লাগিয়ে পর্যটন শিল্পের বিকাশ সাধনে চউক ইতোমধ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। যেমন- বাটার ফ্লাই পার্ক, নান্দনিক ডিসি হিল পার্ক, সি আর বি ল্যান্ডস্কেপ উন্নয়ন।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও জাতিসংঘের গউএ বাস্তবায়নকল্পে চউক গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারকে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী চউক নিজস্ব অর্থায়নের পাশাপাশি সরকারি অর্থায়ন, চচচ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (যেমন-জাইকা) ইত্যাদির মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।
বি ক্যাঃ বন্দরনগরী চট্টগ্রামের উন্নয়নমূলক কাজ কেমন চলছে?
আবদুচ ছালামঃ বন্দরনগরী চট্টগ্রাম উন্নয়নের মহাসড়কে রয়েছে। গত সাত বছর ধরে চট্টগ্রামে আশাতীত উন্নয়ন হয়েছে। এত উন্নয়ন চট্টগ্রামের মানুষ আগে কখনো দেখেনি। মানুষ এই উন্নয়নের কথা চিরদিন মনে রাখবে। নগরজুড়ে উন্নয়নের মহাযজ্ঞ চলেছে। কেবলমাত্র মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছা এবং চট্টগ্রামের প্রতি আন্তরিকতার ফলে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ সম্ভব হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী অনুধাবন এবং বিশ্বাস করেন যে, চট্টগ্রামের উন্নয়ন মানেই দেশের উন্নয়ন। চট্টগ্রামের উন্নয়ন নিয়ে যতগুলো প্রকল্প নিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়েছি তিনি কোনোদিন কোনো প্রকল্পের ব্যাপারে না করেননি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কেবল অনুমোদন দিয়েই ক্ষ্যান্ত হননি, তিনি প্রয়োজনীয় অর্থেরও যোগান দিয়েছেন। অর্থের অভাবে কোনো কাজ বন্ধ রয়েছে এমন কোনো নজির নেই। এই ধারা যদি আগামী পাঁচ বছর অব্যাহত রাখা যায় তাহলে চট্টগ্রামের চেহারা একেবারই পাল্টে যাবে। চট্টগ্রামের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আন্তরিকতা এতদঞ্চলের উন্নয়নকে বহুমাত্রিক গতি দিয়েছে। আমি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি নগরবাসীর পক্ষ থেকে নিজের কৃতজ্ঞতা জানাই।
বি ক্যাঃ আপনি দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কার বা কাদের সহযোগিতা বেশি পেয়েছেন?
আবদুচ ছালামঃ চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতার জন্য আমি নগরবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞ। চট্টগ্রামের ৬৫ লাখ মানুষ দলমত নির্বিশেষে আমাকে অকাতরে সহায়তা করেছেন। তাদের সহায়তা পেয়েছি বলেই এতগুলো প্রকল্প এভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়েছে। এমন অনেক কাজ করেছি যা এক কথায় দুঃসাধ্য ছিল। যেমন চট্টগ্রাম কলেজ রোড সম্প্রসারণ, পাহাড়তলী বাজারের উপর দিয়ে যাওয়া রোড সম্প্রসারণ, পাঠানটুলি রোড সম্প্রসারণসহ বিভিন্ন এলাকার রাস্তা নির্মাণ করতে গিয়ে মানুষ নিজের বসতঘর ছেড়ে দিয়েছে। দোকান ছেড়ে দিয়েছে, অফিস ছেড়ে দিয়েছে। মানুষের এই ঋণ কোনোদিন শোধ হবার নয়। চট্টগ্রামের উন্নয়নে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন, পুলিশ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, গণপূর্ত বিভাগ, বন্দর, রেলওয়ে, টিএন্ডটি, পিডিবি, ওয়াসাসহ এমন কোনো সংস্থা নেই যারা আমাকে সহায়তা করেনি। বিভিন্ন সংস্থা যেভাবে সহায়তা করেছে তার তুলনা হয় না। এদের সকলের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
চট্টগ্রামবাসী গত সাত বছর ধরে তাদের সহায়তা যেভাবে অব্যাহত রেখেছেন তা ভবিষ্যতেও অব্যাহত রাখলে চট্টগ্রামকে আক্ষরিক অর্থেই বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে দেখা সম্ভব হবে। এই ধারা অব্যাহত রাখলে চট্টগ্রামের উন্নয়ন নিয়ে আর খুব বেশি ভাবতে হবে না। রাস্তাঘাট হয়ে গেছে। এখন ফ্লাইওভার নির্মাণের কাজ চলছে। ফ্লাইওভারগুলো নির্মিত হলে যোগাযোগের ক্ষেত্রে চট্টগ্রামে বিপ্লব ঘটবে। এখন চট্টগ্রাম টানেলের যুগে প্রবেশ করার অপেক্ষা করছে। চট্টগ্রামে রেডিসন ব্লু হোটেল হয়েছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলেও অচিরেই চট্টগ্রাম একটি বিশ্বমানের নগরীতে পরিণত হবে।
চট্টগ্রামের উন্নয়ন এগিয়ে চলেছে। গত ৭ বছরে চট্টগ্রামে যে পরিমাণ উন্নয়ন সাধন হয়েছে চট্টগ্রামের ইতিহাসে গত ৪৫ বছরেও এত পরিমাণ উন্নয়ন হয়নি। চট্টগ্রামের প্রতি বিগত দিনের সরকার প্রধানরা বরাবরই বিমাতা সূলভ আচরণ করেছে। চট্টগ্রামের মাস্টার প্ল্যান উন্নয়নের নামে তারা টাকার পাহাড় গড়েছে। কিন্তু চট্টগ্রামকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে মাত্র। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামের উন্নয়নে সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছেন। এখানে উন্নয়নের বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। এই সরকারের অধীনে চট্টগ্রামে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকবে। প্রযুক্তির এই যুগে নতুন নতুন উন্নয়নমূলক প্রকল্প আসছে।
বি ক্যাঃ সিডিএ’র মাধ্যমে যে কাজ করতে পারছেন তাতে কী আপনি সন্তুষ্ট?
আবদুচ ছালামঃ অবশ্যই সন্তুষ্ট। আগে সিডিএ তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান বলে পরিচিত ছিল। এখানে কর্মরত সামরিক ও বেসামরিক আমলাদের নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। ২০০৯ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে চট্টগ্রামের উন্নয়নের দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর চেয়ারম্যান হিসেবে আমাকে দায়িত্ব দেন। প্রধানমন্ত্রীর হাত ধরেই উন্নয়নকাজ শুরু করেছিলাম। তাই তাঁর হাত দিয়েই অনেক প্রকল্পের উদ্বোধন করা হয়েছে।
বি ক্যাঃ নবীন ও তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে আপনার পরামর্শ কী?
আবদুচ ছালামঃ তারা বাবা-মা ও শিক্ষকের আদেশ মানবে। প্রতিটি মানুষ সব কিছু শিখে তার পরিবার থেকে। আমিও আমার পরিবার থেকে শিখেছি সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে কিভাবে কাজ করতে হয়। সততা, ইচ্ছা, অভ্যাস, আন্তরিকতা সর্বোপরি আল্লাহর ওপর বিশ্বাস থাকলে সমাজের জন্য অনেক কিছু করা যায়।
জীবনে বড় হওয়ার জন্য স্বপ্ন দেখতে হবে, ব্যর্থতা নয়, পরিশ্রমের মাধ্যমে সফলতা অর্জন করতে হবে। আমার জীবনের গল্পটা শুরু হয়েছিল শূন্য দিয়ে কঠিন পরিশ্রম আর নিরলস প্রচেষ্টায় আজ আমি এই অবস্থানে। আমার বিশ্বাস, মা-বাবা, শিক্ষকসহ গুরুজনদের দোয়া নিয়ে একনিষ্ঠ চেষ্টা করলে ব্যর্থতা বলে কোনো শব্দ তোমাদের স্পর্শ করতে পারবে না। আমি বিশ্বাস করি যে, বর্তমান প্রজন্মের মেধাবীরা এগিয়ে আসলে দেশ ও জাতি উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হয়ে বিশ্বের উন্নত দেশসমূহের ন্যায় একটি উন্নত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠবে। শুধু উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না, মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ হয়ে সমাজ ও দেশের সেবায় এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের প্রত্যেককে সাধারণ অথচ উন্নতমানের মানুষ হতে হবে। ন্যায়বোধে দৃঢ় থেকে দৃঢ়তর হতে হবে। একটি লক্ষ্য নিয়ে দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে থাক, ফল পাবে।
বি ক্যাঃ আপনার ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা জানতে চাই?
আবদুচ ছালামঃ দেখুন, আমার যতটুকু অর্জন তা শুধুই পরিশ্রম ও সাধনার ফসল। মায়ের দোয়া ছিলো বলেই আমি আজকের আবদুচ ছালাম। ধন-সম্পদ অনেকের হয়। কিন্তু অঢেল সম্পদ যাদের আছে তাদের ক’জনইবা মানুষের কাছাকাছি আসতে পারে? রবিঠাকুরের কবিতায় আছে- ‘হাত বাড়িয়ে ছুঁই না তোমায়, মন বাড়িয়ে ছুঁই’। আমি আমার শরীর ও মন দুটো দিয়েই মানুষকে ছুঁতে চেষ্টা করেছি, করছি এবং করবো। আমি সবসময় মানুষের কাছাকাছি আপন হিসেবে থাকার চেষ্টা করেছি। সজ্ঞানে কাউকে কখনোই ঠকাইনি, কারো সাথে প্রবঞ্চনার আশ্রয় নেইনি। যতদিন বেঁচে থাকব, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে চট্টগ্রামবাসীর উন্নয়নে আজীবন কাজ করে যেতে চাই। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানো আর বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজ করতে পারাই আমার পরম আনন্দের বিষয়।
আমি নিজে সোনার চামচ মুখে দিয়ে না জন্মালেও চট্টগ্রামের মানুষ যাতে একদিন সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারেন -আর্থিকভাবে সেই স্বাবলম্বিতার স্বপ্নই দেখছি আমি। আমার স্বপ্ন হচ্ছে- একদিন এই চট্টগ্রাম কুয়ালালামপুর হবে। বিশ্বের আধুনিকতম শহর হবে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ