বিশেষ খবর

যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও আমাদের মন পড়ে থাকে বাংলাদেশে- মিয়া মনিরুল আলম

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ প্রতিবেদন

যেসব ব্যক্তিত্বের অর্জন ও সাফল্যের আলো ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময় এবং আলোকিত করে দেশ ও জাতিকে, তেমনি এক বিরল প্রতিভার অধিকারী মিয়া মনিরুল আলম। কঠোর অধ্যবসায়, দক্ষতা, সততা ও ব্যবসায়িক দূরদৃষ্টির মাধ্যমে তিনি বাংলাদেশ ছাড়িয়ে সুদূর যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নিজকে সফলভাবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক ড. এম হেলাল যুক্তরাজ্য সফরকালীন এই প্রবীণ কমিউনিটি লিডার, সফল সংগঠক ও লন্ডনস্থ ইউরোবাংলা পত্রিকার বোর্ড অব ডাইরেক্টরস-এর চেয়ারম্যানের সাথে তাঁর একান্ত মতবিনিময় হয়। এই গুণী ব্যক্তিত্বের আলাপচারিতার উল্লেখযোগ্য অংশবিশেষ পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হলো। ২০১৫ সালে নেয়া এ সাক্ষাৎকারটি ঐ সময়ের পদবী ও পরিচয়ে হুবহু ছাপানো হয়। বর্তমান সময়ের পদবী ও পরিচয় পরিবর্তন করা হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসঃ যুক্তরাজ্যে বসবাস করতে আপনার কেমন লাগছে?
মিয়া মনিরুল আলমঃ যুক্তরাজ্যে বসবাস করতে আমার ভাল লাগছে। আমি যেখানে বসবাস করি সেটি একটি চমৎকার এলাকা, একেবারে নীরব এলাকা। আমি মনে করি, একটি ভাল এরিয়াতে আমি বাস করছি।

বি ক্যাঃ বাংলাদেশের তুলনায় যুক্তরাজ্যের কোন্ কোন্ বিষয় আপনার ভাল লাগছে?
মিয়া মনিরুলঃ বাংলাদেশ আমার দেশ, আমার মায়ের দেশ, আমাদের মাতৃভূমি। সেজন্য বাংলাদেশ আমার ভাল লাগবে এটাই স্বাভাবিক। তবে বাংলাদেশের পরিবেশ ও যুক্তরাজ্যের পরিবেশের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। আমি যেহেতু এখানে নিজকে খাপ খাইয়ে নিয়েছি সেহেতু আমার কাছে যুক্তরাজ্যও ভাল লাগে, বাংলাদেশও ভাল লাগে। তবে বাংলাদেশে সময়ের মূল্যায়ন নেই। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকা কার্যালয়ে সময়ের মূল্যায়ন করতে দেখেছি। যুক্তরাজ্যে ব্যস্ততা থাকলেও আমরা সময় মেনে চলি।
বি ক্যাঃ বাংলাদেশ সম্পর্কে ব্রিটেনের মূল অধিবাসীদের ধারণা কিরূপ?
মিয়া মনিরুলঃ যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন স্থানের পরিবেশ বিভিন্ন রকম। বাংলাদেশ সম্পর্কে ব্রিটেনের মূল অধিবাসীদের ধারণা হচ্ছে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ, গরিব দেশ, সেখানের রাজনীতিবিদগণ দুর্নীতিপরায়ণ এবং বাংলাদেশিরা সময়ের মূল্য দিতে জানে না।
বি ক্যাঃ বাংলাদেশের সাথে কতটা এবং কীভাবে যোগাযোগ রক্ষা করছেন?
মিয়া মনিরুলঃ বাংলাদেশের লোকাল রাজনীতি ও যুক্তরাজ্যের প্রত্যেক এরিয়ার রাজনীতিতে আমরা জড়িত রয়েছি। আমরা যুক্তরাজ্যস্থ বাংলাদেশীদের উৎসাহিত করছি যুক্তরাজ্যের মূল রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্ত হতে। একইভাবে আমরা বাংলাদেশের সাথেও যোগাযোগ রক্ষা করে যাচ্ছি এবং রাজনৈতিক দলগুলোর সাথেও আমরা জড়িত রয়েছি।
বি ক্যাঃ দেশের কল্যাণে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী বাঙালিদের কী ভূমিকা রয়েছে বলে আপনি মনে করেন?
মিয়া মনিরুলঃ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন আমি ইংল্যান্ডে ছিলাম। তখন এখানে আমাদের লোক সংখ্যা খুব কম ছিল। তারপরও আমরা সংগঠিত হয়ে এখান থেকে অনেক অর্থ-সম্পদ সংগ্রহ করে দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের দিয়েছি। এখনও আমরা সেইভাবে দেশের কথা চিন্তা করি। আমরা বাংলাদেশি, আমাদের প্রাণটাও বাংলাদেশি। অর্থাৎ আমরা যুক্তরাজ্যে বসবাস করলেও আমাদের মন পড়ে থাকে বাংলাদেশে। আমরা আমাদের মাতৃভূমি সম্পর্কে অত্যন্ত সজাগ।
বি ক্যাঃ যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশিদের উল্লেখযোগ্য কী কী সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রয়েছে?
মিয়া মনিরুলঃ আমি মনে করি, যুক্তরাজ্যে আমাদের যে সংগঠন রয়েছে বাংলাদেশেও আমাদের এতো সংগঠন নেই। এখানে সব ধরনের সংগঠনই আমাদের রয়েছে। আনন্দের কথা হচ্ছে এখানে ইসলামিক দিক দিয়েও আমরা অনেক এগিয়ে গেছি। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরাও আমাদের ধর্মীয় বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করছে।
বি ক্যাঃ এসব সংগঠন বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তি বা স্বার্থ সংরক্ষণে কী ভূমিকা রাখছে?
মিয়া মনিরুলঃ যুক্তরাজ্যে ইহুদীদের চেয়ে বাংলাদেশি মুসলমান অনেক বেশি আছে। আমরা মুসলমানরা এখানে সংগঠিত। ইদানিং এখানে মুসলমানদের সমস্যা হচ্ছে। যেমন-দাঁড়িওয়ালা কাউকে দেখলে সন্ত্রাসী হিসেবে মনে করে। আমি এটাকে মহা সমস্যা মনে না করলেও এটি একটি সমস্যা। আশা করি, এরও সমাধান হবে। আমি প্রতিমাসে একবার ট্যুরিস্ট এন্ড কমিউনিটি মিটিং ডাকি। সেখানেও তারা চিন্তা করছে কিভাবে এক সাথে বসবাস করা যায়, সমঝোতা করা যায় এবং অধিকার বাস্তবায়ন করা যায়। এতসব কিছুর পরও এখানে সাদারা আমাদের সাথে মিলে মিশে চলছে।
বি ক্যাঃ এখানে বসবাসরত বাংলাদেশি নতুন প্রজন্ম আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য কতটুকু জানার ও লালন করার সুযোগ পাচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?
মিয়া মনিরুলঃ যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি নতুন প্রজন্মদের যদি সময়-সুযোগ করে বাংলাদেশে না নেয়া যায়, তাহলে ভবিষ্যতে আর তারা বাংলাদেশে যেতে চাইবে না। এখানে প্রতিবছর ৮ থেকে ১০ হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে বাংলাদেশি কমিউনিটি থেকে। বাংলাদেশে যদি শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বজায় রাখা যায় তবে প্রতি বছর ছুটিতে অনেক ছেলেমেয়ে বাংলাদেশে গিয়ে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও শিল্প-সংস্কৃতি জানার সুযোগ পাবে এবং একটি ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বাংলাদেশে তাদের ভূমিকা রাখতে পারবে।
বি ক্যাঃ ব্রিটেনের প্রেস-মিডিয়ার সাথে বাংলাদেশের প্রেস-মিডিয়ার তুলনামূলক আলোচনা করবেন কী?
মিয়া মনিরুলঃ সরকারিভাবে ব্রিটেনের প্রেস-মিডিয়ার সাথে বাংলাদেশের প্রেস-মিডিয়ার কোনো পার্থক্য নেই। তবে বেসরকারি পর্যায়ে এই সেক্টরে অনেক অগ্রগতি হয়েছে।
বি ক্যাঃ যুক্তরাজ্যে বাংলা ভাষাভাষী পত্রিকা ও টিভি চ্যানেলগুলো প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ সংরক্ষণে কী ধরনের ভূমিকা রাখছে?
মিয়া মনিরুলঃ যুক্তরাজ্যে এখন বাংলাভাষার অনেক পত্রিকা আছে। যেমন- ইউরোবাংলা, বাংলা পোস্ট ও জনমত ছাড়া আরো বেশ ক’টি বাংলা পত্রিকা আমাদের কমিউনিটির ভাল সার্ভিস দিচ্ছে। এছাড়া এস টিভি বাংলাদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরছে।
বি ক্যাঃ যুক্তরাজ্য প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটি সার্ভিসের পাশাপাশি বাংলাদেশিদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি বা স্বার্থ সংরক্ষণে এসব মিডিয়া কোন ভূমিকা পালন করে বলে কী আপনি মনে করেন?
মিয়া মনিরুলঃ বাংলাদেশি কমিউনিটি সার্ভিসের পাশাপাশি এসব মিডিয়া বাংলাদেশি সংস্কৃতি ও স্বার্থ সংরক্ষণে ইদানিং কিছু কিছু কাজ করছে।
বি ক্যাঃ ব্রিটেনের অভিবাসন প্রক্রিয়া বা মাইগ্রেশন সম্পর্কে কিছু বলবেন কী?
মিয়া মনিরুলঃ বৈধ মাইগ্রেশনের ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। যেমন যেসব ছাত্র-ছাত্রী বৈধ কাগজপত্র নিয়ে যুক্তরাজ্যে পড়াশোনা করতে আসছে তাদের কোনো সমস্যা হচ্ছে না। ইদানিং কিছু কিছু ক্ষেত্রে কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে। এখন ওয়ার্কিং হলিডে নামে একটি সুন্দর প্রক্রিয়া চালু করা হয়েছে।
বি ক্যাঃ যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের মধ্যকার রাজনীতি ও রাজনীতিবিদদের বিশেষ কোনো পার্থক্য আপনি লক্ষ্য করছেন কী?
মিয়া মনিরুলঃ বাংলাদেশের রাজনীতিবিদগণ মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সাধারণ জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে তাদের কোনো কাজ করেন না। বরং তাদের সাথে প্রতারণা করেন। কিন্তু যুক্তরাজ্যের রাজনীতিবিদদের মধ্যে এধরনের প্রতারণা লক্ষ্য করা যায় না। যুক্তরাজ্যের রাজনীতি হচ্ছে জনগণের জন্য, জাতির জন্য ও দেশের কল্যাণে নিবেদিত।
বি ক্যাঃ ব্রিটেনে বসবাসকারী বাঙালিরা বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোকে কোন্ দৃষ্টিতে দেখেন?
মিয়া মনিরুলঃ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীকে আমাদের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনে করি। এরপরও আমরা ব্যক্তিগতভাবে কোনো না কোনো দলকে সমর্থন করি। কিন্তু আমাদের সমর্থন দেয়ার কথা চলমান সরকারকে, যারা সততা ও দক্ষতার সাথে দেশ পরিচালনা করবে। তবে সৎ ব্যক্তিদের প্রতি আবেদন জানাচ্ছি দেশের মঙ্গলে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসুন।
বি ক্যাঃ বাংলাদেশী ও ভারতীয় প্রবাসী নাগরিকরা সাধারণত ব্রিটেনের লেবার পার্টিকে সমর্থন করেন, এর কারণ কী বলে আপনি মনে করেন?
মিয়া মনিরুলঃ আমি কনজারভেটিভ পার্টিকে সমর্থন করি। কিন্তু বাংলাদেশি ও ভারতীয়দের কেউ কেউ লেবার পার্টিকে সমর্থন করেন। তারা যাচাই বাছাই না করেই হয়তো মনে করেন লেবার পার্টি তাদের জন্য ভাল হবে। এভাবেই তারা চলে আসছে।
বি ক্যাঃ যুক্তরাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে আমাদের কী কী শিক্ষণীয় রয়েছে?
মিয়া মনিরুলঃ বাংলাদেশের আগের শিক্ষাব্যবস্থার চেয়ে এখনকার শিক্ষাব্যবস্থা অনেক উন্নত হয়েছে। বাংলাদেশ থেকে এখন যেসব ছেলেমেয়ে যুক্তরাজ্যে আসছে তাদের মান এখানকার ছেলেমেয়েদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটা উন্নত হয়েছে।
বি ক্যাঃ ব্রিটেনে চাকরির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কোন্ কোন্ শ্রেণির পেশাজীবীদের সুযোগ রয়েছে?
মিয়া মনিরুলঃ বাংলাদেশের ছেলেমেয়েরা ব্রিটেনে ভাল ভাল চাকরি করছে। এমনকি তারা ৮০ হাজার পাউন্ড থেকে শুরু করে ১ লক্ষ ২০ হাজার পাউন্ডেরও চাকরি করছে।
বি ক্যাঃ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যুক্তরাজ্যে এসে কী ধরনের সমস্যায় পড়ে থাকে? এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণে কী করা উচিৎ বলে আপনি মনে করেন?
মিয়া মনিরুলঃ অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল যেসব শিক্ষার্থী পড়াশোনার মনোভাব নিয়ে যুক্তরাজ্যে আসে তাদের কোনো সমস্যায় পড়তে হয় না। কিন্তু যদি পড়ার পাশাপাশি অর্থ উপার্জনের চিন্তাভাবনা থাকে তাহলে সমস্যা হতে পারে। এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণে পড়াশোনাকে প্রধান্য দেয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি, অন্যদিকে মনোযোগ না দিয়ে যদি পড়াশোনা করে তবে ভাল ডিগ্রি অর্জন করতে পারবে, যুক্তরাজ্যের ছেলেমেয়েদের সাথে প্রতিযোগিতা করে তারা ভাল চাকরি করতে পারবে এবং কাজের কোনো সমস্যা হবে না।
বি ক্যাঃ আপনি কী উদ্দেশ্য নিয়ে ইউরো বাংলা প্রকাশ করেন এবং সে উদ্দেশ্য সফল হয়েছে কী?
মিয়া মনিরুলঃ ইউরোবাংলা পত্রিকা প্রকাশনার ৭ বছর চলছে। আমরা কমিউনিটি এ্যাওয়ারনেস তুলে ধরার জন্য এই পত্রিকা প্রকাশ করছি। তাছাড়া পত্রিকা প্রকাশনার পেছনে আমাদের কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য পূর্বেও ছিল না, এখনও নেই। ইউরোবাংলা হচ্ছে সম্পূর্ণ স্বাধীন ও স্বতন্ত্র পত্রিকা। আমাদের মোটিভ হচ্ছে কমিউনিটির সেবা করা।
বি ক্যাঃ বাংলাদেশের ছাত্র-যুবকদের উদ্দেশে আপনার পরামর্শ জানতে চাচ্ছি।
মিয়া মনিরুলঃ ছাত্র-যুবকদের উদ্দেশে আমার পরামর্শ হচ্ছে শিক্ষা গ্রহণ করে নিজেদেরকে গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। আর অভিভাবকদের প্রতি আমার আবেদন লক্ষ-কোটি টাকার প্রয়োজন নেই, আপনারা নিজেদের সন্তানদের পড়ালেখা শিখিয়ে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলুন।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ