বিশেষ খবর

স্বাস্থ্যহানি ও আয়ুক্ষয়ের অন্যান্য কারণ ও প্রতিকার -৩৩

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ নিবন্ধ

॥ পূর্ব প্রকাশিতের পর -৩৩ ॥
ব্যক্তিত্বের সংঘাতে মানসিক রোগ
বংশগতি, পরিবেশ এবং নানা পারিপার্শ্বিক ঘটনা মানুষের ব্যক্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং ব্যক্তিত্বের প্রকাশকে করে প্রভাবিত। একজনের সঙ্গে আরেকজনের ব্যক্তিত্বের কিছু কিছু লক্ষণের মিল থাকতে পারে, কিন্তু পুরোপুরি থাকে না। পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষের ব্যক্তিত্ব ৭০০ রকম। কারও মানসিক প্রক্রিয়া ও আচরণ তার নিজের ও অন্যের জন্য পীড়াদায়ক বা স্বাভাবিক কর্মকা-ের অন্তরায় হলে বুঝতে হবে যে, তার ব্যক্তিত্বে সমস্যা রয়েছে। গবেষণায়ও দেখা গেছে, পৃথিবীতে মোট জনসংখ্যার ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে ব্যক্তিত্বের সমস্যা থাকে। অযৌক্তিক, অবৈজ্ঞানিক ও অগ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্বের কারণে স্বাস্থ্যহানি ঘটতে পারে এমনকি জীবনও হতে পারে নাতিদীর্ঘ। অর্থাৎ পারসোনালিটির সমস্যা এক জটিল মানসিক রোগ, যা তার নিজের ও সংশ্লিষ্টদের জন্য ক্ষতিকর। এরূপ মানুষের অতি উদ্বিগ্নতা ও আবেগজনিত রোগ এবং মাদকাসক্তি, হত্যা, আত্মহত্যাসহ নানা ধরনের অপরাধে সম্পৃক্ত হওয়ার আশঙ্কা বেশি। পারসোনালিটির সমস্যা মানসিক রোগ বলে চিহ্নিত হলেও অনেক সময় রোগীর মা-বাবা তথা পরিবার-পরিজনরা একে রোগ হিসেবে মানতে রাজি হন না। তাই সর্বপ্রথম মেনে নিতে হবে অন্য মানসিক রোগের মতো এটিও একটি রোগ এবং এর বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা রয়েছে। এক্ষেত্রে পরিবার ও চারপাশের মানুষদের সচেতনতা খুবই প্রয়োজন। পারসোনালিটি সমস্যার চিকিৎসা হিসেবে সাইকোথেরাপি বেশ কার্যকর। রোগীর অভিযোজন ক্ষমতা বাড়াতে, ব্যক্তিত্বকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসতে দরকার সাইকোথেরাপি। সমস্যার ধরন বুঝে সাপোর্টিভ সাইকোথেরাপি, প্রবলেম সলভিং কাউন্সেলিং, সাইকোডায়নামিক কাউন্সেলিং, ডায়নামিক সাইকোথেরাপি, কগনিটিভ থেরাপি, কগনিটিভ এনালাইটিক থেরাপি ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের থেরাপি ব্যবহৃত হতে পারে। তাই সকলের প্রতি অনুরোধ, ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে গিয়ে নিজের স্বাস্থ্যহানি ঘটাবেন না এবং অন্যের মনঃপীড়ার কারণ হবেন না।
মনের দাওয়াই বন্ধুথেরাপি
মানসিক চাপ থেকে বাঁচার সবচেয়ে ভালো দাওয়াইয়ের কথা জানিয়েছেন চিকিৎসা বিজ্ঞানীগণ, যা স্থান-কাল-পাত্রভেদে সব মানুষের জন্যই সর্বোত্তম। দাওয়াইটি হলো বন্ধু। তবে যেনতেন বন্ধু নয়, হতে হবে একেবারে মানিকজোড় প্রাণের সখী বা সখা। সিনসিনাটি চিলড্রেনস হসপিটাল মেডিকেল সেন্টারের গবেষকগণ জানিয়েছেন মানুষ যখন প্রচ- মানসিক চাপে থাকে, তখন সে চাপ কমাতে সহায়ক হয় কাছের বন্ধুটির সাহচর্য। গবেষক রায়ান এডামস জানিয়েছেন, স্কুলপড়ুয়া শিশুদের ওপর সম্প্রতি এক গবেষণা পরিচালনা করা হয়। এতে শিশুদেরকে তাদের কয়েকদিনের অভিজ্ঞতা একটি ডায়েরিতে লিখে রাখতে বলা হয়। পাশাপাশি তাদের মানসিক চাপের সময় বাবা-মা, অন্য অভিভাবক, শুধু বন্ধু, ছেলে বা মেয়ে বন্ধু, শিক্ষক কার সঙ্গে তারা সময় কাটাতে পছন্দ করবে, সেটিও জানতে চাওয়া হয়। এছাড়া তাদের পছন্দ অনুযায়ী ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে শিশুদের লালার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে দেখা যায়, সবচেয়ে কাছের বন্ধুর উপস্থিতিতে শিশুদের লালায় মানসিক চাপের সময় সৃষ্ট হরমোন (কর্টিসোল) সবচেয়ে কম মাত্রায় পাওয়া গেছে। আর বন্ধুর অনুপস্থিতি বা একা থাকার সময় তাদের লালায় কর্টিসোলের উপস্থিতি পাওয়া গেছে সবচেয়ে বেশি। মনোবিজ্ঞানী ড. ক্যারেন মেজরস জানিয়েছেন, কাছের বন্ধুরা বেশ উপকারী ও সাপোর্টিভ হয়ে থাকে। তবে এটিও মিথ্যা নয় যে কাছের বন্ধুরা উচ্ছন্নেও নিয়ে যেতে পারে সহজেই।
ক্ষেত্রবিশেষে বন্ধুত্বও হতে পারে রোগের কারণ
বন্ধু যদি ভালো না হয়, তবে তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। খারাপ বন্ধুদের কারণে ক্যান্সার ও হৃদরোগের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। ন্যাশনাল একাডেমী অব সায়েন্সেস নামের একটি সাময়িকীতে গবেষকরা জানিয়েছেন, বন্ধুদেরকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখা হয়। বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা, সময় কাটানোর অনেক সুফল রয়েছে; বিপদে-আপদেও বন্ধুরা এগিয়ে আসে। তাই বলে বন্ধু সবসময় উপকারী নয়। বন্ধু যদি খারাপ হয় কিংবা বন্ধুত্বে যদি অবনতি ঘটে, তাদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি ঈর্ষা ও পরশ্রীকাতরতা জন্মে, তবে তা আবার ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গবেষকরা বলছেন, সম্পর্কের অবনতি বা খারাপ বন্ধুদের আচরণের ফলে সৃষ্ট চাপ মানসিক স্বাস্থ্যের পাশাপাশি শরীরিক স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। এতে মানুষ বিষণœতা ও উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যায় পড়ে। এসবের কারণে মানুষ ক্যান্সার ও হৃদরোগের মতো প্রাণঘাতী সমস্যার ঝুঁকিতেও পড়তে পারে। তাই গবেষকরা বলছেন, বন্ধুত্ব করা ও ধরে রাখা জরুরি হলেও এ ব্যাপারে আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। নাহলে যথেষ্ট সচেতনতার অভাবে বন্ধুদের কারণে উপকারের চেয়ে অপকারের মাত্রা বেশি হয়ে যেতে পারে।
ফেসবুকে মস্তিষ্কের ক্ষতি
সামাজিক যোগাযোগের অন্যতম ওয়েবসাইট বলে প্রচলিত ফেসবুকে অধিক আসক্তি মানুষের মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর। বিজ্ঞানীরা বলছেন ইন্টারনেট, বিশেষত ফেসবুকের অধিক ব্যবহার মানুষের মস্তিষ্কের গঠন বদলে দেয় এবং ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন এর বিজ্ঞানীরা দেখেছেন সামাজিক যোগাযোগের ওয়েব সাইটগুলোতে বিশেষত ফেসবুকে যাদের বন্ধুসংখ্যা বেশি, তাদের মস্তিষ্কের ভেতর গ্রে-ম্যাটারের ঘনত্ব বেড়ে যায়। এতে মস্তিষ্কের আকার পরিবর্তন হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা জানান, থ্রি-ডি ব্রেন স্ক্যানার দিয়ে স্বাস্থ্যবান ১২৫ জন কলেজ ছাত্রের মস্তিষ্ক স্ক্যান করা হয়। এতে দেখা যায় যাদের ফেসবুক-বন্ধু বাস্তবের বন্ধুর তুলনায় বেশি, তাদের মস্তিষ্কের গ্রে-ম্যাটার অংশের গঠন বদলে গেছে। গবেষণায় বলা হয় ফেসবুকের বন্ধুদের নাম, ছবি ও ছবির অঙ্গভঙ্গি ব্যবহারকারীর মস্তিষ্ক দখল করে থাকে স্মৃতি হিসেবে। আর ফেসবুক-বন্ধুর সংখ্যা বেশি হলে তারা মস্তিষ্কের বেশি অংশ জুড়ে থাকে। গবেষক দলের প্রধান জেরেইন্ড রেইস বলেন গবেষণা থেকে বোঝা যাচ্ছে যে, সামাজিক এ নেটওয়ার্কগুলো মস্তিষ্কের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাঁর দু’মেয়ে মালিয়া ও সাশাকে ফেসবুক ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন বলে পত্রিকান্তরে জানা গেছে।
এসএমএস মস্তিষ্ক সংকোচন করে এবং পড়া ভোলায়
শর্ট টেক্সট মেসেজ বা খুদে বার্তা, প্রচলিত শব্দে এসএমএস যেভাবেই বলা হোক না কেন, বিষয়টির গুরুত্ব বা ভূমিকা মোটেই খুদে নয়। মোবাইল ফোনের টেক্সট মেসেজে সামান্য কথায় অনেক সময় অনেক জরুরি কাজই সেরে ফেলা যায়। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর অতিরিক্ত ব্যবহারের পরিণাম মোটেই ভালো নয়। এটি মস্তিষ্কের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ ক্ষতির ফলে বই বা এমন কিছু পড়ার কাজটি কষ্টকর হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাজ্যের গবেষকরা জানিয়েছেন, মোবাইল ফোন বা এ ধরনের যন্ত্রের মাধ্যমে টেক্সট মেসেজ লিখতে প্রচলিত অনেক শব্দের সংক্ষিপ্ত এবং কখনো কখনো বিকৃত রূপ ব্যবহার করা হয়। মৌখিক ভাষা না হওয়ায় সহজে লেখা যায়, এমন অল্প কয়েকটি শব্দ ও কথাই খুব বেশি ব্যবহার করা হয়। ফলে সীমিত পরিসরের এ ভাষার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে গিয়ে এসব মেসেজ লিখতে ও পড়তে যারা খুব বেশি অভ্যস্ত, তাদের মস্তিষ্কের ক্রিয়া অনেকটাই সীমিত হয়ে পড়ে। গবেষকরা বলছেন, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে পড়ার বেলায় জটিলতার সম্মুখীন হতে দেখা গেছে। কোনো কিছু পড়তে দিলে সেখানে নতুন নতুন শব্দ চিনতে পারা বা গ্রহণ করা তাদের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ে। গবেষকরা বলছেন, টেক্সট মেসেজ জরুরি বিষয় হলেও খেয়াল রাখা দরকার, সেটি প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার করা হচ্ছে কিনা। সচেতন না হলে উপকারী এ বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে বড় ক্ষতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। মোবাইল ফোন, এসএমএস, ফেসবুক, চ্যাটিং প্রভৃতির যান্ত্রিকতায় আবিষ্ট হয়ে গেছে মানব জীবন। তাই দেখা যায়, প্রেমিক-প্রেমিকা বা স্বামী-স্ত্রী সশরীরে একত্রে থাকলেও মনোরাজ্যে একের ভুবনে নেই অন্যজন। পাশাপাশি বসে থাকা প্রেমিক যুগলের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা পরস্পরের প্রতি মনোযোগ না দিয়ে দু’জনেই ব্যস্ত নিজ নিজ ফোনে, হয়ত ফেসবুক স্ট্যাটাস দিচ্ছে কিংবা এসএমএস করছে।
॥পর্ব ৩॥
নগর জীবনের প্রভাব নাইট ডিউটিতে হৃদরোগ, ডায়াবেটিস ও স্ট্রোকের ঝুঁকি
কর্মস্থলে রাতে যারা ডিউটি করেন, হরহামেশাই তাদের নানা শারীরিক সমস্যায় পড়তে হয়। গবেষণায় জানা গেছে, দিনে-রাতে কাজ হয় এমন কর্মক্ষেত্রে যারা রাতে কাজ করেন, তাদের ডায়াবেটিস ও মোটা হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমনকি রাতের পালায় কাজ করা কর্মীদের হার্ট এটাক ও স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও দিনে কাজ করা কর্মীদের তুলনায় বেশি। মূলত ঘুমের সমস্যাই এসব রোগের জন্য দায়ী। যুক্তরাষ্ট্রের গবেষকরা জানান, পালাক্রমে কাজ করার কারণে দিনের বেলায় ঘুমাতে হয়। এতে একদিকে তাদের ঘুম কম হয়, অন্যদিকে দেহঘড়ির কাঁটার নড়চড় হয়। এতে শরীরে ইনসুলিন উৎপাদনে জটিলতার সৃষ্টি হয়। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যায়। আর এর অনিবার্য পরিণতি হলো ডায়াবেটিস ও মুটিয়ে যাওয়া। অন্যদিকে বিভিন্ন পালায় কাজ করা কর্মীদের মধ্যে চর্বিজাতীয় খাবার গ্রহণ, শরীরচর্চা না করার মতো অভ্যাস রয়েছে; যেগুলো হার্ট এটাক ও স্ট্রোকের কারণ।
শহরবাসীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেশি গ্রাম বা মফস্বলের তুলনায় রাজধানী বা ব্যস্ততম শহরে বসবাসকারী মানুষের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেক বেশি। বিশেষত যেসব শিশুর জন্ম শহরে, তাদের জীবনজুড়ে শারীরিক ও মানসিক অসুখ লেগেই থাকে। স্পেনের ইউনিভার্সিটি অব গ্রানাডা’র গবেষকরা এ তথ্য জানিয়েছেন।
গবেষকরা জানান জন্মের আগেই শহুরে শিশুরা পরিবেশ দূষণের শিকার হয়ে থাকে, যা ব্যাপকভাবে প্রভাব ফেলে তাদের পরবর্তী জীবনে। গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামের তুলনায় শহুরে মায়েদের জন্ম দেয়া শিশু বেশ বড়সড়, ওজনদার হয়। সাধারণভাবে এটি ভালো লক্ষণ হিসেবে ভাবা হয়। কিন্তু গ্রাম ও শহুরে মায়ের প্লাসেন্টা (যা প্রসবকালে নাড়ির সঙ্গে বেরিয়ে আসে) পরীক্ষা করে দেখা গেছে, শহুরে মায়ের রক্তে উচ্চ স্তরের রাসায়নিকের উপস্থিতি রয়েছে, যাকে জেনো-এস্টোজেন বলা হয়। জেনো-এস্টোজেন হলো ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিক্যাল, যা মায়ের দেহ থেকে শহুরে শিশুর শরীরও বহন করে চলে। মূলত গাড়ি ও কলকারখানার ধোঁয়ায় এবং ইন্ডাস্ট্রিয়াল এলাকার বাতাসে জেনো-এস্টোজেনের উপস্থিতি রয়েছে। স্পেনের গবেষকরা আরো জানান, গর্ভাবস্থায়ই শহুরে শিশুদের বৃদ্ধি বেশি হওয়ায় এরা পরে মেদবহুল দেহের অধিকারী ও কম বয়সে বয়ঃসন্ধিপ্রাপ্ত হয়। এমনকি ফুসফুস, স্তন ও মূত্রথলির ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়। এছাড়া শহুরে মায়েরা গ্রামের মায়েদের তুলনায় দ্রুত বুড়ো ও মেদবহুল দেহের অধিকারী হয়ে যান। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শহরবাসীরা গ্রামবাসীদের তুলনায় উন্নত জীবনযাপনের সর্বরকম সুযোগ-সুবিধা সহজেই পেয়ে থাকে। তারপরও শহুরে মানুষ অনেক ধরনের নাগরিক বিড়ম্বনার শিকার হয়ে থাকে। ফলে নিজের অজান্তেই তারা দেহের ভেতর দীর্ঘমেয়াদি কিছু স্বাস্থ্যঝুঁকি বহন করে চলে। তাই স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম ও মেডিটেশন শহুরেদের জন্য অত্যাবশ্যক।
গাড়ি মালিকদের হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি
টিভি ও গাড়ি যাদের আছে, তাদের হৃদরোগের ঝুঁকি এসব যাদের নেই, তাদের চেয়ে ২৭ শতাংশ বেশি। তবে টিভি বা গাড়ি সরাসরি কোনো সমস্যা নয়, সমস্যা হলো জীবনাচরণের ধরনে। নগরায়নের প্রভাবে আমরা আধুনিক যন্ত্রপাতির সুবিধা ভোগ করছি, তবে সেগুলো এমন জীবনাচরণ গড়ে দিচ্ছে, যা ক্ষতিকর। ইন্টারহার্ট নামের একটি প্রতিষ্ঠান ১৯৯৯ সাল থেকে বিশ্বের ৫২টি দেশে গবেষণা পরিচালনা করে দেখেছে যতই দিন যাচ্ছে, ততই নগরায়নের আওতা বাড়ছে। আর নগরায়নের ফলে টিভি, গাড়ি, কম্পিউটার, এস্কেলেটর, এলিভেটর এ ধরনের সামগ্রীর ব্যবহার বাড়ছে। অর্থাৎ এমনসব জিনিসের ব্যবহার বাড়ছে, যেগুলো দীর্ঘসময় ধরে বসে ব্যবহার করতে হয় অথবা শারীরিক পরিশ্রম অনেক কম লাগে। আর দীর্ঘসময় ধরে এভাবে শারীরিক পরিশ্রম ছাড়া কাটানো স্বাস্থ্যের জন্য অনেক ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে।
গবেষকরা জানিয়েছে, মানুষের চলাফেরা বা শারীরিক শ্রম কমিয়ে দিয়েছে নগরায়ন। কিন্তু কম পরিশ্রম বা পরিশ্রম ছাড়াই থাকতে হলে অন্য অনেক সমস্যার পাশাপাশি মানুষের পাচনক্রিয়ায় বিপত্তি দেখা দেয়। এতে শরীরে যথাযথ রক্ত ও পুষ্টি সঞ্চালিত হতে পারে না। আরো অনেক কারণেই এটি মানুষের ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের মতো অনেক রোগের ঝুঁকি তৈরি করে। তবে গবেষকরা বলছেন, নগরায়ন নিয়ে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। কেননা এতটা ঝুঁকি তৈরি হলেও এর থেকে বাঁচাও সম্ভব। এজন্য প্রতিদিন নিয়ম করে হাঁটাসহ ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।
স্বাস্থ্যহানি রোধে সাইকেল
সময় বাঁচাতে বেশিরভাগ শহুরে কর্মজীবীই বাসস্থান থেকে কর্মস্থলে যান প্রাইভেট কার, বাস বা ট্রেনে চড়ে। কিন্তু যানজটে পড়লে সময়তো বাঁচেই না, বরং অফিসে যেতে দেরি হয়। দেখতে হয় বসের রক্তচক্ষু; পুরো দিনটিই কাটে চাপের মধ্যে। এভাবে চাপ ও হতাশায় ঘটে স্বাস্থ্যহানি। সম্প্রতি এর সমাধান পেয়েছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, সাইকেলে চেপে বা হেঁটে কর্মস্থলে গেলে চাপমুক্ত থাকা যায়। এতে স্বাস্থ্যহানির ঝুঁকিও কমে। সুইডেনের লুনড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ ১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সি কর্মীদের ওপর জরিপ চালিয়ে এ তথ্য জানিয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে গাড়ি, বাস বা ট্রেনে করে কর্মস্থলে পৌঁছানোদের চেয়ে হেঁটে বা সাইকেলে অফিস যাওয়ারা কম পরিশ্রান্ত ও কম চাপে থাকেন। এর কারণ হিসেবে গবেষক এরিক হ্যানসন বলেন, যারা বাসে বা ট্রেনে কর্মস্থলে যান তারা প্রতিনিয়ত হতাশায় ভোগেন, ঘুম কম হয়, পরিশ্রান্ত থাকেন এবং নানারকম স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগেন। তাদের স্বাস্থ্য সমস্যার পাশাপাশি কর্মঘন্টাও অপচয় হয়। বলাই বাহুল্য যে, আমাদের মতো দুর্বিষহ যানজটের দেশে উপরোক্ত স্বাস্থ্যহানি আরো মারাত্মক। বাই-সাইকেল ব্যবহারসহ বিভিন্নভাবে এ সংকট কাটানোর উপায় সম্পর্কে বলেছি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ এবং আলোকিত জাতির সন্ধানে বাংলাদেশ ও বিশ্ব অধ্যয়ন গ্রন্থে।
চলবে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ