বিশেষ খবর

৫০০০ পিএইচডি ডিগ্রি জালিয়াতি এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা!

ক্যাম্পাস ডেস্ক মতামত

সর্বজন স্বীকৃত প্রবাদ ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। অর্থাৎ কোনো জাতিকে পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হলে প্রথমে তাকে মেরুদ- শক্ত ও সোজা করতে হবে। এদিক থেকে আমরা দেখতে পাই, পৃথিবীতে শিক্ষায় যে জাতি যত বেশি উন্নত, সে জাতি অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে ঈর্ষণীয় অগ্রগতি লাভ করতে সক্ষম হয়েছে। সেই রোমান সভ্যতা থেকে শুরু করে আজকের আধুনিক বিশ্বেও এই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে ইউরোপীয়রা। ফলে তাদের উন্নতির কথা আমাদের সবারই জানা।
অন্যদিকে বলা যায়, কোনো জাতিকে অকার্যকর করে রাখতে হলে তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্ত ভিত্তির উপর গড়ে উঠতে না দেয়ার পলিসি অনেক আগে থেকেই অবলম্বন করে আসছে সাম্রাজ্যবাদীরা। প্রায় দুশতবছর পর বৃটিশ গোলামী থেকে এবং দুই যুগ পাকিস্তানী গোলামী থেকে আমরা স্বাধীন হলাম। দেশ স্বাধীনের ৪৪ বছর অতিবাহিত হচ্ছে, কিন্তু আমরা কী আমাদের মেরুদণ্ড শক্ত করতে পেরেছি?
এ জন্য যে মাস্টারপ্লান ও সুনির্দিষ্ট নীতি থাকা প্রয়োজন। আমরা কী সেটা করতে পেরেছি? বলা যায়, এসব কিছুর কোনোটাই নেই আমাদের। যখন যে সরকার ক্ষমতাসীন হয়, তারা নিজেদের মতো করে চিন্তা করে এবং তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। এতে যা হবার তাই হচ্ছে। আর এই সুযোগে বেনিয়া সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের দুর্বল করে রাখতে যা করার তাই করছে। এটা জাতির জন্য খুবই দুর্ভাগ্যের বিষয়।
সম্প্রতি ‘৫০০০ ভুয়া পিএইচডি’ শিরোনামে প্রকাশিত পৃথক দুটি প্রতিবেদন আমাদেরকে ভাবিয়ে তুলেছে। আর এতেই ফুটে উঠেছে আমাদের জাতির দৈন্যতা। একটা জাতির অধপতন কতটা নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, তা কী আমাদের দেশের নীতিনির্ধারকরা একবার ভেবে দেখেছেন? না, এই অবক্ষয় রোধে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিয়েছেন।
অন্যদিকে গত বছর একটি জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়- ৫০০০ ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রিধারী দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন। এতে সম্প্রতি গাজীপুরের একটি বেসরকারি কলেজের অধ্যক্ষের কথা উল্লেখ করা হয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী তিনি সহকারী অধ্যাপক। অথচ তিনি নিজেকে অধ্যাপকের পাশাপাশি ডক্টরেটধারী বলে প্রচার করেন। এমনকি তার রুমের সামনে টাঙানো নামফলকেও নামের আগে ‘ড.’ লিখে রাখেন। বিষয়টি ওই কলেজে বেশ কৌতূহল তৈরি করে। তার পিএইচডি ডিগ্রি তদন্ত করে ষোল আনাই ভুয়া বলে প্রমাণ পায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ)। অন্যদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ইউজিসি সূত্রে জানা যায়, শুধু এই অধ্যক্ষই নন, এরকম ভুয়া এমফিল, পিএইচডি নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে চাকরি করছেন ৫ হাজারের বেশি কর্মকর্তা। পর্যায়ক্রমে সব ভুয়া পিএইচডিধারীদের ডিগ্রি যাচাই করার কথা জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের ওই সূত্রটি।
ভুয়া সনদধারীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত এক ঘটনা ছিল ২০১১ সালে। ওই সময় তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক নজরুল ইসলামের কাছে ধরা পড়েন আল জাহেরী নামে পল্লী বিদ্যুৎ বোর্ডের (আরইবি) এক কর্মকর্তা। তিনি পিএইচডি ডিগ্রি সমতা বিধান করার জন্য ইউজিসি’র কাছে আবেদন করেন।
পিএইচডি’র সুপারভাইজার হিসেবে তিনি খোদ ইউজিসি’র চেয়ারম্যানের নাম উল্লেখ করেন। এরপর ওই ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান ডেকে পাঠান। সেই ব্যক্তির কাছে নজরুল ইসলাম জানতে চান তিনি (নজরুল ইসলাম) দেখতে কেমন। ওই ব্যক্তি বলেন, তিনি দেখতে অনেক লম্বা এবং মুখে তার দাড়ি রয়েছে। এই সময় চেয়ারম্যানের রুমে ইউজিসি’র সদস্য ছাড়াও বেশ কয়েকজন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে তখন হাস্যরস তৈরি হয়। এরপর কর্তৃপক্ষ ওই কর্মকর্তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। পরে জানা যায়, আরইবি’র ওই কর্মকর্তা রাজধানীর ঝিগাতলার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে এক লাখ ৪০ হাজার টাকা দিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছিলেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আমেরিকা ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি ইউএসএ (বাংলাদেশ স্ট্যাডি সেন্টার)সহ অন্তত ৫৬টি প্রতিষ্ঠান থেকে দেড় লাখ থেকে ৩ লাখ টাকায় পিএইচডি ডিগ্রি বিক্রি করছে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) এ রকম কয়েকজন ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রিধারীকে চিহ্নিতও করেছে। তাদের ব্যাপারে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন বলছে, যারা ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি নেয়, তাদের ডিগ্রিকে সমতা করাতে আমাদের কাছে আসে না। তবে এ ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি সংখ্যা সঠিক পরিসংখ্যান কারও কাছে না থাকলেও ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছেন এ সংখ্যা ৫ হাজারের কম নয়।
শুধু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাই এই গুরুতর অপরাধ করেননি। তথ্য নিয়ে যতদূর জানার চেষ্টা করেছি তাতে, কয়েক জন যুগ্ম সচিব, উপ-সচিব, কয়েকটি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, নির্বাহী প্রকৌশলী, উপজেলা নির্বাহী অফিসাররা অবৈধভাবে পিএইচডি ডিগ্রি নিয়েছেন। এছাড়াও একটি জেলার শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক, হাইকোর্টে দুই ডজন আইনজীবী, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহকারী অধ্যাপক, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র ক্যাটালগার, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী আঞ্চলিক পরিচালক, তথ্য ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব এবং কয়েকটি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পদে চাকরি করছেন এমন ডিগ্রি নিয়ে। তারা ২০১৩ সালে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এই ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি জমা দিলেও এখন তারা নীরব রয়েছেন। 
শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, শুধু দেশে নয়, বিদেশ থেকে অনেকেই ভুয়া পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছেন। আমেরিকা ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, ইউএসএ (বাংলাদেশ স্ট্যাডি সেন্টার) নামে একটি প্রতিষ্ঠান গত ১০ বছরে ৪ হাজারের বেশি পিএইচডি ডিগ্রি দিয়েছে। ২০১২ সালে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলার পর এখন তা বন্ধ রয়েছে। এরপর থেকে সেখান থেকে নেয়া সার্টিফিকেটধারী ডক্টরেট ডিগ্রি ব্যবহার করছেন না। বর্তমানে আরও ৫৬টি ভুয়া প্রতিষ্ঠান এভাবে ভুয়া মাস্টার্স, এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রি দিচ্ছে। ডিআইএ বলছে, ৫ হাজারের বেশি পিএইচডি ডিগ্রি নিয়ে কমর্রত আছেন এ রকম তথ্য তাদের কাছেও রয়েছে।
এ ব্যাপারে শিক্ষা সচিবের বক্তব্য হলো, কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে এমফিল, পিএইচডি ডিগ্রি প্রদানের অনুমোদন নেই। তারপরও যারা এখান থেকে ডিগ্রি নিয়েছে তাদের ধরতে শিগগিরই অভিযান চালানো হবে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বা ডিগ্রি নেয়ার আগে ইউজিসি’র কাছ থেকে তথ্য জেনে নিতে পরামর্শ দেন তিনি।
আগে এসএসসি, এইচএসসি’র সনদ নকল করলেও এই বাণিজ্য এখন অনার্স-মাস্টার্স থেকে বিশ্বের সর্বোচ্চ শিক্ষা ডিগ্রি এমফিল, পিএইচডি দিয়েও শুরু হয়েছে। এতে সহজেই অনুমান করা যে, আমাদের জাতির শরীরে পচন রোগ আজ কতটা জটিল আকার ধারণ করেছে। বলা যায়, এই পচন এখন ক্যান্সারে রূপ নিয়েছে। 
তাই সরকারের নির্বাহী প্রধান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রীর প্রতি আহবান জানাবো, জাতিকে এই মরণ ক্যান্সারের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। ফলে এ সব অপরাধের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে জড়িতদের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রয়োজনে কঠোর শিক্ষা আইন করে এই জালিয়াতচক্রের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথা গোটা জাতি ধ্বংসের দিকেই ধাবিত হবে, আর এতে উন্নত জাতি গড়ার স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

-লেখক, ড. সরদার এম. আনিছুর রহমান, শিক্ষা ও সমাজ বিষয় গবেষক


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ