উচ্চশিক্ষার মুখ্য উদ্দ্যেশ্য হলো বাজার উপযোগী জনশক্তি প্রস্তুত ও তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। আর এ জনশক্তি বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার জন্য কল্যাণকর। শিল্প এবং শিল্পের উৎপাদিত পণ্যের সর্বোচ্চ মান নিয়ন্ত্রণের জন্য ৮০`র দশক থেকেই পৃথিবীব্যাপী শুরু হয়েছে নানাবিধ শিল্পের বেসরকারিকরণ। শিক্ষাও একটি শিল্প। এটিরও বেসরকারিকরণ হয়েছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অষ্ট্রেলিয়া, কানাডা এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে উচ্চশিক্ষার বেসরকারিকরণ লক্ষ্য করার মত। তারই সূত্র ধরে বাংলাদেশেও উচ্চশিক্ষার বেসরকারিকরণ হয়েছে এবং হচ্ছে। কর্মক্ষম জনশক্তি তৈরিতে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভূমিকাকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। দেশের দ্রুত বর্ধনশীল উচ্চশিক্ষার চাহিদা মেটানোর জন্য সরকারি পর্যায়ের পাশাপাশি বেসরকারি সেক্টরের অবদান অবশ্যই অনস্বীকার্য।
উচ্চশিক্ষা বিষয়ে টঘঊঝঈঙ`র ২০০৯ সালের বিশ্ব সম্মেলনের জন্য যে প্রতিবেদনটি তৈরি হয়েছিলো, তার শিরোনাম ছিলো Trends in Global Higher Education: Tracking an Academic Revolution. বিশ্বব্যাপী অর্থনীতির নজিরবিহীন গতিপরিবর্তন ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে প্রতিবেদনটি বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রে পালাবদলের জোরালো ইঙ্গিত দিয়েছিলো। এ রকম অবস্থা পরবর্তীতে শিল্প-অর্থনীতির গতিধারাকে পাল্টে দিয়ে পরিসেবামূলক শিল্প ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির বিকাশের ক্ষেত্রে বর্তমানে ভূমিকা রাখছে। এটি উচ্চশিক্ষার চাহিদা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও তুলনাহীন ভূমিকা রাখছে। এটাকে বলা যায় উচ্চশিক্ষার গণতন্ত্রায়ন।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে বেসরকারিকরণের বৈপ্লবিক পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন হলো নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং দীর্ঘ সময় নিয়ে এর ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো চিহ্নিতকরণ এবং তা থেকে উত্তরণের উপায়সমূহ বের করণ। এ বৈপ্লবিক পরিবর্তনকে কার্যকর করার স্বার্থেই নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। বেসরকারিকরণের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষাকে প্রতিযোগিতামূলক করবার ক্ষেত্রে গোটা বিশ্বই একটি নতুন অভিজ্ঞতার সম্মূখীন হয়েছে, এ অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের একার নয়।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে `দ্য কমনওয়েলথ অব লার্নিং` এর প্রেসিডেন্ট ও সিইও জন ডানিয়েল উন্মুক্ত ও দূরশিক্ষণের উপর জোর দেন। উচ্চশিক্ষার বেসরকারিকরণ তথা এ বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কন্টকাকীর্ণ পথ পাড়ি দেয়ার জন্য `প্রযুক্তিগত রূপান্তরের অঙ্গীকার` গ্রহণ করার জন্য তিনি সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। তিনি বলেছেন, শিক্ষা তথা উচ্চশিক্ষাকে মান সম্মত করা এবং এটিকে সম্পদে পরিণত করতে হলে এটি হবে ব্যয় সাপেক্ষ। খরচ হ্রাস করতে চাইলে প্রাপ্তি ও মানের ক্ষেত্রে অনিবার্য ঝুঁকিতে পড়তে হবে।
ড্যানিয়েল আরো বলেন, প্রযুক্তি ব্যবহার করে বেশি অর্জন করা যায়, উচ্চ মান লাভ করা যায় এবং একই সাথে খরচও কমানো যায়। এটিই একটি বিপ্লব। যা পূর্বে কখনো ঘটেনি। তিনি উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সফলতার কথা তুলে ধরেন (যেমন- ইন্দিরা গান্ধী উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়)। তিনি সাম্প্রতিক প্রযুক্তিগত অগ্রগতির উৎকর্ষতার উদাহরণস্বরূপ এমআইটি`র উন্মুক্ত শিক্ষামূলক প্রোগ্রামগুলোর কথা তুলে ধরেন। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয় বহু আউট-ক্যাম্পাসের সমন্বয়ে। এমআইটি তাদের আউট-ক্যাম্পাসের কাজকে ত্বরান্বিত করবার জন্য এর পরিপূর্ণ ডিজিটাইজেশন করেছেন অর্থাৎ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করেছেন।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রীর `ডিজিটাল বাংলাদেশ` ঘোষণা একটি যুগান্তকারী ঘোষণা। এই একটি সাহসী এবং উচ্চাভিলাষী উচ্চারণ দেশটিকে সমসাময়িক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে সাহায্য করছে। সার্ভিস সেক্টরের প্রতিটি অধ্যায়ে আজ ডিজিটাইজেশন জরুরী। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই দূরদর্শী চিন্তার ফলে দেশের প্রতিটি সেক্টরে আজ শুরু হয়েছে ডিজিটাইজেশন বা ডিজিটালকরণ। উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রের `বেসরকারিকরণ` বিপ্লবকে সত্যিকার রূপ দিতে গেলে এটির `ডিজিটালকরণ`-এর বিকল্প নেই।
গরীব ও মধ্য আয়ের দেশগুলোতে বর্তমানে পরিচালিত উচ্চশিক্ষা বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করবার জন্য যেমন সময় বাঁচাতে হবে তেমনি অনুৎপাদনশীল ক্ষেত্রে অযথা পয়সা খরচ করা থেকেও বিরত থাকতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পদ/রিসোর্স ব্যবহার করবার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহারকে সামনে নিয়ে আসতে হবে। দেখা গেছে, ছাত্র আন্দোলনের কারনে, ধর্মঘটের কারনে, হরতাল ইত্যাদির কারনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্লাস হয় না। নির্ধারিত সময়ে কোর্সও শেষ হয় না, বরং সেশনজট বাড়তে থাকে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও যে সব সময় ক্লাস নেওয়া সম্ভব হচ্ছে তা নয়, কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগণ নির্ধারিত সময়ে তাদের কোর্স সম্পন্ন করবার জন্য বাসায় বসে সেল ফোন থেকে কোর্স আউট লাইন ছাত্রদের কাছে অনলাইনে পাঠাচ্ছেন এবং ছাত্ররা বাসায় বসে তা ডাউনলোড করে পড়াশুনা করছে, এমনকি অনলাইনে পরীক্ষাও দিচ্ছে। এতে দেখা যাচ্ছে শ্রেণিকক্ষে বসেই পড়াশুনা করতে হবে বিষয়টি তা নয়। শ্রেণিকক্ষের বাইরেও পড়াশুনা হতে পারে এবং হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে বাংলাদেশ শিক্ষায় উন্নয়ন করছে। এখানে উচ্চশিক্ষার বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করবার জন্য গবেষনা ও উন্নয়ন, দক্ষ শিক্ষক, পাঠদান পরিবেশ, সহ-পাঠ্যানুক্রমিক কর্মকান্ড/ক্লাব, শিক্ষার মান এবং গ্র্যাজুয়েটদের কর্ম যোগ্যতাকে অত্যাধিক গুরুত্বারোপ করতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ করে বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে শিক্ষার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র ভৌত কাঠামোকে অগ্রাধিকার দেয়া নয়, শুধু তদারকি নয়, নিছক গ্রাজুয়েট তৈরি নয়; বরং জাতির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির লক্ষ্যে প্রযুক্তির যথোপযুক্ত ব্যবহারকে গুরুত্ব দিতে হবে সবার আগে।
- লেখকঃ প্রফেসর, আইবিএ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; চেয়ারম্যান, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ট্রাস্ট, উপাচার্য, নর্দান ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজি খুলনা " /> উচ্চশিক্ষার গনতন্ত্রায়ণ
বিশেষ খবর

উচ্চশিক্ষার গনতন্ত্রায়ণ

ক্যাম্পাস ডেস্ক মতামত

উচ্চশিক্ষার মুখ্য উদ্দ্যেশ্য হলো বাজার উপযোগী জনশক্তি প্রস্তুত ও তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। আর এ জনশক্তি বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার জন্য কল্যাণকর। শিল্প এবং শিল্পের উৎপাদিত


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ