বিশেষ খবর

তীব্র যানজট ও সড়ক দূর্ঘটনা হ্রাস এবং জ্বালানি খাতে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ে সাইকেল ও মোটর বাইক লেইন বাস্তবায়সনহ সড়ক ও পরিবহনে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা জরুরি

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ নিবন্ধ

আমি যখন প্রথম প্রথম ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণে যেতাম, তখন আমার কৌতুহল ও ঔৎসুক্য কাজ করত, কিন্তু আবেগ কাজ করত না। কারণ ছোটবেলা থেকেই শুনেছি বা বইপত্রে পড়েছি যে, ঔপনিবেশিক ও সাম্রাজ্যবাদী শোষণের মাধ্যমে ইউরোপ-আমেরিকা নিজেদের সম্পদ বাড়িয়েছে; তাই এরা আমাদের চেয়ে ঢের এগিয়ে থাকবে এটিই স্বাভাবিক। এতে আফসোস বা আবেগের কী আছে? কিন্তু পরবর্তীতে যখন মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড বা দক্ষিণ এশীয় দেশ ভ্রমণ করি এবং তাদের উন্নয়ন-অগ্রগতি-সংস্কৃতি, চিন্তা-চেতনা ও মানবিকতার সাথে নিজেদের তুলনা করি, দেশ ও জাতির উন্নয়নে তাদের বজ্র-কঠিন শপথ ও সেক্রিফাইস দেখি, তখনই চোখে জল এসে যায়, মনটা ডুকরে কেঁদে ওঠে।
উন্নত দেশের রাস্তায় রাস্তায় হাজার হাজার বাইকের সুশৃঙ্খল এগিয়ে চলা দেখে প্রথমেই মনে পড়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত প্রবাদ ‘হোন্ডা চালায় গুন্ডারা’। এরূপ কথা উন্নত দেশগুলোর ক্ষেত্রে যে মোটেও প্রযোজ্য নয়, সেটি তারা প্রমাণ করছে নিজেদের উন্নতি-অগ্রগতি-শৃঙ্খলা ও ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে। সেখানকার বাইক চালকরা যেন নিজেদের মধ্যে এমন বোঝাপড়া করে নিয়েছে কেউ কাউকে ল্যাং মারবে না, লেইন ক্রস করবে না, অন্যকে পেছনে ফেলার প্রতিযোগিতা করবে না। সবাই যেন সবাইকে সহযোগিতা করার জন্য সদা প্রস্তুত। বাইক চালকদের শৃঙ্খলা-ধৈর্য-সহমর্মিতা-ভদ্রতা ও ট্রাফিক আইন মানার এরূপ সদিচ্ছা মহাস্বাধীন বাঙালির জন্য শিক্ষণীয় ও অনুকরণীয়।
ভিয়েতনামের কথাই ধরা যাক। ভিয়েতনামকে বলা হয় মোটর বাইকের দেশ। ২০০৯ সালে ভিয়েতনাম সফরকালীন দেখেছি সেখানকার রাস্তায় সারি সারিতে চলে শত-সহস্র মোটর বাইক। ঢাকা থেকে উড়াল দিয়ে ভিয়েতনাম পৌঁছলে আপনার কাছে মনে হবে যেন মোটর বাইকের মহা-মিছিলের মুখোমুখি আপনি; রাস্তায় শুধু বাইক আর বাইক। শহুরে রাস্তার প্রায় ৯০% ট্রান্সপোর্টই হচ্ছে মোটর বাইক, সাইকেল ৩%, বাকি ৭% হচ্ছে কার, টেক্সি, মাইক্রোবাস, মিনিবাস, বাস ইত্যাদি। তবে এয়ারপোর্ট রোড বা হাইওয়েতে মোটর বাইকের পাশাপাশি কার ও বড় ট্রান্সপোর্ট ২০% এর অধিক দেখা যায়। ছেলে-মেয়ে, শিশু-বৃদ্ধ সবাই যেন মোটর বাইকে দ্রুত ধাবমান সামনের দিকে। বাহন বা গাড়ির জন্য কেউ অপেক্ষা করছে না। কেউ কোথাও থেমে নেই। ট্রাফিক সিগনালে থামতে হলে তাও বড়জোর ৪০ সেকেন্ড।
বাবার পেছনে বড় সন্তান এবং মায়ের পেছনে ছোট দু’সন্তানকে বসিয়ে দু’টি বাইকে পরিবারের ৫-৬ জনের একত্রে ঘুরতে যাওয়ার দৃশ্য সেখানে সাধারণ। মানুষকে বহন ছাড়াও নানা কাজে ব্যবহৃত হয় তাদের বাইক। এমনকি বাসা-বাড়ি পরিবর্তন করতেও মোটর বাইকই তাদের যথেষ্ট। নানা কৌশলে তারা বাইকে করেই এক স্থান থেকে অন্যস্থানে নিয়ে যায় মুরগি, ছাগল, গরু, বোঝা, সরঞ্জাম গোটা সংসার।
পাবলিক পরিবহন হিসেবেও ব্যবহৃত হয় মোটর বাইক। আমাদের দেশে যেরূপ ঘর থেকে বের হলেই রিক্সা পাওয়া যায়, সেরূপ ভিয়েতনামেও ভাড়ায় পাওয়া যায় মোটর বাইক। ভাড়া হয় দু’রকমে। ঘন্টা বা দিনের জন্য আপনি বাইক ভাড়া নিতে পারেন, আবার বাইকের মালিক বা চালক ভাড়ার বিনিময়ে কাক্সিক্ষত স্থানে পৌঁছে দেবে আপনাকে। সেখানকার বাইকও আবার হরেক রকমের। বড় হোন্ডা বা জেন্টস বাইক, লেডিস বাইক, জুনিয়রস বাইক ইত্যাদি। ভিয়েতনামে মোটর বাইকের এই বহুল ব্যবহার এবং বাইকে দৈনন্দিন সকল প্রয়োজন মেটানোর কৌশল থেকে আমাদের শেখার রয়েছে অনেক কিছু। 
২০০৪ সালে হল্যান্ড সফরকালীন দেখেছি, সেখানে সবাই প্যাডেল বাইক চালায়; ছেলে-বালিকা-বুড়ো, প্রফেসর, ভাইস-চ্যান্সেলর, আমলা-ব্যবসায়ী সব্বাই। বাইক চালানোর জন্য সেখানে অবশ্য প্রত্যেক রাস্তা ও ফুটপাতের পার্শ্বে আলাদা লেইন রয়েছে। বাইক সাধারণ বাহন হলেও ধনী দেশ হিসেবে তাদের সুউন্নত, অত্যাধুনিক ও দ্রুত গতিসম্পন্ন ট্রেন, বাস, ট্রামসহ নানা পাবলিক ও প্রাইভেট ট্রান্সপোর্টও রয়েছে কিন্তু। 
মোটরগাড়ির আধিক্যের কারণে যে শব্দ ও বায়ুদূষণ বাড়ছে, তা রোধকল্পে চীনের বেইজিং নগর কর্তৃপক্ষ ২০১৫ সালেই বেইজিংয়ের ১ কোটি ৭০ লাখ বাসিন্দার এক চতুর্থাংশকে বাই-সাইকেল চালনায় অভ্যস্ত করার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল।
ঐ প্রকল্পের আওতায় কেউ সাইকেল ভাড়া নিতে চাইলে তাকে ২০০ ইয়েন জমা দিয়ে একটি সুইপ কার্ড গ্রহণ করতে হয়। শহরের বিভিন্ন জায়গায় সাইকেল কেন্দ্র রয়েছে। গ্রাহক যেকোনো কেন্দ্র থেকে সাইকেল নিতে পারে। এক জায়গা থেকে অন্যত্র গিয়ে সেখানকার স্থানীয় কেন্দ্রে সেটি জমাও দিতে পারে। ঘন্টা হিসেবে তার কার্ড থেকে অর্থ কেটে রাখা হয়।
হল্যান্ডের মতো ধনী দেশে যেখানে প্যাডেল বাইকের সাধারণ জীবন; ভিয়েতনাম যেখানে মোটর বাইকে এগিয়ে যাচ্ছে দ্রুত; চীন যেখানে বাই-সাইকেলের পুনরুত্থান করছে সেখানে আমাদের বাংলাদেশের দাম্ভিক জনতার বাইক-টাইক কিন্তু পছন্দ নয়। এখানে প্যাডেল বাইক বা মোটর বাইক যেন নিম্নবিত্তের বাহন। মধ্যবিত্তদের জন্য এটি অত্যন্ত সেনসিটিভ প্রেস্টিজ কনসার্ন; আর মেয়েদের জন্যতো ধর্মবিরুদ্ধ, সমাজবিরুদ্ধ ও রুচিবিরুদ্ধ গর্হিত কাজ। এর চেয়ে ঢের ভালো যেন রাস্তায় রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে অথবা থেমে থাকা, স্টেশনে স্টেশনে ঘন্টার পর ঘন্টা বিরক্তি ও বিতৃষ্ণায় দিনমান পার করে দেয়া। রাস্তার জ্যামে মার্সিডিজ-বেঞ্জ বা পোরশে-লেক্সাস গাড়িতে বসে কর্তৃপক্ষকে গালমন্দ ও দোষাদুষী করে কর্মশক্তি ও জীবনীশক্তি ক্ষয়ে ক্ষয়ে ক্ষয়িষ্ণু জাতির খাতায় নাম লেখানোই যেন সার।
বাই-সাইকেলঃ পরিবেশ বান্ধব এবং সহজ ও সুলভ মূল্যের

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশ থেকে সাইকেল রপ্তানি বাড়ছে প্রতি বছরই। ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশি বাই-সাইকেল বেশ জনপ্রিয়। বাংলাদেশ থেকে সাইকেল আমদানি করে যুক্তরাজ্য, হল্যান্ড, জার্মানি বেলজিয়ামসহ ইউরোপের ধনী দেশগুলো। সে ধনীরা তাদের তৈরি অত্যাধুনিক ও বিলাসবহুল যানবাহনের পাশাপাশি আমাদের গরিবদের তৈরি সাইকেলে চড়ে স্বচ্ছন্দে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। অথচ আমরা সাইকেল উৎপাদনকারী বা রপ্তানিকারীরা মুড়ির টিনরূপী বাস-টেক্সির অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকছি স্টেশনে অথবা থেমে থাকছি রাস্তার জ্যামে।
বাঙালি ভালো জিনিস রপ্তানি করলেও নিজে কিন্তু ভোগ করে খারাপ বা নিম্নমানের জিনিস, এমনকি কারো কারো ভাগ্যে তাও জোটে না। অথচ ইউরোপীয়রা তাদের উৎপাদনের ফার্স্টক্লাস পণ্য নিজেরা ব্যবহার করে আর থার্ড ক্লাসগুলো রপ্তানি করে পাঠিয়ে দেয় আমাদের মতো অনুন্নত দেশে।  ফার্স্টক্লাস পণ্য কেনার সাধ্য আমাদের না থাকায় তাদের থার্ডক্লাস পণ্যকেই ‘বিদেশি’ বলে  আমরা কাড়াকাড়ি করি; তা-ই পেয়ে দেশীয় ভালো পণ্যের দিকে আর নজর দেই না। তাইতো কৃষি প্রধান বাংলাদেশে বাজার-ঘাট-গঞ্জ সয়লাব এখন বিদেশি দুধ, মধু, ফল, সব্জিসহ সব সব পণ্যে।  এরূপ মনন ও অভ্যাসের কারণেই আমরা আজও সহজলভ্য, পরিবেশ বান্ধব, যানজটরোধী বাই-সাইকেলে চড়ি না; আমাদের যানজট সমস্যারও সমাধান হয় না। মানসিক বিকারগ্রস্ত এরূপ মেকী দম্ভ বা অহঙ্কার যতদিন না বাঙালি পরিহার করতে পারবে, ততদিন তাদের সমস্যা কেবলই জটিল থেকে জটিলতর হতে থাকবে। ...এবং হচ্ছেও তাই। সমস্যার মূলে গিয়ে তার সমাধানে আমাদের বড়ই অনাগ্রহ। 
বাই-সাইকেল বা মোটর সাইকেল চালানোয় বাঙালির অনীহার বিষয়টি নোয়াখালীর একটি প্রবচনের মতো। ‘হমদে মায় রাঁধেনা, হুতেতো হান্তাভাত খায়না’। এর অর্থ হচ্ছে এমনিতে মা কিছুই রান্না করেনি, অথচ ছেলে বলছে যে আমি পান্তা ভাত খাব না! যেখানে ৯৯% মানুষেরই নিজস্ব ট্রান্সপোর্ট নেই, সেখানে রাস্তায় যানবাহনের অপেক্ষায় যৌবন ও জীবন ক্ষয় করা সত্ত্বেও আমরা বাই সাইকেল বা মোটর সাইকেলে চড়তে কুন্ঠিত ও লজ্জিত! সদাশয় সরকারের পক্ষ থেকেও এরূপ পরিবেশ-বান্ধব যানবাহন চালু ও জনপ্রিয় করার কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। ট্যাক্স কমিয়ে এবং সাইকেল লেইন চালু করে সরকার এ বিষয়ে অতি দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেবেন সে কামনা এ বাঙাল কাঙ্গালের। 
আমাদের দেশে ঘর থেকে রাস্তায় বেরুলেই শুরু হয়ে যায় অবর্র্ণনীয় দুর্ভোগ। পাবলিক ট্রান্সপোর্টে যেতে চাইলে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকেও পাওয়া যায় না কাক্সিক্ষত বাহন। অন্যদিকে ভাগ্যবান মানুষরা নিজস্ব গাড়ি নিয়ে বের হলেই পড়েন দুর্বিষহ ট্রাফিক জ্যামে। অর্থাৎ প্রাইভেট বা পাবলিক যে ট্রান্সপোর্টেই থাকুন না কেন, বিধির বিধান ‘দুর্বিষহ যানজট’ কাউকে ছাড়বেই না। 
কেবল রাজধানীর কথাই ধরা যাক। ঢাকা এখন জন-অরণ্যের শহর। ঢাকা মানেই মানুষ আর মানুষ; কোটি কোটি মানুষে গিজগিজ করছে এ শহর। জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান ‘নিপোর্ট’ বলছে, এ শহরে এক কোটি ৩০ লাখ লোকের বাস এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে বাস করে ২৭ হাজার ৭০০ মানুষ। গবেষকরা বলছেন, প্রতিদিন নতুন করে দু’হাজার ১৩৬ জন ঢুকে পড়ছে এ শহরে। আর বছর শেষে যুক্ত হচ্ছে সাত লাখ ৮০ হাজার নতুন মানুষ। যে হারে মানুষ বাড়ছে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে না নাগরিক সুবিধা। এতে পানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও যানজটের সমস্যা দিনদিন প্রকট থেকে প্রকটতর হচ্ছে। 
এ শহরে মানুষের পাশাপাশি বাড়ছে কালো ধোঁয়ার গাড়ি ও ইটের দুর্বল গাঁথুনি। ফলে একদিকে গড়ে উঠছে আগাছারূপী রোগাক্রান্ত ও দুর্বল জাতি; অন্যদিকে নিত্য সংবাদ হচ্ছে বাড়ি ধসে অথবা আগুনের লেলিহানে সারি সারি লাশ। ঢাকা যেন মৃত্যুপুরী; সর্বসংকটের সাথে এখন গোরস্থানেও কবরের মহাসংকট।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এক প্রতিবেদনে বলেছে, ২০০৭ সাল পর্যন্ত রাজধানীতে নিবন্ধনকৃত যানবাহনের সংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৫৪ হাজার। এর মধ্যে আছে মোটরগাড়ি, মাইক্রোবাস, বাস, মিনিবাস, ট্রাক, অটোরিক্সা, মোটরসাইকেল ইত্যাদি। সরকারের সে হিসাবে অবশ্য রিক্সা নেই। সরকারি, বেসরকারি সূত্র বলছে গাড়ির প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি। বিআরটিএ বলছে, প্রতিদিন ঢাকা শহরে শতাধিক নতুন গাড়ি নিবন্ধিত হয়েই রাস্তায় নামছে। বছর শেষে ৩৬ হাজার ৫০০টি নতুন গাড়ি যুক্ত হচ্ছে ঢাকার গাড়িবহরে। কার্যকর কোনো উদ্যোগ না দেখে শহরের মানুষ বুঝে গেছে যে দুর্বিষহ যানজট থেকে নিস্তার নেই। 
বাংলাদেশের পাবলিক বাস ও মিনি বাসগুলো অধিকাংশই যেন মুড়ির টিন। যে দু’চারটি আধুনিক বাহন রয়েছে, তাও জনসংখ্যা বা প্রয়োজনের তুলনায় ২০% এর বেশি নয়। যানবাহনের অপেক্ষায় রাস্তায় ঠায় দাঁড়িয়ে এবং যানবাহন নিয়ে ঘরের বাইরে গিয়ে কেবল ঘন্টার পর ঘন্টাই নয়, বেলার পর বেলা পার করে দেয়া নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। রাস্তায় যানবাহনের দীর্ঘ লাইনে পড়ে থাকার দুর্ভোগ থেকে উদ্ধারের কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেই। আছে কেবল প্রতিশ্রুতি, ইশতেহার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, প্রেস কনফারেন্স, পাবলিক এনাউন্সমেন্ট ইত্যাদি। দুর্বিষহ যানজটে পড়ে মানুষের সময়, শ্রম ও অর্থের যে ক্ষতি হচ্ছে, জ্বালানি তেল ও গ্যাসের যে অপচয় হচ্ছে, তার ঘন্টাপ্রতি হিসাব রীতিমতো আতঙ্কের বিষয়।
বাংলাদেশের বর্তমান জাতীয় সমস্যা যে যানজট, তার অন্যতম কারণ মহানগরীর এক প্রান্তের শিশু-কিশোরদের নিয়ে অভিভাবকদের অন্য প্রান্তের স্কুল ও কোচিং সেন্টারে দৈনিক কয়েকবার যাওয়া-আসা। এলাকাভিত্তিক স্কুলিং ব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যাওয়া-আসা বন্ধ হলে এবং মৌলিক শিক্ষার উন্নয়নের মাধ্যমে প্রাইভেট কোচিংয়ে চলাচল বন্ধ হলে যানজট সমস্যার সমাধান সহজ হবে। তাই দুর্বিষহ যানজট, অর্থ-শ্রম ও সময়ের অপচয়, মৌলিক শিক্ষায় ত্রুটি, ড্রপ-আউট, শ্রেণিবৈষম্যসহ জাতীয় বহু সমস্যা থেকে দেশ রক্ষার তাগিদে আমি এলাকাভিত্তিক স্কুলিং মডেল প্রণয়ন করে মহামান্য রাষ্ট্রপতি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ও মান্যবর মন্ত্রীবর্গকে পাঠিয়েছি; লিফলেট তৈরি করে জানান দিয়েছি ষ্টেক-হোল্ডারদেরকে। যে মডেলের বাস্তবায়ন এ মুহূর্তেই জরুরি, তা কেন এখনও বিবেচনায় আসছে না এটি বোধগম্য নয়। 
এ মডেলে বহু সমস্যার একক সমাধান নিহিত থাকায়ই সম্ভবত তা বাস্তবায়নের মুখ দেখছে না। কারণ, সমস্যার সমাধান হয়ে গেলে স্বার্থান্বেষী কোনো কোনো মহলের স্বার্থ ক্ষুন্ন হয়। সেজন্যই হয়ত সমস্যার মৌলিক সমাধান না করে তা নিয়ে যত গড়িমসি বা আলাপ-আলোচনার ‘মূলা ঝুলিয়ে’ রাখা যায়, ততই স্বার্থ-সিদ্ধির পথ সুগম হয়। তাই সমস্যার সহজ ও মূল সমাধানে আমাদের যত আপত্তি ও বিপত্তি।
ষ্টেক-হোল্ডারদের কাছে আমার প্রণীত এলাকাভিত্তিক স্কুলিংয়ের মডেল এবং বাংলাদেশের সকল সমস্যার স্থায়ী সমাধানের মডেল (www.helal.net.bd/model) পাঠিয়ে এর শূন্য ফলাফলে আমি বুঝেছি যে আমরা হয় সমস্যার মূলে যেতে পারি না অথবা সমস্যার সহজ সমাধান চাই না। তাই যেকোনো জাতীয় সমস্যা সমাধানের ‘নেপথ্য সমস্যা’ উদঘাটন এবং এর বিরুদ্ধে সামাজিক যুদ্ধ শুরুর সময় এখনই।  আমাদের দেশের ভাগ্যবান গাড়ি মালিকদের ততোধিক ভাগ্যবান ও ক্ষমতাধর ড্রাইভারগণ মনে করেন, পুরো দেশটাই যেন তাদের ড্রাইভিং ও পার্কিংয়ের জন্য বরাদ্দ। যেখানে ইচ্ছে সেখানেই এবং যেভাবে ইচ্ছে সেভাবেই গাড়ি পার্ক করতে যেন নেই কোনো মানা। যেকোনো উপায়ে গাড়ি কিনতে পারলেই হয়, কেনার পর মাসিক বাজেটে পার্কিং-ব্যয় বরাদ্দের কোনো প্রয়োজন পড়ে না।
পার্কিং প্লেস হিসেবে বাংলাদেশের সকল মানুষের যৌথ মালিকানার জায়গা যথেচ্ছ ব্যবহার করে যাচ্ছেন হাতেগোনা সর্বোচ্চ ৫% ভাগ্যবান গাড়ি-মালিক। ৫ ব্যক্তি তাদের ৫টি গাড়ি যে রাস্তায় পার্কিং করছেন, সে রাস্তার অধিকারী কিন্তু শুধু সেই ৫ ব্যক্তিই নন, তাদের সাথে সে জায়গার অধিকারে সমভাগে রয়েছেন দেশের আরো ৯৫ জন নাগরিক, যাদের গাড়ি নেই। অথচ ৫% ব্যক্তিই কিন্তু ৯৫% ব্যক্তির জায়গা ব্যবহারের সুবিধাভোগ করছেন। ৯৫ জন যে জায়গা দিয়ে হেঁটে বা রিক্সা-ভ্যান-সাইকেল দ্রুত চালিয়ে সহজে গন্তব্যে যেতে পারতেন, সে জায়গায় শৃঙ্খলা বহির্ভূতভাবে গাড়ি চালনা ও পার্কিংয়ের ফলে যাতায়াত বিঘিœত হচ্ছে। এভাবেই ৫ জন গাড়ি-মালিকের বিনামূল্যে পার্কিং-স্বার্থ রক্ষায় ৯৫ জন গাড়িহীন নাগরিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিনিময় তত্ত্বের অথবা সুষম সুবিধা-বন্টন তত্ত্বের আওতায় এনে যদি এসব গাড়ি পার্কিংয়ের জন্য চার্জ আরোপ করা যেত, তাহলে সে অর্থ সরকারি কোষাগার হয়ে পরোক্ষভাবে ৯৫% মানুষের সুবিধায় আসত এবং তাতে প্রতি ১ জন গাড়ি-মালিকের সুবিধাভোগের জন্য বাকি ১৯ জন গাড়িহীন বা বিত্তহীন নাগরিকের অধিকার বঞ্চনার তীব্রতা কমে যেত। এতে সামগ্রিকভাবে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান হ্রাস সহজতর হতো।
সড়ক দূর্ঘটনা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছে আজ। সংবাদপত্রের পাতা খুললেই বা টেলিভিশন অন করলেই প্রথমে আসে সড়ক দূর্ঘটনায় স্কুল-কলেজ শিক্ষার্থী বা সাধারণ নাগরিকের প্রাণহানীর খবর। বেপরোয়া বাস-ট্রাক ও গাড়ি চালকদের দুর্বিষহ চালনায় প্রাণহানী এখন নৈমিত্তিক ঘটনা। এ সড়ক দূর্ঘটনা বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব বাই-সাইকেল চালনার মাধ্যমে।
অথচ উন্নত দেশের রাস্তাঘাটে তথা হাইওয়েতে গাড়ির মুখোমুখি সংঘর্ষের সুযোগ নেই, ফ্লাইওভার এবং ওভার ব্রিজও রয়েছে ৩ স্তর পর্যন্ত। গাড়ির গতি নির্ধারিত, সেখানকার মানুষ হাইওয়েতেও ততটা দ্রুত গাড়ি চালায় না। গাড়ি চলে রাস্তার ডানে অর্থাৎ গাড়ির স্টিয়ারিং থাকে বাঁ পাশে। এভাবে অনেক কিছুতেই তারা আমাদের উল্টো। সেখানে ট্রাফিক সিগনালিং কঠোর ও স্বয়ংক্রিয় তথা কম্পিউটারাইজ্ড। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক সিগনালের পাশাপাশি পথচারীদের রাস্তা পারাপারের জন্য রয়েছে সিগনালিং। পথচারী ও গাড়ির চালক সকলেই সে সিগনাল মেনে চলে। এমনকি আমার মতো বাংলার ভবঘুরেরাও সেখানে গিয়ে নিয়ম মানতে বাধ্য। কারণ নিয়ম না মানলে তাৎক্ষণিক দু’টো পরিণতি অবধারিত, যার কোনো একটির শিকার আপনাকে হতেই হবে। এক, রেড বা ইয়েলো সিগনালে ফুটপাথ থেকে রাস্তায় নামলে অন্যরা করুণ দৃষ্টিতে আপনার দিকে তাকাবে; তারা ভাববে আপনি হয় পাগল, নতুবা নিয়ম-কানুন বোঝেন না। দুই, আপনি সিগনাল না মানলেও অন্য সবাই যেহেতু মানে, তাই সেখানে সিগনাল না মেনে নিজকে যে অক্ষত রাখতে পারবেন না, এটি নিশ্চিত।  ফলে আপনি যদি বাংলাদেশি বদভ্যাসবশতঃ রেড সিগনালে রাস্তায় পা রাখেন, তাহলে গ্রীন সিগনালের গাড়ি আপনাকে এমন সমুচিত শিক্ষা দেবে, যে শিক্ষা আপনার এ জনমে আর কাজে লাগানোর সুযোগ হবে না।  
বাংলাদেশের ট্রাফিক সিগনাল-পদ্ধতি ও ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত দুর্বল, তদুপরি এ নিয়ম মানে না কেউই, সবাই অ-নে-ক স্বাধীন। এখানে নিয়ম না মানাটাই হয়ে গেছে নিয়ম। চালক বা পথচারী কেউই সিগনালের তোয়াক্কা করে না। সাধারণ চালকরাতো বটেই, এমনকি মন্ত্রী বা নেতাদের গাড়ির চালকরাও তা মানে না। ট্রাফিক পুলিশ নির্বিকার তাকিয়ে থাকে নিয়ম অমান্যকারীর দিকে; কিছু বলেও না, করেও না। উন্নত দেশে সবকিছুই অটোমেটেড বলে এরূপ অলস ও অকার্যকর ট্রাফিক পুলিশের বেতনভার সইতে হয় না সেখানকার জনগণকে। আসলে পৃথিবীর কোনো উন্নত বা আধুনিক দেশের রাস্তায় এখন আর আমাদের দেশের মতো এত ট্রাফিক পুলিশ দেখা যায় না। সেখানে রাস্তার মাস্তান ও সড়ক-সন্ত্রাসীকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করে দেয় কম্পিউটার। 
সর্বক্ষেত্রে আমাদের অনিয়ম, অনাচার ও শ্রেণিবৈষম্যের স্পর্শকাতর ও উদ্দীপিত উপাখ্যান আমাকে আন্দোলিত ও উদ্বেলিত করে প্রতিনিয়ত। গুটিকতক মানুষের শোষণ-বঞ্চনার কারণে এবং তাদের অসদিচ্ছা ও অন্যের অধিকারের বিষয়ে উদাসীনতার কারণে, এক কথায় তাদের সৎচিন্তার অভাবে এদেশের ৯৫% মানুষ অধিকার-বঞ্চিত হয়ে শত শত বছর ধরে অসহায়, মূক ও বধির হয়ে কালাতিপাত করছে।
আর কতকাল! কতকাল পর দুর্ভাগা বঙ্গজননীর ৯৫% সন্তানের সাথে আমার এ লেখনীর ক্রন্দনরোল আকাশে বাতাসে ধ্বনিবে না, অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ ভীম রণভূমে রণিবে না...।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ