বিশেষ খবর

নামিদামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও জঙ্গি তৈরির কারখানা!

ক্যাম্পাস ডেস্ক শিক্ষা সংবাদ
img

নামিদামি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরাও যুক্ত হচ্ছে ভয়াবহ জঙ্গি তৎপরতায়। বিশেষ করে ইংলিশ মিডিয়াম (ইংরেজি মাধ্যম) স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী বিপথে যাচ্ছে বেশি। এতদিন শুধু জঙ্গি কার্যক্রমে যুক্ত হওয়ার অভিযোগ ছিল মূলত সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে। তবে সম্প্রতি রাতে গুলশানে হলি আর্টিজান রেস্টুরেন্টে সশস্ত্র হামলা ও বর্বরোচিত হত্যাকান্ডে জড়িত বেশির ভাগ জঙ্গিই নামিদামি ইংরেজি মাধ্যম স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বলে জানা যাচ্ছে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে জঙ্গি সম্পৃক্ততার অভিযোগ আগে থেকেই থাকলেও তা ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ নেই। তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দেখভালকারী একমাত্র সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) শুধু কোর্স অনুমোদন করেই তাদের দায়িত্ব শেষ করছে। ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের দিকেও তেমন গুরুত্ব নেই। এমনকি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলো এখনো সরকারের নজরদারির বাইরে। ফলে সহজেই বিপথে যাচ্ছে অনেক শিক্ষার্থী।
২০১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নাশকতা পরিকল্পনার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশি তরুণ কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিস দেশে থাকার সময় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করেন। গত বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যার সঙ্গেও জড়িত ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়েরই পাঁচ শিক্ষার্থী, যাদের সে সময়েই বহিষ্কার করে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। নাফিসসহ এই ছয়জন ইলেকট্রনিক অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইটিই) এবং ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের ছাত্র ছিল। গুলশানে নিহত পাঁচ হামলাকারীর মধ্যেও একজন নর্থ সাউথের এবং একজন ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী। অন্যরা ইংলিশ মিডিয়াম স্কলাসটিকা, টার্কিশ হোপসহ আরো একটি স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থী।
জানা যায়, জঙ্গিবাদী কর্মকান্ডের দায়ে এখন পর্যন্ত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই বহিষ্কৃত হয়েছেন পাঁচজন শিক্ষক ও ১৪ জন শিক্ষার্থী। তবে অন্যান্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও শিক্ষার্থীরা জঙ্গি কার্যক্রমে জড়িত থাকার অভিযোগে বহিষ্কার হয়েছে। তবে প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি নষ্ট হওয়ার ভয়ে তা প্রকাশ করা হয় না। পরীক্ষা না দেয়া, অনিয়মিত থাকা, খারাপ ফলসহ নানা কারণ দেখিয়ে ছাত্রত্ব বাতিল করা হয়। ফলে ঠিক কতজন জঙ্গিসংশ্লিষ্টতার কারণে বহিষ্কৃত হলো তা আড়ালেই থেকে যায়। পূর্ণাঙ্গ তথ্যসহকারে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর ডাটাবেইস করার কথা থাকলেও তা এখনো করেনি কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়।
গুলশানে নিহত জঙ্গি নিবরাস ইসলামও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ফ্যাকাল্টির শিক্ষার্থী ছিল। ২০১১ সালের সামার সিমেস্টারে সে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও ২০১২ সালের স্প্রিং সিমেস্টার পর্যন্ত শেষ করে। এর পর থেকে বিনা নোটিশেই বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকে। পর পর দুই সিমেস্টারে অনুপস্থিত থাকায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার ছাত্রত্ব বাতিল করে। এ ছাড়া গুলশানের হোটেলে জিম্মিদশা থেকে ছাড় পাওয়া প্রকৌশলী আবুল হাসনাত রেজা করিমও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ফ্যাকাল্টির সাবেক শিক্ষক। তিনিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন।
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির স্টুডেন্ট অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক ড. ইমদাদুল হক বলেন, হাইকোর্টের এক রুলের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের একটি তদন্ত কমিটি হয়েছিল। আমরা কোর্টে সেই রিপোর্ট জমা দিয়েছি। তবে রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০০ সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। শিক্ষার্থীদের সব কাজই এখন আমাদের নখদর্পণে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থী। এর মধ্যে প্রায় ছয় হাজারের প্রয়োজনীয় স্ট্যান্ডার্ড নেই। আমাদের কাজ শিক্ষা প্রদান করা। বাউন্ডারির বাইরে গোয়েন্দাবৃত্তি করা আমাদের দায়িত্ব নয়। একজন শিক্ষার্থী সপ্তাহে বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৪ থেকে ১৫ ঘণ্টা থাকে। ফলে পরিবারেরই উচিত তার সন্তান কী করছে সেদিকে নজর রাখা। তবে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০টি ক্লাব রয়েছে। আমরা শিক্ষার্থীদের এসব ক্লাবের কার্যক্রমে প্রতিনিয়ত অন্তর্ভুক্ত করি।
অভিযোগ রয়েছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক খ-কালীন শিক্ষক ও ভিজিটিং প্রফেসরের বিরুদ্ধে। ওই শিক্ষকরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই ঢোকেন। এরপর শিক্ষার্থীদের সম্পৃক্ত করেন জঙ্গি কার্যক্রমে। বিশেষ করে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাই তাদের টার্গেট হয়। মধ্যপ্রাচের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা কোনো কোনো শিক্ষকও এখন ভিজিটিং প্রফেসর হিসেবে কাজ করছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে। তাঁরাই শিক্ষার্থীদের জঙ্গি কার্যক্রমে যুক্ত করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির উপাচার্য প্রফেসর ড. আবদুল মান্নান চৌধুরী বলেন, অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ই পার্ট-টাইম শিক্ষক ব্যবহার করে। এসব শিক্ষকের কেউ কেউ এই জঙ্গি কার্যক্রমে শিক্ষার্থীদের দীক্ষা দিয়ে থাকে। এমনকি তারা ছাত্রদের নিয়ে গোপনে বৈঠকও করে। প্রথমে বোঝানো হয়, এরপর সরাসরি জঙ্গি কার্যক্রমে সম্পৃক্ত করা হয়। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় অধিক পার্ট টাইমার ব্যবহার করে ও ধর্মীয় উদ্দেশ্য নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে তাদের ওখানেই মূলত জঙ্গি তৈরি হচ্ছে। প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ওপর নজর রাখা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। একজন শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে যদি কিছু শিক্ষার্থীকে দেয়া হয়। তাহলে তাঁরই দায়িত্ব ওই শিক্ষার্থীর খবর রাখা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনিই দায়িত্ব পালন করবেন। আমার বিশ্ববিদ্যালয়ও এই পদ্ধতিতে চলছে। এতে একজন শিক্ষককে ২০ থেকে ৩০ জন শিক্ষার্থীর খবর রাখতে হবে। এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম চালু রাখতে হবে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ