বিশেষ খবর

শতবর্ষের পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ প্রতিবেদন
img

‘ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই দেশটির যা কিছু আশা-ভরসার, তার সবটাইতো ধারণ করে এই বিশ্ববিদ্যালয়’- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে কথাগুলো আহমদ ছফার। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সমাবর্তনে চ্যান্সেলর লর্ড লিটন বলেছিলেন, এ বিশ্ববিদ্যালয় শুধু ঢাকাকেই পরিচিত করবে না, পুরো অঞ্চলটাকেই সারাবিশ্বে পরিচিত করবে। তাদের এ বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত করবেন এমন লোক সারা বাংলায় খুব বেশি পাওয়া যাবে না নিঃসন্দেহে।
শিক্ষাই আলো সেøাগানকে ধারণ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অন্ধকারে থাকা বাঙালি জাতিকে শুধু আলোর পথই দেখায়নি, শোষণের জাঁতাকলে পিষ্ট হওয়া একটি জাতিকে এনে দিয়েছে পরম আরাধ্য স্বাধীনতাও। এই দ্বৈত ভূমিকার কারণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের যে কোনো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে অনন্য।
শিক্ষা-দীক্ষা এবং গবেষণা ক্ষেত্রেই কেবল নয় বাঙালির বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা ও মননশীলতা চর্চার তীর্থভূমি এ বিদ্যায়তন। বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ‘অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়’এর মডেলে প্রতিষ্ঠিত ও ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত এ বিশ্ববিদ্যালয়টি দেশের সীমানা ছাড়িয়ে সুনাম ছড়িয়েছে বিশ্ব দরবারে।
‘উচ্চ শিক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন’ প্রতিপাদ্য নিয়ে দেশের প্রাচীনতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ১ জুলাই পালন করেছে ৯৪ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। এ উপলক্ষে রঙ-বেরঙের আলোতে ভরে উঠেছে পুরো ক্যাম্পাস। বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারে বিরাজ করছে সাজ সাজ রব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দিবস ২০১৫ উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক এক শুভেচ্ছা বাণীতে বলেন,  জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানালোক সমৃদ্ধ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের মহান ব্রত নিয়ে শতকের পথে এগিয়ে চলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতিকে উদারনৈতিক উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত নতুন প্রজন্ম উপহার দিতে সদাসচেষ্ট। একথা নির্দি¦ধায় বলা যায় কেবলমাত্র উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। 
শতবর্ষের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে এর মূল্যায়ন করতে গিয়ে অনেকেই বলে থাকেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক অবদান ছাড়া তেমন কোনো অ্যাকাডেমিক অর্জন নেই। অথবা যে স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করেছিল তা এখন অনেকটাই ফিকে।
এ কথার সঙ্গে দ্বিমত রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তানজিম উদ্দিন খানের। তার মতে, কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্জনকে কোনভাবেই খাটো করে দেখা যায় না। এখানকার অনেক শিক্ষক তাদের ব্যক্তিগত চেষ্টায় বিশ্বের খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান যেমন- রুটলেজ, পালগ্রেভ, ম্যাকমিলান, আর্থসক্যান থেকে নিজেদের বই প্রকাশ করেছেন। সাম্প্রতিক সময়ে পাটের জিনম আবিষ্কারে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদানও গর্বের বলে অভিমত তার।
অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের মতে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় যখন কার্যক্রম শুরু করল, তখন তিনটি ক্ষেত্রে আমাদের প্রত্যাশা এক লাফে অনেক বেড়ে গেল। প্রথমত, এই প্রথম পুর্ববঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হল যার মাধ্যমে এই অঞ্চলের অনগ্রসর ও পশ্চাৎপদ মুসলিম সমাজ শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে যাওয়ার একটি উপায় পেল।
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা যে একটি জাতির জন্য কত গুরুত্বপুর্ণ সেটি জাতি হিসেবে বাঙালি প্রথম উপলব্ধি করতে পারলো।
তৃতীয়ত, ইংরেজি শিক্ষায় পাঠদান শুরু হলেও এই ইংরেজি শিখতে গিয়েই শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের দেশাত্ম্যবোধ তৈরি হলো। নিজের ভাষার প্রতি অনুরাগ জাগার পাশাপাশি তাদের মধ্যে স্বাতন্ত্র্যবোধও প্রবল হলো।
বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার ফলে শিক্ষিত-মধ্যবিত্ত শ্রেণির বুদ্ধি ও মননশীলতা চর্চার ক্ষেত্র প্রস্তুত হওয়াকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন সৈয়দ মনজুরুল ইসলামে।
তিনি বলেন, এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরে পুর্ববঙ্গের অনগ্রসর সমাজের স্বাতন্ত্র্যবোধ যে কতটা জাগ্রত হয়, তার প্রমাণ পাওয়া গেল প্রথম ১৯৪৭ সালে। এ বছরই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা উর্দু হবে বলে ঘোষণা দিলেন মোহম্মদ আলী জিন্নাহ। তার মুখের ওপরই ‘নো, নো’ আওয়াজ তোলার সাহস দেখিয়েছিল এ দেশের ছাত্র সমাজ।
শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রথম থেকেই মেধাবী কিছু শিক্ষক জড়ো হয়ে যাওয়া ছিল শুরুর দিকে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় সাফল্য। তাদের মধ্যে বিজ্ঞানী সত্যেন বোস, রমেশ চন্দ্র মজুমদারসহ আরও অনেকে উল্লেখযোগ্য। তবে বর্তমানে সেরকম যোগ্যতা সম্পন্ন শিক্ষকের খুব অভাব এখানে।
কিন্তু এমন কথা মানতে নারাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক।
তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান শিক্ষকরা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে অনেক বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন। এখন যতো শিক্ষক পিএইচডি ডিগ্রিধারী, অতীতের কোনো সময়েই এমনটি ছিল না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সাবেক এক শিক্ষার্থীর মতে, শত বছরের দরজায় কড়া নাড়া এই বিশ্ববিদ্যালয় পাল্টে দিয়েছে এখানকার লৈঙ্গিক মানচিত্রও। প্রতিষ্ঠার সময় এক লীলা নাগ না থাকলে আমাদের লিখতে হতো, ‘৮৭৬ জন ছাত্রকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি যাত্রা শুরু করে।’
তবে আশার কথা হলো বর্তমানে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩৭ হাজার ৬৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে লীলা নাগরা এখন ৪৫ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪৯ তম সমাবর্তনে সংখ্যা গরিষ্ঠ গ্রাজুয়েট ছিলেন তারাই!
বর্তমান সময়ের অসুস্থ শিক্ষক রাজনীতি, ছাত্র রাজনীতির দুর্বৃত্তায়ন, বাজেট ঘাটতি, আবাসন সমস্যা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয়টি এগিয়ে চলেছে আলো ছড়িয়ে।
সোনালী অতীতকে পাথেয় করে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সন্ধানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পথচলা হোক নিরন্তর। ৯৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের প্রত্যাশা এমনটাই।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ