বিশেষ খবর

প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে চিকিৎসা বিভিন্ন পদ্ধতি ও কৌশল -২৬

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ নিবন্ধ

॥পর্ব ২॥
ব্যায়াম সুস্থ-সবল ও দীর্ঘায়ুলাভে নিয়মিত ব্যায়াম
প্রাকৃতিক চর্চা হিসেবে ব্যায়াম বহুল সমাদৃত হলেও অনেক রোগের ক্ষেত্রে তা চিকিৎসাও বটে। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য খাবার গ্রহণ যেমনি জরুরি, নিয়মিত ব্যায়ামও তেমনি অত্যাবশ্যক। আমার মতে খাবারের বিকল্প থাকতেও পারে, কিন্তু ব্যায়ামের কোনো বিকল্প নেই। তিনটি বিশেষ কারণে ব্যায়াম অতীব জরুরি। এক- অতিরিক্ত ক্যালরি ক্ষয় করা; দুই- শরীরের গঠন-গড়ন সচল রাখা; তিন- শিথিলায়ন ও মানসিক স্বচ্ছতা ইত্যাদি। বিভিন্ন উপায়ে এরূপ বিশেষ উদ্দেশ্য সাধন হতে পারে। যেমন ব্যায়ামাগার বা জিমে গিয়ে, মাঠে দৌড়াদৌড়ি করে, সাঁতার কেটে, যোগাসন করে, শারীরিক পরিশ্রম করে এবং এরূপ বা অনুরূপ যেকোনো পদ্ধতিতে। তবে ক্যালরি ক্ষয় এবং শারীরিক সচলতা চাই-ই চাই! সুস্থতা ও দীর্ঘায়ু লাভের মৌলিক অনুষঙ্গ হিসেবে এর কোনোই বিকল্প নেই। এমনকি বয়োবৃদ্ধদের ক্ষেত্রেও নিয়মিত ব্যায়াম জরুরি। তবে উপরোক্ত কঠিন পদ্ধতিতে নয়; হাঁটাচলা, যোগাসন, আকুপ্রেশার বা অন্যকোনো থেরাপিউটিক পদ্ধতিতে।
মার্কিন গবেষকরা জানিয়েছেন, সপ্তাহে কমপক্ষে ৬ মাইল হাঁটলে বৃদ্ধ বয়সেও মস্তিষ্ক সুস্থ থাকে। তাদের মতে প্রাপ্তবয়স্ক হবার পর থেকেই মস্তিষ্কে এক ধরনের ক্ষয় শুরু হয়, ফলে স্মৃতিতে সমস্যা দেখা দেয়। গবেষণায় তারা দেখেছেন যে, সুশৃঙ্খল শারীরিক ব্যায়াম বয়স্কদের মস্তিষ্কের বিস্মৃতিজনিত রোগ প্রতিরোধ করে। নিয়মিত ব্যায়াম অনুশীলনের ফলে শারীরিক সুস্থতা, মানসিক সচেতনতা, রোগ নিরাময়, রোগ প্রতিরোধ ছাড়াও আরো কত বিষয়ে যে উপকারলাভ করা যায়, তার ইয়ত্তা নেই। এমনকি নিয়মিত ব্যায়াম করলে ক্যান্সারে মৃত্যুর ঝুঁকি কমার পাশাপাশি এর চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও হ্রাস পায় এমনটিই জানা গেছে ম্যাকমিলান ক্যান্সার সাপোর্টের এক প্রতিবেদনে। তাছাড়া ব্যায়ামের সঙ্গে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও অটিজম দূর হওয়ার সম্পর্কও খুঁজে পেয়েছেন নেদারল্যান্ডসের একদল বিজ্ঞানী। তারা বলছেন অটিজম বা লার্নিং ডিজঅর্ডারে আক্রান্ত শিশুর সমস্যা দূর করতে ঘাম ঝরানো ব্যায়াম হতে পারে একটি চিকিৎসা। একইসঙ্গে নিবিড় ব্যায়াম শিশু থেকে শুরু করে ৩৫ বছরের যুবক পর্যন্ত যেকোনো মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও বাড়ায়।
ব্যায়াম অনুশীলন না করার ফলে কেউ মুটিয়ে যায়, অল্প বয়সেই রোগ-শোকে আক্রান্ত হয়ে মনের বার্ধক্যে উপনীত হয়। অন্যদিকে ঐ একই বয়সি মানুষ নিয়মিত ব্যায়াম করে স্মার্ট, চৌকস, সুঠামদেহী ও চিরসবুজ জীবনযাপন করতে থাকে। ছোটবেলা থেকে নিয়মিত যোগাসন ও ব্যায়াম অনুশীলনের মাধ্যমে অনেকে সুস্থ ও আনন্দঘন জীবনযাপনই শুধু করে না, বহুক্ষেত্রে সাফল্যও ছিনিয়ে আনে; যা ঘটে থাকে খেলোয়াড় ও প্রতিরক্ষা বাহিনীর সদস্যদের জীবনে। ব্যায়ামের পর যে খাবার ছোঁবেন নাঃ ব্যায়ামের ফলে শরীর থেকে প্রচুর গ্লুকোজ ও তরল বের হয়ে যায়। তাই ব্যায়ামের পর এমন খাবার খাওয়া উচিত, যা ধীরে ধীরে শরীরে গ্লুকোজের মাত্রা বৃদ্ধি করবে। কিন্তু যদি এমন খাবার খাওয়া হয়, যা শরীরে কেবল চর্বি ও লবণ বাড়াবে, তাহলে তা শরীরকে গ্লুকোজ আর পানি গ্রহণে বাধা দেবে; এটি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। ব্যায়ামের পরপরই চর্বি ও লবণযুক্ত যেসব খাবার খাওয়া উচিত নয় তা হলো পনির, প্রক্রিয়াজাত মাংস, বেকন, সালামি, সসেজ, সেরিয়ালস, রুটি, ফলের রস, ডিমভাজি, মিল্কশেক, কাঁচা সব্জি ইত্যাদি।
নিজ বাগানে ব্যায়ামের মাধ্যমে নিশ্চিত সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ুলাভ আপনার বাড়ির আঙিনায় বা আশপাশে একটি বাগান তৈরি করে তার পরিচর্যা নিজ হাতে রাখলেই আপনি স্বাস্থ্যের দিক থেকে ভীষণ সমৃদ্ধ ও সুখী মানুষ বনে যেতে পারেন সহজে। কারণ এই একটি বাগান আপনাকে যেমন সৃজনশীলতা, সৌন্দর্য ও প্রাকৃতিক চর্চায় নিয়োজিত করে রাখবে; তেমনি মানসিক চাপ, অবসাদ ও হতাশা দূর করে আপনাকে কর্মক্ষম, কর্মদ্যোগী, সুস্থ-সবল ও দীর্ঘায়ুর নিশ্চয়তা দেবে। জীবনকে নানাভাবে সমৃদ্ধ করার পাশাপাশি নিম্নোক্ত ধরনের শারীরিক রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে অনুরূপ একটি প্রিয় বাগান।
ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণঃ ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রাথমিক চিকিৎসা শারীরিক পরিশ্রম। নিজের তৈরি বাগানে সক্রিয়ভাবে কাজ করা একজন মানুষ কম করে হলেও সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট পরিশ্রম করার সুযোগ পান। এ পরিশ্রমেই ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ করা যায় অনায়াসে। কানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরাও এমনটিই বলেছেন। তারা জানান যারা নিজের বাগানে পরিতৃপ্তি নিয়ে পরিশ্রম করেন, তাদের এসব রোগ হওয়ার ঝুঁকি একদম কম। অস্টিওপোরোসিসের ঝুঁকি কমেঃ কাজকর্মে ব্যতিব্যস্ত থাকলে শরীরের ওজন যেমন কমে, ঠিক তেমনি সুস্বাস্থ্যের জন্যও পরিশ্রম খুব দরকার। আর নিজেই নিজের বাগান চর্চার কাজটুকু করলে শরীর সুস্থ রাখার জন্য ঐ পরিশ্রমটুকু আপনাতেই হয়ে যায়। এতে ভালো থাকে হাড়। এ কারণে শরীরে অস্টিওপোরোসিস রোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। আরকানসাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক ৩,৩১০ জন বয়স্ক নারী বাগান-মালিকের ওপর গবেষণা করে দেখেছেন সাঁতারু, প্রাতঃভ্রমণকারী বা অন্যান্য ছাপোষা নারীদের তুলনায় বাগান-মালিক নারীর অস্টিওপোরোসিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক কম।
জীবনের প্রতি আনে ভালোবাসাঃ গাছগাছালি পরিবেষ্টিত হয়ে থাকাটা কঠিন কিছু নয়। এতে যেমন ভালো লাগারও বিষয় থাকে, ঠিক তেমনই এ পরিবেশ জীবনের প্রতি গভীর ভালোবাসাও তৈরি করে। টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল অধ্যাপক ২৯৮ জন বৃদ্ধ বাগান মালিকের ওপর গবেষণা করে এ তথ্য পেয়েছেন। গবেষণায় তারা দেখেছেন ঐ বৃদ্ধদের জীবনে আনন্দ, বিশ্বাস ও আত্মসংযম অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। গভীর ঘুম আনেঃ বাগানে পরিশ্রম করলে যেমন শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়, ঠিক তেমনই তা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো। বাগানে পরিশ্রম করলে ভালো ঘুম হয়। আর এই ভালো ঘুমের কারণেই ভুলে যাওয়া কিংবা অত্যধিক উত্তেজনার মতো রোগের প্রবণতা কমে আসে অনেকাংশে। ফলে দীর্ঘায়ু বা শতায়ু লাভ সহজ হয়ে যায়। ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি ফর হর্টিকালচার সায়েন্সের গবেষকরাও তাদের গবেষণায় এ ধরনের নিশ্চয়তাই দিচ্ছেন।
ক্যান্সার রোধে ব্যায়াম
নীরোগ ও সুস্থ শরীরের জন্য ব্যায়ামের বিকল্প নেই। ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীর শুধু সুগঠিত এবং রোগ প্রতিরোধকই হয় না, শরীর থেকে অনেক রোগজীবাণুও বের হয়ে যায়। ক্যান্সার রোধেও ব্যায়াম দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে। আর এ কারণে ক্যান্সারের চিকিৎসা গ্রহণকারীদের সপ্তাহে আড়াই ঘণ্টা করে শারীরিক পরিশ্রম করা উচিত বলে ক্যান্সার গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাকমিলান ক্যান্সার সাপোর্ট’ এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্যান্সার আক্রান্ত চিকিৎসাপরবর্তী পর্যায়ে ব্যায়াম করা নিরাপদ এবং ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের নিষ্ক্রিয় থাকা উচিত নয় বলে আমেরিকান কলেজ অব স্পোর্টস মেডিসিন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এতে বলা হয়, সক্রিয় থাকলে দুর্বলতা এবং ওজন বৃদ্ধির মতো ক্যান্সার ও এর চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রোধ করা যায়। পাশাপাশি এ রোগে মৃত্যুঝুঁকিও কমানো যেতে পারে। তবে এজন্য কঠোর পরিশ্রমের প্রয়োজন নেই। সাধারণ কাজকর্ম যেমন বাগানে কাজ করা, হাঁটা বা সাঁতার কাটলেও একই উপকার পাওয়া যাবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ম্যাকমিলান ক্যান্সার সাপোর্টের প্রধান নির্বাহী সিয়ারান ডেভানে বলেন ক্যান্সার থেকে আরোগ্য লাভের ক্ষেত্রে ব্যায়াম কতটা সুফল বয়ে আনে, তা জানলে এ রোগে আক্রান্তরা হতবাক হয়ে যাবে।
ব্যায়াম ঠেকায় স্তন ক্যান্সার
শারীরিক সুস্থতার জন্য ব্যায়ামের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। বিশেষ করে বাড়তি মেদ কমাতে ব্যায়ামের কার্যকারিতা সর্বজনস্বীকৃত। এসবের পাশাপাশি স্তন ক্যান্সার ঠেকাতেও ব্যায়ামের ফলপ্রসূ প্রভাবের প্রমাণ পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা জানান, যেসব নারী সামান্য ব্যায়াম করে অথবা একেবারেই ব্যায়াম করে না, তাদের তুলনায় দৈনিক কয়েক ঘণ্টা ব্যায়াম কিংবা অনুরূপ কঠিন পরিশ্রম করে এমন নারীদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি ২১ শতাংশ কম। এরূপ ব্যায়ামের মধ্যে রয়েছে শরীরচর্চার বিশেষ প্রশিক্ষণ সাপেক্ষে ব্যায়াম করা ও নাচ, হাঁটা, সাঁতার ইত্যাদি। বিজ্ঞানীরা আরো জানান, পাতলা গড়নের নারীদের চেয়ে মেদবহুল নারীদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি ৫৫ শতাংশ বেশি। তাই মেদ কমাতেও শরীরচর্চার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের বিশ্বাস, স্থূল নারীদের শরীরের স্নেহজাতীয় কোষগুলো এস্ট্রোজেন হরমোন নিঃসরণে ভূমিকা রাখে। আর এই হরমোন টিউমার কোষগুলোর বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। তাই এই হরমোন নিঃসরণ কমাতে তথা ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি ঠেকাতে ব্যায়ামের পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
ব্যায়ামে উপার্জন বাড়ে
তরুণ প্রজন্মের জন্য সুসংবাদ! অন্য অনেক কিছুর মতো ব্যায়াম করলেও তারা আর্থিক সমৃদ্ধির সুযোগ পেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের কিভল্যান্ড স্টেট ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক সম্প্রতি এ বিষয়ে ১২ হাজার লোকের ওপর গবেষণা করে এ তথ্য প্রকাশ করেছে। তাদের দাবি, নিয়মিত ব্যায়াম করলে প্রত্যেকের উপার্জন ৯ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। গবেষকরা জানান সপ্তাহে কেউ যদি কমপক্ষে তিনবার জগিং, সাঁতার কিংবা ব্যায়ামাগারে গিয়ে ভারোত্তোলনের মতো ব্যায়াম করে, তাহলে তার স্বাস্থ্য এমন সুঠাম হবে যে তিনি এর ফলে বাড়তি উপার্জন করতে পারবেন। এমনকি কারো যদি প্রতিদিন হাঁটার অভ্যাস থাকে, তিনিও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এর সুফল পাবেন।
দৈহিক পরিশ্রম করলে
ঔষধ হিসেবে ভাবলে ব্যায়ামের নিরাময় ক্ষমতা বিস্ময়কর। নিয়মিত ব্যায়াম ও নড়াচড়ায় ঠান্ডা-সর্দির মাত্রা কমে যায় বলে জানিয়েছেন গবেষকরা। এর পাশাপাশি স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে ২৭ শতাংশ, ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি কমে ৫০ শতাংশ, উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার ঝুঁকি কমে প্রায় ৪০ শতাংশ, ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় ৫০ শতাংশ, কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় ৬০ শতাংশেরও বেশি, আলঝেইমারস হওয়ার ঝুঁকি কমায় ৪০ শতাংশ; বিষণœতা কমায় ঠিক যেমন কমে ঔষধ বা বিভিন্ন থেরাপি নিলে।
নিয়মিত ব্যায়ামে আয়ু বাড়ে টিভি বেশি দেখায় আয়ু কমে
প্রতিদিন মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যায়াম ৩ বছর আয়ু বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সঙ্গে মৃত্যুঝুঁকি কমাতে পারে ১৪ শতাংশ। তাইওয়ানের জাতীয় স্বাস্থ্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও চীনের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের যৌথ গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। ৪ লাখ ১৬ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর পরিচালিত এ গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, দিনে ১৫ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম যে কারও জীবনে ৩ বছরের আয়ু যুক্ত করতে পারে। গবেষণায় এও বলা হয়েছে ৩০ মিনিটের জায়গায় কেউ যদি প্রতিদিন অন্তত ১৫ মিনিট ব্যায়াম করে, তাহলেও সেটা শরীরের জন্য খুব উপকারী। গবেষকরা দেখেছেন যারা প্রতিদিন কমপক্ষে ১৫ মিনিট ব্যায়াম করে, তাদের হৃদরাগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি যারা ব্যায়াম একেবারেই করে না, তাদের চেয়ে ১৪ শতাংশ কম। গবেষকরা বলেন, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী প্রত্যেকের উচিত নিয়মিত শরীরচর্চা করা। এতে শরীর সুস্থ থাকার পাশাপাশি মৃত্যুঝুঁকিও কমবে।
এছাড়া অস্ট্রেলিয়ায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক সময় ধরে বসে টেলিভিশন দেখার ফলে আয়ু কমে যায়। কারণ যারা বসে বসে অনেকক্ষণ ধরে টিভি দেখে, তাদের শরীরে আলস্য বাসা বাঁধার কারণে তারা শরীরচর্চা কম করে; অসুখ-বিসুখও বেশি হয়। নিষ্ক্রিয়তা মানুষকে রোগা বানায়, এর কারণ রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। রক্তে শর্করার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার মানেই হলো হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরলসহ নানা রোগ-ব্যাধির জ্ঞাতিগোষ্ঠীকে আমন্ত্রণ জানানো। ল্যানসেট চিকিৎসা সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ধূমপানজনিত কারণে বিশ্বে প্রতিবছর যত লোক মারা যায়, তার প্রায় সমপরিমাণ মারা যায় শরীরচর্চাসহ কায়িক পরিশ্রম না করার কারণে। গবেষকরা বলেছেন সমস্যাটি এতই প্রকট হয়ে উঠেছে যে, একে মহামারী বলে বিবেচনা করা উচিত। তাদের মতে, মানুষকে শরীরচর্চার গুণাগুণ প্রচারের চেয়ে এখন তা না করার ভয়াবহতা সম্পর্কে জানানোই জরুরি হয়ে পড়েছে।
এক গবেষণায় জানা গেছে, প্রাকৃতিক পরিবেশ থেকে দূরে থাকা শহরের মানুষের এলার্জি ও এজমা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। ফিনল্যান্ডের বিজ্ঞানীরা বলেন মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সহায়ক ব্যাকটেরিয়া প্রাকৃতিক পরিবেশে বেশি থাকে। দৈহিক বৃদ্ধি এবং রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে এ ধরনের অনুজীব। তাই প্রকৃতির সান্নিধ্যে যত বেশি থাকা যায় ততই মঙ্গল। এজন্য সকালের স্বচ্ছ পরিচ্ছন্ন আলো-হাওয়ায় জগিং, হাঁটা বা যেকোনো ব্যায়াম শরীরের জন্য সবদিক থেকেই উপকারী। গ্লাসগো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন, গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মানুষের মনের ওপর এমন প্রভাব ফেলে যে প্রায় ৫০ শতাংশ মানসিক সমস্যা কেটে যায়। শরীরের জন্য মন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরীর ও মন উভয় ভালো রাখতে প্রকৃতি অনেক বড় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া প্রকৃতির সান্নিধ্য পেলে আপনাআপনিই মানুষের মস্তিষ্কের ব্যাটারি রিচার্জ হয়। এর ফলে মস্তিষ্ক অনেক বেশি সৃষ্টিশীল কাজ করতে পারে।
নিজেকে ফিট রাখতে, সুস্থ ও সুঠাম রাখতে দৌড় অদ্বিতীয় একটি ব্যায়াম। বিশেষজ্ঞরা বলেন দিনে ১৫ মিনিট দৌড়ানো কিংবা ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট দ্রুত হাঁটার অভ্যাস জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে। শরীরের প্রতিটি অঙ্গের নড়াচড়ার পাশাপাশি রক্ত সঞ্চালনের গতি থাকে স্বাভাবিক ও বাধাহীন। শারীরিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি এতে মানসিক স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটে। হৃৎপি-, ফুসফুস ও রক্তনালিকে সতেজ ও সাবলীল রাখতে দৌড় অধিক কার্যকর।
শরীরচর্চায় অবিবাহিতরা এগিয়ে
মানবদেহ সুস্থ ও সুন্দর রাখতে ব্যায়াম বা শরীরচর্চা একেবারেই অপরিহার্য। কিন্তু এ কাজটি বিবাহিত নারী-পুরুষরা অবিবাহিত বা তালাকপ্রাপ্তদের তুলনায় কম করে। ফলে বিবাহিতরা তুলনামূলকভাবে মেদবহুল ও স্বাস্থ্যজনিত নানা অসুখ-বিসুখে ভোগে। এছাড়া বিবাহিত পুরুষরা বেশিমাত্রায় অলস হয়ে থাকে। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত গবেষণায় এসব তথ্য জানা গেছে।
গবেষকরা বলছেন, দেহ সুস্থ ও সুন্দর রাখার জন্য প্রাপ্ত বয়স্কদের দিনে অন্তত ১৫ মিনিট ব্যায়াম করা প্রয়োজন। কিন্তু জরিপে দেখা গেছে, প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে গড়ে ২৭ শতাংশ নিয়মমাফিক ব্যায়াম করে। আর বেশিরভাগ বিবাহিত দম্পতিই থাকে ব্যায়াম থেকে দূরে। অবশ্য এর মধ্যেও ব্যায়াম করার ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীরা ১০ শতাংশ এগিয়ে। ১০০ জন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির ওপর এ জরিপ চালান লকবার্গ ইউনিভার্সিটির গবেষকরা। সেখানে দেখা যায় গড়ে ৬৩ শতাংশ নারী এবং ৭৬ শতাংশ পুরুষ নিয়মিত হাঁটাহাঁটি, দৌড়ানো, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা কিংবা খেলাধুলা থেকে দূরে থাকেন। তাদের বেশিরভাগই বিবাহিত। কিন্তু অবিবাহিতরা এসব ক্ষেত্রে এগিয়ে রয়েছেন। তাই বিবাহিতদেরকে নিয়মিত ব্যায়াম ও শরীরচর্চায় আরো এগিয়ে আসতে হবে।
ইয়োগা বা যোগব্যায়াম
ইয়োগা বা যোগব্যায়াম শারীর-বিজ্ঞানের সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। দেহকে নীরোগ, সুস্থ, সবল ও কর্মঠ রাখতে এর গুরুত্ব অপরিসীম। এতে অটুট স্বাস্থ্য ও মজবুত দেহ গড়ার পাশাপাশি যোগ-অভ্যাস করে নানা প্রকার অলৌকিক শক্তি অর্জন করা যায়।
যোগ অর্থ নিজের চেতনা বা অস্তিত্বের বোধ। সংযমপূর্বক সাধনা করে আত্মাকে পরমাত্মার সাথে যুক্ত করে প্রশান্তি লাভকেই বলে যোগ। যোগব্যায়ামের প্রতিটি ক্রিয়ার পেছনেই শরীর ও মনের পর্যবেক্ষণ প্রসূত গভীর জ্ঞানের পরিচয় রয়েছে। অল্পসময়ে দেহের প্রতিটি স্নায়ু, শিরা, গ্রন্থি ও পেশীকে মজবুত করে স্বাস্থ্য অটুট রাখার এবং নীরোগ দেহে দীর্ঘায়ু লাভের নির্দোষ ও অব্যর্থ পদ্ধতি যোগব্যায়াম। যোগব্যায়ামের যে সমস্ত আসন দ্বারা ধ্যান, প্রাণায়াম ও যোগের নানা প্রক্রিয়া অভ্যাস করা হয়, সেগুলো হলো ধ্যানাসন বা যোগাসন। যেমন সিদ্ধাসন, পদ্মাসন, বীরাসন ইত্যাদি। আর যে সমস্ত আসন দ্বারা দেহ নীরোগ-সুস্থ-সবল-কর্মঠ-কষ্টসহিষ্ণু, সমাজ ও সংসারের প্রয়োজন উপযোগী সর্বকর্মে নিয়োজিত করার মতো করে গঠিত হয়, তাকে বলে স্বাস্থ্যাসন। নিয়মিত যোগব্যায়ামে দেহ নমনীয় ও কমনীয় হয় এবং দেহের ক্ষিপ্রতা বৃদ্ধি পায়। কিছু কিছু যোগব্যায়াম আছে, যেগুলো যেকোনো পরিবেশে এবং যেকোনো সময়ে করা যায়। যেমন কপাল ভাতিঃ এ পদ্ধতিতে নাক দিয়ে স্বাভাবিকভাবে প্রশ্বাস নিয়ে জোরে চাপ প্রয়োগ করে নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে হয়; সেই সাথে পেট ভেতরের দিকে টেনে ধরে রাখতে হয়। নিয়মিত এই প্রাণায়াম করলে মস্তিষ্ক ও মুখমন্ডলে কান্তি, তেজ, আভা ও সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়; সমস্ত প্রকারের কফরোগ, হাঁপানী, শ্বাসরোগ, এলার্জি, সাইনাস ইত্যাদি দূর হয়; হার্ট, ফুসফুস ও মস্তিষ্কের রোগ দূর হয়; অতিরিক্ত মোটা, ডায়াবেটিস, গ্যাস্ট্রিক সমস্যা, কোষ্ঠকাঠিন্য, এসিডিটি, কিডনি ও প্রোষ্টেটের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত রোগ দূর হয়; বিনা ঔষধে ডায়াবেটিস নিরাময় করা যেতে পারে; এক মাসে ৪-৮ কেজি পর্যন্ত ওজন কমানো যায়; হার্টের ব্লকেজ খুলতেও এই প্রাণায়াম সাহায্য করে। এটি করলে মন স্থির, শান্ত ও প্রসন্ন থাকে; নেতিবাচক বিচার নষ্ট হয়, ফলে ডিপ্রেশনের হাত থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।
অনুলোম-বিলোমঃ ডান হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি দিয়ে নাকের ডান ছিদ্র বন্ধ করে বাম ছিদ্র দিয়ে শ্বাস গ্রহণ করে এরপর মধ্যমা ও অনামিকা দিয়ে বাম ছিদ্র বন্ধ করে ডান ছিদ্র দিয়ে শ্বাস ত্যাগ করতে হয়। এরপর আবার ডান ছিদ্র দিয়ে শ্বাস নিয়ে তারপর ডান ছিদ্র বন্ধ করে বাম ছিদ্র দিয়ে শ্বাস ছেড়ে আবার বাম ছিদ্র দিয়ে শ্বাস গ্রহণ করতে হয়। এভাবে শ্বাস ত্যাগ ও গ্রহণ একই ছিদ্র পথে পরিচালনা করতে হয়। এই প্রাণায়াম অভ্যাসের ফলে দেহের সমস্ত নাড়ী বিশুদ্ধ হয়; ফলে দেহ পূর্ণ সুস্থ, কান্তিময় ও বলিষ্ঠ হয়ে ওঠে। সন্ধি বাত, আম বাত, কম্প বাত ইত্যাদি সমস্ত রকম বাত রোগ; স্নায়ু দুর্বলতা, মূত্ররোগ, শীত-পিত ইত্যাদি সমস্ত রকম পিত্তরোগ; সর্দি-জ্বর, শ্লেষ্মা, সাইনাস, হাঁপানী, কাশি, টনসিল ইত্যাদি কফ রোগ দূর করে। হার্টের ব্লকেজ খুলে যায়; নিয়মিত অভ্যাসে ৩০%-৪০% ব্লকেজ খুলে যায়। রক্তে কোলেস্টেরল, ট্রাইগ্লিসারাইড জাতীয় ফ্যাটের অনিয়মিততা দূর করে। নেতিবাচক চিন্তায় পরিবর্তন এসে ইতিবাচক মনোভাব বাড়তে থাকে। মানসিক সুখ-শান্তি, আনন্দ, উৎসাহ-উদ্দীপনা, নির্ভয়তা ইত্যাদি বৃদ্ধি পেতে থাকে।
শ্রীলঙ্কার এমপিদের জন্য যোগব্যায়াম
চাপমুক্ত থেকে কাজ-কর্মে যেন শতভাগ মনোনিবেশ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে শ্রীলঙ্কার আইন প্রণেতাদের জন্য কর্মস্থলে যোগব্যায়ামের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যোগব্যায়ামের প্রশিক্ষক চামিন ওয়ার্নাকুলা বলেছেন এমপিরা চাপমুক্ত থেকে যেন কাজ করতে পারেন, সেজন্য যোগব্যায়াম অধিবেশনের আয়োজন করা হয়েছে। এর মাধ্যমে এমপিরা শৃঙ্খখলা, সদাচারণ ও চাপের মধ্যে থেকেও কীভাবে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করা যাবে, সে সম্পর্কে জানতে পারবেন। যোগব্যায়াম অধিবেশনে ভর্তি হওয়া এমপি সঞ্জিবা পেরেরা বলেছেন এমপিরা খুব চাপের মধ্যে কাজ করেন, তাদের ব্যায়াম করার সুযোগ কম। তাই প্রত্যেক পার্লামেন্ট অধিবেশনের শুরুতে এমপিদের জন্য যোগব্যায়াম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হবে। এমপিদের এই যোগব্যায়াম অধিবেশন সম্পর্কে প্রথম ধারণা দানকারী মালানি ফনসেকা বলেন যোগব্যায়ামের মাধ্যমে এমপিরা তাদের শরীরী ভাষা বোঝার ক্ষমতা অর্জন করতে পারলে তাদের মনে শান্তভাব চলে আসবে; পরস্পরের সাথে বাক-বিতন্ডা কম হবে। ফলে তারা চাপমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারবে।
চলবে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ