বিশেষ খবর

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উৎসে কর প্রত্যাহারের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ প্রতিবেদন
img

প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধক্রমে অর্থমন্ত্রী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের উৎসে কর হার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করেন। 
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ প্রসঙ্গে অর্থমন্ত্রী বলেন, জ্বালানি ও পরিবহন খাতে বরাদ্দ বাড়াতে গিয়ে এ দুটি খাতে বরাদ্দ কমে গেছে। আগামী বছর থেকে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের প্রতি বিশেষ নজর  দেয়া হবে বলে তিনি জানান।

‘শিক্ষা পণ্য নয় অধিকার’
শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, অধিকার। ভ্যাট দিয়ে শিক্ষা কিনলে আর কেউ শিক্ষার্থী থাকবে না, তাদের ক্রেতা নামে চিহ্নিত করা উচিত। তাই সরকারকে উচ্চশিক্ষায় ভ্যাট আরোপের আগে নির্ধারণ করতে হবে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা পড়ালেখা করে, তারা শিক্ষার্থী না ক্রেতা। আর এক দেশে তো দুই নিয়ম চলতে পারে না। সম্প্রতি রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে এসব কথা বলেন কয়েকজন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। মানববন্ধনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবি জানান তাঁরা।
মানববন্ধনে বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ধশত শিক্ষার্থী অংশ নেন। মানববন্ধন শেষে শিক্ষার্থীরা অর্থ মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি পালন করতে গেলে সচিবালয়ের ৫ নম্বর গেটের সামনেই তাঁদের আটকে দেয় পুলিশ। এ সময় শিক্ষার্থীরা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ১০ শতাংশ হারে মূসক (ভ্যাট) প্রত্যাহারের দাবি জানান। প্রস্তাবিত বাজেটের আরোপিত ভ্যাট প্রত্যাহার না করলে চার লাখ শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণে পুরো ঢাকা শহর স্থবির করে দেয়া হবে বলে হুমকিও দেন তাঁরা।
আগামী বাজেটে অতিরিক্ত ভ্যাট সংযোজনের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এক শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষামন্ত্রী প্রায়ই বলেন, আমরা পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পার্থক্য করি না। অথচ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা একপ্রকার বিনা মূল্যে পড়ছে আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অভিভাবকদের পকেট কাটার পরিমাণ দিন দিন বাড়ছে।
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী এস এম শুভ্র ভৌমিক বলেন, অল্পসংখ্যক শিক্ষার্থী দেখে কেউ মনে করবেন না আমরা সংখ্যায় কম। আমাদের সঙ্গে চার লাখ সমর্থক রয়েছে। আমাদের পরবর্তী কর্মসূচিতে চার লাখ শিক্ষার্থী পুরো শহর স্থবির করে দেবে। সুতরাং আন্দোলনে যাওয়ার আগেই ভ্যাটের প্রস্তাব প্রত্যাহার করুন।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মোঃ ঝন্টু শুভ বলেন, ভ্যাট আরোপের প্রস্তাব ইউজিসি’র তৈরি করা ২০ বছর মেয়াদি কৌশলপত্রের প্রথম ধাপ। শিক্ষার্থীদের ভাবার সময় এসেছে যে তারা কি উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য এসেছে নাকি ভ্যাট দিয়ে উচ্চশিক্ষা নামক পণ্য কিনতে এসেছে। সরকার ভ্যাট আরোপ করলে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এক টাকাও পকেট থেকে যাবে না। তারা ঠিকই বিভিন্ন ফি বাড়িয়ে দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই এ ভ্যাটের টাকা আদায় করে নেবে।
অর্থমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে শিক্ষার্থীরা বলেন, বাজেটের আগে যেমন পণ্যের দাম বাড়ে। তেমনি শিক্ষার দাম বাড়িয়ে শিক্ষাকে পণ্যে পরিণত করা হচ্ছে।

বাড়তি অর্থ গুনতে হবে মধ্যবিত্তকে
প্রস্তাবিত বাজেটে ১০ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক) আরোপের ঘটনাকে কেন্দ্র করে অসন্তোষ বাড়ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজগুলোতে। শিক্ষা ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় কর প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেছে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা অধিকার আন্দোলনের ব্যানারে সংগঠিত হচ্ছেন তারা। প্রতিবাদমুখর হচ্ছেন অভিভাবকরাও। এ কর আরোপকে অগণতান্ত্রিক ও উচ্চ শিক্ষার অগ্রগতি বিরোধী অভিহিত করে অবিলম্বে এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তাদের সংগঠন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতি। দাবি বাস্তবায়নে ইতোমধ্যে সমিতির নেতৃবৃন্দ অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, করের কারণে সঙ্কটে পড়বে শিক্ষার্থীরা। এতে অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়বে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্যেক্তা থেকে শুরু করে এ সেক্টরের সঙ্গে জড়িত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, বর্তমানে বাংলাদেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেবল উচ্চবিত্তের সন্তানরাই পড়ছে না, উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য মফস্বল থেকে আসা এমনকি প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষকের সন্তানরাও ভর্তি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বেতন-ফি পরিশোধের জন্য অভিভাবকরা জমিজমা বন্ধক এমনকি বিক্রি পর্যন্ত করছে। এ অবস্থায় ১০% কর আরোপ করা হলে শিক্ষা ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা শিক্ষার্থীদেরই পরিশোধ করতে হবে। এই সিদ্ধান্ত উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রকে আরও সঙ্কুুচিত করবে। 
বাজেট প্রস্তাবের দিনই অবশ্য সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এ কর আরোপের নেতিবাচক ফল সম্পর্কে নিজেদের আশঙ্কার কথা জানান। তারা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর কর বসালে তা শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই কোন না কোনভাবে আদায় করা হবে। ফলে শিক্ষার্থীদের পেছনে অভিভাবকদের ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। এরপর  বাজেটের এ দিকটি নিয়ে অসন্তোষ ক্রমশই বাড়ছে করের আওতায় আসা এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও এর উদ্যোক্তাদের মাঝে। প্রথমেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির পক্ষ থেকে চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন এক বিবৃতিতে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে বলেন, কর আরোপ করা হলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা সঙ্কুচিত হবে। এর ফলে শিক্ষার্থীদের মাঝে অসন্তোষ বাড়বে। এতে প্রতিষ্ঠানগুলোতে অচলাবস্থার সৃষ্টি হবে এবং তার অতিরিক্ত অর্থ মূলত শিক্ষার্থীদেরই বহন করতে হবে। 
খোদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এ কে আজাদ চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে আসনসংখ্যা সীমিত। তাই অনেক শিক্ষার্থী বাধ্য হয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। এখানে কেবল ধনীদের সন্তান নয়, বহু গরিবের ছেয়েমেয়েরা পড়ছে। সরকারের উচিত এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নিয়ন্ত্রণ এবং উন্নয়নে ভূমিকা রাখা। কিন্তু তা না করে কর আরোপ করছে। এটা ঠিক নয়। 
শিক্ষার্থী, অভিভাবকরা বলছেন, কর আরোপের ফলে যে সঙ্কট আসছে তা আঁচ করতে পেরেই বাজেট প্রস্তাবের পর থেকে অস্থিরতা বাড়ছে বেশ কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর মাঝে। 
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা অধিকার আন্দোলনের আহ্বায়ক রায়হান তাহারাত লিয়ন জানান, ধানমন্ডির সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে এসেছে। সরকারের নতুন অর্থবছরের বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ১০ শতাংশ মূসক বৃদ্ধি শিক্ষাকে ‘হত্যার শামিল’। আমরা ইতোমধ্যে জানিয়েছি, সরকার এই নীতি থেকে সরে না এলে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। রাজপথে অবস্থান নেব আমরা। ড্যাফোডিল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী প্রতীতি রায় বলছিলেন, ১০ শতাংশ মূসক নির্ধারণ অন্যায়। এটা করলে তার পুরো চাপ পড়বে আমাদের ওপর। এর জন্য হয়ত আমাদের পড়াশোনাই ছেড়ে দিতে হবে। 
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী ইমরুল উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছিলেন, ১০ শতাংশ কর আরোপ করা হলে স্বাভাবিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনার খরচ বাড়বে। আর করের বোঝা শিক্ষার্থীদের ওপরই পড়বে।
এদিকে ইতোমধ্যেই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর প্রস্তাবিত কর প্রত্যাহারের দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদের বাজেট আলোচনায়ও। বগুড়া ৩ আসনের বিরোধীদলীয় সদস্য নুরুল ইসলাম তালুকদার সম্প্রতি বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ১০ ভাগ কর আরোপের প্রস্তাব করা হয়েছে সেটা কোনো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দেবে না। এটা দিতে হবে আমার-আপনার ছেলেমেয়েদের যারা ওই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ছে। এর মানে দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির ওপরই এই করের বোঝা গিয়ে পড়বে। তাই আমি অর্থমন্ত্রীর প্রতি দাবি জানাব, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর প্রস্তাবিত এই ১০ ভাগ কর প্রত্যাহার করা হোক।
ইতোমধ্যেই করের বিরোধিতা করে বাম ছাত্র সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের নেতারা আন্দোলন শুরু করেছেন। তারা বলেছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর ভ্যাট আরোপের ফলে উচ্চ শিক্ষায় মধ্যবিত্তের শিক্ষা লাভের পথ রুদ্ধ হয়ে এ শিক্ষা ধনিক শ্রেণির হাতে চলে যাবে। উপলব্ধি করতে হবে, শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, অধিকার। শিক্ষার্থীদের ভাবার সময় এসেছে যে, তারা কি উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য এসেছে, নাকি ভ্যাট দিয়ে উচ্চশিক্ষা নামক পণ্য কিনতে এসেছে। কিছু কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ভ্যাট প্রস্তাবের সঙ্গে সঙ্গে তা কার্যকর শুরু করেছে অভিযোগে নেতৃবৃন্দ বলেছেন, ভ্যাট প্রস্তাব করা হয়েছে, পাস হয়নি। এর আগেই একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ভ্যাটসহ ফি পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে। আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এমন নোটিস দিয়েছে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ