বিশেষ খবর

আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা বিস্তারে থাইল্যান্ড এগিয়ে

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ প্রতিবেদন

জন্মের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতি মুহূর্তেই মানুষ শিক্ষালাভ করে। এ শিক্ষা সে পায় প্রকৃতির কাছে, দৈনন্দিন অভিজ্ঞতায় এবং প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ‘শিক্ষাব্যবস্থা’, ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’, ‘শিক্ষানীতি’ ইত্যাকার শব্দ যেভাবে আমরা ব্যবহার করি তাতে শিক্ষা বলতে সাধারণভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত শিক্ষাকেই বুঝি। সেটি আনুষ্ঠানিক হোক, কিংবা অনানুষ্ঠানিকই হোক। জাতিসংঘের সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ২৬ ধারা অনুসারে শিক্ষাদানের উদ্দেশ্য হচ্ছে ব্যক্তিত্বের পূর্ণ বিকাশ এবং মানবিক অধিকার ও মৌলিক স্বাধিকারসমূহের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ দৃঢ়তর করা।
আধুনিক সভ্যতা ও তথ্য-প্রযুক্তির যুগে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার গুরুত্ব কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একটি ভালো স্কুল থেকে যে উদ্যম ও শক্তি পাওয়া যায়, তা যে কোনো পরীক্ষাগারের সকল রাসায়নিক ও ভৌত রূপান্তরের চেয়েও বেশি শক্তিশালী। উন্নয়ন বৃদ্ধি, মেধা জাগিয়ে তোলা, জনগণের ক্ষমতায়ন ও তাদের অধিকার সুরক্ষার জন্য অন্য যেকোনো একক উদ্যোগের তুলনায় শিক্ষার সামর্থ্য অনেক বেশি। তাই শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ কোনো দেশের নিজস্ব অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন এবং একটি কল্যাণ গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি রচনার সবচেয়ে নিশ্চিত ও প্রত্যক্ষ উপায়। এ কথাও সত্য যে, সৃষ্টিজগতে একমাত্র মানুষেরই সংস্কৃতি রয়েছে এবং বিশ্বকল্যাণ সাধনে প্রতিনিয়ত মানুষই শিক্ষা গ্রহণ করছে।
চীন দেশে একটি প্রবাদ আছে, তুমি যদি শতবছরের পরিকল্পনা কর তাহলে গাছ লাগাও; আর যদি হাজার বছরের পরিকল্পনা করে থাক, তাহলে মানুষ তৈরি কর। আর মানুষ নামের প্রাণিকে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে গড়ে তোলার আয়োজনই শিক্ষা। মানুষ ছাড়া সকল প্রাণীই প্রকৃতির নিজস্ব আয়োজনে জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় জ্ঞানসমৃদ্ধ হয়, এজন্য তাদের কৃত্রিম ব্যবস্থা করতে হয় না। অথচ মানুষকে জ্ঞানসমৃদ্ধ হওয়ার জন্য একটি পরিকল্পিত ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে হয়; আর সেটিই হচ্ছে শিক্ষা। শিক্ষার সর্বজনগ্রাহ্য সংজ্ঞা দিয়েছেন মহাকবি মিল্টন। তাঁর মতে, Education is the harmonious development of body, mind and soulঅর্থাৎ শিক্ষা হলো দেহ, মন ও আত্মার সমন্বিত উন্নতি সাধন। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথও মিল্টনের কথার প্রতিধ্বনি করেছেন, ‘মানুষের অভ্যন্তরের মানুষটিকে পরিচর্যা করে খাঁটি মানুষ বানানোর প্রচেষ্টাই শিক্ষা।’ সক্রেটিস কিংবা তাঁর শিষ্য প্লেটোর মতে, ‘নিজেকে জানার নামই শিক্ষা।’ সুতরাং কোনো জাতির সন্তানদের যোগ্য, দক্ষ, সার্থক ও কল্যাণকামী সদস্য হিসেবে গড়ে তোলার মাধ্যমকেই শিক্ষা বলে। সংগত কারণেই প্রত্যেক জাতির শিক্ষাব্যবস্থা এক হবে না। কারণ প্রতিটি জাতির প্রয়োজনও এক নয়, সংস্কৃতিও এক নয়, আধ্যাত্মিক চিন্তাও এক নয়, সামাজিক রীতিনীতি এবং লোকাচারও এক নয়, বরং তা ভিন্ন ভিন্ন। তাই শিক্ষাকে সার্বজনীন করতে বিশ্বের উন্নত দেশগুলো তাদের ঐতিহ্য, কৃষ্টি-কালচার, চিন্তা-চেতনা এবং চাহিদাকে ঠিক রেখে সমসাময়িক বিশ্বের সর্বশেষ জ্ঞান-প্রযুক্তির সমন্বয়ে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে সাজিয়ে থাকে। কিন্তু আমাদের দেশে তার বাস্তবায়ন প্রায় নেই বললেই চলে।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলতে হয়। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখন সে দল নিজেদের মতো করে ইতিহাস ঢেলে সাজানোর চেষ্টা করে। এভাবে নতুন প্রজন্ম সত্য ইতিহাস থেকে হয় বঞ্চিত। বিকৃত ইতিহাস জাতিকে বিভাজন ও অনৈক্যের দিকে ঠেলে দেয়। স্বাধীনতার ৪৬ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরও আমরা আমাদের জাতিসত্তার পরিচিতির ব্যাপারে এখনো ঐকমত্যে পৌঁছতে পারিনি। মূল্যবোধের চরম অবক্ষয়ের দরুন প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থা একদল ভোগবাদী, স্বার্থপূজারি ও অবিবেচক লোক ছাড়া বিকল্প কিছু উপহার দিতে পারছে না। ‘শিক্ষার উদ্দেশ্যে প্রবেশ কর, সেবার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যাও’, শিক্ষাঙ্গনের ফলকে এমনটি লেখা থাকলেও বাস্তবে এর কোনো প্রতিফলন নেই।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার প্রয়াসে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে এবং তা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় তা বেশিদূর এগিয়েছে বলা যাবে না। তাছাড়া বছরের প্রথম দিনে শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যের বই তুলে দিয়ে তাদের উৎসাহিত করছে সরকার; যা পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনো দেশ করতে পেরেছে বলে আমার জানা নেই।
পঞ্চম ও অষ্টম শ্রেণিতে জাতীয় পরীক্ষা এবং সৃজনশীল পরীক্ষা পদ্ধতি অবলম্বনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের পড়ার টেবিলে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে গাছতলা বা টিনের ঘরের বৃত্ত থেকে আধুনিক অবকাঠামোতে ফিরিয়ে আনাতে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নির্মাণ, দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করা, বেসরকারি শিক্ষকদের ১০০% বেতন প্রদানসহ উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। এতকিছুর পরও আমরা বলতে পারছি না আমাদের শিক্ষা গুণগত মানসম্পন্ন; যা বিশ্বের যেকোনো দেশের সাথে প্রতিযোগিতা করতে পারে। দুঃখজনক হলেও সত্য, আজ ইন্টারন্যাশনাল র‌্যাংকিংয়ে হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও আমাদের কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নাম নেই।
আমরা হরহামেশাই বলে থাকি, জাতীয় বাজেটের সবচেয়ে বড় খাত শিক্ষা। কিন্তু সে বড় খাতে যে পরিমাণ বরাদ্দ থাকে, তা যে অন্য অনেক দেশের শুধু গবেষণা বাজেট থেকেও ছোট; আমরা তা কখনও ভেবে দেখি না। শিক্ষায় জাতীয় বাজেটে যা বরাদ্দ রাখা হয়, তা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-বোনাস আর প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম-অপচয়েই শেষ হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা নেই বললেই চলে। আর যে শিক্ষায় গবেষণা নেই, সেই শিক্ষা আর যাই হোক নিত্যনতুন জ্ঞান তৈরি করতে কখনোই পারে না। আর যে শিক্ষা জ্ঞান সৃষ্টি করতে পারে না, সে শিক্ষা দিয়ে জাতীয় অগ্রগতিকে খুব বেশিদূর এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।
তাই এখনও সময় আছে শিক্ষায় বিশ্বের যেসব দেশ প্রভূত উন্নতি করেছে, যারা তাদের শিক্ষাকে আকর্ষণীয় করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে টানছে; আর পরবর্তীতে সেরা মেধাগুলোকে নিয়ে তাদের উন্নতি-অগ্রগতিতে কাজে লাগাচ্ছে, তাদের দেখে শেখা।
আমেরিকা বা ইউরোপের কথা বলব না; দক্ষিণ এশিয়ার যেসব দেশ শিক্ষায় ৮০ দশকেও বাংলাদেশের পেছনে ছিল, তারা আজ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে আমাদেরকে পেছনে ফেলে বহুদূর এগিয়েছে। প্রিয় পাঠক, আজ তেমনই একটি দেশের কথা বলব যারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি এবং পর্যটন শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। সম্প্রতি ৭ দিন থাইল্যান্ড ঘুরে এসে লিখেছেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার প্রতিনিধি গিয়াস উদ্দিন আহমেদ।

সরেজমিনে থাইল্যান্ডে শিক্ষা সংস্কৃতি পর্যবেক্ষণ
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত থাইল্যান্ড এশিয়ার একটি উন্নয়নশীল দেশ। পর্যটনের দেশ হিসেবেও থাইল্যান্ডের রয়েছে অনেক সুখ্যাতি। থাইল্যান্ডের জাতীয় আয়ের একটি বিরাট অংশ আসে পর্যটন শিল্পের আয় থেকে। অবশ্য থাইল্যান্ড জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যে অন্য যে ৩টি খাতের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে তা হলো কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা। শান্তিপ্রিয় মানুষের এ দেশটি উচ্চশিক্ষার জন্যে অত্যন্ত আকর্ষণীয়।
শিক্ষার পেছনে প্রচুর অর্থও ব্যয় করছে থাইল্যান্ড। চলতি অর্থবছরে বার্ষিক বাজেটের ২০% তথা ১৫.৬৬ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দেয়া হয়েছে এ খাতে। থাইল্যান্ডের বর্তমান সামরিক সরকার বিগত বছরের চেয়ে ৩ গুণ বেশি অর্থ বরাদ্দ দিয়ে শিক্ষায় গুণগত পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছেন। ইতোমধ্যেই থাইল্যান্ডের ৯৩.৫ শতাংশ মানুষ সাক্ষরতার আওতায় এসেছে। বিশ্বের সর্বশেষ তথ্য-প্রযুক্তি আর জ্ঞান-বিজ্ঞানকে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করে বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে নতুন নতুন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে শিক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে থাইল্যান্ড। দেশের আয়ের প্রধান খাত পর্যটনের মতোই শিক্ষা খাতকেও জাতীয় আয়ের একটি খাত হিসেবে গড়ে তুলতে চাইছে থাই সরকার। এ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিদেশি শিক্ষার্থীদের আকৃষ্ট করতে নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বাড়তি অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক শাখা বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে আন্তঃযোগাযোগ ও মেধাবীদের বৃত্তি প্রদানের মাধ্যমে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নের সুযোগ করে দিচ্ছে। তাছাড়া বিশ্বসেরা স্কলারদের কাজ করার সুযোগও করে দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
থাইল্যান্ডে পড়াশোনার ভাষা ইংরেজি। টিউশন ফিসহ অন্যান্য খরচ হাতের নাগালে। তাছাড়া স্কলারশিপও পাওয়া যায়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক থাকলে সহজেই ভিসা পাওয়া যায়। তাই যারা উচ্চ শিক্ষালাভে থাইল্যান্ডে যেতে চান, তাদের জন্য নিচে কিছু তথ্য দেয়া হলো।
যেসব ডিগ্রি অর্জন করা যেতে পারে
ক) ডিপ্লোমা ডিগ্রি খ) এসোসিয়েট ডিগ্রি গ) ব্যাচেলর ডিগ্রি ঘ) গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা ডিগ্রি ঙ) মাস্টার্স ডিগ্রি চ) ডক্টরাল ডিগ্রি বা পিএইচডি ডিগ্রি।
সিমেস্টার থাইল্যান্ডের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এক বছর ৩টি সিমেস্টারে বিভক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে সিমেস্টারও ভিন্ন হয়। সিমেস্টারগুলো হচ্ছে- জুন থেকে অক্টোবর, নভেম্বর থেকে মার্চ, এপ্রিল থেকে মে অথবা আগস্ট থেকে ডিসেম্বর, জানুয়ারি থেকে মে এবং জুন থেকে জুলাই।
ভাষা ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা হলেও চলাফেরা করতে থাই ভাষা জানা জরুরি। থাইল্যান্ডে থাই ভাষা শেখার জন্য নিচের ঠিকানায় যোগাযোগ করা যেতে পারে। English Speaking Students at The Union Language School 197-1 Silom Road, Bankok, Thailand. ব্যাচেলর ও মাস্টার্স প্রোগ্রামের আওতাধীন বিষয় একাউন্টিং, এপ্লাইড সায়েন্স, এগ্রিকালচার সায়েন্স, এপ্লাইড কেমেস্ট্রি, এপ্লাইড মাইক্রো-বায়োলজি, এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রি, বায়োটেকনোলজি, আর্কিটেকচার, ফুড টেকনোলজি, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস, এপ্লাইড থাই মেডিসিন, বায়োডাইভারসিটি, মেডিসিন, হেলথ কেয়ার, পাবলিক হেল্থ, মার্কেটিং এন্ড ই-কর্মাস, ট্যুরিজম এন্ড হোটেল ম্যানেজমেন্ট, সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, মেরিন টেকনোলজি, ইকো-ট্যুরিজম, স্পোর্ট সায়েন্স, ভেটেরিনারি সায়েন্স, নার্সিং, বিবিএ, এমবিএ, লিবারেল আর্টস, ফাইন এন্ড এপ্লাইড আর্টস ইত্যাদি।
টিউশন ফি ৪ বছর মেয়াদি ব্যাচেলর প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে মোট টিউশন ফি প্রায় ৩ হাজার ৮০৪ থেকে ১৩ হাজার ৩৩৩ এবং দু’বছর মেয়াদি মাস্টার্স প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে টিউশন ফি প্রায় ৩ হাজার ৫৮২ থেকে ৮ হাজার ৯৮৭ মার্কিন ডলার। তবে বিশ্ববিদ্যালয় ভেদে ফি-এর হার কমবেশি হতে পারে। তাই ভর্তির পূর্বে এ বিষয়গুলো ভালোভাবে নিশ্চিত হতে হবে।
ভর্তির যোগ্যতা ব্যাচেলর প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে ১২ বছরের শিক্ষাজীবন অর্থাৎ এইচএসসি পাস হতে হবে এবং মাস্টার্স প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে ১৬ বছরের শিক্ষাজীবন সম্পন্ন হতে হবে। ব্যাচেলর ও মাস্টার্স উভয় প্রোগ্রামের ক্ষেত্রে ওঊখঞঝ এ কমপক্ষে ৫ পেতে হবে অর্থাৎ ঞঙঊঋখ এর ঈইঞতে ১৯৭ পয়েন্ট বা ওইঞতে ৭১ পয়েন্ট থাকতে হবে।
এছাড়া চিকিংসা সেবার ক্ষেত্রেও থাইল্যান্ড এশিয়ার দেশগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। সুচিকিৎসার জন্য রোগীরা ব্যাংককের নামকরা হাসপাতালে ছুটে যায়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। থাইল্যান্ড সরকার তার শিক্ষা, পর্যটন ও স্বাস্থ্যসেবাকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করতে প্রতিবছর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের থাইল্যান্ড ভ্রমণ করিয়ে থাকে। এ বছর বাংলাদেশ থেকে ১৭ সদস্যের এক ডেলিগেশন থাইল্যান্ড নিয়ে যায় থাই রয়েল এম্বেসী, ঢাকা। ৭ দিনের সফরে ডেলিগেশনকে থাইল্যান্ডের সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্টারন্যাশনাল স্কুল, হাসপাতাল ও দর্শনীয় স্থান ঘুরিয়ে দেখানো হয়।
আমার এবারের থাইল্যান্ড সফর পর্যটক কিংবা শিক্ষার্থী হিসেবে নয়; বরং থাইল্যান্ড এডুকেশন প্রমোশন প্রজেক্টের আওতায় ১৭ সদস্যের ডেলিগেশনের সদস্য হিসেবে। এ ডেলিগেশনের প্রধান ছিলেন ঢাকাস্থ রয়াল থাই দূতাবাসের থার্ড সেক্রেটারি পাচরাপোল প্যাডারমপোচ, সদস্য ছিলেন বিএসবি এডুকেশন গ্রুপের চেয়ারম্যান লায়ন এম কে বাশার এবং ডিজিটাল কনটেন্ট এর মাস্টার ট্রেইনার কাওসার আলী হাওলাদার; অরেঞ্জ বাংলাদেশ এর বিজনেস ডেভেলপমেন্ট (শিক্ষা) এর ডাইরেক্টর মুনির উদ্দিন আহমেদ; চ্যানেল আই এর সিনিয়র স্টাফ করোসপন্ডেন্ট মুস্তফা মল্লিক এবং সিনিয়র ক্যামেরাম্যান মোঃ মনির হোসেন; এস এ টিভি’র রিপোর্টার এম এম বাদশা এবং সিনিয়র ক্যামেরাম্যান কামরুজ্জামান; দেশ টিভি’র রিপোর্টার জুয়েল থিওটোনিয়াস গোমেজ এবং সিনিয়র ক্যামেরাম্যান খন্দকার মুসা রেজা; দি ডেইলি স্টার পত্রিকার বিজনেস ডেভেলপমেন্ট (শিক্ষা) এর সিনিয়র এক্সিকিউটিভ তানভীর আহসান; পাক্ষিক ক্যারিয়ার এর সম্পাদক এবং দৈনিক ইত্তেফাক এর সিনিয়র রিপোর্টার নজরুল ইসলাম; দৈনিক মানবজমিন এর স্টাফ রিপোর্টার লুৎফুর রহমান; বাংলাদেশ-প্রতিদিন এর স্টাফ রিপোর্টার মোঃ আকতারুজ্জামান; বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সহকারী সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন আহমেদ; রয়েল থাই এ্যাম্বেসি, ঢাকা এর সিনিয়র এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার শাহজাহান রেজা এবং এ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অফিসার মোঃ সানভিরাজ হাসান।
১৭ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার ডেলিগেট সদস্যগণ শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে থাই এয়ার ওয়েজের বিমানযোগে ব্যাংককের উদ্দেশ্য ঢাকা ছেড়ে যায়। বিকেল ৫টায় বিমান ব্যাংককের সুবর্ণভূমি ইন্টারন্যাশনাল বিমান বন্দরে অবতরণ করে। আমরা বিমান বন্দর থেকে সোজা প্লয় রেস্টুরেন্টে যাই। সেখানে রাত্র ৮টায় ডিনার সেরে সুকোসল হোটেলে উঠি।
সুকোসল হোটেলের কাছেই রয়েছে থাইল্যান্ডের সবচেয়ে উঁচু টাওয়ার; যেখানে রয়েছে ব্যাংককের স্কাই রেস্টুরেন্ট, রেইনবো কনভেশন হল, স্টেলা প্যালেস রেস্টুরেন্ট, স্কাই কফি শপ, ক্রিস্টাল গ্রিল, ব্যাংকক বেলকনী, বোইয়ক, ফ্লোটিং মার্কেট, অবজারভেশন ডেক, হেলথ্ এন্ড ফিটনেস ক্লাব, বোইয়ক গল্ফ রেঞ্জ, ফ্রুট বুফে ফ্রুট কোর্ট, প্লয় রেস্টুরেন্ট।
ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন, ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল সাড়ে ৮টায় আমরা স্বনামখ্যাত ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে সকাল ১০টায় পৌঁছলাম সেখানে। ক্যাসেটসার্ট পৌঁছামাত্রই উষ্ণ আতিথেয়তায় অভিনন্দিত করেন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ভাইস-প্রেসিডেন্ট ড. পনিপপ ক্যাসেমসাপ। অভ্যর্থনা পর্বশেষে মতবিনিময়কালীন ইউনিভার্সিটির নানা বিষয় তিনি প্রতিনিধি দলের কাছে তুলে ধরেন। পাঠকদের উদ্দেশ্যে ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটি সম্পর্কে তারই কিছু সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।
ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটি থাইল্যান্ডের একটি নামকরা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে এটি ৪০১-৫০০ এর মধ্যে রয়েছে। কহড়ষিবফমব ড়ভ ঃযব ষধহফ খ্যাত এ বিশ্ববিদ্যালয়টি থাইল্যান্ডের কৃষিশিক্ষার বিবর্তনের অংশ। যেখান থেকে সে দেশের টেকনিক্যাল স্কুলের গোড়াপত্তন হয়। বিবর্তনের ধারায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি তার জ্ঞানের পরিধি বাড়িয়ে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হয়েছে। এটি থাইল্যান্ডের প্রথম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৩য় প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়। কৃষি বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত বিষয়গুলোর প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৪৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় থেকে ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটি তার শিক্ষার ক্ষেত্র বিস্তৃত করেছে বিজ্ঞান, আর্টস, সোস্যাল সায়েন্সেস, হিউম্যানেটিস, শিক্ষা, ইঞ্জিনিয়ারিং এবং স্থাপত্য অনুষদ খোলার মাধ্যমে। বিশ্ববিদ্যালয়টি তার শিক্ষাধারার মাঝে মেডিসিন এন্ড হেল্থ সায়েন্স যোগ করার আশা ব্যক্ত করেছে। ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটির রয়েছে ৭টি ক্যাম্পাস। মূল ক্যাম্পাস হলো ব্যাংককের বাংখেন এলাকায়। দেশি-বিদেশি মিলিয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৬৬ হাজার। এটি থাইল্যান্ডের সর্ববৃহৎ বিশ্ববিদ্যালয়।
ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটির ইতিহাসকে ৩ ভাগে ভাগ করা হয়। প্রাথমিক যুগ (১৯০৪-১৯১৩), মিডল পিরিয়ড (১৯১৪-১৯২৩) এবং পরবর্তী যুগ (১৯২৪-১৯৪২)। ১৯৪৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটির নতুন নামকরণ করা হয় ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটি অব এগ্রিকালচার। নিম্নে প্রধান ৪টি ক্যাম্পাসের বর্ণনা দেয়া হলো।
বাংখেন ক্যাম্পাস বাংখেন ক্যাম্পাস হলো ইউনিভার্সিটির আদি এবং মূল ক্যাম্পাস, যা ১৯৪৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ব্যাংককের উত্তরাঞ্চলে ১৩৫ হেক্টর জমির ওপর এ ক্যাম্পাসের অবস্থান। ইউনিভার্সিটির সকল কলেজ, ইনস্টিটিউট সেন্টার এর হেড কোয়ার্টার এ ক্যাম্পাসে অবস্থিত। ‘এ ক্যাম্পাসটি ইউনিভার্সিটির উন্নত গবেষণা, শিক্ষান্নোয়ন, শিক্ষাদানসহ দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতামূলক নীতি প্রণয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এ ক্যাম্পাস’র মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৩৯,০৪৬ জন, একাডেমিক স্টাফ ২৪৩৩ জন, সহকারী স্টাফ ৪৬৯৭ জন।
ক্যামফেং সায়েন ক্যাম্পাস ক্যামফেং সায়েন ক্যাসেটসার্ট শহরতলীতে অবস্থিত ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটির প্রথম শাখা, যা ১২৮২ হেক্টর জমির ওপর ১৯৭৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটির অনুমোদনে এ ক্যাম্পাস উচ্চশিক্ষা প্রসারে কাজ করে, গবেষণা পরিচালনা করে সমাজে শিক্ষাগত সেবা প্রদান করে, জাতীয় শিল্প-সংস্কৃতির পরিচর্যা এবং জাতীয় উন্নয়নে অংশগ্রহণ করে।
সি রাচা ক্যাম্পাস সি রাচা ক্যাম্পাস ৩২ হেক্টর জমির ওপর ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্যাংককের পূর্বে চোর বুরি প্রদেশে ১০৭ কি.মি. দূরে এর অবস্থান। ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত এটি ছিল মূলতঃ ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটির এগ্রিকালচারাল রিসাচ্ স্টেশন। উচ্চগুণ সম্পন্ন জনবলের অভাব দূর করতে এ রিসাচ্ স্টেশন ক্যাম্পাস হিসেবে গড়ে ওঠে।
চেলারমরাকিয়াট সাখন নাখন ক্যাম্পাস রাজা ভূমিবল আদুলাদেজ’র সিংহাসন আরোহনের স্বর্ণ-জুবিলিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য ১৯৯৬ সালে চেলারমরাকিয়াট সাখন নাখন প্রদেশে এ ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য ছিল থাইল্যান্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রয়োজনীয় উন্নয়ন, শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা এবং এ অঞ্চলের শিক্ষার কেন্দ্রভূমিতে পরিণত করা। পাশাপাশি রাজকীয় প্রকল্প ও রাজকীয় উদ্যোগের বাস্তবায়নও এ ক্যাম্পাস’র লক্ষ্য ছিল। এ ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থী সংখ্যা ৫১৭৭ জন, একাডেমিক স্টাফ ২১৮ এবং সাপোর্টিং স্টাফ রয়েছে ৩০৩ জন।
ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটির অবকাঠামো গড়ে উঠেছে যেভাবে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২৯টি ফ্যাকাল্টি, ২টি কলেজ; ৯টি ইনস্টিটিউট, ১৩টি অফিস, ১০৫টি সেন্টার, ১৮টি রিসার্চ স্টেশন, ৪টি ফিল্ড স্টেশন, ৪টি ভেটেরিনারি হাসপাতাল, ২টি কে ইউ লেবেরেটরি স্কুল ও ৪টি আর ইউ রেডিও স্টেশন রয়েছে। থাইল্যান্ডের ৩টি বিশ্ববিদ্যালয় ওয়ার্ল্ড র‌্যাংকিংয়ে স্থান পেয়েছে। তন্মধ্যে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে বিশ্বে ২১তম এবং এশিয়ায় ৪র্থ এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু বিদেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। আধুনিক গবেষণাগার সমৃদ্ধ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ৩০০০ শিক্ষকের প্রায় ৭৫ ভাগই পিএইচডি ডিগ্রিধারী। ব্যাচেলর, মাস্টার্স এবং পিএইচডি প্রোগ্রামে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের তারা স্বাগত জানায়।
ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটিতে বাংলাদেশের ১০ জন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এরা হলেন কাজী কায়েসুল ইসলাম (এগ্রিকালচার মাস্টার্স); মোঃ আলমগীর কবির (মাস্টার্স এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রি); এএসএম হাসান লতিফ (এগ্রিকালচার মাস্টার্স); মোঃ আতিকুল ইসলাম (মাস্টার্স ইকোনোমিক্স); মোহাম্মদ মোমেনুল ইসলাম মৃধা (মাস্টার্স ইঞ্জিনিয়ারিং); দেওয়ান আবুল কাশেম এবং মোহাম্মদ মাহিন রেজা (মাস্টার্স ইঞ্জিনিয়ারিং); মিজ রোকেয়া আকতার (ডক্টরেল সায়েন্স); মোঃ আনিসুর রহমান মজুমদার ডক্টরেল (এগ্রো-ইন্ডাস্ট্রি); মিজ নাদিরা ইসলাম (ডক্টরেল-এগ্রিকালচার ডক্টর অব ফিলসফি প্রোগ্রাম ইন ট্রফিক্যাল এগ্রিকালচার (ইন্টারন্যাশনাল প্রোগ্রাম)।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ভারপ্রাপ্ত ভাইস-প্রেসিডেন্ট ড. পনিপপ ক্যাসেমসাপ বলেন, থাইল্যান্ডের কৃষি বিজ্ঞানের উন্নয়নে ক্যাসেটসার্ট কাজ করছে। এখানে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলা হচ্ছে মানুষকে উন্নতসেবা দেয়ার জন্য। থাইল্যান্ডের কৃষি উন্নয়নে এ বিশ্ববিদ্যালয় বড় ভূমিকা রাখছে বলেও জানান তিনি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী নাদিরা ইসলাম জানান, গবেষণায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাচ্ছেন। তিনি বলেন, এখানে কম খরচে বিশ্বমানের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের। বাংলাদেশি আরেক শিক্ষার্থী এএসএম হাসান লতিফ বলেন, বছরে বিশ্ববিদ্যালয়টি শুধু গবেষণায় যে অর্থ ব্যয় করে বাংলাদেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটও এর চেয়ে কম। থাইল্যান্ড সরকারের বৃত্তি নিয়ে পড়তে যাওয়া এ শিক্ষার্থী বলেন, শিক্ষক ও ছাত্র-রাজনীতি না থাকায় অকারণে ক্লাস-পরীক্ষা বন্ধ হয় না। নির্ধারিত সময়ে কোর্স, পরীক্ষা শেষ হয়। গবেষণায় শিক্ষকরা সহযোগিতা করেন। ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটিতে দু’টি মতবিনিময় সভা শেষে প্রতিনিধি দল মধ্যাহ্ন ভোজন সেরে উপস্থিত হয় থাই চেম্বার প্রতিষ্ঠিত সেদেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব থাই চেম্বার অব কমার্স এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (ইউটিসিসি) এ। থাই ব্যবসায়ীদের তত্ত্বাবধানে ১৯৭০ সালে কমার্স কলেজ হিসেবে যাত্রা শুরু করে ১৯৮৪ সালে এটি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ইউটিসিসির ইন্টারন্যাশনাল কলেজের ডিন ড. জাকেরিন শ্রিমন জানান, চার শতাধিক বিদেশি শিক্ষার্থী তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছে। প্রতিবছরই এ সংখ্যা বাড়ছে। বাংলাদেশি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মতবিনিময়ের সময় তিনি জানান, এশিয়া অঞ্চলে কম খরচে বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করায় ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও মধ্যপ্রাচ্য থেকেও শিক্ষার্থীরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসছেন। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়টি বেসরকারি কর্তৃপক্ষ পরিচালনা করলেও এটি অলাভজনক একটি প্রতিষ্ঠান। ২০১০ সালে মাত্র ৩৩ জন বিদেশি শিক্ষার্থী ছিল এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ বছর এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৬৭ জনে। বিশ্বের অনেক খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে চুক্তির আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এক্সচেঞ্জের সুযোগ রেখেছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশি কয়েকজন শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে বিভিন্ন বিভাগে। তাদের মধ্যে ঢাকার আশুলিয়ার মেয়ে শম্পা পারভিন সোমার সাথে থাই এবং বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আলাপ হলে তিনি জানান ইউটিসিসি’র শিক্ষকরা অনেক বেশি অভিজ্ঞ। এখানকার অধিকাংশ শিক্ষক দীর্ঘদিন ইউএসএ বা ইউকে তে শিক্ষকতা করে বর্তমানে ইউটিসিসিতে পড়াচ্ছেন। বাংলাদেশে পড়াকালীন আমরা কোনো বিষয়ে জানতে শিক্ষকদের একবারের বেশি দুইবার প্রশ্ন করতে পারতাম না। কিন্তু এখানে একাধিকবার জানতে চাইলেও শিক্ষকরা কিছু মনে করেন না, বরং তারা খুশি হন।
থাইল্যান্ডের মানুষ আমাদের সাথে বন্ধুসুলভ আচরণ করেন, তাই এখানে বসবাস করতে কোনো সমস্যা হয় না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের বলব তোমরা বিদেশে পড়ালেখা করতে চাইলে থাইল্যান্ডকে বিবেচনা করতে পার, কারণ অল্প খরচে উন্নতমানের শিক্ষা থাইল্যান্ডেই পাওয়া যায়। ইউটিসিসি পরিদর্শন শেষে প্রতিনিধি দল বিশ্রাম নিতে ফিরে যায় সুকোসল হোটেলে। সুকোসলে যেতে যেতেই বিএসবি’র চেয়ারম্যান লায়ন এম কে বাশার ব্যাংককে অবস্থিত নাসিরের রেস্টুরেন্ট এর মালিক নাসির সাহেবের সাথে যোগাযোগ করে রাতের খাবারের জন্যে বিভিন্ন ভর্তা, ভাজি, সব্জি, গোমাংস ভুনা এবং পাতলা ডালের অর্ডার দেন। সুকোসলে সামান্য বিশ্রাম নিয়েই আমরা দলে দলে বিভক্ত হয়ে থাইল্যান্ডের অলিগলি ঘুরে এবং পছন্দমতো কেনাকাটা করে পূর্বনির্ধারিত সময়ে নাসিরের রেস্টুরেন্টে উপস্থিত হই; আর দু’দিন পর তৃপ্তি সহকারে রাতের আহার গ্রহণ করি। এরপর রাতের ব্যাংকক দেখতে দেখতে পায়ে হেঁটেই হোটেলে ফিরলাম এবং সারাদিনের সকল ক্লান্তিকে দূর করতে বিছানায় নিজকে সঁপে দিলাম।
১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টায় আয়ুথায়া প্রদেশের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। আয়ুথায়া থাইল্যান্ডের একটি দৃষ্টিনন্দন, মনোরম অঞ্চল। যেখানে রয়েছে আয়ুথায়া ঐতিহাসিক পার্ক যা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ হিসেবে সংরক্ষিত। এ পার্কের চারপাশেই রয়েছে বিনোদনের নানা ব্যবস্থা।
১.৩০ মিনিট লাঞ্চ সেরে কিছুটা বিশ্রাম। দুপুর ২টায় রওনা হলাম পর্যটকদের তীর্থভূমি পাতায়ার উদ্দেশ্যে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ১৭৫ কিঃমিঃ রাস্তা মাত্র ১ ঘন্টা ৩০ মিনিটে পাড়ি দিল আমাদের গাড়ি। গাড়ি থামল সৈকতের পাশ ঘেঁষেই। ছোট সৈকত, ছিমছাম, গোছানো। রাস্তার পাশে বিভিন্ন প্রজাতির সারি সারি গাছ। দূরে টিলায় ইংরেজি বড় হরফে লেখা পাতায়া। সূর্যাস্তের সময় হয়ে এসেছে। তাই বিচে লোকজন তেমন নেই। আমরা ২/১টি ছবি তুলে রাস্তার অপর পাশে গড়ে ওঠা বিনোদন কেন্দ্রগুলোর দিকে হাঁটা শুরু করলাম। ইতোমধ্যে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাতের নিকশ কালো অন্ধকার নেমে এসেছে পাতায়ার আকাশে। কিন্তু বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে দাঁড়িয়ে বোঝার উপায় নেই পাতায়ায় এখন রাত। মনে হলো সবাই যেন ঘুম থেকে এইমাত্র জেগে উঠেছে। সত্যিই এ শহর দিনে ঘুমায় আর রাতে জাগে। ওয়াকিং স্ট্রিট হয়ে বিভিন্ন পথ প্রদক্ষিণ করে আমরা সী-ফুডের স্বাদ নিতে সমুদ্রের জলের উপরে তৈরি ভাসমান রেস্তোরায় উপস্থিত হলাম; ১ কেজি ওজনের বিশালাকৃতির লভস্টার ভেটকিসহ অন্যান্য মাছের স্বাদ নিয়ে যখন ব্যাংককের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম, তখন ভাবলাম বিনোদনের কী নেই এই শহরে। যে যেরকম বিনোদন চায়, তার জন্যে সেরকম বিনোদনই এখানে থরে থরে সাজানো। আমরা পাতায়ায় রাতের বিনোদন উপভোগ না করলেও ব্যাংকক আসার পথে গাড়িতে সবাই কৌতুক আর চুটকির ডালি মেলে ধরলাম। এতে দমফাটা হাসিতে সবাই পুলকিত হলাম। রাত ১২টায় গাড়ি যখন হোটেলের সামনে এসে দাঁড়াল, তখনও সবাই যেন উজ্জীবিত। কাউকে দেখে মনেই হচ্ছিল না যে, তারা সারাদিন বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র ঘুরে শ্রান্ত-ক্লান্ত।
২০ সেপ্টেম্বর রবিবার। থাইল্যান্ড এডুকেশন প্রমোশন প্রজেক্টের লোকজন আমাদেরকে নিয়ে চললেন গ্রান্ড প্যালেস দেখাতে। থাইল্যান্ড এমন একটি দেশ, যেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে শত শত দর্শনীয় স্থান ও স্থাপনা; যা দেখে শেষ করা যায় না। গ্রান্ড প্যালেস পরিদর্শন শেষে দুপুর সাড়ে ১২টায় আমরা লাঞ্চ করলাম। দুপুর ২টায় আমরা গেলাম অনন্ত সমখোম সিংহাসন হলে, যেখানে রয়েছে থাই সাম্রাজ্যের শিল্পকর্ম প্রদর্শনীর সুবিন্যস্ত আয়োজন। এ সুযোগে আমরা বিমার্নমেক প্যালেস পরিদর্শন করলাম। সন্ধ্যে ৭টায় ডিনার সেরে সেদিনের মতো বিশ্রামে গেলাম।
২১ সেপ্টেম্বর, সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় খ্যাতনামা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাহিদল ইউনিভার্সিটির উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা। সকাল ১০টায় সেখানে পৌঁছালে আমাদের স্বাগত জানান ইন্টারন্যাশনাল এ্যাফেয়ার্স ডিরেক্টর ওয়ানপিমন স্যানাপাদাকর্ন।
দেশটির সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি মাহিদল ইউনিভার্সিটি। একটি হাসপাতাল থেকে শুরু হয়ে এ প্রতিষ্ঠানটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর হওয়ায় এতে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ওপর বিশেষ গরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। থাইল্যান্ডের সেরা ও বিশ্বের টপ র‌্যাঙ্কের ৩০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি মাহিদল। বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণায়ও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। ১৯৪৩ সালে ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সের নামে বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কার্যক্রম শুরু করলেও ১৯৬৯ সালে প্রিন্স মাহিদলের নামে এর পুনঃনামকরণ করা হয়। সরকারি হিসেবে সাম্প্রতিক সময়ে এ বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। বছরে এক হাজার মিলিয়নের বেশি থাই বাথ বিনিয়োগ করা হয় এ খাতে। এখানে তিন শতাধিক বিদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। ২০টিরও বেশি বিষয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীদের পড়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের পরিচালক ওয়ানপিমন স্যানাপাদাকর্ন। তিনি বলেন, তুলনামূলক কম খরচে মাহিদল ইউনিভার্সিটিতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের অধ্যয়নের সুযোগ রয়েছে। এছাড়া বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্যে বৃত্তির সুযোগও আছে এখানে। বায়ো মেডিকেল এন্ড হেলথ ইনফরমেশনস বিভাগের বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জাকির হোসেন জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করে বৃত্তি নিয়ে তিনি মাহিদলে মাস্টার্স পড়তে যান। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণার মান, শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষকদের আন্তরিকতায় মুগ্ধ বাংলাদেশি এ শিক্ষার্থী বলেন তুলনামূলক কম ব্যয়ে এখানে বিশ্বমানের শিক্ষা দেয়া হয়। বাংলাদেশি আরেক শিক্ষার্থী আনিকা ইসলাম জানান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বিদেশি শিক্ষার্থীদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করায় কোনো ধরনের সমস্যা হচ্ছে না তাদের। এছাড়া ভালো ইংরেজি জানা শিক্ষার্থীরা এখানে বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন। মাহিদল ইউনিভার্সিটি ইন্টারন্যাশনাল কলেজ ও মাহিদল ইন্টারন্যাশনাল ডেমোনস্ট্রেশন স্কুল ঘুরে দেখা গেছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থার মেলবন্ধন গড়ে তুলেছে প্রতিষ্ঠান দু’টি।
কলেজ অব মিউজিকের শৈল্পিক ক্যাম্পাসে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের তত্ত্বাবধানে গড়ে উঠেছে শিল্পচর্চার অনন্য কেন্দ্র। এখানে নির্মাণ করা হয়েছে প্রিন্স মাহিদল হল। এশিয়ার অন্যতম এ সম্মেলন কেন্দ্রটি ব্যবহার হচ্ছে কলেজ অব মিউজিকের শিক্ষার্থীদের কাজে।
সন্ধ্যে ৭টায় ডিনার সেরে আমরা বিশ্রামে গেলাম। সারাদিনের কর্মক্লান্ত শরীর এলিয়ে দিলাম নিদ্রাদেবীর কোলে। সেদিনের ঘুমটাও ছিল গভীর তৃপ্তির। আমাদের শিক্ষা ও আনন্দ ভ্রমণ প্রায় সমাপ্তির দিকে এসে গেছে। ২২ সেপ্টেম্বর আমরা সকাল সাড়ে ৮টায় রওয়ানা হলাম থাই পর্যটন কর্তৃপক্ষের (ঞঅঞ) সাথে দেখা করতে। পর্যটন কর্তৃপক্ষ জানায়,গত বছরের চেয়ে এ বছর পর্যটন খাতে ৪০ শতাংশ আয় বৃদ্ধি পাবে। দেশটি চলতি বছরের জুলাই পর্যন্ত ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে পর্যটন খাত থেকে। এ সময়ে ১৭ মিলিয়নের বেশি পর্যটক দেশটি ভ্রমণ করেছেন। গত বছর ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি আয় হয় এ খাত থেকে। পর্যটক এসেছিলেন ২৫ মিলিয়ন। এর আগের বছর পর্যটন খাত থেকে তাদের আয় হয়েছিল ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশটির পর্যটন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী মোট জাতীয় আয়ের অন্তত সাত ভাগ আসে এই পর্যটন খাত থেকে। তবে অন্য সূত্রের দাবি, থাইল্যান্ড পর্যটন খাত থেকে দৃশ্যত যে আয় করে এর বাইরে অদৃশ্য আয়ও রয়েছে। এটি যোগ করলে এ আয়ের পরিমাণ আরও অনেক বেশি হবে।
থাইল্যান্ডের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মানুষের সরল আতিথেয়তা আর সাশ্রয়ী খরচে উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থার কারণে দিন দিন প্রসারিত হচ্ছে পর্যটনের খাত। টিএটি’র তথ্য অনুযায়ী দেশটি বছরে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করছে শুধু মেডিকেল ট্যুরিজম খাত থেকেই। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে প্রতিবছর প্রায় তিন মিলিয়ন রোগী চিকিৎসা নিতে থাইল্যান্ডে আসছে। কারণ অন্য যেকোনো উন্নত দেশের তুলনায় ১৫ ভাগ কম খরচেই বিশ্বমানের চিকিৎসা পাওয়া যায় এখানে। থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিকমানের ৪৪টি জেসিআই (জয়েন্ট কমিশন ইন্টারন্যাশনাল) হাসপাতাল রয়েছে। এসব হাসপাতালের চিকিৎসকরা অনেক যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। তাদের ৬ শতাধিক চিকিৎসক আছেন, যারা আমেরিকান বোর্ড সার্টিফিকেটপ্রাপ্ত।
ব্যাংককের অন্যতম বেসরকারি হাসপাতাল রমা-৯ হাসপাতাল দেখতে গেলাম দুপুর ২টায়। এ হাসপাতালটির বোর্ড অব ডাইরেক্টর প্রাসার্ট ট্রাইরাটবুরাকুল জানান, তাদের হাসপাতালে মিয়ানমার, বাংলাদেশ, ভারতসহ আরও কয়েকটি দেশের রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। তুলনামূলক কম ব্যয়ে এ হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হয় জানিয়ে তিনি বলেন, রোগীদের সর্বাধুনিক চিকিৎসা দিতে প্রতিনিয়ত গবেষণা করছে হাসপাতালটি। হাসপাতালের ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটিং ম্যানেজার সুই অ্যাং ন্যাং ছিট জানান, জেসিআই স্বীকৃত হাসপাতাল হিসেবে বিদেশি রোগীদের জন্য আবাসিকসহ সব ধরনের সুবিধা আছে এখানে। তিনি জানান, শুধু এই হাসপাতালই নয়, জেসিআই স্বীকৃত সব হাসপাতালেই সর্বোচ্চ রোগী সেবা দেয়া হয়।
হাসপাতাল ঘুরে দেখতে গিয়ে দেখলাম হাসপাতালের সুন্দর মনোরম পরিবেশ; যা দেখলে মন শান্ত হয়ে আসে। ডাক্তারদের কোনো ফুরসৎ নেই, রোগীর খুঁটিনাটি দেখছেন, ধৈর্যসহকারে রোগীর কথা শুনছেন। ব্যবহারের গুণেই এখানে অর্ধেক রোগের উপশম হয়ে যায় বলে আমার মনে হয়েছে। বুঝলাম, বাংলাদেশ থেকে রোগীরা থাইল্যান্ডে এমনি এমনি আসে না।
বিকালে সবাই মিলে শপিংমলগুলোতে উপস্থিত হলাম বাংলাদেশে রেখে আসা প্রিয়জনদের জন্যে কিছু কেনার প্রত্যাশায়। যে যা পারলাম, প্রিয়জনদের জন্যে কেনাকাটা শেষে হোটেলে ফিরে সামান্য বিশ্রাম নিয়ে ডিনার সারতে উপস্থিত হলাম থাইল্যান্ড টাওয়ারের ৮৩ তলায় অবস্থিত ব্যাংকক স্কাই রেস্টুরেন্টে। যেখানে ডিনার শেষে ৮৫ তলায় গেলাম রাতের ব্যাংকক দেখতে। ৮৫ তলা থেকে আলো-ঝলমলে ব্যাংকককে স্বপ্নপুরীর মতোই লাগছিল। ২৩ সেপ্টেম্বর; এবার বিদায়ের পালা। এ ক’দিন হাসিখুশি-আনন্দের মধ্যদিয়ে আমাদের সময় কেটেছে। ভ্রমণজনিত ক্লান্তি কাবু করতে পারেনি, ব্যক্তিগতভাবে এটা আমি বলতে পারি। ক’দিনে থাইল্যান্ড সম্পর্কে অনেক জেনেছি; আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশি ছাত্র-তরুণরা আরও বেশি সংখ্যায় থাইল্যান্ডের উন্নতমানের শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ নেবেন; ভ্রমণ-পিপাসুরা ভ্রমণের জন্য আর যারা অল্প খরচে উন্নত চিকিৎসা নিতে চান, তারা অবশ্যই থাইল্যান্ডে যেতে পারেন।
প্রিয় পাঠক, থাইল্যান্ডে শিক্ষা বা চিকিৎসাসেবা নিতে বিদেশে উচ্চ শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিকারী বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান বিএসবি ফাউন্ডেশন এবং বিএসবি ট্রাভেলস এর সাথে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
যোগাযোগের ঠিকানাঃ প্লট ২২, গুলশান সার্কেল ২, ঢাকা। ফোনঃ ৮৮১৮৮১৬, ৯৮৮৫০৬৬, ৮৮২৯৬৬৩; মোবাঃ ০১৭৩৩০৭৭৭৭৬, ০১৭২০৫৫৭১১৩, ০১৭২০৫৫৭১১৮, ০১৭২০৫৫৭১২৯, ০১৭২০৫৫৭১৯৮ বসধরষ: নংনঃৎধাবষং@নংননফ.পড়স বিন: িি.িনংননফ.পড়স
সকাল ৭টায় আমরা সুকোসল হোটেল থেকে সুবর্ণভূমি আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। সফরসঙ্গীদের অনেকের সাথে পূর্ব পরিচয় থাকলেও ৭ দিনের থাই সফলে সবার জন্যে অন্যরকম এক ভালোবাসার জন্ম নেয়ায় মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল; কারণ কয়েক ঘন্টা পরই আমরা জীবন ও জীবীকার প্রয়োজনে একে অন্যের থেকে আলাদা হয়ে যাব। ব্যাংককের রাস্তা তখনও ফাঁকা; লোকালয় ছেড়ে আমাদের বাস যখন এক্সপ্রেস ওয়েতে, তখন যেন থাইল্যান্ডের আকাশও কেঁদে উঠল। শুরু হলো ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। আমাদের গাইড (যার নাম টিম), যে গত ৭ দিন ধরে তার সাধ্যমতো থাইল্যান্ডকে আমাদের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে; সেও আজ কান্নাজড়িত কন্ঠে আমাদের বিদায় জানাল। টিম এবং বাসারে ড্রাইভার ও হেলপারকে বিদায় জানিয়ে সকাল ১০.৩৫ মিনিটে থাই এয়ারওয়জযোগে ঢাকার উদ্দেশ্যে ব্যাংকক ত্যাগ করলাম। বিমানের ভেতরই প্রতিনিধি দলের কয়েকজন সদস্যদের সাথে থাই সফরের অভিজ্ঞতা শেয়ার করলাম। কথোপকথনের সময় তারা তাদের মতামত চমৎকারভাবে তুলে ধরেন। এতে আমি বুঝলাম, এ সফরে শুধু আমিই অভিভুত হইনি, অন্যরাও আমার মতো অভিভুত। অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে করতে কখন যে ঢাকা এসে পৌঁছালাম বুঝতেই পারিনি। ৭ দিনের শিক্ষণীয় ও আনন্দঘন থাইল্যান্ড সফর শেষে স্বদেশের দুর্ণিবার আকর্ষণে কোরবাণীর আগের দিন দেশে পৌঁছে আত্মীয়-পরিজনের সাথে দেখা করে ঈদের আগেই উপভোগ করলাম অপার আনন্দ। কথোপকথনের উল্লেখযোগ্য অংশবিশেষ পাঠকদের জন্যে নিম্নে তুলে ধরা হলো।

লায়ন এম কে বাশার পিএমজেএফ চেয়ারম্যান, বিএসবি ফাউন্ডেশন থাইল্যান্ড এডুকেশনাল প্রমোশন প্রজেক্ট প্রোগ্রামের আওতায় সাংবাদিক প্রতিনিধিদেরকে নিয়ে থাইল্যান্ড ভ্রমণ শেষে নিজ অনুভূতি ব্যক্ত করে বিশিষ্ট শিক্ষাদ্যোক্তা লায়ন এম কে বাশার বলেন, থাই সরকার সে দেশের শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। থাই সরকার মনে করে, শিক্ষার্থীদের দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হলে যুগোপযোগী শিক্ষাদান প্রয়োজন। আমেরিকা-কানাডা-ব্রিটেন-অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি উন্নত দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্যাম্পাস থাইল্যান্ডে স্থাপন করা হয়েছে। সেসব শাখা দেশের মূল প্রতিষ্ঠানের চেয়েও অনেক উন্নত করে পরিচালিত হচ্ছে। কৃষিতে থাইল্যান্ড স্বয়ংসম্পূর্ণ, বীজ বপন উদ্বোধন করেন সে দেশের রাজা, ফসল কাটার উদ্বোধনও হয় রাজার হাতে। থাইল্যান্ডের এগ্রিকালচার ইউনিভার্সিটি বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে উপরের দিকে রয়েছে। কৃষিবিভাগ দেশের চাহিদা মিটিয়ে খাদ্যশস্য বিদেশেও রপ্তানি করছে। একসময় দেশটি বাংলাদেশের মতোই দরিদ্র ছিল। কিন্তু শিক্ষান্নোয়নের মাধ্যমে থাইল্যান্ড এগিয়ে যায়। থাইল্যান্ডে অনেক দর্শনীয় স্থান আছে, যা পর্যটকদের আকর্ষণ করে। থাইল্যান্ডের পর্যটন শিল্প অনেক উন্নত। শিক্ষাকে আনন্দদায়ক করে গড়ে তোলা হয় বলে থাইল্যান্ডে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে পর্যটকের সংখ্যাও। সাউথইস্ট এশিয়ায় শিক্ষাক্ষেত্রে মালয়েশিয়া সবচেয়ে এগিয়ে। আশা করা যায়, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে থাইল্যান্ড সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাবে।
বাংলাদেশ সরকার যদি কিছু বিশেষায়িত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে সেগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে পারে তাহলে চীন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশের শিক্ষার্থীরা বাংলাদেশে আগ্রহ সহকারে পড়তে আসবে। এর ফলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অনেক বাড়বে, আমাদের অর্থনীতি আরও বেশি চাঙ্গা হবে। থাইল্যান্ডে যে শিক্ষা পদ্ধতি আছে, বাংলাদেশ সরকার যদি শিক্ষাক্ষেত্রে সেই সিস্টেম চালু করে তাহলে দেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। তিনি বলেন, বিশ্বের বড় বড় ইউনিভার্সিটিগুলো বহিঃবিশ্বের চাহিদা সামনে রেখে শিক্ষানীতি ও কারিকুলাম তৈরি করে। বাংলাদেশ যদি আন্তর্জাতিক মানের কারিকুলামের মাধ্যমে বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পরিচালিত করে, তাহলে সেসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা গ্র্যাজুয়েটদের চাকরি বিশ্বের যেকোনো দেশের মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে অবধারিত। আমরা উন্নত দেশের উন্নতমানের শিক্ষার প্রোগ্রামগুলো সরাসরি আমাদের দেশে পরিচালনা করতে পারি। এতে কারিকুলাম তৈরির কোনো ঝামেলা থাকবে না। অন্যদিকে আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা দেশে বসেই কম খরচে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার এখনও কেন সেই প্রস্তাব গ্রহণ করতে দ্বিধান্বিত, তা আমার বোধগম্য নয়।
তিনি আরও বলেন, উন্নত বিশ্বের স্কুলগুলোর শতকরা ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ ছেলেমেয়ে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণ করছে। এজন্য তারা এত উন্নত। উন্নয়নশীল বিশ্বও জোর দিচ্ছে কারিগরি শিক্ষার ওপর। বাংলাদেশ দেরিতে হলেও কারিগরি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পেরেছে, এজন্য তারা কারিগরি শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি করেছে। আমাদের দেশে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পাসের পর ৪ বছরে ডিপ্লোমা কোর্স সম্পন্ন করতে হয়, কিন্তু ইংল্যান্ডে ৪ বছরে ব্যাচেলর ডিগ্রি অর্জন করা যায়। এনডি (ন্যাশনাল ডিপ্লোমা) এইচএনডি (হায়ার ন্যাশনাল ডিপ্লোমা) সম্পন্ন করা যায় ৩ বছরে। জব মার্কেটেও তাদের চাহিদা অগ্রগণ্য। বাংলাদেশে চিত্রটা উল্টো- ৪ বছরে ডিপ্লোমা করল, তার সামাজিক মর্যাদা নেই; জব মার্কেটেও চাকরির নিশ্চয়তা নেই। আমাদের কারিগরি লেসনও তেমন উন্নত নয়। সারা পৃথিবীতে শিক্ষার পদ্ধতি পাল্টে গেছে। বই পড়ে, নোট মুখস্থ করে পরীক্ষা দিয়ে পাস করা যায়; কিন্তু বাস্তব জীবনে সেটি তেমন কার্যকর হয় না। উন্নত পৃথিবীর শিক্ষা বিষয়গুলো জব ওরিয়েন্টেড। আমরা এখনও সেই জায়গাটুকুতে পৌঁছাতে পারিনি। আমাদের উপদেষ্টাদের বললে তারা আস্তে আস্তে এগুতে চান। কিন্তু আস্তে আস্তে এগুলে আমরা যেখানে পৌঁছাব, তাতে দেখা যাবে গতিশীলতা নিয়ে যারা এগিয়েছে আমরা তাদের অনেক পেছনে পড়ে আছি। এভাবে চললে আমরা কখনো তাদের নাগাল পাব না। তাই দ্রুত গতিতে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইলে আমরা তাদের গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে সরাসরি কাজে লাগাতে পারি।
এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, চীন প্রভৃতি দেশে শিল্পায়ন ঘটেছে; এসব দেশে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীগুলো তাদের বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এদের বড় একটা অংশ সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক কেন্দ্রিক; যেখানে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা রয়েছে। তাই চাকরি প্রার্থীদের কাছে থাইল্যান্ড একটি পছন্দনীয় স্থান।
বিএসবি ফাউন্ডেশন বাংলাদেশি তরুণদের উচ্চশিক্ষার সুবিধার্থে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়ায় পাঠায়। বর্তমানে উচ্চশিক্ষার জন্যে থাইল্যান্ডেও শিক্ষার্থী পাঠানো শুরু করেছে। আশা করছি, ভবিষ্যতে আরও বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীকে আমরা থাইল্যান্ড পাঠাতে সক্ষম হব। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি দেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ভিসা প্রসেসিং সহজ; তাই এসব দেশে শিক্ষার্থীরা বেশি যায়। থাইল্যান্ডও এশিয়ার দেশগুলোর শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ভর্তি প্রক্রিয়া সহজ করেছে, এজন্য সে দেশেও শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রতিবছর বাড়ছে।

মুনির উদ্দিন আহমেদ ডাইরেক্টর, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট (শিক্ষা), অরেঞ্জ বাংলাদেশ থাইল্যান্ড সরকারের নিমন্ত্রণে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পর্যটন কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে অরেঞ্জ বাংলাদেশ এর বিজনেস ডেভেলপমেন্ট (শিক্ষা) এর ডাইরেক্টর মুনির উদ্দিন আহমেদ তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, সেখানে আমার অবজার্ভেশন ছিল থাই শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কীভাবে তুলনা করতে পারি। থাইল্যান্ড সম্পর্কে সাধারণ ধারণা হলো সেখানে মানুষ ভ্রমণ, হেলথ চেকআপ বা শপিংয়ের জন্য যাবে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থার এত উন্নতি হয়েছে, তা অনেকেই জানে না। ক্যাসেটসার্ট ইউনিভার্সিটি পরিদর্শন করে আমার মনে হয়েছে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এত সুন্দর সমৃদ্ধ ইউনিভাার্সটি দ্বিতীয়টি আর নেই। একটি বড় ক্যাম্পাসের জন্য যতটুকু জায়গা প্রয়োজন তার চেয়ে অনেক বেশি জায়গা জুড়ে রয়েছে এ ক্যাম্পাস। তাদের ল্যাব ফ্যাসিলিটি দেখে আমরা মুগ্ধ হয়েছি।
আমরা আমাদের ছাত্র-ছাত্রীদের আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, ব্রিটেন প্রভৃতি দেশে প্রমোট করি; কিন্তু আমাদের প্রতিবেশি দেশ থাইল্যান্ডের কথা ভাবি না। এ ট্যুরে থাই সরকার আমাদের দেখার জন্য যে সকল স্থান ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট করেছে, আমাদের ছাত্র-ছাত্রীরা উচ্চশিক্ষার জন্য সেসব প্রতিষ্ঠানে নিঃসন্দেহে যেতে পারে। শুধু যে আমাদের দেশ থেকে টাকা-পয়সা খরচ করে যেতে হবে তা নয়, সে দেশে পর্যাপ্ত স্কলারশিপের ব্যবস্থাও রয়েছে। আমাদের দেশে অনেক ছাত্র-ছাত্রী প্রতিবছর এসএসসি, এইচএসসি পাস করে বেরুচ্ছে; কিন্তু দেশের ইউনিভার্সিটিগুলো তাদের উচ্চশিক্ষার কাঙ্খিত ব্যবস্থা করতে পারছে না। আমাদের ছেলে-মেয়েরা ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা না করলে গ্লোবাল কম্পিটিশনে তারা পিছিয়ে পড়বে। অথচ আমাদের সন্তানরা কোনো দেশের সন্তানদের তুলনায় কম মেধাবী নয়। এখানে অনেক এজেন্সি আছে, আমরা চাইলে আমাদের ছেলে-মেয়েদেরকে প্রমোট করে উচ্চশিক্ষার জন্য থাইল্যান্ডে নিয়ে যেতে পারি। থাইল্যান্ডে পড়ালেখা করে ছাত্র-ছাত্রীরা গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ডে শিক্ষালাভ করে কম্পিটিশনে নিজেদের যোগ্য করে তুলতে পারবে।
যেসব ছেলে-মেয়ে বিদেশ যাওয়ার জন্য অরেঞ্জ বাংলাদেশে আসে, এখন থেকে আমরা তাদেরকে অন্যান্য দেশের সাথে থাইল্যান্ডে যাওয়ার জন্যেও উদ্বুদ্ধ করব। শিক্ষার্থীদের থাইল্যান্ডে নিয়ে যাবার জন্যে ঢাকাস্থ থাই এ্যাম্বেসী আমাদেরকে আশ্বাস দিয়েছে যে, তারাও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবে।

নজরুল ইসলাম সম্পাদক, পাক্ষিক ক্যারিয়ার থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের অন্যতম সদস্য হিসেবে নিজ অনুভূতি ব্যক্ত করে প্রাণবন্ত সংবাদকর্মী নজরুল ইসলাম বলেন, থাইল্যান্ডে আমাদের এ ভ্রমণটি অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের চমৎকার সুযোগ করে দিয়েছিল। এ ভ্রমণের যারা উদ্যোক্তা, তাদের বিভিন্ন আয়োজন, ঐতিহ্যবাহী থাই আতিথেয়তার প্রতিফলন আমাদেরকে দারুণভাবে উদ্দীপ্ত ও মুগ্ধ করেছে।
আমাদের লক্ষ্য সে দেশের শিক্ষাপদ্ধতি, শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষাঙ্গন সম্পর্কে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা; যা বাংলাদেশের শিক্ষা-ব্যবস্থার সাথে জড়িতদের সামনে তুলে ধরা যায়; শিক্ষাদ্যোক্তা, শিক্ষার্থীদেরকে জ্ঞাত করা যায়। শিক্ষান্নোয়নে, শিক্ষাপ্রশাসনে যারা সংশ্লিষ্ট; তাদের সামনে আমাদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরব; বারবার তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করব শিক্ষাক্ষেত্রে থাইল্যান্ডের ব্যাপক অগ্রগতি সম্পর্কে। আমি এ চেতনাই তুলে ধরব যে, থাইল্যান্ড আমাদের চেয়ে অনেক দূর এগিয়ে গেছে; আমাদের চেষ্টা অব্যহত থাকলে আমরাও তা পারব।
থাইল্যান্ডের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রত্যক্ষভাবে দেখে আমার মনে হয়েছে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক উন্নত; ক্যাম্পাসগুলো অনেক পরিচ্ছন্ন, মনোমুগ্ধকর এবং শিক্ষাবান্ধব। ছাত্র-ছাত্রীরা ক্যাম্পাসে আসা-যাওয়া করছে হাসিখুশি মনে, পাঠ গ্রহণ করছে সানন্দচিত্তে। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বমানের অনেক শিক্ষক আছেন; কিন্তু আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশকে শিক্ষাবান্ধব করে গড়ে তুলতে পারিনি; বাইরের রাজনীতির বিরূপতা, আদর্শহীন ছাত্রদের অপতৎপরতা, হানাহানি এ বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম-সুখ্যাতি ক্ষুন্ন করে চলেছে। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বহির্বিশ্বের শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় করতে হলে পরিকল্পিতভাবে অগ্রসর হতে হবে। সাংস্কৃতিক চর্চা, খেলাধূলা, সাহিত্য-অনুষ্ঠান, বিতর্ক প্রতিযোগিতার নিয়মিত আয়োজন করা হলে পরিবেশ অনেকটা উন্নত হবে বলে আমার বিশ্বাস।
তবে এখনই যারা উচ্চশিক্ষার জন্যে ভর্তি হতে চায়, তাদের উচিত প্রথমে দেশের ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হবার চেষ্টা করা। না হলে তুলনামূলক কম শিক্ষাব্যয়ে তারা থাইল্যান্ডে পড়ালেখা করার চিন্তা করতে পারে। সেখানকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কোনো অস্থিরতা নেই, যখন-তখন প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয় না। তাছাড়া সে দেশে গবেষণারও পর্যাপ্ত সুযোগ আছে। সীমিত ব্যয়ে ভালো শিক্ষা পাচ্ছে বলেই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা থাইল্যান্ডকে বেছে নিচ্ছে।

লুৎফুর রহমান স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক মানবজমিন থাইল্যান্ড সরকারের নিমন্ত্রণে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পর্যটন কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে দৈনিক মানবজমিনের স্টাফ রিপোর্টার লুৎফর রহমান তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশ সরকারের সাথে সমঝোতার মাধ্যমে আমাদের সাংবাদিক প্রতিনিধি দলকে থাইল্যান্ডে নিয়ে যায়। থাই সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে জানানো এবং কয়েকটি খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদরকে নিয়ে গিয়ে শিক্ষার মান, সুযোগ-সুবিধা, ফলাফল এসব বিষয়ে অবগত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে যাতে আরও বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য থাইল্যান্ড যেতে আগ্রহী হয়, সেরকম একটা আবহ তৈরিতে আমাদের উদ্বুদ্ধ করা।
থাইল্যান্ড কোয়ালিটি এডুকেশনের ক্ষেত্রে কমিটেড বলেই তাদের অসামান্য অগ্রগতি হয়েছে। কারিগরি শিক্ষাকে ব্যাপকভাবে প্রসারিত করার ফলে শতকরা ৪০ ভাগ শিক্ষার্থী বর্তমানে কারিগরি শিক্ষায় নিয়োজিত। থাইল্যান্ড টাকা খরচ করে কোয়ালিটি এডুকেশন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে এবং এ খবর সারা বিশ্বকে জানিয়ে দিচ্ছে। এভাবে তারা এডুকেশনের ক্ষেত্রে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। বিভিন্ন দেশ থেকে শিক্ষার্থী আসার পথ সহজ করেছে। আমরা এখনও দেশে কোয়ালিটি এডুকেশন প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি; ফলে আমাদেরকে এশিয়ার উন্নত দেশসমূহের পেছনে পেছনে অগ্রসর হতে হচ্ছে। এর অন্যতম কারণ, আমরা আমাদের শিক্ষাদান পদ্ধতিকে এখনও বিশ্বমানে নিয়ে যেতে পারিনি। থাইল্যান্ড শিক্ষামান এবং শিক্ষাদান পদ্ধতির দিক থেকে শতভাগ সাফল্য অর্জন করতে পেরেছে, সেটি বলা যাবে না; তবে সেটি অর্জনের জন্য তাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
বাংলাদেশে শিক্ষাদান বিশ্বমানে উন্নীত করার প্রচেষ্টা বেগবান নয়, এজন্য বিশ্বায়ন প্রতিযোগিতায় আমাদের পক্ষে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে গড়ে ওঠা সময়সাপেক্ষ। থাইল্যান্ড সে অবস্থান তৈরি করতে পেরেছে বলে তারা জ্ঞান-পিপাসু বিশ্বকে তাদের দিকে আকৃষ্ট করতে সক্ষম হচ্ছে। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ মালয়েশিয়ায় শিক্ষাব্যয় তুলনামূলক থাইল্যান্ডের চেয়ে বেশি। এজন্য বাংলাদেশসহ সার্কভুক্ত দেশগুলো থেকে শিক্ষার্থী আগমন থাইল্যান্ডে ক্রমাগত বাড়ছে। অন্য যে বিষয়টি আমি লক্ষ্য করেছি, তা হলো তাদের শিক্ষা কর্মমুখী; মাধ্যমিক থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত তারা এ ধারা বজায় রেখে চলেছে।

মোঃ আকতারুজ্জামান স্টাফ রিপোর্টার, বাংলাদেশ প্রতিদিন বাংলাদেশের সাংবাদিক প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে থাইল্যান্ড সফরের অনুভূতি ব্যক্ত করে তরুণ প্রতিশ্রুতিশীল সংবাদকর্মী আকতারুজ্জামান বলেন, থাইল্যান্ড দূতাবাসের উদ্যোগে তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঘুরিয়ে দেখানো হয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ভিজিট করে আমার মনে হয়েছে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং স্কুলগুলো অনেক উন্নত। শিক্ষার মানও ভালো এবং শিক্ষাদানের কৌশলেও চমৎকারিত্ব আছে। থাইল্যান্ড শিক্ষাক্ষেত্রে উন্নত হওয়ার কারণ তারা পরিকল্পিতভাবে শিক্ষার উন্নয়ন ঘটিয়েছে, আর আমরা তা করতে পারিনি বলে পিছিয়ে রয়েছি।
থাইল্যান্ডে পলিটিক্যাল আনরেস্ট হলেও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ওপর তার প্রভাব পড়ে না; কিন্তু বাংলাদেশে দেখি তার বিপরীত চিত্র। এখানে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কপাট ঝুপ ঝুপ করে বন্ধ হয়ে যায়। যেসব ছাত্রছাত্রী আবাসিক হলে থাকেন, তারা পড়ি কি মরি করে বাড়ির উদ্দেশ্যে ছোটে। ২০১৪ সালে হরতাল-অবরোধের কারণে টানা তিন মাস পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছিল।
ক্যাসেসার্ট বিশ্ববিদ্যালয় এশিয়ার মধ্যে একটি সেরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গত বছর মাত্র একদিন এ প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল, তাও কোনো রাজনৈতিক কারণে নয়, অভ্যন্তরীণ সমস্যার জন্য একদিন বন্ধ রাখতে হয়েছিল। থাইল্যান্ডে এ ধরনের কোনো ঘটনার প্রভাব শিক্ষার ওপর পড়ে না বলে সেখানে শিক্ষাব্যবস্থা সংকটমুক্ত। বাংলাদেশে তুচ্ছ কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করার চলমান কালচার থেকে মুক্ত হতে না পারলে আমাদের শিক্ষার অগ্রগতি ব্যাহত হতে থাকবে।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশের শিক্ষা এখনও গৎবাঁধা নিয়মে চলছে; থাইল্যান্ড সে অবস্থা কাটিয়ে তাদের শিক্ষার্থীদের পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছে। বাংলাদেশে সর্বোাচ্চ ডিগ্রিধারী হয়েও শিক্ষার্থীরা চাকরির নিশ্চয়তা পাচ্ছে না, কিন্তু থাইল্যান্ডে শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে সাজানো যে, শিক্ষার্থী পাস করার পর তার বিষয়ের সাথে মিল আছে এমন একটি চাকরির ব্যবস্থা বিশ্বের যোকোনো দেশে অনায়াসে করতে পারে। সামগ্রিক বিবেচনায় যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষা নিতে চায়, তারা নিঃসন্দেহে থাইল্যান্ডকে বেছে নিতে পারেন।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ