বিশেষ খবর

ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ কী!

ক্যাম্পাস ডেস্ক মতামত

বছর কয়েক আগে একটি জাতীয় দৈনিকে ছাত্রনেতা বা ছাত্ররাজনীতি নিয়ে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন করে। ২০১২ সালের ১৯ ডিসেম্বর প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনটির শিরোনাম ছিল ‘ছাত্রনেতা হলেই ধনী’। উপশিরোনাম ছিল দুটি- ‘ছাত্রলীগঃ সোনার ডিমপাড়া হাঁস’ এবং ‘ছাত্রদল নেতাদের বিলাসী জীবন’। নিচে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের চার-পাঁচজন নেতার ছবিও দেয়া হয়। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর আমাদের দেশের ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্রনেতাদের নিয়ে নতুন করে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। সম্ভবত ক্ষমতাবলয়ের বাইরে থাকায় এ নিয়ে বিএনপির অঙ্গসংগঠন ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা বলতে গেলে নিশ্চুপই ছিলেন- বিএনপি ক্ষমতায় থাকলে এ ধরনের কোনো ইস্যুতে ছাত্রদলের আস্ফালনের বিপরীতে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সাধারণত ঠিক যেভাবে নীরব থাকেন।
১৯৭৫ সাল থেকে বলতে গেলে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত আমি পর পর ঐতিহ্যবাহী তিনটি কলেজে এবং সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত পড়াশোনা করি। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবনের কোনো স্তরে কোনোভাবেই ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সরাসরি আমার সংশ্লিষ্টতা ছিল না। তবে স্কুলজীবনে ষাটের দশকে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে সতীর্থদের সঙ্গে সীমাহীন আবেগ ও উৎসাহ নিয়ে ছাত্রমিছিলে যোগ দিয়েছি। কিশোর বয়সে প্রগতিশীল একটি ছাত্রসংগঠনের সক্রিয় একজন কর্মী হিসেবে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীনতা লাভের অব্যবহিত পর নিজের কিছু কর্মতৎপরতার জন্য আমি সব সময় খুবই গর্ব বোধ করি। 
কাজেই বলা যায়, শিক্ষাজীবনে নানাভাবে ছাত্ররাজনীতি, ছাত্রসংগঠন ও ছাত্রনেতাদের সম্পর্কে কিছুটা হলেও অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের সুযোগ হয়েছিল আমার। আর বিগত তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে শিক্ষকতাজীবনে ছোট-বড় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখা ছাত্ররাজনীতির গতি-প্রকৃতি, স্বরূপ-বৈশিষ্ট্য এবং সময় সময় ব্যক্তিগতভাবে অর্জন করা অম্ল-মধুর অভিজ্ঞতা তো প্রায় প্রতিনিয়তই মনের মাঝে অনুরণিত হয়।
নব্বইয়ের দশকে আমাদের ছাত্রনেতারা নিজেদের উপর্যুপরি নেতিবাচক কার্যকলাপের জন্য দেশব্যাপী দারুণভাবে সমালোচনার সম্মুখীন হন। ছাত্ররাজনীতির ভয়াবহ পরিস্থিতি এবং এর পরিণাম সম্পর্কে পত্রপত্রিকায় অনেক লেখালেখি, আলোচনা ও সমালোচনা চলে। 
সুশীল সমাজের অনেকেই বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতি থাকাকালে (১৯৯৬-২০০১) অনেকবার প্রদত্ত ভাষণে ছাত্ররাজনীতির ভয়াবহ পরিণাম সম্পর্কে নিজের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন। জাতির বিবেকের মতো যেখানেই যখন সুযোগ পেয়েছেন সেখানেই তিনি শিক্ষাঙ্গনের নৈরাজ্য এবং ছাত্ররাজনীতির ভয়াবহ পরিস্থিতি সম্পর্কে মন্তব্য করতে দ্বিধা করেননি। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সাময়িককালের জন্য হলেও ছাত্ররাজনীতি বন্ধ করে দিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি বারবার আহ্বান জানান তিনি। 
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ছাত্ররাজনীতির ব্যাপারে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ অভিমত, মন্তব্য ও আহ্বান সে সময় সচেতন সব মহলে ব্যাপক আশার সঞ্চার করলেও বড় রাজনৈতিক দলগুলোয় ইতিবাচক সাড়া জাগাতে ব্যর্থ হয়।
স্বীকার করতেই হবে যে বড় রাজনৈতিক দলগুলো, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দেশকে এবং দেশের মানুষকে অনেক কিছু দিয়েছে। কোনোভাবেই বিস্মৃত হয়ে থাকা যাবে না জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আন্দোলন-সংগ্রামের মাহেন্দ্রক্ষণগুলোতে ঐতিহ্যবাহী সংগঠন ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের গৌরবময় ভূমিকার কথা। 
একটি ক্ষেত্রে ক্ষমতাপিয়াসি উভয় দলেরই দেউলিয়াপনা ও দীনতার কথাটি ভাবলে মনে সত্যি সত্যিই করুণার উদ্রেক হয়। নানাভাবে নষ্ট-ভ্রষ্ট ছাত্ররাজনীতির ওপর ভর না করে কখনো যে সহজে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া যাবে না কিংবা কোনো না কোনোভাবে অধিষ্ঠিত হলেও বেশি দিন অবস্থান করা যাবে না, তা এত দিনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই দলেরই নেতাদের বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গেছে। আর এই দুর্বলতার সুযোগটিই সব সময় লুফে নেন চরম স্বার্থান্বেষী ও সুযোগসন্ধানী মতলববাজ ছাত্রনেতারা। অনেক ছাত্রনেতাই দলের জন্য একেবারে বিষফোড়া। দল ক্ষমতায় থাকলে সব সময়ই হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায় তাদের ঔদ্ধত্য ও আস্ফালন। এ যেন ‘দলের ভেতরে দল’, ‘সরকারের ভেতরে সরকার’, এমনকি বলা যায় ‘রাষ্ট্রের ভেতরে রাষ্ট্র’। 
দীর্ঘ স্বৈরশাসনের পর ১৯৯১ সালে সংসদীয় শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর থেকে মূলত এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও দুর্ভাবনার বিষয় হলো, এসব কিছুর মাত্রাটি কিন্তু দিনের পর দিন (কোনো রকম ব্যতিক্রম ছাড়া) কেবল বেড়েই চলেছে। 
আশঙ্কার ব্যাপার হচ্ছে, অন্য কেউ তো দূরের কথা, নিজ দলের নেতাদের কথা, এমনকি শীর্ষ নেতার কথাও তাঁরা শুনতে চান না, শোনেন না। বঙ্গবন্ধুর মতো কিংবা তাঁর কাছাকাছি স্তরের এমন কোনো নেতার অভ্যুদয়েরও তো কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, যিনি তর্জনী উঁচিয়ে বেপরোয়া ছাত্রনেতাদের উদ্দেশে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলবেন, ‘আর যদি একটি গুলি চলে... ’। এমন ছাত্ররাজনীতির ভবিষ্যৎ কী? 
-বিমল সরকার


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ