বিশেষ খবর

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ছাত্রদের জঙ্গি সম্পৃক্ততা তদন্তে ইউজিসি

ক্যাম্পাস ডেস্ক শিক্ষা সংবাদ
img

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি (এনএসইউ) নিয়ে বিতর্ক চরম আকার ধারণ করেছ। গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারী জঙ্গিদের একজন নিবরাস ইসলাম এনএসইউ এর শিক্ষার্থী ছিল। বলা হচ্ছে, মানবতাবিরোধী অপরাধে দন্ডিত জামায়াত নেতা গোলাম আযমের দুই ছেলে এবং মতিউর রহমান নিজামীর এক ছেলেও এনএসইউয়ের খন্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন। এমনকি গোলাম আযমের এক ভাগ্নেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, তাঁকে উপাচার্য করার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাবও পাঠিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
সাম্প্রতিক নানা বিতর্কের পরিপ্রেক্ষিতে এনএসইউ নিয়ে ফের তদন্তে নামছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. দিল আফরোজা বেগমকে এ বিষয়ক তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে। তাঁকে নিয়ে কমিটির সদস্যসংখ্যা চার। অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন কি না তাও খতিয়ে দেখবে তদন্ত কমিটি।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, আমরা গত অক্টোবরে একটি তদন্ত করেছিলাম। মূলত সেই তদন্তের ফলোআপ হিসেবে এবারের তদন্ত কমিটি। তবে বর্তমানে যেহেতু নর্থ সাউথ নিয়ে নানা বিতর্ক হচ্ছে তাই এসব বিষয়ও এবারের তদন্তে আসবে। এছাড়া যুদ্ধাপরাধীর সন্তানরা এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আছেন কি না, সেটাও আমরা জানতে চাইব।
অভিযোগ উঠেছে, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির গোলাম আযমের ছেলে আব্দুল্লা হিল আমান আযমী ও সাদমান আযমী এনএসইউ এর খন্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন। মতিউর রহমান নিজামীর ছেলে নাদিম তালহাও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। বর্তমানে তিনি ডক্টরেট করতে বিদেশে রয়েছেন। তবে এনএসইউ কর্তৃপক্ষ তাঁদের শিক্ষক থাকার তথ্য অস্বীকার করেছে।
তবে জানা যায়, এনএসইউ এর কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের শিক্ষক ছিলেন গোলাম আযমের ভাগ্নে আবুল আল হক। তিনি ইসলামী ছাত্রসংঘের সাবেক নেতা। ২০১২ সালে এনএসইউতে উপাচার্য নিয়োগের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির কাছে তিন শিক্ষকের নাম পাঠানো হয়। তাঁদের মধ্যে আবুল আল হকের নামও ছিল। তবে বিষয়টি জানতে পেরে সে সময় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ নামটি বাদ দেয়ার জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুরোধ জানানো হয়। এরপর তাঁর নাম বাদ দেয়া হয়।
উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তিত এনএসইউ কর্তৃপক্ষও। বিশ্ববিদ্যালয় খোলার প্রথম দিন জরুরি বৈঠক করেছেন এনএসইউ এর বোর্ড অব ট্রাস্টিজের সদস্যরা। বৈঠকে কোনো শিক্ষার্থী এক সিমেস্টার অনুপস্থিত থাকলে তার ছাত্রত্ব বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ ছাড়া পুরো বিষয়টি বিস্তারিতভাবে খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
এর আগে ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে নাশকতা চেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার বাংলাদেশি তরুণ কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিসও ছিলেন নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী। গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়েরই পাঁচ শিক্ষার্থী। তাদের সে সময়েই বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ইউজিসি গত বছর তাদের তদন্তে এনএসইউ লাইব্রেরিতে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহ্রীরের কিছু বইপত্রও পায় বলে তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে।
নর্থ সাউথের ৪০ ছাত্রের তথ্য চেয়েছে সরকার বেসরকারি নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০ ছাত্রের তথ্য চেয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি)। এই ৪০ ছাত্র ক্লাসে প্রায়ই অনিয়মিত থাকেন ও দুই বছর ধরে কমবেশি ক্যাম্পাসে অনুপস্থিত। ইউজিসি থেকে একটি তালিকা পাঠিয়ে এই শিক্ষার্থীদের বিষয়ে বিশদ তথ্য চেয়েছে সরকার।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, একটি গোয়েন্দা সংস্থার দেয়া প্রাথমিক প্রতিবেদনের ভিত্তিতেই অফিসিয়ালি ওই ৪০ ছাত্রের তথ্য চাওয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় উইংয়ের দায়িত্বশীল সূত্র এই ৪০ ছাত্রের তালিকা দিয়ে তথ্য চাওয়ার কথা স্বীকার করেছে। যদিও এই ৪০ ছাত্রের নাম প্রকাশ করেনি সূত্র। তবে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অনুপস্থিত থাকা মানেই তারা জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে জড়িয়েছে এমনটি সবার ক্ষেত্রে নাও হতে পারে। বাবার ব্যবসা দেখাশোনার জন্যও অনেকে দু’এক সিমেস্টার গ্যাপ দেয়। তবে এক সিমেস্টারের বেশি গ্যাপ দিলে ছাত্রত্ব বাতিলের নতুন সিদ্ধান্ত নেয়ার পর কেউ হয়তো আর এমনটি করবে না। ইউজিসি সূত্র জানায়, যে ৪০ ছাত্রের তথ্য চাওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের শিক্ষার্থীই ১১ জন। এ ছাড়া বিবিএ, ফিন্যান্স ও প্রকৌশল বিষয়ের আরও কয়েকটি বিভাগের শিক্ষার্থীরা এর মধ্যে রয়েছেন।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের (বিওটি) সদস্য মোহাম্মদ শাহজাহান জানান, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে বিভিন্ন তথ্য চাওয়া হচ্ছে। তারা সরকারকে সব ধরনের সহায়তা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পাশাপাশি তারা নিজ উদ্যোগেও শিক্ষার্থী ও কর্মরত শিক্ষকদের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে খোঁজখবর নেবেন। তিনি বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমাদের কাছে গত দু’বছর অনুপস্থিত ছিল এমন ছাত্রদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। যদিও এটা প্রস্তুত করা কঠিন। এরপরও আমরা তালিকাটি তৈরি করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এ ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন বিভাগের ৩০-৪০ ছাত্রের ব্যাপারে তথ্য চাওয়া হয়েছে। আসলে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ছাত্রের তথ্য চাওয়া হচ্ছে। আমরা সে সব তথ্যও সরবরাহ করছি।
শিক্ষার্থী-অভিভাবকদের জঙ্গি আতঙ্ক জঙ্গি হামলার সঙ্গে নর্থ সাউথের শিক্ষার্থীর সম্পৃক্ততায় উৎকণ্ঠা ও উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়টির ২০ হাজার শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবার। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট দিয়ে ঢুকছিলেন কম্পিউটার সায়েন্সের এক শিক্ষার্থী বলেন, মা-বাবা আসতে দিতে চাচ্ছিলেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থীর জঙ্গি কর্মকান্ডে সম্পৃক্ততার কথা জানতে পেরে তাঁরা খুবই চিন্তিত। তাঁরা এই সপ্তাহটা দেখতে বলেছিলেন। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ক্লাস আছে। তাই অনেকটা জোর করেই আমি এসেছি। এ জন্য কিছুটা দেরি হয়ে গেছে।
ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দুই শিক্ষার্থী বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু বাইরে ব্যাপারটি এমনভাবে আলোচিত হচ্ছে যে অভিভাবকরা ভয় পেয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে মেয়েরা বেশি অনুপস্থিত। জঙ্গি সম্পৃক্ততা তো বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকেও হতে পারে। আমি নিজে যদি ঠিক থাকি তাহলে কেউ আমাকে অন্য পথে নিতে পারবে না।
কম্পিউটার সায়েন্সের পঞ্চম সিমেস্টারের আরেক শিক্ষার্থী বলেন, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জঙ্গি সম্পৃক্ততা প্রমাণের পর নিরাপত্তা অনেক বেশি বাড়ানো হয়েছে। তবে বাইরের মানুষ অনেক বেশি রিঅ্যাক্ট করছে, যা আমাদের ভীত করে তুলছে।
এনএসইউ এর এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক বলেন, আমাদের তো বলার কিছু নেই। সবচেয়ে ভালো ইউনিভার্সিটিতে মেয়েকে ভর্তি করেছি। এখন শুনছি এখানে জঙ্গি হয়। উদ্বেগ তো কিছুটা কাজ করছে। তাই এখন মেয়ের সঙ্গে আসতে হচ্ছে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ