বিশেষ খবর

ভ্যাট আরোপে অসন্তোষ বাড়ছে বেসরকারি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে

ক্যাম্পাস ডেস্ক প্রতিবেদন
img

ভ্যাট আরোপকে কেন্দ্র করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোতে অসন্তোষ ক্রমশই বাড়ছে। আরোপিত ভ্যাটের পরিমাণ ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে সাত শতাংশ করা হলেও প্রতিষ্ঠানগুলোর উদ্যোক্তা ও শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ প্রশমিত হচ্ছে না। এদিকে ভ্যাট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে ভ্যাট প্রদানকারী হিসেবে নিবন্ধনের নির্দেশ দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাট পরিশোধ সংক্রান্ত কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট এলাকার সার্কেল কার্যালয়ে জমা দিতেও বলা হয়েছে। তবে এ নির্দেশের ফলে বেতন, ফি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা অধিকার আন্দোলনের ব্যানারে বৃহত্তর আন্দোলনের ঘোষণা দিয়েছেন শিক্ষার্থীরা। সংগঠিত হচ্ছেন অভিভাবকরাও। আজ জরুরি বৈঠকে বসছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি।
কর আরোপকে অগণতান্ত্রিক ও উচ্চ শিক্ষার অগ্রগতি বিরোধী অভিহিত করে অবিলম্বে কর আরোপের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি। দাবি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যেই সমিতির নেতৃবৃন্দ অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাতও করেছেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে ৮৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় চার লাখ ৬১ হাজার এবং ৬৪টি বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজে ২০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থী লেখাপড়া করছে। করের কারণে সঙ্কটে পড়বে শিক্ষার্থীরা। এমনিতেই এ নিয়ে আন্দোলন চলছে। এ অবস্থার মধ্যে এনবিআর এর নির্দেশে অস্থিরতা আরও বেড়ে গেছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিশেষত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবার বাজেটে ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপের পর থেকেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলছে আন্দোলন। সভা সমাবেশ করে প্রতিদিনই প্রতিবাদ জানাচ্ছেন তারা। অসন্তোষ সামাল দিতে আরোপিত ভ্যাটের হার কিছুটা কমিয়ে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ করার ঘোষণা দেয়া হলেও পরিস্থিতি পাল্টায়নি। জানা গেছে, এমন অবস্থার মধ্যেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ভ্যাট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধনের নির্দেশ দিয়েছে এনবিআর। এনবিআরের এ নির্দেশনায় তিনটি বিষয় স্পষ্ট করেই বলা হয়েছে। প্রথমত, এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে ১৫ আগস্টের মধ্যে ভ্যাট প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিবন্ধিত হতে হবে। দ্বিতীয়ত, ওই তারিখের মধ্যেই জুলাই মাসে এসব প্রতিষ্ঠানের দেয়া সেবার বিপরীতে যে ভ্যাট সংগৃহীত হয়েছে তা জমা দিতে হবে। তৃতীয়ত, জুন মাসে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি হিসেবে যে অর্থ আদায় করেছে তার ওপর ভ্যাট জমা দিতেও বাধ্য এসব প্রতিষ্ঠান।
এনবিআর এই সংবিধিবদ্ধ নিয়ন্ত্রণ আদেশ (এসআরও) জারি করেছে। এবারই প্রথমবারের মতো সরকার বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এত দিন ভ্যাটের আওতামুক্ত ছিল। ২০১০ সালে একবার ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত নেয়া হলেও অসন্তোষের কারণে পরে তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়েছিল। সূত্রগুলো বলছে, ইতোমধ্যেই ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় ভ্যাট দেয়ার প্রস্তুতি নিয়েছে। আইন অনুসারে, প্রতি মাসে ভ্যাট জমা দেয়ার কাগজপত্র পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে স্থানীয় রাজস্ব কার্যালয়ে জমা দিতে হবে। প্রক্রিয়াটা আয়করের মতোই। তবে আয়কর বাৎসরিক হিসাবে জমা দিতে হয়। এ বিষয়ে এনবিআর কার্যালয় থেকে বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নোটিশ দেয়া হয়েছে। ইতোমধ্যেই বিষয়টি নিয়ে বৈঠক ডেকেছে বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি।
বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যোক্তা থেকে শুরু করে এ খাতের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল উচ্চবিত্তের সন্তানরাই পড়ছে না, উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য মফস্বল থেকে আসা এমনকি প্রত্যন্তগ্রামের কৃষকের সন্তানরাও ভর্তি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন-ফি পরিশোধের জন্য অভিভাবকরা জমিজমা বন্ধক এমনকি বিক্রি পর্যন্ত করছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর প্রস্তাবিত কর প্রত্যাহারের দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদের বাজেট আলোচনায়ও। সংসদের গেল অধিবেশনে বগুড়া-৩ আসনের বিরোধীদলীয় সদস্য নুরুল ইসলাম তালুকদার বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে সেটা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেবে না। এটা দিতে হবে আমার আপনার ছেলে-মেয়েদের যারা ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ছে। এর মানে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপরই এই করের বোঝা গিয়ে পড়বে। তাই আমি অর্থমন্ত্রীর প্রতি দাবি জানাব, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর প্রস্তাবিত এই কর প্রত্যাহার করা হোক।

হাইকোর্টের রুল উচ্চশিক্ষায় ভ্যাট কেন অবৈধ নয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ ভ্যাট আরোপের সিদ্ধান্ত কেন অবৈধ নয়-তা জানতে চেয়ে সরকারের প্রতি রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট।
জনস্বার্থে করা একটি রিট আবেদনের ওপর প্রাথমিক শুনানি শেষে ৯ আগস্ট বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি জে এন দেবের বেঞ্চ এই রুল জারি করেন। অর্থসচিব, শিক্ষাসচিব, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানকে আগামী তিন সপ্তাহের মধ্যে এই রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
সরকার চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি’র ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ৪ জুলাই এ বিষয়ে অফিস আদেশ জারি করে। এরপর থেকেই এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ওই ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ-সমাবেশসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে।
‘নো ভ্যাট অন অ্যাডুকেশন’ নামের একটি সংগঠন এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদের কার্যালয়ে স্মারকলিপিও দিয়েছে। সম্প্রতি ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির আইন বিভাগের শিক্ষক খন্দকার দিদার উস সালাম ও দুই শিক্ষার্থী এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রিট আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার হাসান এম এস আজিম।
রিট আবেদনকারী দিদার উস সালাম বলেন, বিষয়টি বৈষম্যমূলক। সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দুই রকম নিয়ম করা হয়েছে। নিয়ম সবার জন্য সমান হতে হবে। এ কারণেই রিট আবেদন করা হয়েছে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ