বিশেষ খবর

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সচিবের ক্ষমতায় লাগাম

ক্যাম্পাস ডেস্ক সংবাদ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে অবশেষে শিক্ষা সচিবের স্বেচ্ছাচারিতার লাগাম টানা হচ্ছে। তাকে সব ধরনের বদলি, সিন্ধান্ত গ্রহণ ও নীতিনির্ধারণী কার্যক্রম গ্রহণ থেকে দূরে রাখার সিন্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এখন থেকে সরকারি কলেজের শিক্ষক বদলিতেও কোনো হস্তক্ষেপ করতে পারবে না সচিব।
জানা যায়, এবার কলেজ ভর্তি নিয়ে চলমান নৈরাজ্য ছাড়াও গত এক বছরে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত সচিব এককভাবে গ্রহণ করার ফলে সমালোচনার মুখে পড়ে মন্ত্রণালয় ও সরকার। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়াই একাদশ শ্রেণিতে মেধার ভিত্তিতে অনলাইনে আবেদনে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করার পর মেধাতালিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে ব্যাপক জটিলতার সৃষ্টি হয়। পূর্ব-প্রস্তুতি ছাড়া ভর্তির এমন সিদ্ধান্তে শিক্ষার্থীদের পোহাতে হয় চরম বিড়ম্বনা। ইতোমধ্যে বিড়ম্বনার এ দায়ও স্বীকার করেন শিক্ষাসচিব। 
এছাড়া, মন্ত্রীকে পাশকাটিয়ে অন্তত ৮টি পরিপত্র ও আদেশ জারি করা হয়, যা নিয়ে শিক্ষা সেক্টরে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ায় এক পর্যায়ে সেই সিদ্ধান্তগুলো বাতিল করতে হয় মন্ত্রণালয়কে। এরমধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই অনার্স এ ভর্তির পদ্ধতি জারি করার ফলে উপাচার্যগণ ব্যাপক আপত্তি জানিয়েছিলেন। 
কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতাও দেখা দেয়। পরে সেই পরিপত্র বাতিল করা হয়। এরপর পরিপত্র জারি করা হয় যে, পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য নির্বাচনী পরীক্ষায় পাস করা বাধ্যতামূলক নয়। এই পরিপত্রও পড়েছে সমালোচনা ও প্রতিবাদের মুখে। এরপরে সকল স্কুল-কলেজে সাঁতার বাধ্যতামূলক করে পরিপত্র জারি করেন সচিব। সাঁতারের ব্যবস্থা আছে কিনা, কোথায় সাঁতার কাটবে, নিরাপত্তা আছে কিনা, সাঁতারের পানিতে থাকা কেমিক্যাল শিশু-তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য কতটা ক্ষতিকর হবে -এরুপ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে  ছড়িয়ে পড়ে অসন্তোষ। 
এই বহু অবিবেচ্য কর্মকা-ের কারণে গৌরোবজ্জ্বল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ভাবমূর্তি তলানিতে নামে। 
শিক্ষা প্রশাসনের একটি সূত্রে জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরে লাগামহীনভাবে চলা শিক্ষা সচিবের স্বেচ্ছাচারিতার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের সঙ্গে জাতীয় সংসদ ভবনে প্রায় এক ঘণ্টা কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি এ সময় শিক্ষামন্ত্রীকে বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা প্রদান করেন। 
প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রণালয়ের সকল বিষয়ে সিন্ধান্ত গ্রহণ থেকে সচিবকে বিরত রাখার নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানা যায়।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার আলোকে সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের জন্য কয়েকটি জরুরি নির্দেশনা জারি করেন শিক্ষামন্ত্রী। অত্যন্ত গোপনীয়ভাবে জারি করা এই নির্দেশনার কোনো ফটোকপি কর্মকর্তাদের না দিয়ে তা দেখিয়ে (পড়ে দেখা) স্বাক্ষর নেয়া হয়। 
এ ক্ষেত্রে মন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনাসমূহ উপসচিব, যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিবদের জানিয়ে দেন যুগ্মসচিব (অর্থ ও প্রশাসন) আমিনুল ইসলাম খান। 
শিক্ষামন্ত্রী স্বাক্ষরিত নির্দেশনার এক জায়গায় বলা হয়েছে, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে আমার সার্বিক বিষয়ে কথা হয়েছে, তিনিই ডেকে বলে দিয়েছেন মন্ত্রণালয়ের সকল সিদ্ধান্ত মন্ত্রী চূড়ান্ত করবেন। আমাকে না জানিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা যাবে না।’
নির্দেশনা জারির কথা স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, ‘রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী মন্ত্রণালয়ের সব প্রশাসনিক ক্ষমতা মন্ত্রীর। আইন-কানুন জানা প্রত্যেক ব্যক্তি বিষয়টি জানেন। নতুন করে এটি মনে করিয়ে দেয়ার কিছু নেই। কিন্তু তার পরও সংসদে এবং আমার সংসদীয় এলাকার কাজে আমার ব্যস্ত থাকার সুবাদে আমাকে না জানিয়ে কেউ যাতে কোনো সিদ্ধান্ত না নেন সে বিষয়ে আমার পিএসকে একটি নোট দিয়েছিলাম। পিএস সেটি সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন।’


শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা জারির পর স্বস্তিতে কর্মকর্তা কর্মচারীরা
নীতিগ্রহণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা জারির পর স্বস্তিতে আছেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। নির্দেশনা জারির আগে অস্বস্তিতে ছিলেন বলে দাবি তাদের। এদিকে শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খানের একক কর্তৃত্ব খর্ব করে নির্দেশনা জারি নিয়ে কোনো ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। আর অসুস্থ থাকার তথ্য দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি শিক্ষা সচিব নজরুল ইসলাম খান।
ঘটনার পর থেকেই ৮ জুলাই সংশ্লিষ্টদের বিশেষত গণমাধ্যমের বিশেষ নজর ছিল সচিবের প্রতি। সচিবালয়ে এক সভা শেষে তড়িঘড়ি সংসদের উদ্দেশে বের হয়ে যাচ্ছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। এ সময় সাংবাদিকরা তার কাছে জানতে চান- মন্ত্রণালয়ে নির্দেশনা জারির পর এ নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি হয়েছে কি না? মন্ত্রী লিফটে ওঠার ঠিক আগ মুহূর্তে বলেন, ধোঁয়াশা কোথায় পেলেন? কোনো ধোঁয়াশাই সৃষ্টি হয়নি। 
এরপরই মন্ত্রীর দফতরে আসেন সচিব। মন্ত্রীকে না পেয়ে নিজের কক্ষে যাওয়ার সময় সাংবাদিকরা কথা বলতে চাইলে তিনি বলেন ‘কাজে ব্যস্ত’। এ সময় তাকে খানিকটা বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমের ডজনখানেক প্রতিবেদক সচিবের সাক্ষাত চেয়ে তার কক্ষে ভিজিটং কার্ড পাঠান। সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মোঃ মনিরুল ইসলাম মিলন কার্ডগুলো ফেরত দিয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্যার বিনীতভাবে বলেছেন তার শরীর ভাল নয়, তিনি সাক্ষাৎ দিতে পারছেন না, তিনি অসুস্থ। এর আগে মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের সঙ্গে মন্ত্রীর যে সভা ছিল সেখানেও দেখা যায়নি শিক্ষা সচিবকে। 
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রস্তাবিত অষ্টম বেতন কাঠানো নিয়ে উপাচার্যরা তাদের ক্ষোভের বিষয়গুলো জানাতেই মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে সরকারের আমলাদের নিয়েও উপাচার্যরা ক্ষোভ জানাতে পারেন এমনটা ধরে নিয়েই সচিবকে সভায় রাখা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, মন্ত্রী-সচিবের অধীনস্থরা এত দিন দোদুল্যমনায় ছিলেন। এককভাবে সচিব সিদ্ধান্ত নিলে তা নিয়ে সমালোচনার মধ্যে মন্ত্রীর কাছেও বিপাকে পড়তে হতো। নির্দেশনার পর বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। ফলে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার আগে মন্ত্রীর নজরে আসবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনেকেই সচিবের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা মোঃ মনিরুল ইসলাম মিলনকে নিয়ে আপত্তি তুলছেন সাংবাদিকদের কাছে। তারা বলেছেন, মিলন কর্মচারী ইউনিয়নের বিএনপি-জামায়াতপন্থী প্যানেলের শীর্ষ নেতা। তাকে তার সরকার বিরোধী রাজনৈতিক পরিচয় ও তার বিরুদ্ধে নারী অফিসারদের সঙ্গে অশোভন আচরণের জন্য ইতিপূর্বে শিক্ষামন্ত্রী দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন। বিষয়টি জেনেও সচিব তাকে আবার মন্ত্রণালয়ে নিয়ে এসেছেন নিজ দফতরে। এ নিয়ে কর্মচারী ইউনিয়নের সরকার সমর্থন পক্ষ মন্ত্রীর কাছে অভিযোগ দিয়েছেন। তার পরেও তাকে কেন রাখা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয়ের কাজকর্মে শৃঙ্খলা বিষয়ে নিয়োজিত এ ব্যক্তিকে অবিলম্বে প্রেস্টিজিয়াস শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেয়া উচিত বলে মন্ত্রণালয় কর্মকর্তাদের অভিমত।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ