বিশেষ খবর

শিক্ষার একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক, উদারপ্রাণ সমাজসেবী আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ)

ক্যাম্পাস ডেস্ক প্রিয় মানুষের মুখোমুখি
img

সাধারণ থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠার গল্প এটি। আরও আছে কথার ফাঁকে ফাঁকে স্বপ্ন পূরণের হাতছানি, কখনওবা টিকে থাকার লড়াই। জীবনের এমন নানা দোলাচলের মাঝে স্বপ্নকে ছুয়ে দেখার তীব্র চাওয়াটাই হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর এগিয়ে যাওয়ার শক্তিরূপে। এনে দিয়েছে তাঁকে দেশজোড়া খ্যাতি; ছাড়িয়ে গেছেন দেশের সীমানা।

তিনি দেশকে নিয়ে ভাবেন; বলেন- দেশের জন্য, দেশবাসীর জন্য আমাদের কিছু করার আছে। দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ যখন আমাদের সবার মধ্যে জাগ্রত হবে, সেদিন থেকে আমরা আর দেশের কাজে পিছিয়ে যাব না -এটি তাঁর বিশ্বাস। এ দেশের ছাত্র-যুবকদের সম্ভাবনা সম্পর্কে তিনি খুব আশাবাদী। আর তাইতো দেশের প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের নিয়ে চালু করেছেন গরিব-মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান কর্মসূচি; তারই আওতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৭শ’ গরিব-মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের বৃত্তি প্রদানে রেখেছেন অগ্রণী ভূমিকা।

তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন ঢাকায়, পৈত্রিক নিবাস বৃহত্তর নোয়াখালীর ফেনীতে। পিতা শাহ আলম চৌধুরী, ঢাকা আহছানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে পাস করেছেন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং; স্বাধীনতার পর পুরোপুরি ব্যবসায়ী বনে যান। মা জাহানারা বেগম, ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স। ৩ ভাই ১ বোন তারা। দু’ভাই ইঞ্জিনিয়ার, ব্যবসা করেন। বোন আমেরিকায় থাকে, আইটি প্রফেশনালিস্ট; বোনের স্বামী ডাক্তার।

তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন। এমবিএ করেছেন আমেরিকা থেকে। স্ত্রী শবনম শেহনাজ চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স। দু’ছেলে ১ মেয়ের গর্বিত পিতা। তার বড় ছেলে আদীব ইন্ডিয়া থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছে। ছোট ছেলে রাঈদ আমেরিকা থেকে গ্র্যাজুয়েশন করেছে। মানুষ হিসেবে, ব্যবসায়ী হিসেবে তিনি সাকসেসফুল। সমাজ, সংসার, স্ত্রী-সন্তানকে উপেক্ষা করে কখনও কিছু করেননি। যেখানে যার প্রতি যা দায়িত্ব, তা ঠিকভাবে পালন করে চলেছেন। সবসময় সবকিছু সময়মতো করেন। বলা যায়, ১০০% সময় মেনে চলা মানুষ তিনি। ব্যবসায়িক ব্যস্ততায় ছুটে চলেন এদেশ-ওদেশ; অথচ খাবারের পরিপূর্ণ স্বাদটা পান দেশীয় খাবারেই। মুখরোচক ফাস্টফুড বা চায়নিজের চেয়ে দেশীয় ভর্তা-ভাতই তার প্রিয়। এতক্ষণ ধরে যাঁর নামটা জানার কৌতুহল হচ্ছে তিনি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ; বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি, ইভেন্স গ্রুপ এর চেয়ারম্যান। তাঁর সাথে একান্ত আলাপচারিতায় মিলিত হন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার প্রতিনিধি, যার উল্লেখযোগ্য অংশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস’র কন্ট্রিবিউটর মোহাম্মদ মোস্তফার অনুলিখনে সন্নিবেশিত হলো।

সোনাঝরা শৈশবের স্মৃতিকথা সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রতিভাবান শিল্পব্যক্তিত্ব আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন- শৈশবে স্কুলে পড়াকালীন সময়ে শিক্ষকগণ যেমন কড়া শাসন করতেন, তেমনি ছাত্রদেরকে সন্তানের মতো স্নেহও করতেন। আমি স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দেবার জন্য বাসা থেকে রওয়ানা হলে পথিমধ্যে ড্রেনে পড়ে যাই। তাই আমার পক্ষে পরীক্ষায় বসা আর সম্ভব হয়নি। ফলে স্কুলে ভর্তি হওয়া অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। আমার নানা ছিলেন টিচার্স ট্রেনিং কলেজের ভাইস-প্রিন্সিপাল। তিনি আমাকে নিয়ে গেলেন গভঃ ল্যাবরেটরি স্কুলে; তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন স্বনামধন্য শিক্ষাবিদ খান মহম্মদ সালেক। সালেক স্যারকে নানা অনুরোধ করলেন আমাকে ভর্তি নেবার জন্যে। সালেক স্যার আমাকে সরাসরি ২য় শ্রেণিতে ভর্তি করে নিলেন।

আমি পড়ালেখায় অমনোযোগী ছিলাম, কিন্তু আমার স্মৃতিশক্তি খুব প্রখর ছিল। ধৈর্য্য ধরে একটানা বেশিক্ষণ পড়ালেখা করতে পারতাম না। আমার ঝোঁক ছিল খেলাধুলার দিকে, আড্ডার দিকে। আর ছিল বিদেশ যাওয়ার ঝোঁক। যাকে পেতাম তাকেই হাত দেখাতাম- বিদেশ যেতে পারব কিনা, ক’বার যেতে পারব, একবার না দশবার -এই কেবল জানতে চাইতাম।

আমার মামা আর আমি একই ক্লাসে পড়তাম। মামা ছিলেন খুব সিরিয়াস স্টুডেন্ট। আমাদের লেখাপড়ার অগ্রগতি দেখতেন নানা, মাঝে মাঝে পড়া জিজ্ঞেস করতেন। নানা আমাদেরকে ইংরেজীতে রচনা লিখতেও দিতেন। আমি তখন জাফর নানা (নানার চাচাত ভাই) এর কাছে যেতাম রচনা লেখার ব্যাপারে তালিম নিতে, সেই নানাও আমাকে ভালোবাসতেন। তিনি যতœ-সহকারেই আমাকে সাহায্য করতেন। ফলে আমার রচনা সবসময়ই ভালো হতো। কিন্তু বিষয়টি মামাকে কখনও জানাতাম না। সকালবেলা নানা আমাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে দিতেন ফজরের নামাজ পড়ার জন্য। নামাজ পড়ে আবার শুয়ে পড়তাম। নানা আবার আমাদের উঠিয়ে দিতেন পড়ালেখা করার জন্য। ছোটবেলায় বড্ড দুরন্ত ছিলাম। পড়া ফাঁকি দেবার বাহানা খুঁজতাম কেবল। বলাকা হলে সিনেমা দেখার ঝোঁক ছিল।

ম্যাট্্িরকের পর ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম। স্কুলের মতো এখানে কড়াকড়ি নেই, বিধিনিষেধ নেই। দেখতাম এখানকার ছেলেরা ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে ছাত্রদের সাথে খোশমেজাজে মেলামেশা করছে, কেউ কেউ ছাত্র-রাজনীতিতেও জড়িয়ে পড়ছে। পারভেজ চৌধুরী বলেন- ইন্টারমিডিয়েটে আমি সায়েন্সের ছাত্র ছিলাম, আমার মেডিক্যালে পড়ার খুব ইচ্ছা ছিল। কিন্তু ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পেলাম না। বাবার শখ ছিল আমি এমবিএ পড়ব। শেষপর্যন্ত বাবার ইচ্ছাই জয়ী হলো; আমি ম্যানেজমেন্টে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট বিষয় নিয়ে ভর্তি হলাম। আমার দুলাভাই ড. শহীদ উদ্দিন আহমেদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবার বিষয়ে সাহায্য করলেন। আমরা ছিলাম প্রথম সেমিস্টার ব্যাচ। আমার সায়েন্স ব্যাকগ্রাউন্ড থাকায় অংকে ভালো ছিলাম, তাই ম্যানেজমেন্টেও আমার রেজাল্ট ভালো হতে লাগলো; পড়াশোনায় মনোযোগী হতে শুরু করলাম; দুরন্তপনাটাও এসময় অনেক কমে গেল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার জীবন ছিল আনন্দময়, বন্ধু-বান্ধব নিয়ে বেশ আড্ডা জমাতাম। বন্ধুদের প্রাধান্য আমার কাছে সবসময়ই ছিল। কার কী সমস্যা, কীভাবে হেল্প করা যায় সে চেষ্টা করতাম। বন্ধু-বান্ধবদের মাঝে আমি প্রবলেম সলভার হিসেবে খ্যাত ছিলাম। সম্পর্কের প্রাধান্য আমার কাছে এমনই ছিল যে- একবার ফাইনাল পরীক্ষায় পাবলিক এডমিন সাবজেক্টের পরীক্ষা দিচ্ছি, ঘন্টাখানেক পরে হঠাৎ আশপাশের ক্লাস ফ্রেন্ডরা বলে উঠল- প্রশ্ন কঠিন, পারছি না; আমরা উঠছি, তুইও চলে আয়। আমার কিন্তু প্রিপারেশন ভালোই ছিল, তবু বন্ধুদের ডাকে আমিও উঠে গেলাম। ক্লাস টেস্টের রেজাল্ট ভালো ছিল এবং সেমিস্টার সিস্টেম হওয়ায় সে পরীক্ষায় পাশ করে গেলাম ঠিকই, কিন্তু ফার্স্ট ক্লাস ছুটে গেল। এ নিয়ে আক্ষেপ কখনও ছিল না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শেষে উচ্চশিক্ষা নিতে পাড়ি জমাই আমেরিকায়। সেখানে এমবিএ করার পাশাপাশি আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত হতে থাকে আমার ভেতর। আমেরিকায় ছাত্ররা দেখতাম নিজের খরচ নিজেই চালায়। তাদেরকে দেখে আমার ভেতরেও এ বোধ আসতে থাকে- নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে, এছাড়া অগ্রসর হওয়া যাবে না। নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা, পরিমিতি-জ্ঞান, যৌক্তিক আচরণ সম্পর্কে বাবার কাছ থেকেই জেনেছি। আমেরিকা থাকাকালীন এ বোধ আরও পাকাপোক্ত হলো। শিখলাম দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ সম্পর্কে। বুঝলাম- আমাদের শ্রদ্ধাবোধ থাকতে হবে, কারণ আমি নিজের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করতে পারলেই কেবল অন্যকে সম্মান করতে পারব।

গার্মেন্টস ব্যবসার শুরুটা কীভাবে হলো জানতে চাইলে দক্ষ ব্যবসায়ী জনাব পারভেজ বলেন- আমেরিকায় পড়ালেখা শেষ করে দেশে ফিরে আসি। চিন্তা করতে থাকি এবার কী করব। নানা আমার মাথায় ব্যবসার বিষয়টি ঢুকিয়ে দিলেন। নানা বলতেন- এমন একটা শিল্পের কথা চিন্তা করো যাতে সমাজ ও মানুষের কল্যাণ হয়, দেশ উপকৃত হয়। তখন বাংলাদেশে গার্মেন্টস শিল্পের শুরুর সময়; মাঠে তেমন প্রতিদ্বন্দ্বী নেই। ভাবলাম- আমেরিকায় পড়ালেখার অভিজ্ঞতা আছে, কাজেই গার্মেন্টস বা অনুরূপ শিল্প পরিচালনায় আমার অসুবিধা হবে না। গার্মেন্টস শিল্পের ওপর স্টাডি শুরু করলাম, এর ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করলাম এবং এ শিল্পে জড়িত হবার মনস্থির করলাম। একটি বিস্তারিত প্রজেক্ট প্রপোজাল তৈরি করে বাবার হাতে দিয়ে বললাম, আমি গার্মেন্টস শিল্প প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এজন্য ব্যাংক লোন নেয়ার কথাও বাবাকে জানালাম। বাবা আমার সিদ্ধান্তের কথা জেনে খুশি হলেন। কিন্তু ব্যাংক লোনের পরিবর্তে তিনি তাঁর জমানো টাকা পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করতে বললেন। আমি বললাম- না, আমি সেভাবে নেব না; আমি আপনাকে দু’ বছরের মধ্যে টাকা ফেরৎ দেব; আশা করি, আমি আপনার টাকাটা এ সময়ের মধ্যেই ফেরত দিতে পারব।

এরপর আমি প্রথমেই জাকারিয়া ভূঁইয়ার সাথে দেখা করলাম। এ শিল্পে তার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে। তার কাছে গার্মেন্টস এর আধুনিক যন্ত্রপাতি ছিল। এছাড়া আছেন নুরুল কাদের খান, গার্মেন্টস শিল্পে তিনি ছিলেন একটি ইনস্টিটিউশন। সেই সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে জয়েন্ট ভেঞ্চারে স্টাফদের ট্রেনিং দিয়ে তিনি কারখানা পরিচালনা করছিলেন। জাকারিয়া এবং নুরুল কাদের খান সাহেব আমাকে ভরসা দিয়ে বলেছিলেন- সাহস এবং আত্মবিশ্বাস থাকলে এ শিল্পে ভালো করতে পারবেন, এখানে বড় পুঁজির প্রয়োজন নেই। গার্মেন্টস শিল্পের প্রাণপুরুষ নুরুল কাদের খান এবং জাকারিয়া ভূঁইয়া- এ দু’মহৎপ্রাণ ব্যক্তির কাছে জাতি ঋণী থাকবে। আজকে আমরা যত সহজে ব্যবসা করছি, তা তাদের অবদানের ফলেই সম্ভব হচ্ছে; তাদের তৈরি পথেই আমরা খুব সহজে পদচারণা করছি।

আমাদের শিল্পক্ষেত্রে বিশেষ করে পোশাক শিল্পে মাঝে মাঝে অসন্তোষ দেখা দেয়; যা কখনও কখনও মারাত্মক রূপ ধারণ করে। শ্রমিক-অসন্তোষ যাতে দানা বাঁধতে না পারে সেজন্য কী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে -এমন প্রশ্নের জবাবে শিল্পজগতের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন, পোশাক শিল্পে বর্তমানে শান্ত অবস্থা বিরাজ করছে। এ শিল্পের সাথে জড়িত উদ্যোক্তারা আন্তরিক, দায়িত্বশীল; শ্রমিকদের কল্যাণে তাদের চিন্তা-ভাবনা আছে। শিল্পে শান্তিপূর্ণ অবস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রে তারা অত্যন্ত সচেতন। কোনো সমস্যা দেখা দিলে তারা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে আগ্রহী। সমস্যা জটিলতার দিকে যাক, এটি তারা কিছুতেই চান না। তবে মাঝে মাঝে সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চায়। মিড-ম্যানেজমেন্টের লোকেরা এ সমস্যা সৃষ্টি করেন। তারা পোশাক প্রসেসিং, রপ্তানি, বাজারজাতকরণের সাথে জড়িত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও পর্যাপ্ত শিক্ষার অভাবে শ্রমিকদের সাথে যথাযথ ব্যবহার করতে অনেকক্ষেত্রেই অপারগ হন। তারা ভুলে যান শ্রমিকরাও এ যুগের মানুষ, আত্মমর্যাদাবোধ তাদের প্রখর, তারা মানবিক আচরণ কামনা করে। শ্রমিক, কর্মকর্তা, কর্মচারী, মালিক সবারই মনে রাখতে হবে শিল্পে শান্তি বিরাজ করলে উৎপাদন বাড়বে, মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আসবে, দেশের রিজার্ভ বৃদ্ধি পাবে দ্রুতগতিতে। আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী আরও বলেন, এখন অনাকাঙ্খিত ঘটনা অনেক হ্রাস পেয়েছে। আশা করা যায় ভবিষ্যতে এসব থাকবেই না; শিল্পে স্থায়ী শান্তি বিরাজ করবে। দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান মাধ্যম গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি; এটিকে রক্ষা করা, এর বিকাশ ঘটানো প্রয়োজন। এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে দেশপ্রেমী, সমাজসচেতন মানুষদেরও এগিয়ে আসতে হবে। পোশাক শিল্পকে ধ্বংস করার জন্য দেশি-বিদেশি চক্রান্ত দীর্ঘদিন থেকে সক্রিয় রয়েছে। পোশাক শিল্পে মাঝে মাঝে যে হামলা হয়, সেখানে যারা অংশ নেয় তারা ঐ কারখানার শ্রমিক নয়, বাইরের ভাড়াটিয়া মাস্তান।

তিনি বলেন, পোশাক শিল্পে অনেকগুলো দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব ব্যাপারে আমরা যদি এখনও যথেষ্ট সতর্ক না হই, তাহলে ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে, শিল্পে শান্তি বিঘিœত হবে। জনাব পারভেজ বলেন, সব প্রতিকূল অবস্থাকে কাটিয়ে উঠে পোশাক শিল্পকে এগিয়ে নিতে হবে। এ শিল্পে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত লোকের সমাবেশ ঘটাতে হবে। এজন্য দেশে আরও টেক্সটাইল কলেজ ও টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শিক্ষিত, প্রাণোদিত লোকজন শিল্পের প্রাণ; এরা শিল্পের আধুনিকায়নে ভূমিকা রাখতে পারেন, শিল্পকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেন।

পোশাক শিল্পের বিকাশ এবং নির্বিঘ্ন অগ্রগতি সম্পর্কে বিশিষ্ট শিল্পপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী (পারভেজ) বলেন- ব্যক্তিমালিকানায় গড়ে উঠা শিল্প মালিকদের অনেক কিছু যেমনি সামাল দেয়া সম্ভব হয় না; তেমনি গুটিকয়েক শিল্প মালিকের খামখেয়ালিপনার কারণে দুর্বল ভিত্তির ওপর বহুতল কারখানা ভবন নির্মাণ, অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থার অপ্রতুলতা, দুর্ঘটনার সময় অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসার পর্যাপ্ত ব্যবস্থার অভাব, ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তাদানের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্বতার কারণে এ শিল্প আজ প্রশ্নের সম্মুখীন। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে শিল্প মালিকদের যেমনি আন্তরিক হতে হবে, তেমনি সরকারকেও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে। পোশাক শিল্পে সফল দেশ চীন আমেরিকায় তার বিনিয়োগকৃত মূলধন অন্যখাতে বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। ভিয়েতনাম সুযোগ গ্রহণ করেছে ঠিকই, তবে বেনিফিশিয়ারি হওয়ার সম্ভাবনা বাংলাদেশেরই বেশি। বাংলাদেশ যদি সঠিক নীতি নির্ধারণ করতে পারে, পোশাক শিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে এর বিকাশে প্রতিবন্ধকতাসমূহ দূর করতে পারে -তাহলে আমাদের চিন্তিত হবার কোনো কারণ নেই।

রানা প্লাজার দুর্ঘটনার পর আমাদের গার্মেন্টস শিল্পে কী কী ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে বলে মনে করেন- এ প্রশ্নে সৃজনশীল শিল্পোদ্যোক্তা আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, রানা প্লাজার দুর্ঘটনা আমাদের উদ্যোক্তাদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করেছে, কিন্তু কাউকে উদ্বিগ্ন হতে দেখিনি। এটি বাঙালির চিরন্তন ভাবনা চিন্তার বহিঃপ্রকাশ। বাঙালিরা প্রতিবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের মোকাবেলা করে, ঘরের চালে আশ্রয় নিয়ে হাসিমুখে পরিস্থিতি মেনে নেয়, আবার বন্যার পানি নেমে গেলে হাসতে হাসতে চাল থেকে নেমে আসে। আরো শক্তভাবে ঘরবাড়ি তৈরি করে ভবিষ্যতে আরো বড় দুর্যোগের জন্য অপেক্ষা করে; কিন্তু তার কর্মযজ্ঞ থামে না। বাঙালি পজিটিভ চিন্তা-চেতনার ধারক বাহক। তারা সব বাধা-বিপত্তি ডিঙিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। গার্মেন্টস শিল্পের প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করেও তারা এ শিল্পকে বিশ্বায়ন প্রতিযোগিতায় আরও উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ পৃথিবীর বুকে একমাত্র দেশ হবে, যে তার গার্মেন্টস শিল্পকে সার্বিকভাবে সিকিউরড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।

দেশের অধিকাংশ গার্মেন্টস শিল্পের বিভিন্ন সেক্টরে বিদেশিরা কর্মরত; এতে দেশের অর্থ বিদেশে চলে যাচ্ছে। দেশের সিংহভাগ রপ্তানি আয় গার্মেন্টস থেকে এলেও এ সেক্টরে দক্ষ জনশক্তি গড়ে ওঠেনি। এর কারণ কী, এ সমস্যার সমাধানে আপনার পরামর্শ কী- এমন প্রশ্নে আশাবাদী শিল্পপ্রতিষ্ঠাতা আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, আমাদের শিল্পক্ষেত্রে পরিকল্পিত চিন্তা-ভাবনার অভাব রয়েছে। ভারতের মতো দেশে আগামী দশ, বিশ, ত্রিশ বছর পর কোন্ কোন্্ শিল্পের বিকাশ হবে, সম্ভাবনা রয়েছে- এমন বিবেচনা থেকেই শিল্পস্থাপন করা হয়। আমাদের দেশে এ পদ্ধতি এখনও দেখা যায় না। এলোমেলোভাবে চলছে। ফলে শিল্প-সম্ভাবনা সম্পর্কে আমরা নিশ্চিত হতে পারছি না। ভারতের মতো উন্নত দেশে পরিকল্পনা করা হয় কত বছর পর কী পরিমাণ আইটির লোক লাগবে, ডাক্তার লাগবে, ইঞ্জিনিয়ার লাগবে, কী পরিমাণ টেকনিক্যাল লাগবে, ফার্মাসিস্ট-কেমিস্ট কতজন লাগবে- এটা তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সরবরাহ করে; শিক্ষা মন্ত্রণালয় সে অনুসারে তাদের কারিকুলাম ঠিক করে, শিক্ষিত প্রশিক্ষিত জনসম্পদ গড়ে তোলে। ফলে তাদের উন্নয়ন কর্মকান্ড, কর্মসূচি বাস্তবায়নে দক্ষ জনবলের অভাব হয় না; বিদেশ থেকে জনশক্তি আমদানিও করতে হয় না। ভারতের দক্ষ প্রফেশনালরা জাপান, জার্মানী, ইতালী প্রভৃতি শিল্পোন্নত দেশে উচ্চপদে আসন করে নিতে পেরেছে। আমাদের দেশেও অনুরূপ পরিকল্পনা প্রয়োজন যে আগামী পনেরো, বিশ, ত্রিশ বছরে কোন্ কোন্ সেক্টরে কী কী ধরনের কত লোক প্রয়োজন হবে। সে অনুযায়ী শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলেছে, অথচ কারিগরি শিক্ষা এখনও আশানুরূপ স্থান দখল করতে পারেনি।

আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী আরও বলেন- আমাদের শুধু উন্নত মেশিনপত্র আনলেই চলবে না, এগুলো যারা পরিচালনা করবে সেই দক্ষ প্রকৌশলী তৈরি করতে হবে। যদি দেশ থেকে এর চাহিদা মেটানো না যায় সেক্ষেত্রে বাইরে থেকে আনতে হবে। বর্তমানে আমাদের এটাই করতে হচ্ছে। বিদেশি এক্সপার্টদের সাথে আমাদের দেশের লোকরা কাজ করছে, তারা এ সুযোগে দক্ষতা-অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে। চীন, আমেরিকা, ইউরোপের অন্যান্য দেশ আমাদের প্রতিভাবান শিক্ষক দিয়ে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় চালাচ্ছে, তারা আইটি সেক্টরে কাজ করছে। কাজেই বিদেশি হলেই বর্জন নয়, তাদের থেকে অর্জন করারও বিষয় আছে। We have to be competent enough to meet our demands. গ্লোবালাইজেশনের সুবাদে সবাই সবার জিনিস দেখতে পারছে, দ্রুত যোগাযোগ হচ্ছে। আমাদের প্রোডাক্টকে সবার কাছে গ্রহণীয় করে তুলতে হলে সেরকম কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন লোকের দরকার। দেশে সেই কারিগরি হাত গড়ে তুলতে শিক্ষা ক্ষেত্রে কারিগরি জ্ঞানের প্রসার ঘটাতে হবে। শিক্ষাধারায় আনতে হবে পরিবর্তন। ২ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হলে ৩শ’ টেকনিক্যাল হ্যান্ডের প্রয়োজন। এক্ষেত্রে আমাদের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন এন্ড টেকনোলজি যথেষ্ট নয়। We have to be more practical. প্রাইভেট সেক্টরের পক্ষে এ বিরাট দায়িত্ব পালন সম্ভব হবে না, সরকারকেই এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠায় কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছেন কী- এমন প্রশ্নে আত্মবিশ্বাসী উদ্যোক্তা আনোয়ার-উল-আলম পারভেজ বলেন, আসলে ব্যবসা করতে ঝুঁকির সম্ভাবনা থাকে। এটি মোকাবেলা করেই এগুতে হবে। স্বাধীনতার আগে শিক্ষিত লোকেরা ব্যবসায় আসতে চাইত না। স্বাধীনতার পর শিক্ষিত লোকেরা ব্যবসা নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। ব্যবসার শুরুতে আমিও বিভিন্ন সমস্যার মোকাবেলা করেছি। গ্যাসের সমস্যা, বিদ্যুতের সমস্যা, পানির সমস্যা ছিল; নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবতে হয়েছে। বিদেশে মার্কেট খুঁজে পেতেও সমস্যা ছিল। তবে আমি এগুলোকে তেমন সমস্যা মনে করিনি। এজন্যই এগিয়ে যেতে পেরেছি। আমি সবসময় বলে আসছি যে, আমাদের এডুকেশনের একটা স্ট্যান্ডার্ড থাকা প্রয়োজন। এডুকেশনের সাথে চাকরি বা পেশার একটা যোগসূত্র থাকা উচিত। কারিগরি শিক্ষার সাথে মানবিক মূল্যবোধের সংযোগ থাকা প্রয়োজন। কর্মের ক্ষেত্রে জবাবদিহি থাকলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে, গড়ে উঠবে আলোকিত মানুষ।

আনোয়ার-উল-আলম আরও বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় গুণগত মান সৃষ্টি করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জানাতে হবে আগামী ১০, ২০, ৩০ বছর সময়ের মধ্যে কত এনার্জির প্রয়োজন হবে; কত ম্যানেজার লাগবে। বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে ইকোনোমিক জোন গড়ে তোলা হচ্ছে। এতে যথেষ্ট চমক আছে; কিন্তু সুদূরপ্রসারী ফলাফল কী, এর আল্টিমেট রিটার্ন কী -এগুলো ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে। শিল্পোদ্যোক্তাগণ কতটুকু উপকৃত হবেন এসব ইকোনোমিক জোনে সে সম্পর্কে নিশ্চিত ধারণা প্রয়োজন। আমাদের অর্থনৈতিক কর্মসূচিতে মাস্টার প্ল্যান এবং কোঅর্ডিনেটেড উদ্যোগের অনুপস্থিতি বা অভাব দেখেছি। আমাদের ১৬ কোটি মানুষের দেশে মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে ইন্ডাস্ট্রি গড়ে তোলা অপরিহার্য, তবে যত্রতত্র ইন্ডাস্ট্রি করে আবাদি জমি নষ্ট করা যাবে না- একটা নির্দিষ্ট জায়গায় শিল্পকে সীমিত রাখতে হবে। ইন্ডাস্ট্রি করতে গেলে মাস্টার প্ল্যানের অবশ্যই প্রয়োজন। কোন্ জেলায় কোন্ ইন্ডাস্ট্রি ভালোভাবে চলবে তা নির্ধারণ করা জরুরি। যেখানে যে ইন্ডাস্ট্রি হবে, সে সংক্রান্ত সব অফিস সেখানে পূর্ণাঙ্গভাবে চলবে। মন্ত্রণালয়ের টেক্সটাইল ডিভিশনের একটি ইউনিট শিল্পাঞ্চলে থাকবে। এতে মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট উভয়ের সুবিধা হবে। টেক্সটাইলের মতো কেমিক্যাল ও অন্যান্য শিল্পকে বন্দরের কাছাকাছি নিয়ে গেলে এতে শিল্পের সামগ্রিক উন্নতি হবে, প্রবৃদ্ধির হার বেড়ে যাবে। পায়রা বন্দরের কাছাকাছি এসব শিল্পকে নিয়ে যাওয়া যায়। এতে চট্টগ্রাম বন্দরের ওপর চাপ কমবে, অতি নির্ভরতা কমবে; অর্থ, শ্রম ও সময়ের সাশ্রয় হবে। এতে শিল্পোদ্যোক্তাগণ নিজ নিজ জেলায় শিল্পস্থাপন করতে পারবেন, এলাকার উন্নয়ন হবে, কর্মসংস্থান হবে। সবকিছু ঢাকা-চট্টগ্রামের দিকে ধাবিত হবে না। এভাবে দেশের প্রতিটি অঞ্চল সমান তালে উন্নত হবে, বৈষম্যের অভিযোগ থাকবে না। বিজিএমইএ’র কার্যক্রম পর্যালোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন এমন শীর্ষ ব্যক্তিত্ব আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন- বিজিএমইএ বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পকে অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এতদূর এগিয়ে এনেছে; বিদেশে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শক্ত ভিতের ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছে; বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নের জন্য রিজার্ভ তৈরি করেছে, যেখান থেকে গড়ে তোলা হবে সার্বভৌম সম্পদ তহবিল। উন্নয়নের জন্য বাইরের কাছে যখন তখন হাত পাততে হবে না। অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য এ তহবিল থেকে ঋণ গ্রহণ করা যাবে, যার লভ্যাংশ পাবে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রায় পুরো টাকাটাই দেশে থেকে যাবে।

বিজিএমইএ’র সভাপতি থাকাকালীন সময়ে সাফল্যের কথা উল্লেখ করে জনাব পারভেজ বলেন- আমি যখন বিজিএমই’র প্রেসিডেন্ট হই তখন সদস্যদের নিয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করি, আশাবাদ ব্যক্ত করি যে- ৫ মাসের মধ্যে এর বাস্তবায়ন করব। সব সদস্য আন্তরিকভাবে কাজ করার পর এর ৮০ ভাগ তখনই বাস্তবায়ন হয়। এ সময় শ্রমিক-কর্মচারী প্রতিনিধিদের মধ্যে যে প্রীতির বন্ধন সৃষ্টি হয় তা আজও অব্যাহত আছে। এর ফলে পোশাক শিল্পে ভালো প্রভাব পড়ে, অনাকাক্সিক্ষত কারণে শিল্পে অশান্তি সৃষ্টি হয় না, উৎপাদন ব্যাহত হয় না। আমাদের উৎপাদিত পণ্য বিদেশি প্রতিষ্ঠান সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠাতো, এতে তারা কমিশন সংগ্রহ করতো। বিজিএমইএ কমিটি গঠনের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর ব্যবস্থা নিজেরাই করতে শুরু করে। বৈদেশিক মুদ্রা দেশে থেকে যায়। আমি ২০০৭ সালে বিজিএমইএ’র প্রেসিডেন্ট হবার পর ঘোষণা দিয়েছিলাম যে, ২০০৮-৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশের গার্মেন্টস রপ্তানী ১২ বিলিয়ন ডলার এবং ২০১০-২০১২ সালের মধ্যে তা ২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে। আমার সেই ভবিষ্যৎবাণী সত্য প্রমাণিত হয়েছে। আমাদের দেখানো স্বপ্ন বাস্তবরূপ লাভ করেছে। আমার সময়ে সরকারের সাথে আলাপ করে ট্রেনিং ইনস্টিটিউট স্থাপন করেছি। এ ইনস্টিটিউট থেকে যারা পাস করে বেরুবে তাদের চাকরি সুনিশ্চিত। রাজশাহী, রংপুর টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটে আমরা আমাদের এ কোর্স চালুর ব্যবস্থা করেছি। আপনার সময় দেশে শিক্ষাঙ্গনের অবস্থা আর বর্তমান শিক্ষাঙ্গনের সাথে তুলনা করতে গিয়ে আপনি কী পার্থক্য অনুভব করেন? এমন প্রশ্নে সমাজ সচেতন ব্যক্তিত্ব আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, স্কুলেই দেখেছি যেসব শিক্ষক আমাদের পড়াতেন তারা পড়ানোর সাবজেক্ট সম্পর্কে সম্যক জানতেন, তারা জানতেন কীভাবে পড়াতে হয়। ছাত্রদেরকে যাচাই করার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তাদের; তারা চেহারা দেখেই বুঝে নিতে পারতেন কে পড়া তৈরি করেছে, কে করেনি। কোনো বিষয়ে দুর্বল ছাত্র থাকলে তাদের ক্লাসের বাইরে আলাদাভাবে পড়ানোর চেষ্টা করতেন। আমাদের বিচরণ শুধু পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ ছিল না, আমরা বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলায় মেতে থাকতাম। বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, ফুটবল টুর্নামেন্ট হতো। আমরা দলবদ্ধভাবে তাতে যোগ দিতাম। বাসায় বাবা-মা দেখতেন, কিন্তু স্কুলে আসার পর সব দায়িত্ব গিয়ে পড়তো শিক্ষকদের ওপর। তখন শিক্ষাজীবন ছিল সহজ-স্বাচ্ছন্দ্যময়। এখন দেখি আমার নাতনীকে ভর্তির জন্য প্রিপারেশন নিতে হচ্ছে। ভর্তির পর তার পিঠে চাপিয়ে দেয়া হবে একগাদা বই-খাতার বোঝা, যে বইয়ের ওজন তার নিজের শরীরের ওজনের চেয়েও বেশি।

তিনি বলেন- আমাদের সময় গভর্নমেন্ট স্কুলগুলো ছিল সেরা, মেধাবী ছাত্ররাই সেখানে ভর্তি হতো। স্কুলে আমরা বাংলা মাধ্যমে পড়েছি, কিন্তু কলেজে ভর্তি হবার পর আমরা ইংরেজিতে দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হই। আমরা বিভিন্ন সাবজেক্টের পরীক্ষা ইংরেজিতে দিয়েছি, আমাদের প্রিপারেশনও সেভাবে হয়েছে। আজকে বাংলা মাধ্যমের স্কুলগুলোর কি অবস্থা! স্ট্যান্ডার্ড কোথায় নেমেছে তা চিন্তা করতে ভয় হয়। ক্লাসে একশ’ ছাত্র আর মাত্র একজন শিক্ষক, কীভাবে সামলাবে! অন্যদিকে শিক্ষকতায় কারা আসছে, সেটি দেখুন; মেধাবী শিক্ষকরা আসছেন না। আমাদের সময় যারা শিক্ষকতায় আসতেন তারা ছিলেন অলথ্রো ফার্স্ট ক্লাস। সেকেন্ড ডিভিশিন, থার্ড ডিভিশন নেই। এখন থার্ড ডিভিশনের ছড়াছড়ি। শিক্ষকদের কি দোষ; তাদেরকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে, তারা তাদের ক্যাপাসিটি অনুযায়ী পড়াচ্ছেন। ফলশ্রুতিতে তাদের দ্বারা মেধার বিকাশ হচ্ছে না, মেধাবী শিক্ষার্থীও বেরিয়ে আসছে না। আমাদের সময়ে টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ক্লাসে শিক্ষকের পড়ানোর ধরন দেখা হতো, এর ওপর তার স্ট্যান্ডার্ড মার্কিং হতো। শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাইভেট পড়াবেন, কোচিং করাবেন এ মানসিকতা পোষণ করতেন না। শিক্ষক মনে করতেন তার দায়িত্ব হলো ক্লাসে ভালোভাবে শিক্ষার্থীদের পড়িয়ে দেয়া, না বুঝলে আবার বুঝিয়ে দেয়া। তিনি কেন বাইরে গিয়ে পড়াবেন- যেটি ক্লাসেই পড়ানো তার দায়িত্ব! বর্তমান সময়ে শিক্ষকের সেই দায়িত্ববোধের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। ছাত্র তার টিউশনি বা কোচিংয়ে না পড়লে শিক্ষক তার ওপর নাখোশ থাকেন, পরীক্ষায় কম নম্বর দেন!

মেধাবী শিক্ষার্থীরা কেন কর্মজীবনে শিক্ষকতায় আসছে না- এ প্রশ্ন তোলা হলে জবাবে গার্মেন্টস শিল্পের আইকন আনোয়ার-উল-আলম বলেন, আমরা মেধাবীদের এ অঙ্গনে জায়গা করে দিতে পারছি না। খান মোহাম্মদ সালেক স্যার গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি স্কুলের হেড মাস্টার ছিলেন; তার ৭/৮ সন্তান, সবাইকে উচ্চশিক্ষা দিয়েছেন, প্রাইভেট টিউশনি করেননি, কোচিং সেন্টার খোলেননি। এখনকার হেড মাস্টাররা যে বেতন পান তা দিয়ে সংসার চালানোই দায়, ছেলেমেয়েদের মানুষ করা দূরের কথা। আজকে প্রাইভেট স্কুল-কলেজের মালিকরা শিক্ষা-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের লক্ষ্য টাকা আয় করা, ছাত্র-ছাত্রীদের মানুষ করা নয়। বাণিজ্যিক ধ্যান-ধারণা শিক্ষায় ঢুকে গেলে শিক্ষা আর শিক্ষা থাকে না। পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের দিকে তাকালে দেখা যায় সেখানে শিক্ষকের বেতন সচিবের বেতনের কাছাকাছি। আমরা যদি বেশি সুযোগ-সুবিধা দিয়ে দক্ষ-অভিজ্ঞ-মেধাবী শিক্ষকদের শিক্ষা পেশায় আনতে পারি, তাহলে প্রজন্মকে ঠিক লাইনে পরিচালিত করতে পারব। কোচিং টিউশনির মারাত্মক ধারণা তাদের মাথায় রাখবে না, শিক্ষাপেশায় নিবেদিত থাকবে। ভারতে শিক্ষকদের জন্য রেশনিংয়ের ব্যবস্থা আছে, যাতে তারা কোনো না কোনোভাবে উপকৃত হয়। রাষ্ট্রের এ দায়িত্বের কথা শিক্ষকরা বিবেচনা করেন এবং দেশ ও সমাজের প্রতি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন।

গুণগত শিক্ষার উন্নয়নে শিক্ষা ব্যবস্থায় কী কী পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন- এ প্রশ্নে অভিজ্ঞ শিল্প ব্যক্তিত্ব আনোয়ার-উল-আলম বলেন, স্কুলের হারানো পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। স্কুলে গিয়ে দেখি খেলার মাঠ নেই। শিশুরা কীভাবে বেড়ে উঠবে! ক্লাসে শিক্ষক এমনভাবে পড়ান যাতে ছাত্ররা কোচিং সেন্টারে যেতে বাধ্য হয়। শিশুদের ওপর বইয়ের এতবেশি বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয়েছে যে, এসব বই পড়তে পড়তে তাদের সময় শেষ, তারা নতুন কিছু ভাববে তার অবকাশ নেই। আমরা আমাদের শিশুদের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্যে বিদ্যার্জন, স্বাস্থ্য সুরক্ষা, শিক্ষার নিশ্চয়তা আজও দিতে পারিনি। বর্তমান শিক্ষানীতি সম্পর্কে নিজ মতামত ব্যক্ত করতে গিয়ে দেশদরদি, সমাজহিতৈষী ব্যক্তিত্ব আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন- এখন প্রাইমারি লেভেলে বাচ্চাদের পড়ানো হয় পুলিশ কাকে বলে, তার ভূমিকা কী, রাস্তা কীভাবে পার হতে হয়, দুর্ঘটনা ঘটলে কী করতে হয় ইত্যাদি। কিন্তু সদা সত্য কথা বলিবে, লেখাপড়া করে যে গাড়িঘোড়া চড়ে সে, মাতা-পিতা-গুরুজনকে ভক্তি করিবে, বিপদে বন্ধুর পরিচয়- এ ধরনের নীতিবাক্যগুলো পড়ানো হয় না, শেখানো হয় না। ছোটবেলায় নীতিবাক্য শেখে না বলে এগুলো পরবর্তী জীবনে কাজে আসে না। যে ভালো জিনিসটি শৈশবে সে শেখে, তা চিরদিনের জন্য মনে গেঁথে যায়। কীভাবে জীবনে বড় হওয়া যায়, দেশ পরিচালনার জন্য নেতৃত্বগুণ অর্জন করা যায় -ছোটবেলায় এগুলো শেখানো প্রয়োজন।

শিল্পপতিদের অনেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলে সামাজিক দায়বদ্ধতা কিছুটা পূরণ করছেন, আপনার এ ব্যাপারে কোনো পরিকল্পনা আছে কী- এমন প্রশ্নে কল্যাণকর্মী শিল্পদ্যোক্তা জনাব পারভেজ বলেন, গাজীপুরে একখন্ড জমির উপর এভিয়েন্স মডেল স্কুল নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চালু করেছি; সমগ্র প্রতিষ্ঠানের জন্য মাস্টার প্ল্যান করা হয়েছে। আমার স্কুলে কারিগরি শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হচ্ছে। আমি চাই দেশের প্রতিটি শিশু শিক্ষিত হোক, কারিগরি জ্ঞান লাভ করুক। সে শিক্ষাই তারা শিখবে, যে শিক্ষা অর্জন করে তারা বেকারের খাতায় নাম লিখাবে না। আজ এসএসসি এইচএসসিতে এত জিপিএ-৫ পাচ্ছে, কিন্তু ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হচ্ছে। অভিভাবকগণের মনে প্রশ্ন জাগছে তাহলে তাদের ছেলেমেয়েরা জোড়াতালি দিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছে! বিষয়টি খুবই বেদনাদায়ক। ইন্টারমিডিয়েটে জিপিএ-৫ পেয়ে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না তখন সেটি সবাইকে হতবাক করে দেয়। মনে আসা স্বাভাবিক যে- আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো ত্রুটি আছে, যা চিহ্নিত করে বের করে দিতে হবে। রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততা সম্পর্কে জিজ্ঞাসার জবাবে আপাদমস্তক ব্যবসায়ী আনোয়ার-উল-আলম পারভেজ বলেন- আমি প্রকৃতই একজন ব্যবসায়ী, রাজনীতি সচেতন হলেও রাজনীতির সাথে যুক্ত নই; সঙ্গত কারণে কোনো রাজনৈতিক দলের সদস্য নই। আমি মনে করি, আমরা যদি আমাদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করি তাহলে দেশ পিছিয়ে থাকবে না। যারা ব্যবসা করেন তাদের রাজনীতি করা উচিত নয়। ব্যবসায়ী রাজনীতিতে আসলে তাকে কম্প্রোমাইজ করতে হবে, দুর্নীতিকে এড়িয়ে যাওয়া তার পক্ষে সম্ভব হবে না বলে আমি মনে করি। রাজনীতি ও ব্যবসা দু’টো চালাতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়। যারা ছোটবেলা থেকে নেতৃত্বগুণ অর্জন করে বড় হয়ে দেশ পরিচালনার স্বপ্ন দেখে, যোগ্যতা অর্জন করে তাদেরকেই রাজনীতিতে সার্বক্ষণিক সক্রিয় হতে হবে।

আপনি জীবনে অনেক সংগঠন করেছেন, এগুলোর মধ্যে কোন্ কোনটির সাথে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন? এমন প্রশ্নে সমাজসেবী ব্যবসায়ী ব্যক্তিত্ব আনোয়ার-উল-আলম বলেন, আমি সবসময় বিজিএমইএ নিয়েই চিন্তা করি; শয়নে, স্বপনে, জাগরণে। আমার সহকর্মীদের জন্য আমার একটা অনুভূতি রয়েছে, আমি সেই জায়গাটায় বিচরণ করি। আমি সবসময় একটি কথাই বলি- দেশটা আমাদের; আমি ও আমিত্বকে জাগিয়ে তুলতে হবে। এ দেশ, এ মাটি এবং এ দেশের মানুষ সব আমাদের। দেশের জন্য, দেশবাসীর জন্য আমাদের কিছু করার আছে- এ দায়িত্ববোধ যখন আমাদের মাঝে জাগ্রত হবে সেদিন থেকে দেশের কাজে আমরা আর পিছিয়ে থাকব না। আমাদের প্রশংসা করার মনোভাব গড়ে তুলতে হবে। আমি যদি আমার সন্তানের কৃতিত্বে, তার সাফল্যের প্রশংসা করি তা হলে আমার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন, পাড়াপ্রতিবেশীর সন্তানদের কেন সাফল্যের প্রশংসা করব না! মানুষ প্রশংসা পেলে উজ্জীবিত হয়, অনুপ্রাণিত হয়, আরও উদ্যোগী হয়ে ওঠে। আমি আমার সহকর্মীদের কথাটা সবসময় বলি। এ কাজটা আমি সবসময় করে যাব।

এদেশের ছাত্র যুবকদের সম্ভাবনা সম্পর্কে আপনি কতটুকু আশাবাদী? তাদের সমস্যা সমাধানে আপনার পরামর্শ কী -এমন প্রশ্নে ছাত্র-যুবকদের প্রেরণা ব্যক্তিত্ব আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, এদেশের ছাত্র-যুবকরা অত্যন্ত মেধাবী; তারা আইটি শিক্ষায় অনেকদূর এগিয়ে গেছে। তারা কিন্তু কোনো মহল থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা পাচ্ছে না। নিজেদের চেষ্টায় প্রযুক্তি শিক্ষায় তাদের অগ্রগতি বিস্ময়কর। তাদের একটি বিশেষ কোয়ালিটি হলো- তারা কোনো একটি বিষয়কে বুঝতে পারে এবং আস্থার সাথে এগিয়ে যেতে পারে। তাদের দুর্বল দিক হলো- তারা আত্মকেন্দ্রিক। এজন্য ওরা দায়ী নয়। আমরা বড়রা, অভিভাবকরা তাদেরকে যেভাবে গড়ে তুলেছি তাতে আত্মকেন্দ্রিক হওয়াই স্বাভাবিক। তাদেরকে খেলার মাঠের প্রশস্ত অঙ্গনে নিয়ে যেতে পারিনি তার মন প্রসারের জন্য, সুস্বাস্থ্যের জন্য। এমন শিক্ষকের কাছে তাকে নিতে পারিনি- যিনি তাকে যেমন শিখাবে, তেমনি আদর করবে, তেমনি শাসন করবে। তাদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ গড়ে উঠতে পারছে না সঠিকভাবে। তারা সঠিক নেতৃত্ব পাচ্ছে না, আদর্শবান মানুষের প্রভাবে আসতে পারছে না, তারা বিপথগামী হচ্ছে। এদেরকে সঠিকপথে, মানবিকতার পথে, কল্যাণের পথে ফিরিয়ে আনতে হলে আমাদের বড়দের ভূমিকা অগ্রগণ্য। বাঙালির গর্ব করার মতো অনেক বিষয় আছে। বাঙালির সংস্কৃতি বিশ্বসেরা। এখানে বৈশাখ আছে, আছে বসন্ত। বাংলাদেশের মাটি ও মানুষ এ দেশের গৌরব। মাটি, মানুষ ও সংস্কৃতির মতো বেসিক রিসোর্স থাকার পরও আমাদের সমস্যা কোথায়? যারা আমাদের স্বপ্ন দেখাবেন, যারা পলিসি তৈরি করবেন, যারা এডমিনিস্ট্রেটর, তারা নিজেদের কাজ নিজেরা করছেন না। দেশের তিনটা মূল্যবান রিসোর্স একত্র করে মানুষের জন্য সুযোগ তৈরি করার যে দায়িত্ব, তা তারা পালন করছে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রবৃত্তি বৃদ্ধিতে অসামান্য ভূমিকা রেখে চলেছেন তিনি। শিক্ষা ও সমাজ উন্নয়নে এরূপ চিন্তা ও কর্ম সম্পর্কে শিক্ষাব্রতী, সাফল্যকামী ব্যক্তিত্ব আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন- শিক্ষার্থীরা সবাই মেধাবী, কারণ কেবল মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীরাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে, পড়ালেখার সুযোগ পায়। কিন্তু তারা অনেক কষ্টে আছে, সমস্যার মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমাদের ব্যবসায়ী মহলে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে; শেষে সিদ্ধান্ত হলো এদের মধ্যে বৃত্তি চালুর ব্যবস্থা করা হলে সমস্যার অনেকটা সমাধান হবে। আমার প্রস্তাব ছিল মাসে ৩ হাজার টাকা করে ৪ বছর এ বৃত্তি দিতে হবে। অন্যরা আড়াই হাজার টাকা দিতে রাজি হলেন এবং ৭শ’ জনকে বৃত্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। তবে ছাত্রদের ওপর একটা শর্তও থাকবে যে- বৃত্তিপ্রাপ্তরা ফলাফল ভালো করবে, ভালো মানুষ হয়ে উঠবে। তবে আমি চাই বৃত্তিপ্রাপ্ত মেধাবীদের মধ্যে আত্মসম্মানবোধ গড়ে উঠুক। তারা যেন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, পরনির্ভরশীল না হয়। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধকালীন সময়ে গ্রামে গ্রামে গিয়ে সমাজ সচেতনতামূলক, জনকল্যাণমূলক কিছু স্লোগান জনগণের মধ্যে প্রচার করবে। তাদেরকে কিছু পকেট খরচও দেয়া হবে। এ উদ্যোগ সফল হলে আগামীতে এ কর্মসূচি আরও ব্যাপকভাবে পালন করার আশা রাখি। এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী কিন্তু অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার ক্ষতি হবে না; তারা অর্থের জন্য যেকোনো কিছুতে জড়িয়ে পড়বে না।

যুব সমাজের উদ্দেশ্যে আনোয়ার-উল-আলম বলেন, মানুষের মধ্যে দু’ধরনের বিষয় কাজ করে। একটি হলো- Rational, Irrational। মানুষ হিসেবে আমাদের যৌক্তিক আচার-আচরণে উদ্বুদ্ধ হতে হবে। মনে রাখতে হবে সততাই উৎকৃষ্ট পন্থা। জীবনে সাফল্য অর্জনের জন্য ৪টি বিষয়ের প্রতি নজর দিতে হবে। এগুলো হলো- কমিটমেন্ট, গঠনমূলক সমালোচনা, আত্মসম্মান এবং দায়িত্ববোধ। শিক্ষাই শক্তি। এ শিক্ষা মানুষকে মানবসম্পদে পরিণত করে। তাই আমাদের অনবরত শিখে যেতে হবে।

আমাদের রয়েছে বিপুল জনসংখ্যা। যথাযথ শিক্ষার মাধ্যমে এ জনসংখ্যাকে সহজেই জনশক্তিতে পরিণত করা সম্ভব। কোনো কাজ শুরু করার আগে সে কাজের ভিশন, মিশন ও অবজেকটিভ ঠিক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জানা থাকতে হবে কোন্ পরিধির মধ্যে কাজ করতে হবে এবং এর ফোকাল পয়েন্টগুলো কী। দুঃখজনক হলো- আমাদের অধিকাংশেরই কাজের কোনো অবজেকটিভ থাকে না। অবজেকটিভ ঠিক করে কমিটমেন্ট এবং কনফিডেন্স নিয়ে কাজ করলে তাতে সফলতা আসবে। শিক্ষা ও যুব উন্নয়নে নিবেদিত প্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকা এবং ক্যাম্পাস সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (সিএসডিসি) ৩ যুগপূর্তি পালন করছে; এর সম্পর্কে প্রত্যাশা ও পরামর্শ জানাতে চাইলে সমাজপ্রগতিতে বিশ্বাসী কল্যাণকামী ব্যক্তিত্ব আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ২০০৯ সালে বিজিএমইএ’র সভাপতি থাকাকালীন ক্যাম্পাস’র আমন্ত্রণে আমি ক্যাম্পাস অফিস পরিদর্শন করি। আমাকে বলা হলো তরুণদের উদ্দেশ্যে কিছু বলার জন্য। আমি দেখলাম ছাত্র-যুবকরা এখানে কম্পিউটার শিখছে, ইংরেজি শিখছে, স্মার্ট হচ্ছে, নেতৃত্বগুণ অর্জন করছে। ক্যাম্পাস এভাবে যুবসমাজের উন্নয়ন করছে, ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলছে। দেশে ডিজিটাল সোসাইটি গড়ে তোলার সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছে। এটি ক্যাম্পাস’র মহৎ উদ্যোগ।

ক্যাম্পাস পত্রিকার প্রাণপুরুষ ড. এম হেলাল এ প্রতিষ্ঠানটিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন যা এদেশের মানুষের কাছে প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে। আমি ড. এম হেলালের সুখী-সমৃদ্ধ দীর্ঘজীবন এবং ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠানের অব্যাহত সাফল্য কামনা করছি।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ