বিশেষ খবর

প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি ও প্রতিক্রিয়া - ৩৭

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ নিবন্ধ

॥ পূর্ব প্রকাশিতের পর -৩৭ ॥
ডাক্তার নির্বাচনে সতর্কতা
ইউরোপ ও উন্নত বিশ্বে রোগীর কল্যাণে ডাক্তারদের পেশাগত দায়িত্ব ও নিষ্ঠা সম্পর্কে বিগত একটি পর্বে লিখেছি। দুঃখের বিষয় যে আমাদের দেশে অনুরূপ দায়িত্বশীল ডাক্তারের সংখ্যা বেশি নয়। আমার দেখামতে ডাক্তারের সঠিক চিকিৎসায় অসুখ কমে যেতে পারে, আবার ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় বা অনুমান নির্ভর চিকিৎসায় অসুখ জটিল হয়ে বেড়েও যেতে পারে। তাই সাধারণ অসুখের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক চর্চা এবং হারবাল খাদ্য-পথ্য গ্রহণই শ্রেয়। উরবঃ রং নবঃঃবৎ ঃযধহ উড়পঃড়ৎ এ প্রবাদ ও বিদ্যার গুরুত্ব কম নয় কিন্তু! ডাক্তারের কাছে যেতে হলে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের কাছেই যাবেন। হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে কখনই যাবেন না। ভুলক্রমে ভুয়া ডাক্তারের কাছেতো নয়ই, এমনকি অনভিজ্ঞ বা আনাড়ী ডাক্তারের কাছেও নয়। এতে অসুখের সাথে বিসুখ যোগ হয়ে আপনার উচ্চ সংবেদনশীল দেহযন্ত্র জগাখিচুড়িতে পরিণত হতে পারে। সেক্ষেত্রে অকাল মৃত্যু বা জীবন বিপন্নের বিষয়টিও অস্বাভাবিক নয়। দরকার ছাড়াই আপনি কেটেকুটে ছারখার হয়ে যেতে পারেন। প্রয়োজনে বা অপ্রয়োজনে আপনার সাধের পেট কেটে সে পেটে গজ-ব্যান্ডেজ-ছুরি ঢুকিয়ে পেট সেলাই করে আপনাকে ‘সাধের লাউ বৈরাগী’ বানিয়ে দিতে পারে। স্বাধীন এ দেশেতো বহুজন বহুক্ষেত্রে স্বাধীন। নালিশ করে অথবা বিচার চেয়েও তেমন লাভ নেই। অনেকক্ষেত্রে সেতো অরণ্যে রোদন, সেতো কেবলই যাতনাময়, কেবলই জুতার সুখতলা ক্ষয়। এখানে বিচারের বাণী যে নিভৃতে কাঁদে, সে সম্পর্কে সবিস্তারিত বলেছি উন্নত জাতির আধুনিক বাংলাদেশ এবং অত্যাধুনিক বিশ্বের রূপরেখা বইয়ে।
ঝাড়–দার যখন ডাক্তার!
২৮ মে ২০১১ দৈনিক সমকালের প্রথম পাতার একটি রিপোর্ট এরূপ ভোলা জেলার মনপুরা উপজেলার দরিদ্র মানুষের স্বাস্থ্যসেবা কাদের ডাক্তারের ওপর নির্ভরশীল। এই কাদের ডাক্তার এমবিবিএস পাস কোনো স্বাস্থ্য কর্মকর্তা নন। তিনি মনপুরার একমাত্র স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একজন চুক্তিভিত্তিক ঝাড়ুদার! রোগীর শরীরে স্যালাইন পুশ থেকে শুরু করে হাসপাতাল ভবন পরিচ্ছন্ন করার কাজ চলছে এ কাদেরকে দিয়ে। এলাকার অশিক্ষিত মানুষের কাছে তিনি ‘কাদের ডাক্তার’ হিসেবে পরিচিত। চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের অফিস না করে মাসের পর মাস বাড়িতে থাকা, দায়িত্ব পালনে অবহেলা ও গাফিলতির কারণে ভোলা জেলার প্রত্যন্ত এ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত। সরেজমিনে দেখা গেছে, জনবল সংকটের অজুহাত দেখিয়ে বর্তমানে দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক-নার্সরা সেবার পরিবর্তে রোগীকে ভোগান্তিতে ফেলছেন। কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই টানা ১৫ দিন অনুপস্থিত রয়েছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা। এ উপজেলার মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত থাকলেও কার্যকর পদপে নিচ্ছে না স্বাস্থ্য বিভাগ। মনপুরার মানুষের কাছে এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি জেলখানা হিসেবে পরিচিত। নানা সংকটের মধ্যেও মনপুরা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের অন্যতম ভরসা ‘সুইপার কাদের’। সার্বক্ষণিক রোগীকে সেবা দিতে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায় কাদেরকে। তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি নিয়মিত কর্মচারী নন। হাসপাতালে প্রতিদিন ৩ জন ভুয়া রোগী ভর্তি দেখানো হয়। এর মধ্যে একজনের খাবার তিনি খান। দু’জনের খাবারের টাকা দেয়া হয় তার বেতন হিসেবে। ৫ বছর ধরে কাদের এভাবে ‘দায়িত্ব’ পালন করছেন।
সার্জনের দায়িত্বে সাধারণ চিকিৎসক
সামান্য প্রশিক্ষণকে পুঁজি করে সার্জনের দায়িত্ব পালন করছেন ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রধান ডাঃ শাহ আলম। আর অজ্ঞান করার চিকিৎসকের অভাবে সে দায়িত্ব পালন করাচ্ছেন নার্স ও আয়াকে দিয়ে। ২০১১ সালের ২৩ জুলাই তাদের এ কর্মকান্ডের বলি হয়েছেন উপজেলার খাল পাকুটিয়া গ্রামের সোহেল রানার স্ত্রী বিলকিস বেগম। ডাঃ শাহ আলম নিজেই দু’জন নার্স ও বাইরের ক্লিনিকের এক কর্মচারীকে নিয়ে সিজারিয়ান অপারেশন সম্পন্ন করেন। এ সময় বিলকিস একটি পুত্রসন্তান প্রসব করেন। অজ্ঞান করে সিজার করার কয়েক ঘণ্টা পরই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন বিলকিস।
ফিজিওথেরাপিস্ট যখন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে তাকে চেনে অনেকেই। ভিজিটিং কার্ডে বিদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে নেয়া ডিগ্রির ছড়াছড়ি। দেশের শীর্ষস্থানীয় একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে তার চেম্বার। দু’বছর ধরে তিনি রোগীদের প্রেসক্রিপশন দিয়ে আসছিলেন। একসময়ে জানা গেল, শুধু ফিজিওথেরাপির প্রশিক্ষণ নিয়েই তিনি এতদিন এ বিদ্যা ফলিয়েছেন! এ ভুয়া ডাক্তারের নাম দেবেশ সরকার। র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা ও দু’বছর কারাদন্ডের আদেশ দিয়েছে। এ ঘটনায় মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ব্যবস্থাপককেও ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্বদানকারী ম্যাজিস্ট্রেট এএইচএম আনোয়ার পাশা বলেন, ফকিরাপুলে মডার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে রোগী দেখতেন দেবেশ সরকার। একজন পুলিশ সদস্য সামান্য অসুস্থতা নিয়ে তার কাছে চিকিৎসা নিতে গেলে তিনি ১০-১৫টি ঔষধ লিখে দেন। এতে তার উপশম না হওয়ায় তিনি আরেকজন ডাক্তারের কাছে যান। সে ডাক্তার ঐসব ঔষধের নাম দেখে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, কোনো ডাক্তার এ ঔষধ লিখতে পারেন না। এ খবর পাওয়ার পর র্যাবের গোয়েন্দা অনুসন্ধানে দেবেশ সরকারের প্রতারণার বিষয়টি বেরিয়ে আসে।
হাসপাতাল সুন্দর হলে
পশ্চিমবঙ্গের এক কবি লিখেছিলেন নার্স সুন্দরী হলে অর্ধেক অসুখ এমনিতেই সেরে যায়। এবার সুইডেনের গবেষকরা বলছেন হাসপাতালের স্থাপত্যশিল্প, ভেতরের সাজসজ্জা ও পরিবেশ সুন্দর হলে রোগীর শারীরিক ও মানসিক অসুখ দ্রুত সেরে যায়। সুইডেনের ইউনিভার্সিটি অব গুতেনবার্গের গবেষকগণ লক্ষ্য করেছেন হাসপাতালের পরিবেশ-পরিস্থিতি রোগীর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার ওপর বেশ প্রভাব ফেলে। যেসব হাসপাতালে রয়েছে অত্যাধুনিক স্থাপত্যশিল্প, ওয়ার্ডে কিংবা কেবিনে সুন্দর ডিজাইনের আসবাসপত্র, রোগীর জন্য পরিচ্ছন্ন পোশাক, বিনোদনের ব্যবস্থা, সর্বোপরি ভালো চিকিৎসক সেসব হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর অসুখ দ্রুত সেরে যায়। গবেষকগণ বলছেন, হাসপাতালের পরিবেশ রোগীর স্নায়ু ও মস্তিষ্কের ওপর প্রভাব ফেলে।
এ বিষয়ে গুতেনবার্গ ইউনিভার্সিটির স্কুল অব ডিজাইন এন্ড ক্রাফটের গবেষক ক্রিস্তিনা সালকভিস্ত বলেন, আমরা রোগীদের সুস্থ করে তোলার বিষয়ে সহায়তা করতে গিয়ে তাদের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াগুলো অনুসন্ধানের চেষ্টা করেছি। আমরা দেখতে চেয়েছি, কীভাবে রোগীরা তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে পারে। তিনি জানান ভালো হাসপাতালে ভালো পরিবেশের পাশাপাশি রোগীর জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসক থাকে, এর বাইরেও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকে; এসব আয়োজন রোগীকে মানসিকভাবেও সাপোর্ট দেয়।
চিকিৎসকের জন্য ভিন্ন চিকিৎসা
চিকিৎসকদের প্রতি রোগীদের ভরসা অগাধ, কিন্তু সে ভরসার ফলাফল অধিকাংশ ক্ষেত্রে হতাশাব্যঞ্জক। তবে সব ডাক্তার একইরকম নন একথা সত্য। আবার ডাক্তারদের নিছক অবজ্ঞা, অবহেলা বা ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির কারণে অযথাই অনেক রোগীকে দারুণ মূল্য, অনেক ক্ষেত্রে জীবন পর্যন্ত দিতে হচ্ছে এ সত্য নিশ্চয়ই স্বয়ং চিকিৎসকরাও অস্বীকার করবেন না। আর এ সত্য আবার প্রমাণিত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি গবেষণায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় এক হাজার চিকিৎসকের ওপর গবেষণা করে দেখা গেছে তারা রোগীদের যে ধরনের চিকিৎসা বা ঔষধ দেন, সেগুলোর প্রায় কোনো কিছুই নিজেদের ক্ষেত্রে গ্রহণ করেন না। কারণ হচ্ছে, সেগুলো বেশ ঝুঁকিপূর্ণ; শরীর-স্বাস্থ্যের জন্যতো বটেই, অনেক ক্ষেত্রে জীবনের জন্যও। গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, অন্ত্রের ক্যান্সার থেকে শুরু করে বার্ড ফ্লু পর্যন্ত বিভিন্ন রোগের ক্ষেত্রে রোগীদের চিকিৎসায় চিকিৎসকরা অহরহই যেসব উপায় ও ঔষধ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, নিজেদের বেলায় ঐসব রোগের চিকিৎসায় তারা এর ধারেকাছেও যান না। কেননা, এসব পদ্ধতি ও ঔষধের অধিকাংশই সারাজীবনের জন্য রোগীর শরীর ও স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতিসাধন করে। ফলে রোগীদের জন্য চিকিৎসা পদ্ধতি এবং চিকিৎসকদের নিজেদের জন্য অনুসৃত পদ্ধতি একেবারেই আলাদা।
নর্থ ক্যারোলিনার ডিউক ইউনিভার্সিটির গবেষক ড. পিটার উবেল গবেষণার প্রতিবেদনে জানিয়েছেন, চিকিৎসকদের জিজ্ঞাসা করে জানা গেছে অনেক অসুখ আছে, যেগুলো একটু সময় ও ধৈর্য নিয়ে চেষ্টা করলে কোনো ধরনের অস্ত্রোপচার ছাড়াই সারিয়ে তোলা যায়। এসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকরা নিজেদের জন্য সেভাবে এগোলেও রোগীদের তাৎক্ষণিকভাবে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। এছাড়া অস্ত্রোপচার অপরিহার্য হয়ে উঠলেও সেখানে রোগী ও নিজেদের জন্য অনুসৃত পদ্ধতি ভিন্ন। আর এক্ষেত্রে রোগীদের বেলায় অনুসৃত পদ্ধতি অবশ্যই অপেক্ষাকৃত কম নিরাপদ, যন্ত্রণাদায়ক ও কম সাশ্রয়ী হয়। যেসব অস্ত্রোপচারে বা অস্ত্রোপচারের যেসব পদ্ধতিতে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেক বেশি, রোগীর ক্ষেত্রে অহরহই তা অবলম্বন করলেও চিকিৎসকরা নিজেদের জন্য কখনই এর ধারেকাছে ঘেঁষেন না। এমনকি ঔষধ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও রয়েছে বৈষম্য; বিকল্প থাকা সত্ত্বেও অনেক ঔষধ চিকিৎসকরা কোনো কিছু চিন্তা না করেই রোগীদের ওপর প্রয়োগ করেন, যেগুলোর রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি এমনকি চিরস্থায়ী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া। সেসব ঔষধ চিকিৎসকরা নিজেরা কখনই সেবন বা ব্যবহার করেন না। যুক্তরাজ্যভিত্তিক দ্য প্যাশেন্টস এসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহী ক্যাথেরিন মারফি মন্তব্য করেছেন, গবেষণাটিতে চিকিৎসা ব্যবস্থা ও রোগীর প্রতি চিকিৎসকদের মনোভাবের রুক্ষ চিত্রটি ফুটে উঠেছে। চিকিৎসকরা নিজেদের সর্বোত্তম চিকিৎসা নিজেরাই নিশ্চিত করতে পারেন। কিন্তু রোগীরা চিকিৎসা শাস্ত্রে অজ্ঞ হওয়ায় পুরোপুরিই চিকিৎসকের ওপর বিশ্বাসী ও নির্ভরশীল। তাই চিকিৎসকদের উচিত হবে রোগীদের জন্য ভিন্ন, অনুন্নত চিকিৎসা বা ব্যবস্থাপত্র অনুসরণ না করে রোগীদেরও একইভাবে সহমর্মিতাসহ গ্রহণ করা। তাহলেই চিকিৎসা ব্যবস্থায় একটি ভালো পরিবেশ নিশ্চিত হবে।
ডাক্তার ও ডাক্তারী মহান পেশা বনাম কমিশন বাণিজ্য
বর্তমানে ঢাকাসহ দেশের প্রায় সবখানে বেশিরভাগ চিকিৎসকের আয়ের অন্যতম পথ হচ্ছে ‘কমিশন’। চিকিৎসাসেবা নিয়ে কাজ করা একাধিক গবেষক বলেন ডাক্তারদের কমিশন বাণিজ্যের পরিধি দিন দিন বেড়েই চলেছে, তৈরি হচ্ছে কমিশনের নিত্যনতুন খাত। বলা যায়, ডাক্তাররা দশ হাতে কমিশন কামান। সেই সঙ্গে ডাক্তারদের কমিশন ঘিরে গড়ে উঠেছে এক ধরনের বাণিজ্যিক পরিকাঠামো। এর ফলে রোগীর চিকিৎসা-ব্যয় স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি হয়ে থাকে। ডাক্তাররা আগের মতো কেবল ডায়াগনস্টিক বা প্যাথলজিক্যাল ল্যাবে প্রস্রাব-পায়খানা বা কফ-রক্ত পরীক্ষা থেকেই কমিশন নেন না; এর পাশাপাশি নতুন নতুন প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষাও এসেছে কমিশনের আওতায়। যেমন ডিজিটাল এক্সরে, ইসিজি, আল্ট্রাসনোগ্রাম, ইকো, কালার ডপলার, সিটি স্ক্যান, এমআরআই প্রভৃতি। এসবে কমিশনের হারও বেশি। এছাড়া আছে হাসপাতালে রোগী পাঠানোর কমিশন। এক্ষেত্রে আইসিইউ বা সিসিইউয়ে রোগী পাঠানোর জন্য রয়েছে বিশেষ কমিশন। আছে অপারেশনের কমিশনও। আরো আছে ক্যান্সার রোগীদের জন্য কেমোথেরাপি, অর্থোপেডিক রোগীদের জন্য ফিজিওথেরাপি, কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালিসিসের কমিশন। এমনকি ঔষধ লেখার জন্য আগে থেকেই প্রচলিত ঔষধ কোম্পানির কাছ থেকে কমিশনের নামে নানারকম সুযোগ-সুবিধা নেয়ার পাশাপাশি বিদেশি বা চোরাই পথে আসা দামি ঔষধ থেকেও কমিশন পেয়ে থাকেন বেশিরভাগ চিকিৎসক। কেবল হাসপাতালে নিযুক্ত কর্মীই নয়, এর বাইরে ভাসমান দালালদের মাধ্যমেও বিভিন্নভাবে কমিশনের ব্যবস্থা রয়েছে ডাক্তারদের। ডাক্তার ও বিভিন্ন হাসপাতাল বা ল্যাবের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এসব দালাল। এ কথা সত্যি যে, কমিশন বাণিজ্যের জন্য কেবল চিকিৎসকদের দায়ী করলে চলবে না; সংশ্লিষ্ট সবাই এজন্য দায়ী। তাই সংশ্লিষ্ট সব সেক্টর থেকে যার যার মতো করে এ কমিশন বাণিজ্য বন্ধে এগিয়ে আসতে হবে এবং সরকারের দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষকে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। আরও প্রয়োজন মনিটরিং ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া। বিশেষ করে ডাক্তারদের নৈতিকতা চর্চার বিষয়ে বিএমডিসি, ঔষধ কোম্পানির ক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর, হাসপাতাল বা ডায়গনস্টিক সেন্টারের ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এই কমিশন বাণিজ্য ঠেকাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এপেন্ডিক্স অস্ত্রোপচারের দুই-তৃতীয়াংশই অযথা
এপেন্ডিসাইটিসের ব্যথা নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে প্রধান পরামর্শ অস্ত্রোপচার। চিকিৎসা বিজ্ঞানের গোঁড়ামি বা প্রথাই হোক আর ডাক্তার ও ক্লিনিক মালিকদের ব্যবসাই হোক, এমনটা ঘটছে; কেবল বাংলাদেশে নয়, বিশ্বজুড়ে। অথচ গবেষকরা বলছেন, এপেন্ডিসাইটিসের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারের যতগুলো ঘটনা ঘটে এর দুই-তৃতীয়াংশই অপ্রয়োজনীয়। কেবল সাধারণ এন্টিবায়োটিক ঔষধ প্রয়োগ করেই এ সমস্যা সারিয়ে তোলা সম্ভব। ব্রিটিশ মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে এপেন্ডিসাইটিসে ১৩০ বছরের অস্ত্রোপচার প্রথা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। কেননা এতে বলা হয়েছে, এত বছর ধরে চিকিৎসকরা হয়ত এ সমস্যার বেশিরভাগ েেত্রই অস্ত্রোপচারের ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে আসছেন। বরং জটিলতামুক্ত এপেন্ডিসাইটিসের ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিকের মাধ্যমে চিকিৎসা দিলেই অস্ত্রোপচারের চেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শতকরা ৮০ ভাগ ক্ষেত্রেই এপেন্ডিসাইটিসে বড় ধরনের জটিলতামুক্ত থাকে। শুধু জ্বালাপোড়া ও ব্যথাযুক্ত এপেন্ডিসাইটিস ছাড়া অন্য কোনো জটিলতা থাকে না। বাকি ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগীদের মধ্যে জটিলতা থাকে, যেখানে অস্ত্রোপচারই একমাত্র উপায়।
ভুল চিকিৎসা এবং ইসলামের বিধান
মানুষ অসুস্থ হলেই চিকিৎসকের দ্বারস্থ হয়। সুস্থ হওয়ার জন্য, প্রাণে বাঁচার জন্য সাধ্যাতীত ফি দিয়ে হলেও সে নিজের বিচারে ভালো ও বিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়। একজন অভিজ্ঞ-দক্ষ চিকিৎসকের সুচিকিৎসায় যখন সে সুস্থ হয়ে ওঠে, তখন সে তার প্রতি কৃতজ্ঞ হয়। সাধ্যাতীত ব্যয়কেও সার্থক মনে করে। কিন্তু অনভিজ্ঞ-অপরিণামদর্শী হাতুড়ে ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় বা বিজ্ঞ চিকিৎসকের অবহেলায়, অযতেœ অনাদরে যখন কেউ মারা যায় বা কোনো বড় ধরনের ক্ষতি বা অঙ্গহানি ঘটে, তখন এর মতো দুঃখের বিষয় আর হতেই পারে না। তখন চিকিৎসকের প্রতি রোগী, রোগীর স্বজন বা আপামর মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়ে; অনাস্থা, অবিশ্বাস, অশ্রদ্ধা জন্ম নেয়। অনেকে আইনের আশ্রয় নেয়। আবার অনেকে জানেই না যে, চিকিৎসকের বিরুদ্ধে কীভাবে আইনের আশ্রয় নেয়া যায়। এক্ষেত্রেও ইসলামের সুনির্ধারিত ও বিশদ বিধান অবশ্যই রয়েছে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ প্রসঙ্গে মানবতার নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) ইরশাদ করেন কোনো অনভিজ্ঞ, হাতুড়ে ডাক্তার কারো চিকিৎসা করলে এবং তাতে ভুল করলে সে দায়ী হবে (আবু দাউদ)। এটি হলো ভুল চিকিৎসা সম্পর্কে শরীয়তের মৌলিক ও সুনির্দিষ্ট বিধান। অধুনা অনভিজ্ঞ হাতুড়ে ডাক্তারদের অবহেলা-অযতেœ যেভাবে রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে, রোগীরা মারা যাচ্ছে বা অঙ্গহানি হচ্ছে; এসব চিকিৎসকের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই কেবল রোগীদের ভোগান্তি কমবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে। অন্যথায় দিনদিন এসব চিকিৎসক আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠবে। ফলে চিকিৎসকদের বন্ধু নয়, শত্রুই ভাববে মানুষ। চিকিৎসক সমাজের প্রতি মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলবে। ভুল চিকিৎসার নজির যেমন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কম নয়, তেমনি রোগীর পেটে গজ-ব্যান্ডেজ রেখে সেলাই করে দেয়ার উদাহরণও কম নয়। ৩ জুলাই ২০১২ তারিখের কালের কণ্ঠ পত্রিকার সংবাদ অনুযায়ী এপোলো হাসপাতালে রোগীর পেটে কাপড় রেখেই সেলাই করে দিয়েছে ডাঃ মৃণাল কুমার সরকার। রাজধানীর অভিজাত এলাকা বারিধারার ততোধিক অভিজাত ও বহুল ব্যয়ের নামকরা এপোলো হসপিটালের যদি হয় এই অবস্থা, তখন দেশের সাধারণ হাসপাতাল বা ক্লিনিকগুলোর অবস্থা কী হতে পারে?
পত্রিকার খবর অনুযায়ী, প্রায় চার বছর আগে ২০০৯ সালের ১৯ আগস্ট রিপা সরকার ভর্তি হয় এপোলো হসপিটালে জরায়ুতে টিউমার ধরা পড়ায়। সেখানে তার অস্ত্রোপচার করেন ডাঃ মৃণাল কুমার, সহকারী ছিলেন ডাঃ বিলকিছ ও ডাঃ আরিফা। অপারেশনের পর কিছুটা সুস্থ হলে রিপাকে হাসপাতাল থেকে ছেড়ে দেয়া হয়। কিন্তু বাড়িতে ফেরার কিছুদিন পর থেকেই পেটের ব্যথায় অসহ্য যন্ত্রণায় ভুগতে থাকে রিপা। এভাবে প্রায় ৪ বছর কেটে যাবার পর ২৮ জুন তাকে রংপুর মেডিকেল কলেজে ভর্তি করা হয়। সেখানে অস্ত্রোপচার করে তার পেট থেকে কাপড় বের করেন ডাঃ সৈয়দ আবু তালেব।
নড়ে উঠল লাশ!
হাসপাতালের ডাক্তাররা তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন। এমনকি তার নামে ইস্যু করা হয়েছে ডেথ সার্টিফিকেটও! কিন্তু মৃত্যুর ৩ ঘন্টা পর লাশ নিতে মর্গে এসে দেখা গেল লাশ নড়ছে! এমন অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। ২০১৪ সালের ২ ডিসেম্বর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল ৪৫ বছরের অজ্ঞাত পরিচয় ঐ নারীকে। দু’দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৪ ডিসেম্বর দুপুর ২টার দিকে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ডেথ সার্টিফিকেটে লেখা হয়, শ্বাসকষ্টজনিত কারণে মৃত্যু। এতে স্বাক্ষর করেন হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডবয় বেলাল মৃত ঘোষণার কাগজপত্র নিয়ে মর্গ অফিসে যান। মর্গ অফিসের দায়িত্বরত কর্মকর্তা নূরে আলম মৃত ঘোষণার কাগজপত্র গ্রহণ করে আজিজ নামে এক কর্মীকে মৃত নারীর লাশ আনতে পাঠান। ওয়ার্ড থেকে লাশ ট্রলিতে উঠিয়েছেন মর্গের ওয়ার্ডবয়। এ সময় ঘটল বিপত্তি। সবাইকে হতবাক করে মৃত ব্যক্তি নড়েচড়ে উঠলেন। শুরু হয়ে গেল মৃত ঘোষণা করা কর্তব্যরত চিকিৎসকের তোড়জোড়। অবশেষে সাড়ে ৩ ঘণ্টা আগে মৃত ঘোষণা করা নারীর শরীরে ঐ চিকিৎসকের নির্দেশে স্যালাইন পুশ করা হলো। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান বিষয়টি শুনে দায়ী চিকিৎসকের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়ার ঘোষণা দেন।
চলবে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ