বিশেষ খবর

ঢাকা কমার্স কলেজ প্রতিষ্ঠায় আমাদের উদ্যোগ ছিল চ্যালেঞ্জ আর এডভেঞ্চারে ভরা

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ নিবন্ধ

অর্থ-বাণিজ্য শিক্ষার যে বিপ্লব বাংলাদেশে এখন দেখা যাচ্ছে তার সূচনা ঢাকা কমার্স কলেজ থেকে ৮০’র দশকে। বিশেষত বিবিএ, এমবিএ, এক্সিকিউটিভ এমবিএ, বিবিএস, এমবিএস ডিগ্রি প্রদান ও গ্রহণের যে হিড়িক এখন দেখা যাচ্ছে তার প্রাথমিক সূচনা হয় বাণিজ্য শিক্ষার বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ঢাকা কমার্স কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। এর বহু প্রমাণ রয়েছে, রয়েছে সরকারের বারংবার স্বীকৃতি। বিশেষত ১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ২০০২ সালে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে ‘শ্রেষ্ঠ কলেজ’ হিসেবে ঢাকা কমার্স কলেজ এর জাতীয় পুরস্কারলাভ। এছাড়াও ১৯৯৩ সালে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কাছ থেকে ‘শ্রেষ্ঠ কলেজ-শিক্ষক’ হিসেবে এ কলেজের প্রতিষ্ঠাতা-অধ্যক্ষ কাজী ফারুকীকে জাতীয় পুরস্কারের স্বীকৃতি।
একসময়ে ঢাকার শহরতলী মিরপুরে অনুন্নত ও অবহেলিত জনপদের পতিত ডোবায় প্রতিষ্ঠিত একটি অত্যাধুনিক বিদ্যায়তন গুণগত ও বিশেষায়িত শিক্ষাদান করে দ্বিমতাবলম্বী রাজনৈতিক দলের দু’নেত্রীর কাছ থেকে একইরূপ স্বীকৃতির সম্মাননা গ্রহণে কীভাবে সক্ষম হলো এ বিষয়টি দেশের শিক্ষাদ্যোক্তা ও শিক্ষা প্রশাসকগণকে ভাবিয়ে তোলে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় নয়া দিগন্ত উন্মোচনের নেপথ্য রহস্য ও কারিশমা জানতে তখন শুধু ঢাকা মহানগরী থেকেই নয়, দূর-দূরান্তের বিভিন্ন অঞ্চল থেকেও বহু শিক্ষাদ্যোক্তা ও শিক্ষা প্রশাসক ঢাকা কমার্স কলেজ পরিদর্শনে আসতে থাকেন। এমনকি কোনো কোনো শিক্ষা-প্রশাসক দাম্ভিকতার কারণে ঢাকা কমার্স কলেজে সরাসরি না গেলেও এ কলেজের বৈশিষ্ট্য, পাঠদান পদ্ধতি, পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন-কৌশল নিয়ে নেপথ্যে রীতিমতো স্টাডি শুরু করেন। সে অধ্যয়ন ও গবেষণার ফল প্রয়োগ করে বহু শিক্ষাদ্যোক্তা নিজ প্রতিষ্ঠানকে সুউন্নত করার পাশাপাশি নিজেও হয়েছেন গৌরবান্বিত। এভাবেই বাংলাদেশে গুণগত বাণিজ্য শিক্ষার উন্নয়ন ও বিকাশের স্থপতি অধ্যাপক কাজী ফারুকী বরণীয় ও অনুকরণীয় হয়ে আছেন। ঈর্ষা বহুক্ষেত্রে ধ্বংসের কারণ হলেও শিক্ষার উন্নয়ন ও বিকাশের মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের অনুরূপ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ঈর্ষাই ঘটিয়েছে বাংলাদেশের অর্থ-বাণিজ্য শিক্ষায় সৃজনশীল বিপ্লব।
ঢাকার প্রাণকেন্দ্র তথা ধানমন্ডিতে পাকিস্তান আমলে ১৯৫৭ সালে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা সিটি কলেজে ভালো ছাত্রদের ভর্তি হতে দেখিনি আমার ছাত্রজীবন অবধি। অথচ ঢাকা কমার্স কলেজ প্রতিষ্ঠার পর এর অনুকরণে শিক্ষাদান পদ্ধতি ও শিক্ষা প্রশাসনে গুণগত পরিবর্তন সাধন করে পরীক্ষার ফলাফলে চমকপ্রদ সাফল্য লাভ করতে শুরু করে সিটি কলেজ। ঢাকা সিটি কলেজের অধ্যক্ষ মরহুম হাফিজ উদ্দিনের মতো সৈয়দ আবুল হোসেন, লায়ন এম কে বাশার, লায়ন নজরুল ইসলাম প্রমুখ ব্যক্তিত্বগণ নিজেদের একচ্ছত্র পৃষ্ঠপোষকতায় যে আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, সেসবই কিন্তু ঢাকা কমার্স কলেজের অনুকরণে ও প্রেরণায় পুষ্ট ও সমৃদ্ধ বলে বিজ্ঞজনরা মনে করেন।
ঢাকা কমার্স কলেজ সগৌরবে সর্বদা সবার শীর্ষে অবস্থান করেই ক্ষান্ত হয়নি, ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক ও অধ্যক্ষ কাজী ফারুকীসহ বিদগ্ধজনদের সোৎসাহে প্রতিষ্ঠা করেছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ‘বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এন্ড টেকনোলজি’ (BUBT)। ১৯৮৯ সালে ৯৯ জন ছাত্র-ছাত্রী নিয়ে শুরু হওয়া ঢাকা কমার্স কলেজের বর্তমান শিক্ষার্থী সংখ্যা ৬,২০০; শিক্ষক ১৩৮ জন; স্টাফ ১০৩ জন; রয়েছে ৮টি লিফট এবং ৩,৯৫,০০০ বর্গফুটের অবকাঠামো। শিক্ষক-স্টাফদের মাঝে নেই অসন্তোষ, সবাই সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত, তাদের ন্যায্য প্রাপ্তিতে। এখানে একজন প্রভাষকের মাসিক বেতন প্রায় ৩২,০০০ টাকা; সহকারী অধ্যাপকের ৫০,০০০ টাকা; সহযোগী অধ্যাপকের ৭০,০০০ টাকা। বহুতল দু’টি একাডেমিক ভবন ছাড়াও ১২তলা বিশিষ্ট দু’টি স্টাফ রেসিডেনসিয়াল ভবন রয়েছে। ১৯৯৮ সাল নাগাদ, যখন আমি এ কলেজের পরিচালনা পরিষদে ছিলাম তখনও দেখতাম এ কলেজ পরিদর্শন ও পর্যবেক্ষণকারী মাত্রই মন্তব্য করে বলতেন, একে বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলে মনে হচ্ছে না; এ যেন উন্নত বিশ্বের কোনো বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয়।
ঈর্ষণীয় ও অনুকরণীয় এ বিশাল বিদ্যায়তন গড়ে তোলা কিন্তু সহজসাধ্য ছিল না। অধ্যাপক কাজী ফারুকীর সাথে আমারসহ বহুজনের বহু শ্রম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, কৌশল ও প্রত্যয়ের ফসল এই ঢাকা কমার্স কলেজ। এমনকি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সূচনায় এরূপ গুণগত মানের ব্যতিক্রমী কলেজ প্রতিষ্ঠা করা যাবে কি যাবে না তা নিয়ে সংশয় ও সন্দিহান হয়ে অনেকেই বলেছেন, এটি আকাশ-কুসুম কল্পনা; কেউ বলেছেন এটি বিলাসী উদ্যোগ, বিলাসী বাজেট ইত্যাদি। পন্ডিত ব্যক্তিত্বদের এরূপ হতাশাব্যঞ্জক কথা আমাদের নিকট দাঁড়িয়েছিল এক বিরাট চ্যালেঞ্জ হিসেবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রত্ব শেষের হালকা পকেটের ততোধিক হালকা দানের দামে এবং জুতার সুখতলা ক্ষয় করে বৃষ্টি-রোদে ভিজে-শুকিয়ে সাধারণ এই আমি অধ্যাপক কাজী ফারুকীর সাথে ঢাকা কমার্স কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য যে দুর্বার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিলাম, তার দু-একটি প্রসঙ্গ নিম্নে উল্লেখ করছি।
ঢাকা কমার্স কলেজ প্রতিষ্ঠা
শুরুর সেই দিনগুলি
১৯৮১ সালের এপ্রিল মাস। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাউন্টিংয়ের ছাত্র এবং সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্র সংসদের সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক। এলাকাভিত্তিক একটি সমিতির স্যুভেনির প্রকাশের বিষয়ে পরামর্শ ও সহযোগিতার প্রত্যাশায় ঢাকা কলেজের তৎকালীন সহকারী অধ্যাপক কাজী নুরুল ইসলাম ফারুকীর লালমাটিয়াস্থ বাসায় গেলাম এবং এটি ছিল তাঁর সাথে আমার তৃতীয় সাক্ষাৎ। ফারুকী সাহেব আমার একাডেমিক শিক্ষক না হলেও তাঁর জ্ঞান, পান্ডিত্য, আত্মবিশ্বাস ও মনোবল, সর্বোপরি বুকের মধ্যকার উদার প্রশস্ত বারান্দা আমাকে এমনই মুগ্ধ করেছিল যে আমি তাঁকে আদর্শ শিক্ষক হিসেবে শ্রদ্ধা করতাম, সম্বোধন করতাম স্যার বলে।
অধ্যাপক কাজী ফারুকীর নিজস্ব প্রেসে প্রায় বিনা খরচে ম্যাগাজিন ছাপাবার আশ্বাসে পুলকিত হয়ে বিদায় নিচ্ছিলাম। বিদায়কালে বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি বললেন ‘আচ্ছা তুমিতো কমার্সে পড়ছ, কমার্স গ্র্যাজুয়েট। ঢাকায় একটা কমার্স কলেজ করলে কেমন হবে?’ তখন পর্যন্ত ঢাকায় বেসরকারি উদ্যোগে এত বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার হিড়িক পড়েনি। একটু ভেবে উত্তর দিলাম, ‘ঢাকার বাইরে যেহেতু সরকারি কমার্স কলেজ সুনামের সাথে চলছে, ঢাকায়ও চলবে নিশ্চয়ই। কিন্তু একটা বিশেষায়িত কলেজ বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠা করা কি সহজ ব্যাপার, স্যার?’
‘সহজ না কঠিন ভাবলেতো চলবে না। এরূপ কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন যদি থেকেই থাকে, তবে তা করতে হবে। তুমি আরেকদিন একটু বেশি সময় নিয়ে আস, এ বিষয়ে আলাপ আছে।’ সেদিনের আহ্বান অনুযায়ী ২/৩ দিন পর এক বিকেলে অধ্যাপক ফারুকীর বাসায় গেলাম। অনেক কথা হলো; যার সারবত্তা হচ্ছে দীর্ঘদিনের ঘুণেধরা গতানুগতিক শিক্ষা পদ্ধতির বাইরে একটি কর্মমুখী ও জীবনমুখী আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা এদেশে গড়ে তোলা প্রয়োজন, যে শিক্ষাব্যবস্থায় আমাদের তরুণ সমাজ সুশৃঙ্খলভাবে জীবন-যুদ্ধের যোগ্য যোদ্ধা হিসেবে গড়ে উঠবে। তারই একটি মডেল বা দৃষ্টান্ত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন বাণিজ্য শিক্ষার বিশেষায়িত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যা প্রথমে স্বল্প পরিসরে শুরু করে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হবে; যেখানে শুধু আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েরাই পড়াশোনা করবে না, বিদেশি শিক্ষার্থী ও শিক্ষকরাও আসতে আগ্রহী হবে। এক কথায় মানুষ গড়ার এমন শিক্ষায়তন প্রতিষ্ঠা করতে হবে যেখানে শিক্ষিত বেকারের বদলে তৈরি হবে দেশের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সম্ভার, বেরিয়ে আসবে জীবন যুদ্ধের সুযোগ্য যোদ্ধারা। কাজী ফারুকী স্যার জানালেন এখন তাঁর প্রয়োজন দু’চারজন উদ্যোগী যুবক, যারা বিত্তের চেয়ে চিত্তের শক্তিতে অধিক শক্তিমান।
আলাপ শেষে যখন সলিমুল্লাহ হলে ফিরছিলাম, তখন আকাশ ঘন মেঘে আচ্ছন্ন। দৃষ্টির গভীরে যেয়ে দেখলাম কালো মেঘ শুধু লালমাটিয়া তথা ঢাকার আকাশকেই আচ্ছন্ন করেনি, বাংলাদেশের সমগ্র শিক্ষাঙ্গনকেও ছেয়ে ফেলেছে। দূর থেকে মোয়াজ্জিনের আযান ভেসে আসছিল। সুদূর দিগন্তে তাকিয়ে প্রার্থনা করলাম হে স্রষ্টা, এ মহান শিক্ষাবিদের সুমহান স্বপ্নের সাথে আমাকে এক করে তাঁর এ স্বপ্ন কবুল করে নাও। তারপর থেকে এ বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বের সাথে চলল আলাপ-আলোচনা ও বৈঠক। এসব আলোচনা ও বৈঠকে সবাই যে উৎসাহিত হতেন তা নয়, নিরুৎসাহিতও হতেন অনেকে। সম্ভবত এজন্যই ফারুকী স্যার ও আমি ছাড়া অন্যরা খুব একটা নিয়মিত উপস্থিত থাকতেন না।
বাণিজ্য শিক্ষায় প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বদের নিয়ে চট্টগ্রাম কমার্স কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শাফায়াত আহমদ সিদ্দিকীর বাসায়ও কয়েকটি বৈঠক হয়। এসব বৈঠকের মধ্যে ১৯৮৬ সালের মাঝামাঝি সময়ের একটি বৈঠকের কথা আমার স্পষ্টই মনে পড়ছে। সে বৈঠকে উপস্থিতদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের সাবেক ডীন প্রফেসর ড. এম হাবিবুল্লাহ, চট্টগ্রাম কমার্স কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শাফায়াত আহমদ সিদ্দিকী, খুলনা আজম খান কমার্স কলেজের অধ্যক্ষ আবুল বাসার, অধ্যাপক কাজী ফারুকী, এডভোকেট গিয়াস উদ্দিন, ড. খ ম কামাল, আমি এবং আরো ২/৩ জন। এ বৈঠকে কাজী ফারুকী স্যার কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ও পরিকল্পনার রূপরেখা বর্ণনা করার পর উপস্থিতদের অধিকাংশই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে বললেন, এটাতো কল্পকাহিনী! এর বাস্তবায়ন করতে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা লাগবে। এত টাকা আসবে কোত্থেকে?
এভাবে আরও কিছুদিন কেটে গেল। এর মধ্যে ফারুকী স্যারের বন্ধু অধ্যাপক আবুল কাশেম এবং দুই ছাত্র মোঃ শফিকুল ইসলাম চুন্নু (বর্তমানে ঢাকা কমার্স কলেজের উপাধ্যক্ষ-প্রশাসন) ও মরহুম মাহফুজুল হক শাহীন (ইম্পেরিয়াল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ) এর সাথে পরিচয় হলো। পরবর্তীতে এ তিনজনও আমাদের উদ্যোগের সাথে একাত্ম হলেন। এরপর ১৯৮৭ সালে ঢাকা বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুর রশীদ চৌধুরীর সাথে কমার্স কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আলাপ করার জন্য তাঁর আজিমপুরস্থ বাসায় যাই ফারুকী স্যার ও আমি। সেখানেও আমরা প্রতিবন্ধকতাপূর্ণ নানা প্রশ্নের সম্মুখীন হলাম। তবে যতই আমরা বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছিলাম, ততই বজ্র কঠিন শপথে বলীয়ান হয়ে উঠছিলাম।
যাই হোক, অবশেষে অধ্যাপক আবদুর রশীদ চৌধুরীর পরামর্শ ও আশ্বাস নিয়ে ফিরে এলাম। তারপর ১৫ জুন ১৯৮৭ এর এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত গৃহীত হলো, ১৯৮৭-’৮৮ শিক্ষাবর্ষ থেকে লালমাটিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাময়িকভাবে ঢাকা কমার্স কলেজের নৈশকালীন একাডেমিক কার্যক্রম চালানো হবে। তদনুযায়ী ২০ জুন ’৮৭ তারিখে উক্ত বিদ্যালয়ে নৈশকলেজ পরিচালনার অনুমতি চেয়ে উদ্যোক্তাদের পক্ষ থেকে আমি আবেদন করি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে। এ বিষয়ে তৎকালীন শিক্ষা-উপমন্ত্রী গোলাম সরওয়ার মিলনের সাথে আমি ব্যক্তিগতভাবে দেখা করি এবং তাঁর সুপারিশ নিয়ে কলেজ চালু করার আবেদনপত্র সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জমা দেই। কিন্তু টেকনিক্যাল কারণে অনুমতি পাওয়া গেল না। এভাবে কলেজ শুরুর আরও কয়েকটি প্রয়াস ব্যর্থ হবার পর ৬ অক্টোবর ’৮৮ তারিখে আমাদের উদ্যোক্তাদের বিশেষ সভায় ঢাকা কমার্স কলেজ প্রতিষ্ঠার ততোধিক দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে নিম্নরূপ প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়।
অধ্যাপক কাজী ফারুকী আহ্বায়ক
অধ্যাপক আবুল কাশেম যুগ্ম আহ্বায়ক
জনাব এম হেলাল সদস্য
জনাব মাহফুজুল হক শাহীন সদস্য সচিব
এ সভায় ১৯৮৯-’৯০ শিক্ষাবর্ষ থেকে ঢাকা কমার্স কলেজ প্রকল্পের কাজ শুরুর জোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং প্রকল্পের অস্থায়ী কার্যালয় হিসেবে ঢাকাস্থ ই-৫/২ লালমাটিয়া এ ঠিকানা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ঢাকা কমার্স কলেজ বাস্তবায়নে প্রাথমিক ব্যয় মেটানোর উদ্দেশ্যে এ বৈঠকে উপস্থিতরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিম্নরূপ চাঁদা দিয়ে প্রাথমিক তহবিল গঠন করি।
কাজী ফারুকী ১,০০০ টাকা
এম হেলাল ২০০ টাকা
আবুল কাশেম ১০০ টাকা
মাহফুজুল হক শাহীন ৫০ টাকা
শফিকুল ইসলাম চুন্নু ১০০ টাকা
নুরুল ইসলাম ১০০ টাকা
এ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সিটি ব্যাংক লিঃ এর নিউমার্কেট শাখায় একটি সঞ্চয়ী হিসাব খোলা এবং কলেজের জন্য প্যাড ও স্ট্যাম্প তৈরির দায়িত্ব আমার ওপর পড়ে। আমার প্রতিষ্ঠিত প্রেস ‘ইউনিভার্সিটি প্রিন্টিং এন্ড পাবলিকেশন্স’ (UPP) থেকে বিনা খরচে আমি প্যাড ও স্ট্যাম্প তৈরি করে দেই। আর কাজী ফারুকী স্যার কলেজকে একটি স্টীলের ফাইল কেবিনেট দান করেন। উক্ত বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কলেজ শুরুর জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট সবাই বাড়ি খুঁজতে থাকি। এরই মধ্যে কিং খালেদ ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ এ বি এম শামসুদ্দিন এর সাথে কথা বলে তারই ইনস্টিটিউটে বৈকালিক শিফটে ঢাকা কমার্স কলেজ পরিচালনার ব্যবস্থা করি এবং তদনুযায়ী উক্ত ইনস্টিটিউট (৪/৭ এ, ব্লক এফ, লালমাটিয়া, ঢাকা) এ ১ জুলাই ’৮৯ তারিখে আনুষ্ঠানিক মোনাজাত ও মিষ্টি বিতরণের মাধ্যমে ঢাকা কমার্স কলেজের নামফলক উন্মোচন করি।
এরপর খবরের কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে এবং প্রচারপত্র বিলি করে ছাত্র ভর্তির আহ্বান জানাই এবং ৬ আগস্ট ’৮৯ তারিখে সর্বপ্রথম ভর্তির ফরম বিতরণ করি; যাত্রা শুরু হয় ঢাকা কমার্স কলেজের।
এরপর ছাত্রসংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকলে ১৯৯০ সালে ধানমন্ডি আবাহনী মাঠের পূর্বপাশে একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে সেখানে কলেজটি স্থানান্তরিত হয়। তখন কলেজ ফান্ডে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় কলেজে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদেরকে আহ্বান জানিয়ে অধ্যক্ষ কাজী ফারুকী বলেন তোমরা যদি কেউ স্বপ্রণোদিত হয়ে কলেজকে সহযোগিতা করতে চাও, তাহলে তা সাদরে গৃহীত হবে। স্যারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সে সময়ে বি কম এর ছাত্র মোঃ শামীম শিকদার (রোল ডি-১৪৪) একটি সিলিং ফ্যান এবং দু’টি টিউব ভাল্ব, মোঃ সাইদুর রহিম বাপ্পী ১টি স্টিলের আলমারি এবং আরো কয়েকজন নিজ উদ্যোগে বিভিন্নভাবে সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। আরো অনেকে অনুরূপ নানা সহযোগিতা দিয়ে কলেজের কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
এভাবেই অজস্র বাধার প্রাচীর ডিঙ্গিয়ে প্রতিষ্ঠিত ‘ঢাকা কমার্স কলেজ’ আজ কর্মমুখী বাণিজ্য শিক্ষার বিশেষায়িত ও ব্যতিক্রমী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই প্রাত্যহিক শিক্ষাক্রম ছাড়াও ছাত্রদের নৈতিক ও গুণগত মান উন্নয়ন তথা শিক্ষার মান উন্নয়নের লক্ষ্যে একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষা, শিক্ষক ওরিয়েন্টেশন কোর্স, ছাত্র-শিক্ষক সম্মিলিত সভা, নিয়মিত বিতর্ক ও উপস্থিত বক্তৃতা, রচনা প্রতিযোগিতা, বিভিন্ন জাতীয় দিবস উদযাপন, সেমিনার বা আলোচনা সভা, ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক দিবস পালন, ছাত্রদের শিল্প-কারখানা পরিদর্শন, বনভোজন, মাসিক ভোজ, বার্ষিক ভোজ, ঈদ পুনর্মিলনী ইত্যাকার বিভিন্ন কার্যক্রম সুনির্দিষ্ট দিন ও সময় অনুযায়ী নিয়মিত পরিচালিত হচ্ছে; যার কিছু কার্যক্রম কতিপয় ক্যাডেট কলেজ ছাড়া অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তেমন পরিলক্ষিত হয় না। এমনকি ঢাকা কমার্স কলেজ শুরুর সেই সময়ের শিক্ষাদান পদ্ধতি ও একাডেমিক ক্যালেন্ডার শুধু ক্যাডেট কলেজ কেন, যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের তুলনায়ই ছিল অত্যাধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত যা অনেক শিক্ষাবিদ, শিক্ষা প্রশাসক এবং অভিজ্ঞ বুদ্ধিজীবীদের নিকট গৃহীত হয়েছে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হিসেবে।
সরকারের কোনো আর্থিক সহযোগিতা ছাড়াই শূন্য থেকে শুরু করে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা ও সেটিকে অত্যল্প সময়ের ব্যবধানে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে উন্নীতকরণ, সুশৃঙ্খল ও আধুনিক পদ্ধতিতে বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয়ে শীর্ষ ফলাফল অর্জন এক কথায় অতিবাহিত সময়ের তুলনায় গুণগত ও পরিমাণগত দিক থেকে এই বিশাল সাফল্য কোনো সহজ কাজ নয়।
এমনকি প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী সময়ে কিংবা বর্তমান সময়েও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ ও গ্রন্থকার প্রফেসর ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিক এর সুযোগ্য নেতৃত্বে এ কলেজের অবকাঠামোগত উন্নয়ন অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে ঢের উন্নত এবং পাঠদানও ভালো। আমার বিনম্র শুভেচ্ছা, শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা অধ্যাপক কাজী ফারুকী এবং প্রফেসর ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিকসহ সবার প্রতি; যাঁরা এ কলেজের সূচনালগ্নে আমার যৌবনের সেই উত্তাল সময়ের গলদঘর্ম শ্রম, চিন্তা কিংবা অর্থ সাহায্যের বিনিয়োগকে বিপুল সাফল্যে ভরপুর করেছেন এবং পশ্চাদপদ এ সমাজ ও জাতিকে অনন্য সৃজনশীলতা ও শিক্ষার আলোয় উদ্ভাসিত করে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে যাচ্ছেন।
মহাকবি ফেরদৌসি বলেছেন ‘যে গাছের ফল তিক্ত, সে গাছকে যদি তুমি বেহেশতেও রোপণ কর এবং যদি জল সেচনের সময় তুমি তার মূলে শরাবান তহুরা ঢাল, তবুও সে তার প্রকৃতি অনুযায়ী তিক্ত ফলই দান করবে।’ অথচ আমাদের সমাজে এবং শিক্ষাঙ্গনে বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতার জন্য কোমলমতি ছাত্র-যুবকদের শুধু শুধুই দায়ী করা হয়। কিন্তু তারা যে শিক্ষাঙ্গনের ফসল, সে শিক্ষাঙ্গনের ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে কখনো তলিয়ে দেখা হয় না। ভেবে দেখা হয় না যে, এসব ছাত্র-যুবকের সুযোগ্য (?) অভিভাবকত্বের যারা দাবিদার, তারা কি তাদের সন্তানদের মানুষ করার লক্ষ্যে তথা শিক্ষার মূল লক্ষ্য ‘মানবীয় গুণাবলি অর্জন’ এর প্রয়াসে উপযুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়তে পেরেছেন? এ বিষয়টি ভেবে দেখার সময় এসেছে। ঢাকা কমার্স কলেজসহ দেশের বিরল দু’একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পদাংক অনুসরণ করে আমাদের শিক্ষা পদ্ধতি ও শিক্ষানীতি সম্পর্কে শিক্ষক-অভিভাবক, সমাজপতি ও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করা এখনই অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
লেখকঃ
লক্ষ্মীপুর বার্তা এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পত্রিকার সম্পাদক
ফোনঃ ৯৫৫০০৫৫, ৯৫৬০২২৫
web: www.helal.net.bd
e-mail: m7helal@yahoo.com


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ