বিশেষ খবর

দুদক’র বিশেষ অভিযান জোরদার ॥ গ্রেফতার আতঙ্কে দুর্নীতিবাজরা

ক্যাম্পাস ডেস্ক সংবাদ

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গ্রেফতার আতঙ্কে ভুগছে সারাদেশের স্বীকৃত দুর্নীতিবাজরা। সারাদেশে বিভিন্ন সময়ে দায়ের করা দুর্নীতি মামলার আসামিদের ধরতে দুদক’র চলমান বিশেষ অভিযান জোরদার করায় নতুন করে এ আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। প্রতিদিনই এ অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন মামলার অন্তত ৪৩ জন আসামিকে গ্রেফতার করেছে দুদক, যা এত কম সময়ে দুদক’র ইতিহাসে নজিরবিহীন বটে। দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে চালানো অভিযান সফল করতে সমাজের সকল শ্রেণির লোকের সহায়তা চাইছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। আসামি গ্রেফতারের জন্য সারাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে চষে বেড়াচ্ছেন দুদক কর্মকর্তারা। কখনও কখনও দিনে আসামি ধরতে না পারলে রাতের বেলায় অফিসে, বাসায় কিংবা গোপনীয় স্থানে অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন উন্নত তথ্যপ্রযুক্তির সেবা। দুদককে কার্যকরী প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতেই এ গ্রেফতার অভিযান পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
জানা গেছে, সারাদেশের সকল কর্মকর্তাকে দুদক’র করা মামলার আসামিদের ধরতে বিশেষ অভিযান পরিচালনার জন্য দুদক কর্তৃপক্ষের মৌখিক কঠোর নির্দেশের পর এসব আসামি গ্রেফতার করা হচ্ছে। গত ২৭ মার্চ থেকে দুদক গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করছে। বিশেষ করে কমিশনের নতুন চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ ও কমিশনার এ এফ এম আমিনুল ইসলাম গত ১৪ মার্চ কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকেই এক নয়া আতঙ্কে ভুগছেন এসব দুর্নীতিবাজ। এর মাধ্যমে সমাজ থেকে দুর্নীতি রোধে বা তা কমাতে দুদক যে একটি সাংবিধানিকভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে তারই জানান দিচ্ছে।
এর আগে দুর্নীতি করেও সারা বছর গা ছেড়ে সমাজে সর্বত্র দাপিয়ে বেড়ালেও বর্তমানে এসব দুর্নীতিবাজের অনেকেই বাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্মস্থল ছেড়ে অন্যত্র অফিস করতে বা বসবাস করতে দেখা যাচ্ছে। দুর্নীতিবাজদের ধরতে দুদক’র চলমান অভিযান অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে অত্যন্ত কঠোর বলে কমিশন সংশ্লিষ্টদের দাবি। প্রকৃতপক্ষে দুর্নীতি যে অপরাধ তা অনেকেই ভুলে যেতে বসেছিলেন। অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলার পর সমাজের এসব চিহ্নিত দুর্নীতিবাজের এ আতঙ্কে সমাজের অনেক সৎ লোক রয়েছেন যারা বেজায় খুশি। তাদের মতে, দুর্নীতি করার দীর্ঘ বছর পর হলেও এ দুর্নীতিবাজরা আতঙ্কে থাকায় সমাজে সৎ লোকেরা ভাল কাজ করতে উৎসাহিত হবেন। সমাজের এদের গ্রেফতারের মাধ্যমে বিচারের আওতায় এনে শাস্তি প্রদান করা হলে দুর্নীতি অনেকাংশে কমে আসবে।
গত ১৪ মার্চ দুদক কমিশন পুনর্গঠনের পর ২৭ মার্চ থেকে ১৯ এপ্রিল সময় পর্যন্ত ২৫ দিনে সারাদেশে অভিযান চালিয়ে সরকারি চাকরিজীবী, ব্যাংক কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, ডাক্তার, ব্যবসায়ীসহ অন্যান্য পেশার অন্তত ৪৩ জনকে গ্রেফতার করেছে। বিগত সব কমিশনের সময়ে গ্রেফতার অভিযান পরিচালিত হলেও এত অল্প সময়ে এত বেশি আসামি গ্রেফতারের ঘটনা এটাই প্রথম, যা দুর্নীতি দমনে দুদক’র সরব উপস্থিতির জানান দেয়।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে দুর্নীতি দমন ব্যুরো বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে সরকার দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠা করে। এরপর মূলত ২০০৭ সালে ওয়ান-ইলেভেনের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে বিভিন্ন মামলায় অভিযুক্ত আসামিদের গ্রেফতার করা শুরু হয়। ঐসময় দুর্নীতির অভিযোগে দেশের শীর্ষ রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, সরকারি আমলা ও প্রভাবশালীদের গ্রেফতার করা হয়। মামলার আগেই অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার, পরে মামলা দায়ের ও রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদসহ কঠোর অভিযান চালানো হয়, যা নিয়ে পরবর্তীতে ব্যাপক প্রশ্নের মুখে পরতে হয়েছে দুদককে।
পরবর্তীতে নাগরিকদের সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়া অযথা হয়রানি লাঘবে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোট ক্ষমতায় এলে ওই অভিযান শিথিল হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ মামলায় তদন্তের স্বার্থে অপরিহার্য বিবেচনায় নির্দিষ্ট আসামিকে গ্রেফতার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে। মহাজোট সরকারের প্রথম পাঁচ বছরে পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতি চেষ্টার মামলায় ওই সময়ের যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোশাররফ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। পরে তিনি আদালতের জামিনে মুক্তি পান। একইভাবে হলমার্কের ঋণ জালিয়াতির মামলায় প্রতিষ্ঠানটির মালিক তানভীর ও সংশ্লিষ্ট কর্ণধারদের গ্রেফতার করা হয়। বর্তমানে তারা কারাগারে বন্দী রয়েছেন। একই মামলায় সোনালী ব্যাংকের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদেরও গ্রেফতার করা হয়। তাদের অনেকেই কারাগারে আটক রয়েছেন। এমএলএম কোম্পানির নামে প্রতারণার মামলায় ডেসটিনি গ্রুপের কর্তধারদের গ্রেফতার করে জেলহাজতে পাঠানো হয়। ২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত সরকারি-আধাসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে ফাঁদ পেতে ঘুষখোর গ্রেফতার অভিযানও পরিচালিত হয়। তবে ২০১৪ সালে মহাজোট দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর দুদকের গ্রেফতার অভিযানে ভাটা পড়ে। ফলে সুষ্ঠু তদন্তে স্বার্থে আবারও গ্রেফতার প্রক্রিয়া ও ফাঁদ অভিযান সচল করতে উদ্যোগী হলেও ফাঁদ অভিযান সচল করা হয়নি।
দুদক সূত্র জানায়, আসামি গ্রেফতারের জন্য দুদক’র ফাঁদ অভিযানে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে ঘুষ লেনদেনের ভিডিওচিত্র ধারণ করারও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এছাড়া টেলিফোন ট্র্যাকিংয়ের (টেলিফোনে আড়ি পেতে) মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের কথোপকথন সংগ্রহ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্র ব্যবহার করা হবে। এই যন্ত্রের মাধ্যমে সন্দেহভাজন কর্মকর্তারা কে কতটা মোবাইল নম্বর (সিম) ব্যবহার করছেন তাও খুঁজে বের করা হবে। পরে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণ সাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট ঘুষখোরদের হাতেনাতে আটক ও আইনী ব্যবস্থা নেয়া হবে। মোবাইল ট্র্যাকিংয়ের জন্য এরই মধ্যে অনুমোদন দিয়েছে বিটিআরসি। ওয়াকিটকি, স্পাইক্যামসহ এ ধরনের যন্ত্র ক্রয় ও ব্যবহারে দুদক’র প্রস্তাবনাও অনুমোদন দিয়েছে সরকার। অনুমোদন সাপেক্ষে দুদক কার্যালয়ে আর্চওয়েসহ কিছু যন্ত্রপাতিও বসানো হয়েছে। শীঘ্রই বিদেশ থেকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রপাতি সংগ্রহ সম্পন্ন হলে ফাঁদ অভিযান জোরদার করবে দুদক।
এভাবেই আরও কিছুদিন দুদক তাদের গ্রেফতার অভিযান পরিচালনা করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে এবারের গ্রেফতার অভিযান অন্য যে কোন সময়ের চেয়ে আলাদা বিধায় আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে দুর্নীতিবাজদের। সঙ্গে তাদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও নেয়া হচ্ছে। ফলে গ্রেফতারকৃতরাও বাধ্য হয়ে দুদককে প্রকৃত তথ্য দিচ্ছেন। এতে করে দুদক কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিন আগে করা মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তিতে সহায়তা পাচ্ছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুর্নীতি দমন কমিশনের সচিব আবু মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বলেন, আমলযোগ্য যে কোন অপরাধের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তারা যে কোনো আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য গ্রেফতার করা বা নিজেদের হেফাজতে নিতে পারেন। প্রয়োজনে রিমান্ডের জন্য আবেদন করতে পারেন। বর্তমানে গ্রেফতার কার্যক্রম অভিযান পরিচালনা করা দুদক’র একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। দুদক চায় রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতি দমনের জন্য নাগরিকদের সেবা প্রদান কার্যক্রম দৃশ্যমান করতে। কম সময়ে দুর্নীতির অভিযোগ নিষ্পত্তি করতে। এজন্য কমিশনের পক্ষ থেকে কোনো প্রকার অভিযান পরিচালনার বিশেষ নির্দেশ প্রদান করা হয়নি। কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে বলা হয়েছে। কারণ নিয়মানুযায়ী কমিশন কোন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তাকে কোন আসামিকে ধরতে বা ছেড়ে দিতে নির্দেশ বা অনুরোধ করতে পারে না। তদন্তকারী কর্মকর্তাদের ওপরই আসামিকে গ্রেফতার বা জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়টি নির্ভর করে। তবে দুর্নীতি দমনে চলমান এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও সচিব সাংবাদিকদের জানান।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ