বিশেষ খবর

জাপান জাম্বুরিতে বিদেশিদের সাথে আমি - ৩

ক্যাম্পাস ডেস্ক শিশু ক্যাম্পাস
img

(পূর্ব প্রকাশিতের পর)
Water Activities বা পানি বিষয়ক কার্যক্রম
জাম্বুরির ৭ম দিন অর্থাৎ ৫ আগস্ট ছিল Water Activities. এই প্রোগ্রামটি ছিল সারাদিনব্যাপী এবং অনুষ্ঠিত হয়েছিল জাম্বুরি গ্রাউন্ডের বাইরে। সকাল ৭টায় আমরা বাসে করে একটি Shipyard এ যাই এবং একটি Battle Ship তথা যুদ্ধ-জাহাজে উঠি। এর আগে আমি কখনও Battle Ship দেখিনি। আমরা কিন্তু Ship এর সাধারণ দরজা দিয়ে উঠিনি; বরং উঠেছি যুদ্ধের যানবাহন ঢোকার দরজা দিয়ে। Ship এ উঠে কৌতূহল ভরে দেখছিলাম, সমুদ্রপথে যুদ্ধে কত আয়োজন করতে হয়! কত মিসাইল, কত রকম অস্ত্র, শত্রু পক্ষের জাহাজ চিহ্নিত করতে কত আধুনিক ব্যবস্থা! জাহাজটি যখন আমাদের নিয়ে সামনে এগিয়ে চলল, তখন মনে হলো, আমিও যুদ্ধ করতে যাচ্ছি। এটা ভেবে খুব মজা লাগছিল। আমরা ঝযরঢ় এর মধ্যেই লাঞ্চ করি। তারপর ফেরার পালা। যুদ্ধে জয়ী বীরের বেশে ফিরতি ভ্রমণ শুরু করলাম। জাহাজ থেকে নেমে বাসে উঠলাম, গান গাইতে গাইতে ফিরে এলাম তাঁবুতে।
Global Development Village বা GDV
জাম্বুরির ৮ম দিনে এই প্রোগ্রামটি অনুষ্ঠিত হয়। অনেকেই শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধান করতে পারে না। জাম্বুরির এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের শেখানো হয়েছে কীভাবে শান্তিপূর্ণভাবে কোনো সমস্যা সমাধান করতে হয় এবং কীভাবে পৃথিবীকে আরও শান্তিপূর্ণ স্থানে পরিণত করা যায়। GDV এর জন্য নির্ধারিত এলাকায় গিয়ে আমরা বিভিন্ন স্টলে ঘুরে বেড়াই। এসব স্টলে বিভিন্ন লেকচার, ভিডিও ইত্যাদির মাধ্যমে বোঝানো হচ্ছিল কীভাবে আমরা ভালো কাজ করতে পারি, সমাজের উপকারে আসতে পারি, কীভাবে শান্তিপূর্ণভাবে সমাজের নানা সমস্যার সমাধানে উদ্যোগ নিতে পারি ইত্যাদি। আমার এ লেখায় এতক্ষণ পর্যন্ত বলেছি জাম্বুরির মূল প্রোগ্রামগুলো সম্পর্কে। এখন এ জাম্বুরি সংক্রান্ত কিছু আকর্ষণীয় অভিজ্ঞতা বলব।
জাপানের সূর্যোদয়
এই জাম্বুরির মাধ্যমে আমি পৃথিবীর অন্যতম উন্নত দেশ জাপান দেখার সুযোগ পেয়েছি। জাপান সূর্যোদয়ের দেশ। এখানে সূর্য ওঠে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে। তাই জাম্বুরির দিনগুলোতে ঘুম থেকে উঠতে হয়েছিল ভোর ৫টায়। সকালে উঠে মনে হতো আজকের সূর্যটা আমিই প্রথম দেখলাম। সেখানে দিনের বেলায় ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা উঠে যেত এবং রাতে ১৮ ডিগ্রিতে নেমে আসতো। দিবা-রাত্রির তাপমাত্রার এত ব্যবধান এর আগে কোথাও অনুভব করার সুযোগ হয়নি।
Swapping বা অদল-বদল
Swapping ছিল জাম্বুরির অন্যতম আকর্ষণীয় দিক। Swapping হলো একজন স্কাউট আরেকজন স্কাউটের সাথে স্কাউটিং সম্পর্কিত কোনো জিনিস আদান-প্রদান করা। জাম্বুরিতে আমিও অনেক Swapping করেছি। আমি বাংলাদেশের ব্যাজের বদলে বিদেশি ব্যাজ নিয়েছি। আবার বাংলাদেশের T-Shirt দিয়ে পেয়েছি অন্য দেশের ঞ-T-Shirt. Swapping এর বিষয়টি জাম্বুরিতে এতই জনপ্রিয় যে, প্রতিদিন রাত ৯টা থেকে ১২টা পর্যন্ত তাঁবু থেকে বের হলেই দেখা যেত স্কাউটরা তাদের Swapping সামগ্রী নিয়ে রাস্তার দু’পাশে বসে আছে। আমিও নানা প্রোগ্রামের অবসরে রাস্তার পাশে একটি কাপড় বিছিয়ে তার ওপর আমার সকল Swapping Item রেখেছিলাম। এভাবে আমি অনেক Swapping Item বদল করেছি এবং বিভিন্ন দেশের অনেককে বন্ধু বানিয়েছি।
আন্তর্জাতিক বন্ধুত্ব
এই জাম্বুরির আরেকটি বিশেষ দিক হলো অন্য দেশের ছেলে-মেয়েদের সাথে বন্ধুত্ব করা। আমি অনেক বিদেশি বন্ধু বানিয়েছি। এদের মধ্যে কয়েকজন হলো জো (ইংল্যান্ড), এলিস (নেদারল্যান্ডস), ফিলিক্স (উগান্ডা) এবং এলেক্স (আমেরিকা)। তাদের সাথে এখনও যোগাযোগ হয় Facebook এবং ই-মেইলে। তারা আমাদের দেশ সম্পর্কে জানতে পেরেছে। আমিও তাদের দেশ, সংস্কৃতি ইত্যাদি সম্পর্কে জানতে পেরেছি।
Home Hospitality
মূল জাম্বুরিটি ছিল ২৮ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট। কিন্তু অনেকের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ফ্লাইট ছিল আরও পরে। তাই এই ১/২ দিন তাদের থাকার জন্য একটি প্রোগ্রাম নেয়া হয়, যার নাম Home Hospitality. এতে স্কাউটরা সাধারণ জাপানী পরিবারের অতিথি হিসেবে থাকবে। প্রতি ২ জন স্কাউট একেকটি জাপানী পরিবারে অতিথি হিসেবে গিয়েছিল। ঐ পরিবারের দায়িত্ব ছিল তাদের বাসায় থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করা, আমাদেরকে ঘুরানো এবং সবশেষে সময় অনুযায়ী এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেয়া। এমনই একটি পরিবারের অতিথি হিসেবে গেলাম আমি এবং আমার এক স্কাউট বন্ধু। ঐ পরিবারে ছিলেন মি. ও মিসেস শিবাতা। এ বাড়ির সন্তানরা হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করে, তাই বাসায় ছিল না। অজানা-অচেনা বিদেশি একটি বাসায় থাকতে, তাদের সাথে খেতে, কথা বলতে কেমন অদ্ভুত লাগছিল। তারা ফুকুয়াকা শহরের অনেক নিদর্শন আমাদের দেখালেন। তার মধ্যে অন্যতম ছিল ক্যাসেল বা রাজপ্রাসাদ।
মি. শিবাতা জাপানী বিভিন্ন সংস্কৃতির কথা বললেন। তারা আমাদের মতোই খাবার খান; তবে বার-বি-কিউ করে খেতে বেশি পছন্দ করেন। তাদেরও প্রধান খাদ্য ভাত। তবে তা আমাদের মতো হাত দিয়ে নয়, বরং চপস্টিক দিয়ে খান। এছাড়াও তারা অনেক ঠান্ডা চা খেতে পছন্দ করেন। জাপানীদের ঘুমানোর স্টাইলও ভিন্ন। তারা আমাদের মতো খাটে ঘুমায় না, বরং মাটিতে তোষক বিছিয়ে ঘুমায়। মি. শিবাতার বাসায় থাকাকালীন আমরাও এভাবেই ঘুমিয়েছি। জাপানী এই পরিবারের সাথে থাকার এ অভিজ্ঞতা অনন্য, স্কাউট জাম্বুরি থেকে আমার বাড়তি পাওয়া।
বিদায় বিশ্ব স্কাউট জাম্বুরি
বেজে গেল বিদায়ের ঘন্টা। জাম্বুরি উপলক্ষে ১৫ দিনের জাপান সফর শেষে ফেরার পথে কেমন যেন শূন্যতা অনুভব করছিলাম বুকের ভেতর। মনে হচ্ছিল, আর ক’টা দিন যদি থাকতে পারতাম! ফুকুয়াকা এয়ারপোর্টে এসে প্লেনে উঠে গেলাম। প্লেন উড়ছে, আর আমার চেখের সামনে ছোট হয়ে যাচ্ছে জাপানের ঘর-বাড়ি-নগর-বন্দর। বুঝলাম না কেন আমার দু’চোখ জলে ভিজে গেল। ক্লান্ত দেহে ঘুমিয়ে পড়লাম। এরপর আরও দু’টি এয়ারপোর্টের ট্রানজিট পার হয়ে ১১ আগস্ট পৌঁছলাম ঢাকায়। এয়ারপোর্টে আমাকে নিতে এসেছে বাবা ও ছোট্ট ভাই ওয়াসির। ওদের দেখেই মনটা খুশিতে নেচে উঠল। স্বাগতম বাংলাদেশ! বিদায় জাপান!! বিদায় স্কাউট জাম্বুরি!!! স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে জাম্বুরির এ দিনগুলো।
লেখকের ওয়েবঃ www.maheer.helal.net.bd ই-মেইলঃ maheer7helal@gmail.com


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ