বিশেষ খবর

বাবার সাথে সোনারগাঁও হোটেলে বুফে ডিনার খেতে খেতে সমাজসেবার শিক্ষা নেয়া

ক্যাম্পাস ডেস্ক শিশু ক্যাম্পাস
img

॥ ওয়াসির হেলাল ॥
৫ম শ্রেণি, সহজপাঠ স্কুল, ঢাকা

২০ নভেম্বর ২০২০ শুক্রবার॥ ঢাকার বিখ্যাত প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে বাবার সাথে ডিনার করতে গিয়েছিলাম। আগের দিন রাতে বাবা ফোন করে আমাকে আর ভাইয়াকে বললেন, তোমরা কি সোনারগাঁও হোটেলে বুফে ডিনার খেতে চাও? শুনে আমি আর ভাইয়াতো খুব খুশি! আমরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে তখনই রাজি হয়ে গেলাম! আমি ঢাকার বাকি সব বড় বড় হোটেলে ডিনার খেয়েছি; বিশেষত ফাইভ স্টার হোটেলগুলোতে। এমনকি অনেক হোটেলে আমি আর বাবা দু’বন্ধুর মতো দিনের পর দিন থেকেছিও। শুধু সোনারগাঁও হোটেলে আমার ডিনার খাওয়া বাকি ছিল।

ঐদিন সন্ধ্যায় আমি আর ভাইয়া বাবার আগেই সোনারগাঁও হোটেলে পৌঁছে গিয়েছি। বাবা তখন অন্য এক জায়গায় একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে ছিলেন। সেই অনুষ্ঠানে বাবা ছিলেন প্রধান অতিথি। আর প্রধান অতিথিকে অনুষ্ঠানের শেষদিকে বক্তৃতা করতে হয় এবং গুরুত্বপূর্ণ অনেক কথা বলতে হয়। তাই বাবার আসতে একটু দেরি হচ্ছিল। তবুও বাবা ঐ অনুষ্ঠানে বসে বার বার এসএমএস পাঠিয়ে আমাদের সাথে যোগাযোগ করছিলেন এবং লিখছিলেন তোমরা হোটেল লবিতে এবং পুলসাইডে কিছুক্ষণ থেকে তারপর রেস্টুরেন্টে চলে যেও। বুকিংয়ে তোমাদের নাম লিখা আছে। তোমরা দু’ভাই স্মার্টলি একটা টেবিল চুজ করে স্যুপ ও স্টার্টার এনজয় করতে থেকো। খাবারের ক্ষেত্রে আমার জন্যে দেরি করো না। বাবার সেই কথা অনুযায়ী আমি আর ভাইয়া হোটেলের ভিতরে কিছুক্ষণ ঘুরলাম; আর অন্যসব হোটেলের সাথে এটির পার্থক্য খুঁজতে থাকলাম।

প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেল সরকারের পরিচালনায় বাংলাদেশের শীর্ষ ৫ তারকা হোটেল। তাই ঢাকার একেবারেই কেন্দ্রস্থলে অনেক বেশি জায়গার ওপর এটি প্রতিষ্ঠিত। এর ভিতরে পানির ফোয়ারাটি খুব সুন্দর; ফোয়ারার উপরেও একটি রেস্টুরেন্ট আছে। সুইমিংপুলতো আরো সুন্দর। এমনকি আমার মতো বাচ্চাদের জন্য ছোট পুল এবং জাকুজি আছে। খুব কালারফুল ও আকর্ষণীয় পুলগুলো দেখে আমারতো তখনই পানিতে নেমে যেতে ইচ্ছে করছিলো। বাবা সাথে থাকলে হয়তো বাবাকে একটা কিছু বায়না ধরে নেমেও যেতাম। মনে মনে চিন্তা করলাম বাবা আসলে বলব যে, আমি এ হোটেলে থাকতে চাই এবং এসব পুলে নামতে চাই। এরূপ চিন্তা করতে করতে রেস্টুরেন্টে চলে যাই। এমন ধরনের ফাইভ স্টার হোটেলে কিংবা রেস্টুরেন্টে কীভাবে ইন করতে হয়, তা আমার জানা আছে। কারণ বাবার সাথে ২০১৭ সাল থেকে গত ৪ বছরে আমি দেশে-বিদেশে বহু ফাইভ স্টার হোটেলে গিয়েছি, থেকেছি ও বুফে খেয়েছি। এমনকি বিদেশে গেলে ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টগুলোতে বাবার সাথে থাকা চৎরড়ৎরঃু চধংং দিয়ে বড় বড় লাউঞ্জে বুফেতে ব্যতিক্রমী খাবার এনজয় করেছি।

বাবা রেস্টুরেন্টে আসার পূর্বে আমরা স্যুপ ও এপিটাইজার খাচ্ছিলাম। প্রথমে আমি মাশরুম স্যুপ খেয়েছি। তারপর দারুণ মজাদার এক স্পেশাল চিকেন খেয়েছি। একটা মজার ইতালিয়ান চিকেনও খেয়েছি। লাজানিয়া নামের খুব একটি মজার খাবার খেয়েছি। লাজানিয়ার মধ্যে পনির ছিল, সবজি ছিল, আর একটু মাংস ছিল। এতকিছুর মধ্যে আমি আর বিফ খাইনি; তবে ভাইয়া বললো তাদের ইমপোর্টেড বিফ ও ল্যাম্ব এর রেসিপি খুবই ব্যতিক্রমী মজার ছিল। এভাবে আমরা কয়েকটা আইটেম খেতে খেতে বাবা চলে এলেন। বাবাকে জড়িয়ে ধরে শুভেচ্ছা বিনিময় ও একটু কথা বলার পর বাবা স্যুপ ও সালাদ দিয়ে শুরু করলেন আর আমি মিষ্টি জাতীয় খাবারগুলো তথা ডেজার্ট কর্ণারে সারি সারি সাজানো খাবার চুজ করা শুরু করলাম। প্রথমে দারুণ মজার চকলেট জুস খেলাম। চকলেট জুসে অনেক চকলেট আর ক্রিম ছিল। এভাবে কয়েকটি ডেজার্ট খেয়ে বিরতির জন্যে আমি ভাইয়ার সাথে রেস্টুরেন্টের বাইরে ঘুরতে বেরুলাম। কি সুন্দর সাজানো-গোছানো আর ঝকঝকে তকতকে টেরেস আর লবিগুলো। অর্কিড, বাহারি লতা আর দারুণ সুন্দর সব ফুলে ফুলে সাজানো। সবকিছু ছবির মতো সুন্দর!

এরপর আবার রেস্টুরেন্টে গিয়ে দারুণ মজার কেক খেয়েছি। কেকটা ছিল অনেকটা চকলেট কেকের মতো। এভাবে ডেজার্ট খেতে খেতে বাবার ঐদিনের অনুষ্ঠান সম্পর্কে কিছু কথা শুনলাম। ঐ অনুষ্ঠানে এমন ২০টি প্রতিষ্ঠানকে বাবার মাধ্যমে ঐবৎড় অধিৎফ দেয়া হয়, যারা করোনা মহামারির লকডাউনের অচল অবস্থায়ও অভাবী মানুষদেরকে খাদ্যদ্রব্য ও চিকিৎসা-ঔষধ দিয়ে সহযোগিতা করেছে। এমনকি কোনো কোনো সংগঠন কুকুরকেও নিয়মিত খাবার দিয়েছে। মাঠেঘাটে মানবতার কাজ করা সারা বাংলাদেশের শত শত সংগঠন থেকে বাছাই করে মাত্র ২০টিকে ঐবৎড় অধিৎফ দেয়া হয়েছে। আমার বাবাও ছোটবেলা থেকে মানুষকে সাহায্য-সহযোগিতা এবং সব প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণসহ বহু সমাজকল্যাণ কার্যক্রম করে এসেছেন বলে তাঁর মাধ্যমে এ পুরস্কার দেয়ার জন্যে প্রধান অতিথি হিসেবে তাঁকে নিমন্ত্রণ করা হয়।

ডিনারের শেষভাগে বাবা আমাদের কাছে সেই প্রোগ্রামের কথা উঠানোর কারণ হচ্ছে, তাঁর সন্তান হিসেবে আমরাও যেন মানুষ ও স্রষ্টার সৃষ্টির সেবায় এগিয়ে আসি; নিজেদের সব কাজের পাশাপাশি সমাজসেবায়ও উদ্যোগী হই সেজন্য আমাদেরকে সমাজসেবামূলক বিভিন্ন কাজ ও এরূপ কাজের উপকারিতা সম্পর্কে গল্পচ্ছলে বলতে বলতে বাবাও ডিনার শেষ করেন। এভাবে যতবারই আমি বাবার সাথে দেখা করি কিংবা রেস্টুরেন্টে বসি, ততবারই বাবা আমাকে কিছুক্ষণ মিটিংয়ের মতো করে কিংবা আলোচনা সভার মতো করে শিখান কীভাবে মনোযোগ দিয়ে আরেকজনের কথা শুনতে হয়, কীরূপ ভদ্রভাবে অন্যের কথার সাথে দ্বিমত করতে হয়, কীভাবে সভাপতি ও ভালো সমালোচক হতে হয়।

খাওয়া ও গল্প শেষ করে আমরা আবার সুইমিংপুল এরিয়ায় গেলাম। ছোটদের সুইমিংপুলটা দেখে সেটাতে সুইমিং করতে খুব ইচ্ছে করছিল। এবার বাবাকে যদি আমার মনের কথা বলি, তাহলে বাবা আমাকে অনুমতি নিইয়ে দিবেন -সেটাতো আমি জানি। কিন্তু আমি যে নামতে পারব না, কারণ সুইমিং করার জন্য কোনো আলাদা জামাকাপড় নেইনি। সুইমিং পুলের পাশে ছিল জিম আর স্পা। আলাদা জামাকাপড় আনিনি বলে তখন আমার মনে খুব দুঃখ হলো। মনের দুঃখ মনেই রেখে পুলের পাশে অনেকগুলো ছবি তুললাম। ছবি তোলার পর আমাদের ফেরার পালা। ছবি তুলছিলাম আর ভাবছিলাম, যদি আবারো বাবার সাথে আসতে পারতাম দারুণ সুন্দর এই হোটেলে।

বাবা মনে হয় আমার মনের কথা বুঝে ফেলেছেন, তাই হেসে হেসে বললেন তোমার মনে হয় আবারও এই সোনারগাঁও হোটেলে আসতে ইচ্ছে করছে, তাই না ওয়াসির! আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলতেই বাবা বললেন আচ্ছা ঠিক আছে, আমি তোমাকে আবারও সোনারগাঁও হোটেলে নিয়ে আসব এবং করোনা মহামারি শেষ হলে কিংবা টিকা নেয়া হয়ে গেলে তোমাকে নিয়ে এ হোটেলে থাকব, ইনশাআল্লাহ। শুনে আমার মনে তখন কি যে আনন্দ হলো! ভাবতেই খুব মজা লাগছে যে, বাবার সাথে আবার আমি সোনারগাঁও হোটেলে আসব এবং পুরো দিনরাত থাকব!! সেইদিন চলে আসার পর উপরের লিখা লিখে ফেলেছি। এর ঠিক এক সপ্তাহ পর বাবা আবার আমাদেরকে এই সোনারগাঁও হোটেলে ডিনারে ডাকলেন। তবে এ দিনের বেশ কিছু খাবার ছিল অন্যদিনের তুলনায় নতুন, যা এর আগেরদিন ছিল না। কারণ সপ্তাহের প্রতিদিনই তারা খাবারের মেনু পরিবর্তন করে ডিনার সাজায়; সেটা আমি বুঝতাম না, যদি এই ২য় দিন না যেতাম। তাই বাবাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। কারণ বাবা আমার জন্যে এমনই স্পেশাল অনেক কিছু করেন, ব্যতিক্রমী অনেক কিছু শিখান যাতে আমি মানুষের জন্যে, সমাজের জন্যে কাজ করি। তাইতো

আমি ওয়াসির, বাবার ভালোবাসা
আর আমার বাবা, আমার ভালোবাসা॥


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ