বিশেষ খবর

এশিয়াটিক সোসাইটি আয়োজিত তাজউদ্দীন আহমদ স্মারক বক্তৃতা

ক্যাম্পাস ডেস্ক প্রতিবেদন
img

১০ অক্টোবর ২০১৫ তারিখে এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ এর অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হয় তাজউদ্দীন আহমদ স্মারক বক্তৃতামালার দ্বিতীয় পর্ব। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন ট্রাস্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটি ফর বিজনেস স্টাডিজ, হিউম্যানিটিস এন্ড সোস্যাল সায়েন্স এর চেয়ারপার্সন প্রফেসর ড. খন্দকার বজলুল হক এবং স্বাগত বক্তব্য রাখেন ট্রাস্ট ম্যানেজমেন্ট কমিটি ফর বিজনেস স্টাডিজ, হিউম্যানিটিস এন্ড সোস্যাল সায়েন্স এর কনভেনর প্রফেসর এ কে এম গোলাম রব্বানী। তাজউদ্দীন আহমদ এর ওপর স্মারক বক্তৃতা পাঠ করেন প্রফেসর এমেরিটাস ড. আনিসুজ্জামান। অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গণফোরাম চেয়ারম্যান ড. কামাল হোসেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-অর-রশিদ, প্রফেসর মাহফুজা খানম, হাজী গোলাম মোরশেদ, শামসুজ্জামান, সানোয়ারুজ্জামান, শামীম-আল-মামুন, ফজলুর রহমান, মোহাম্মদ আবদুল হাই প্রমুখ।
অনুষ্ঠানের শুরুতে ড. আনিসুজ্জামান স্মারক বক্তৃতা পাঠ করেন, যার শিরোনাম ছিল তাজউদ্দীন আহমদ- এ ম্যান অফ ডেসটিনি।
ড. আনিসুজ্জামান বলেন এ শিরোনামের দ্বিতীয় অংশ কি অতিব্যবহারে বিবর্ণ? সম্ভবত এর উত্তর হবে হ্যাঁ-বোধক। তাহলে প্রশ্ন হতে পারে আমি এখানে আবার সেটিকে ব্যবহার করছি কেন? জবাবে আমি বলব মানবেতিহাস কিছু সংখ্যক লোককে একইভাবে পরিচালিত করে, তারা সমষ্টির জন্য কিছু অনন্য সাধারণ অর্জন করেন, যা তাদের প্রত্যাশার বাইরে; এমনকি তারা তাদের ভূমিকা শেষ হওয়ার আগেই অদৃশ্য হয়ে যান। তাজউদ্দীন আহমদ (১৯২৫-৭৫), বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী অবশ্যই তেমনই এক ধরনের মানুষ ছিলেন।
মধ্যবিত্ত কৃষি পরিবারে জাত, তাজউদ্দীন ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। ম্যাট্রিকুলেশন এবং ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় প্রথম দশজন কৃতী পরীক্ষার্থীর মধ্যে ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে বিএ (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন এবং আরও অনেক পরে জেলে থাকা অবস্থায় ল’ ডিগ্রি অর্জন করেন। জীবনের শুরু থেকে মুসলিম লীগের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং বিভিন্নভাবে নিজ এলাকার জনগণের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। এলাকায় বনবিভাগের লোকদের দুর্নীতি সাধারণ মানুষদের ভোগান্তি সৃিষ্ট করছিল; তিনি এর বিরুদ্ধে জনগণকে নিয়েই আপোসহীন আন্দোলন শুরু করেন। কুসংস্কারের প্রভাবে এলাকার মানুষ গুটিবসন্তের টিকা নেয়া থেকে নিজেদের বিরত রাখত। তাজউদ্দীন মানুষকে বুঝিয়ে-শুনিয়ে টিকা গ্রহণে আগ্রহী করে তোলেন। এসব কর্মসূচিতে তাঁর নিজের কোনো স্বার্থ ছিল না; যে জনগণের মধ্য থেকে তিনি এসেছেন, তাদেরকে সেবাদানের লক্ষ্যে তিনি এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন।
বঙ্গীয় মুসলিম লীগের মধ্যে দু’টি ধারা বজায় ছিল- একটি সভাপতি মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ এবং কেন্দ্রীয় আইনসভার সদস্য ব্রিটিশ সরকারের স্যার উপাধিধারী খাজা নাজিমউদ্দিনের যৌথ নেতৃত্বে। অন্যটি প্রথিতযশা আইনজীবী সি আর দাশের ভক্ত অনুসারী হুসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিমের যৌথ নেতৃত্বে। তাজউদ্দীন আবুল হাশিমের গ্রুপেই থাকেন। ঢাকায় তাঁর নেতা ছিলেন কামরুদ্দিন আহমদ এবং শামসুল হক। যে আকৃতি-প্রকৃতি নিয়ে পাকিস্তানের জন্ম হলো, তাতে তাদের অবিমিশ্র আনন্দের কোনো অবকাশ ছিল না। পাঞ্জাব এবং বঙ্গদেশ ভাগ হয়ে গেল। সিলেট ছাড়া আসামের পুরো অংশই ভারতের অন্তর্ভুক্ত হলো। প্রাদেশিক আইনসভায় মুসলিম লীগের দলীয় নেতা হিসেবে সোহরাওয়ার্দীকে পুনর্নির্বাচন করতে হলো,তাতে তিনি পরাজিত হলোন। অবিভক্ত বাংলাদেশকে সার্বোভৌম দেশ হিসেবে টিকিয়ে রাখতে তাঁর চেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো, পাকিস্তানের প্রতি তাঁর আনুগত্যও প্রশ্নবিদ্ধ হলো। পাকিস্তান সৃষ্টির ৬ মাসের মধ্যে কেন্দ্রীয় সরকার এবং পূর্ববাংলার সম্পর্কের টানাপড়েনে হতাশার জন্ম হলো। এ সময় ১৯৪৮ সালে রাজনৈতিক মেরুকরণে গঠিত হলো পাকিস্তান মুসলিম লীগ, ১৯৪৯ সালে গঠিত হলো পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি এবং দেশে গণতন্ত্রের অবাধ চর্চা এ দু’টি ইস্যু ছাত্র-তরুণদের মনে আলোড়ন তুললো। দাবি উঠলো- সাম্প্রদায়িক রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। কিন্তু তখনও অনুকূল পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। ১৯৫১ সালে পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগ একটি অসাম্প্রদায়িক অরাজনৈতিক দল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মাহমুদ আলী সভাপতি এবং অলি আহাদ তার সাধারণ সম্পাদক। তাজউদ্দীন এর নির্বাহী কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯৫১ সালের শেষের দিকে যুবলীগে তাজউদ্দীনের সাথে আমার প্রথম দেখা। যুবলীগ বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ভাষা আন্দোলনে তাঁর সম্পৃক্ততার জন্য তাজউদ্দীন আহমদ প্রথমবারের মতো গ্রেফতার হন।
১৯৫৩ সালে তাজউদ্দীন আহমদ আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। তিনি ঢাকা জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হন। পরের বছর তাঁকে দেখা গেল কারাবন্দী হিসেবে। পরে কারামুক্ত হলেন এবং আওয়ামী নেতৃত্বের উপরের ধাপের দিকে আরও এগিয়ে গেলেন। তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ঐতিহাসিক ৬ দফা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত ১৯৭১ সালের অসহযোগ আন্দোলনে তিনি অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তখন তাঁর স্বাক্ষরে বেসামরিক কর্মকর্তা, পেশাজীবী এবং ব্যবসায়ী সমাজের কাছে নির্দেশনা যেত; যার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন। এভাবে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে জনগণের ব্যাপক সমর্থন এবং একাত্মতা প্রকাশে বিশ্ববাসী অভিভূত হয়েছিল।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে ঢাকা শহর ও অন্যত্র পাকিস্তান সশস্ত্র বাহিনী নিরস্ত্র জনগণের উপর অপারেশন সার্চলাইট নামের গণহত্যা শুরুর পর অসহযোগ আন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে। এটি ইতিহাসের এক জঘন্য গণহত্যার ঘটনা। বাংলাদেশ যতদিন তাদের দখলে ছিল, ততদিন এ হত্যাযজ্ঞ অব্যাহতভাবে চলেছে। বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হয়ে গেলেন, তাজউদ্দীন গ্রেফতার এড়িয়ে আমীরুল ইসলামসহ ভারত সীমান্ত পার হবার লক্ষ্যে তাৎক্ষণিক প্রাপ্ত যে কোনো যানবাহনের সুযোগ নিলেন, অনেকটা পথ পায়ে হেঁটেও গেলেন। এভাবে তারা ভারত সীমান্ত অতিক্রম করলেন। যাত্রাপথে তারা দখলদার পাকবাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যার অনেক চিহ্ন দেখতে দেখতে গেলেন, পাশাপাশি দেখলেন মুক্তিকামী মানুষের মুক্তির তীব্র আকাক্সক্ষা। ভারত সীমান্তের কাছাকাছি জীবননগরের কাছে টঙ্গীর একটি ব্রীজের নিচে ভারতে প্রবেশ অপেক্ষায় থাকাকালীন তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার জন্য একটি স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করার প্রতিজ্ঞা করেন।
দিল্লীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সাথে সাক্ষাৎ করার সময় তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজ পরিচয় দিয়েছিলেন। তখনকার সময় এটি অতিরঞ্জন মনে হলেও তখন সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য এর বিকল্প ছিল না। তিনি মুক্তিযুদ্ধের এ পুরো সময় সমমর্যাদা ধরে রেখেছিলেন। যদিও সবাই জানত যে, আমরা ভারতের আশ্রয়ে রয়েছি। ইন্দিরা গান্ধীর সাথে তাঁর সাক্ষাতের ঘটনা তাজউদ্দীনকে অনেক কিছুতে সফল করে তুলেছিল। মুক্তিযোদ্ধা ও লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর জন্য অনেক সুযোগ সৃষ্টি করেছিল। ১৭ এপ্রিল বাংলাদেশের মুক্ত অঞ্চলে বিদেশি সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকার গঠনের ঘোষণা দেয়া হয়।
তাজউদ্দীনের ঘোষণা ছিল লাশের পাহাড়ের নিচে পাকিস্তানের কবর হয়ে গেছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এর পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ সরকারের বাইরে সমান্তরাল আরেকটি সংস্থাকে খাড়া করানো হয়। তাজউদ্দীন আমাকে একাধিকবার বলেছিলেন এ প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি যে, ভারত সরকার কেন আরেকটি সশস্ত্র বাহিনী খাড়া করছে! প্রতিবারই প্রশ্ন করলে তাঁকে বলা হতো শিঘ্রই এর জবাব পাওয়া যাবে, কিন্তু এর জবাব কোনোদিন আসেনি।
জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের কিছু সদস্য চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছিলেন কিসের বলে তাজউদ্দীন প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার দখল করে আছেন? অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নজরুল ইসলাম তখন বলেছিলেন বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তিনি স্বয়ং দলের নেতৃত্বভার আগেও নিয়েছেন, এবারেও নিয়েছেন। তিনিই তাজউদ্দীনকে প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত করেছেন। তখন সদস্যগণ শান্ত হলেন।
তাজউদ্দীনের একটি মহৎ কাজ ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্গঠিত করা; ১১ সেক্টরে ভাগ করে কমান্ডার নিয়োগ করা। এরপর তাদের কয়েকটি ব্রিগেডে পরিণত করা। তিনি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ নিশ্চিত করেছিলেন। সেক্টর কমান্ডারদের কেউ কেউ প্রধান সেনাপতি কর্নেল এম এ জি ওসমানী সম্পর্কে প্রশ্ন উত্থাপন করলে ওসমানী পদত্যাগপত্র পেশ করেন। তাজউদ্দীন ওসমানীকে বুঝিয়ে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করিয়ে নেন। খোন্দকার মোশতাক আহমেদ এমএনএ কাজী জহিরুল কাইয়ুমকে পাঠান কলকাতাস্থ মার্কিন দূতাবাসের সাথে আলাপ করে পাকিস্তানের সাথে আপোস করতে। মুক্তিযুদ্ধকে মাঝপথে থামিয়ে দেয়ার এই চক্রান্তকে দূরদর্শী তাজউদ্দীন নস্যাৎ করে দিয়েছিলেন। খোন্দকার মোশতাক আহমেদের জাতিসংঘে লবিং করার কথা ছিল, কিন্তু তাকে আর সেখানে যেতে দেয়া হয়নি। খোন্দকার মোশতাক আহমেদকে স্বপদে বহাল রেখে তার ক্ষমতা কেড়ে নেয়া হয়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র পুনর্গঠন করা হয়। সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে মনস্তাত্বিক যুদ্ধের সেল গঠিত হয়। স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য পরিকল্পনা কমিশন গঠিত হয়।
একাত্তরে অক্টোবর-নভেম্বরে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ কমান্ড গঠনে মেজর ওসমানী নেতৃত্ব দেয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো বাংলাদেশ আর্মির লোকজন ভারতের আতিথেয়তায় কাজ করছে এবং বাংলাদেশের সেনা কর্মকর্তারা ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের অনেক জুনিয়র, যদিও ওসমানী ইন্ডিয়ান বৃটিশ আর্মিতে অনেক ভারতীয় অফিসারের সিনিয়র ছিলেন, কারও কারও সমসাময়িক ছিলেন। ওসমানী এ আয়োজনে ক্ষোভ প্রকাশ করলেন। তিনি আবার পদত্যাগ করলেন, তাজউদ্দীন তাকে আবারও বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করিয়ে নিলেন।
শুরু থেকেই তাজউদ্দীন ৩টি নীতিমালা ঘোষণা করেন, যার ভিত্তিতে সরকার পরিচালিত হবে। সেগুলো হলো গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র। এগুলো আওয়ামী লীগের ৭০ এর নির্বাচনী ইশতেহারেও ছিল। এটি সবাই গ্রহণ করে। সর্বদলীয় উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা খুব সহজ ছিল না। মুক্তিযুদ্ধকে ব্যাপকভিত্তি দান করার নিমিত্তে এর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। ভারতের বেসামরিক ও সামরিক আমলাতন্ত্রের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে তাজউদ্দীন মর্যাদা রক্ষা করে চলতেন, যা তাদের কাছে তাঁকে প্রশংসাযোগ্য করে তোলে।
তাজউদ্দীন শুরুতেই লক্ষ্য ঠিক করেছিলেন যে, ১৯৭১ সালের শীতকালের মধ্যে বাংলাদেশকে মুক্ত করবেন। তাঁর ধারণা ছিল যুদ্ধ যদি দীর্ঘায়িত হয়, তাহলে আমেরিকার সহযোগিতায় বাংলাদেশে আরেকটি ভিয়েতনামের সৃষ্টি হবে। এ সময়ের মধ্যে মুক্তি অর্জন করতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহযোগিতা প্রয়োজন যে হিমালয়ে বরফ আচ্ছাদিত হয়ে গেলে তখনই তা পাওয়া সম্ভবপর ছিল। কারণ তখন বরফ ভেঙে চীনা সৈন্যরা হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। তাজউদ্দীন সরকারের সকল শক্তি সেই রণকৌশলের দিকে নিবদ্ধ করা হয়। তিনি স্পষ্টত বলে দিয়েছিলেন, ভারতীয় বাহিনী বাংলাদেশের সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে। বাংলাদেশ সরকার যখন মনে করবে বাংলাদেশে তাদের আর প্রয়োজন নেই- তারা স্বদেশে ফিরে যাবে। বন্দীদশা থেকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তি প্রসঙ্গে তিনি বলেন অনেকে আমাকে প্রশ্ন করে, আপনি কি দেশের স্বাধীনতা চান, না বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চান? জবাবে আমি বলেছি আমার উত্তর দু’টোই। কেবলমাত্র বাংলাদেশ স্বাধীন হলেই বঙ্গবন্ধু মর্যাদা নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসতে পারেন।
তাজউদ্দীন এমন একটি বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন যেখানে সকল নাগরিক খাদ্য, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কল্যাণ এবং নিরাপত্তা ভোগ করবে। এটি এমন একটি রাষ্ট্র হবে, যেখানে ধর্ম হবে মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ব্যাপার; রাষ্ট্রীয় কোনো ব্যাপারে ভূমিকা রাখবে না। সংখ্যালঘু বলে কোনো কিছু থাকবে না। সবাই মৌলিক অধিকার ভোগ করবে এবং সর্বত্র বিরাজ করবে আইনের শাসন। কেউ পার্টির পদ এবং প্রশাসনিক পদ একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারবে না। দুর্নীতির অবসান করতে হবে। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তিনি বলেন আমাদের সমাজতন্ত্র সোভিয়েত কিংবা চীনা সমাজতন্ত্রের মডেলে নয়, আমরা আমাদের সমাজতন্ত্রের পথ বেছে নেব। শিল্প শ্রমিকের চেয়ে তিনি কৃষকদের প্রতি বেশি আস্থাশীল ছিলেন। বৈদেশিক সাহায্যের ব্যাপারে তাঁর উদ্বেগ ছিল; তিনি জানতেন আমাদের বিদেশি সাহায্যের প্রয়োজন রয়েছে, কিন্তু কেউ যেন আমাদের ভিক্ষুক না ভাবে এবং সাহায্য দানের ক্ষেত্রে এমন শর্ত আরোপ না করে, যা স্বাধীন দেশের জন্য সম্মানজনক নয়। তাঁর অধিকাংশ আদর্শের বাস্তবায়ন তিনি দেখে যাবার সময় পাননি। তাজউদ্দীনের সেই স্বপ্ন এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।
১৯৭১ সালে ঢাকা ত্যাগ করে ভারত যাওয়ার সময় তিনি স্ত্রীর কাছে একটি চিরকুট পাঠালেন; বললেন, বাচ্চাদের নিয়ে জনারণ্যে মিশে যাও। আশা প্রকাশ করলেন, বাংলাদেশ মুক্ত হলে আবার দেখা হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি পরিবার থেকে আলাদা বাস করতেন। প্রধানমন্ত্রীর অফিস সংলগ্ন একটি কক্ষে থাকতেন। নিজের কাপড় নিজেই পরিষ্কার করতেন। তাঁর পিয়ন যখন অসুস্থ হয়ে পড়ে, তিনি তার সেবা শুশ্রষা করেন।
দুঃখের বিষয় স্বাধীন বাংলাদেশে স্বার্থসন্ধানীরা কৌশলে বঙ্গবন্ধু ও তাজউদ্দীনের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি করে। তাজউদ্দীন মন্ত্রিসভা ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, তা করার আগেই প্রধানমন্ত্রী তাঁকে লিখিতভাবে পদত্যাগ করতে বলেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পদত্যাগ পত্রের একটি খসড়াও সংযুক্ত ছিল। তাজউদ্দীন সম্পর্কে ঘাতকদের কিন্তু কোনো সংশয় ছিল না। তিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করলেন যে, বঙ্গবন্ধুর প্রতি তাঁর আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত। বিয়োগান্ত বিষয় হলো বঙ্গবন্ধু বিষয়টি কোনোভাবেই জানতে পারলেন না। তবু তাজউদ্দীনের এটা জানা ছিল যে, ইতিহাস তাঁর ওপর বাংলাদেশের মুক্তির দায়িত্ব দিয়েছে; তিনি তা বাস্তবায়িত করতে পেরেছেন।
প্রফেসর খন্দকার বজলুল হক
সভাপতির ভাষণে প্রফেসর খন্দকার বজলুল হক বলেন- তাজউদ্দীন আহমদ ইতিহাসের উপকরণ নন, তিনি নিজেই ইতিহাস। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর তাজউদ্দীন আহমদ আমাদের মন-মানসিকতা স্পর্শ করেন। তিনি সফলভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। তিনি অর্থপূর্ণ জীবনযাপন করেছেন। বাঙালি জাতির জীবনে যতদিন বঙ্গবন্ধু থাকবেন, ততদিন তাজউদ্দীনও থাকবেন। আজকের সংকট শুধু ব্যক্তিকে নয়, জাতিকেও স্পর্শ করেছে। এর থেকে পরিত্রাণের পথ আমাদের খুঁজতে হবে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ