বিশেষ খবর

সুস্থতা ও শতায়ুলাভে প্রাকৃতিক চর্চা ও চিকিৎসা, পর্ব ১২

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ নিবন্ধ

॥ পূর্ব প্রকাশিতের পর -১২ ॥ ॥পর্ব ৪॥
স্বাস্থ্যরক্ষায় ফল ও ফুল মেদহীন থাকতে সতেজ ফল
স্থূলতা নিয়ে পৃথিবীতে গবেষণা চলছে অবিরত। এর প্রতিকার নিয়েও মানুষের আগ্রহের কমতি নেই। সম্প্রতি এক গবেষণা থেকে জানা যায়, সতেজ ফল ও সব্জি খাওয়ার ফলে মানুষের কোমরের মেদ কমে যায় এবং স্থূলতা প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মানুষের শরীরে পর্যাপ্ত মাত্রার গ্লুকোজ প্রয়োজন। এ গ্লুকোজের সরবরাহের চেয়ে দেহে কার্বোহাইড্রেটের পরিমাণ বেড়ে গেলে মানুষের খাওয়ার আকাক্সক্ষাও বেড়ে যায়। আর এ কারণেই মানুষ স্থূল হয়ে পড়ে।
গবেষকরা জানান, গ্লুুকোজ মস্তিষ্কের ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক। শরীরে এর ঘাটতি দেখা দিলে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ থেকে বিরত থাকা কঠিন হয়ে পড়ে। গ্লুকোজের অভাবই মানুষের কার্বোহাইড্রেট গ্রহণের আকাক্সক্ষাকে তীব্র করে তোলে। আর এটিই মোটা মানুষকে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
মোটা মানুষদের উচ্চ ক্যালরির খাবার কম খাওয়ার পরামর্শ দিয়ে গবেষকরা জানিয়েছেন, এর ফলে দ্রুত মোটা হওয়া থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। তাই মোটা মানুষদের সাদা রুটি, চিনি, কেক, পানীয় এবং বিভিন্ন প্যাকেটজাত খাবার না খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা। কার্বোহাইড্রেটের চেয়ে তাজা ফল, সব্জি, বাদামি চাল ও পাস্তা ভালো খাবার। জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল ইনভেস্টিগেশনের একটি গবেষণায় এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
ফল খাওয়া সম্পর্কে আমাদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমরা মূল খাবারের পর ফল খেতে অভ্যস্ত, যা ভুল পদ্ধতি। ফল খেতে হয় খালি পেটে। খালি পেটে ফল খেলে তা দেহের আন্ত্রিক পদ্ধতি বিষমুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এটি যেমন শারীরিক শক্তি যোগায়, তেমনি ওজন হ্রাস ও অন্যান্য দৈহিক তৎপরতায় যথেষ্ট সহায়তা করে। তাই মূল খাবারের আগে ফল খেতে হয়। খাবার পর ফল খেলে সেগুলো খাদ্যের পচন ক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে গ্যাস তৈরি করে, যার ফলে পেট স্ফীত হয়ে উঠতে পারে।
দৈনিক ৩টি কলায় স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে
রোজ ৩টি করে কলা খেলে মস্তিষ্কে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে। ইংল্যান্ডের ওয়ারউইক বিশ্ববিদ্যালয় এবং ইতালির নেপলস বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দাবি প্রতিদিন তিন বেলা তিনটি কলা খেলে মস্তিষ্কে রক্ত জমাট বাঁধার ঝুঁকি প্রায় ২১ শতাংশ কমে যেতে পারে। কলায় থাকা পটাশিয়ামই এ কাজটি করে। পালং শাক, বাদাম, দুধ, মাছ ও মসুর ডালের মতো পটাশিয়াম সমৃদ্ধ অন্যান্য খাবার খেয়েও এ ঝুঁকি কমানো যেতে পারে।
গবেষণায় পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকরা জানান পূর্ণ বয়স্কদের স্ট্রোকের ঝুঁকি এক পঞ্চমাংশ কমানোর জন্য প্রতিদিন ১,৬০০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম যথেষ্ট। একটি কলায় গড়ে ৫০০ মিলিগ্রাম পটাশিয়াম থাকে। তাই প্রতিদিন তিনটি কলা খেলে উক্ত পটাশিয়ামের চাহিদা পূরণ হয় এবং অনায়াসে স্ট্রোকের ঝুঁকি কমানো যায়।
এছাড়াও কলা হতাশা কমায়, মুড ভালো রাখে, রক্তশূন্যতা রোধ করে। এটি উচ্চ রক্তচাপ, কোষ্ঠকাঠিন্য, বুক জ্বালাপোড়া, ধূমপান ও মাদকাসক্তি কমায়। এই সুলভ ফলটি মাইগ্রেনের ব্যথা কমাতেও কার্যকর।
পেয়ারাঃ সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর ফল
ফলের দোকানগুলোতে যে হারে দামি দামি বিদেশি ফল সাজানো থাকে, তাতে দেশি ফলের কদর কম বলে মনে হয়। অথচ অপেক্ষাকৃত সস্তা দেশি ফল পেয়ারাই মানবদেহের জন্য সবচেয়ে বেশি স্বাস্থ্যকর। ভারতের হায়দ্রাবাদ ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন এর বিজ্ঞানীরা এ তথ্য জানিয়েছেন। বাজারে পাওয়া ১৪টি তাজা ফলে থাকা প্রাকৃতিক এন্টিঅক্সিডেন্টের মাত্রা জানতে বিজ্ঞানীরা এ গবেষণা চালান। এতে দেখা যায় আপেল, কলা, আনারস, পেঁপে, আম, জাম, কাঁঠাল প্রভৃতি ফলের চেয়ে পেয়ারা বেশি পুষ্টিগুণ ও এন্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ।
পুষ্টি বিজ্ঞানীদের মতে, মানবদেহে বেশিরভাগ রোগের কারণ এন্টিঅক্সিডেন্টের অভাব। ক্যান্সার, বার্ধক্যজনিত দৃষ্টিহীনতাসহ মারাত্মক সব রোগের উৎপত্তি হয় এর অভাবে। এন্টিঅক্সিডেন্ট দেহে কোষের সুরক্ষা করে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে। তাই মানবদেহে এন্টিঅক্সিডেন্ট ঔষধ আকারে প্রয়োগ না করে বরং এন্টিঅক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ পেয়ারা খেলে তা অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখে।
কাঁঠালের যত ঔষধি গুণ
আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল পুষ্টিগুণেও সব ফলের রাজা। স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয় ফল কাঁঠাল। গ্রীষ্ম ও বর্ষার এ মৌসুমি ফলটির পুষ্টিগুণ এবং ঔষধিগুণ ঈর্ষণীয়। কাঁঠাল নরম ও সহজপাচ্য খাবার। এটি আঁশযুক্ত বলে চমৎকার ল্যাক্সাটিভ হিসেবে কাজ করে। এর আঁশ কোলনের মিউকাস নিয়ন্ত্রণ করে, যা ক্যান্সার প্রতিরোধে সক্ষম। এতে প্রচুর পরিমাণে ক্যারোটিন ও ভিটামিন এ থাকে, যা ফুসফুস ও মুখ গহ্বরের ক্যান্সার প্রতিরোধ করে। এটি ভিটামিন বি কমপ্লেক্সসমৃদ্ধ বিরল প্রজাতির একটি ফল। এর পটাশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেশিয়াম ও আয়রন মানবদেহের কোষ ও জলীয় অংশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে। মানবদেহের রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে পটাশিয়াম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পরিমাণমতো কাঁঠাল খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করলে অকাল বার্ধক্য রোধ করা যায়। কাঁঠালের বিচিতে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ও মিনারেল থাকে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে কাঁঠালের বিচি দিয়ে নানারকম উপাদেয় খাবার তৈরি করা হয়। কোয়া ছাড়ানো বিচি রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা হয়। এসব বিচি দিয়ে মাংস, ডাল বা অন্যান্য সব্জির উপাদেয় তরকারি রান্না করা হয়, শুকনো বিচি ভেজে খাওয়া হয়। এতে খাবারে আমিষের অভাব পূরণ হয়। এছাড়া কাঁঠালের জ্যাম-জেলি, পিঠা আজকাল বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। সম্পূর্ণ কোলস্টেরলমুক্ত বলে হার্টের রোগীদের জন্য কাঁঠাল নিরাপদ।
আনারের যত গুণ
আনার ফলে (রোজহিপ) উচ্চমাত্রার ঔষধি গুণের সন্ধান পেয়েছেন গবেষকরা। এ ফলের রস পান বা রোজহিপ পাউডার ক্যাপসুল সেবনে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে; হ্রাস পায় উচ্চ রক্তচাপ, রক্তের চর্বি এবং দেহের বাড়তি ওজন।
সুইডেনের লুনড বিশ্ববিদ্যালয়ের খাদ্য বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরা বলেন, আনার ফল ভিটামিন সি’তে ভরপুর। এই ফলের রস এবং রোজহিপ পাউডার ক্যাপসুল দৈহিক স্থূলতা, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, গেঁটেবাত ও রক্তের কোলেস্টেরল চিকিৎসায় দারুণ উপকারী। আনার থেরাপিতে মোটা রোগীদের শরীরের ওজন ১৭ শতাংশ হ্রাস পায়। এছাড়া রক্তের খারাপ চর্বি এলডিএল কমার কারণে রোগীর হার্ট এটাকের ঝুঁকি কমে ১৭ শতাংশ।
দৃষ্টিশক্তি রক্ষায় আঙুর
মানুষের বয়স বেড়ে গেলে চোখের জ্যোতি বা দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হয়ে আসে। চিকিৎসাশাস্ত্রে একে বলা হয় এজ রিলেটেড ম্যাকুলার ডিজেনারেশন (এমডি)। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত আঙুর খেলে দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বহুলাংশে রোধ করা সম্ভব। চিকিৎসকরা বলছেন, আঙুর খেলে চোখের জ্যোতির ক্ষয়রোধ করা সম্ভব। বিশেষ করে বয়স্কদের পরিমিত ও নিয়মিত আঙুর খাওয়ার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন।
নিউইয়র্কের ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান গবেষক সিলভিয়া ফিনম্যান বলেন, তরুণ বয়সে বেশি করে আঙুর খেলে পরিণত বয়সে এসে তা অক্ষিপট রক্ষায় বিস্ময়কর ভূমিকা রাখে এবং অন্ধত্ব থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। আঙুর বা যেকোনো প্রজাতির দ্রাক্ষার রস অক্ষিপটের কোষ ক্ষয়রোধে কার্যকর প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। এ ফলের রস শুধু ক্ষয় রোধই নয়, অক্ষিপটের স্বাস্থ্য এবং কর্মক্ষমতা দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখে। চোখের স্বাস্থ্যই শুধু নয়, সার্বিক সুস্বাস্থ্য রক্ষায়ও আঙুরের ভূমিকা ঈর্ষণীয়।
লাল আপেল খান, ফিট থাকুন
লাল আপেল, পেঁয়াজ, আঙুর এবং বেরি ফলের খোসায় খুবই কার্যকর এন্টিঅক্সিডেন্ট থাকে; এসব ফল নিয়মিত খেলে দেহের সজীবতা বাড়ে। এসব ফলে আছে ক্লান্তি-নিরোধক উপাদান এমনটি জানিয়েছেন ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ক্যারোলিনার স্কুল অব পাবলিক হেলথের গবেষকরা।
ত্বকের সতেজতায় পেঁপে
সব্জি ও ফল দু’ভাবেই খাওয়া যায় পেঁপে। কাঁচা পেপের তরকারি জ্বরের সময় খুবই উপকারী। ত্বকের সতেজতা ধরে রাখতে পাকা পেঁপে অত্যন্ত কার্যকর। নিয়মিত পেঁপে খেলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমে। জন্ডিসে পাকা পেঁপে উপকারী। পেঁপের পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করে ও হাইপারটেনশন কমায়। যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যা, তারাও পেঁপেতে উপকার পাবেন। পেঁপেতে ক্যারোটিন অনেক বেশি থাকে, কিন্তু ক্যালরির পরিমাণ কম থাকায় যারা মেদ সমস্যায় ভুগছেন, তারা পেঁপে খেতে পারেন। পেঁপে মিষ্টি হলেও ডায়াবেটিস রোগীরাও পেঁপে খেতে পারে। পেঁপের বীজেও রয়েছে নানা উপকারিতা। কিডনি অকার্যকর হয়ে যাওয়ার মতো জটিল রোগের ঝুঁকি থেকে মুক্ত রাখতে পারে পেঁপের বীজের জুস। বীজের ফ্ল্যাবনয়েডস ও ফেনোটিক কিডনিকে জীবানুর আক্রমণ থেকে মুক্ত রাখে। এছাড়া হজমে সহায়তা করে পেঁপে।
খেজুরের পুষ্টি
পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ ফলের নাম খেজুর। এতে রয়েছে বিভিন্ন প্রকার ভিটামিন ও খনিজ পদার্থ। পুষ্টিবিদরা বলেন খেজুরে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যালসিয়াম, সালফার, আয়রন, পটাশিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, কপার ও ম্যাগনেশিয়াম রয়েছে। এসব উপাদান মানব স্বাস্থ্যের জন্য খুবই উপকারী। তাই সুষম ও স্বাস্থ্যসম্মত ডায়েটের জন্য প্রতিদিন একটি করে খেজুর খাওয়া প্রয়োজন।
খেজুর নরম ও সহজপাচ্য আঁশসমৃদ্ধ। এতে রয়েছে ফ্রুকটোজ ও ডেক্সট্রোজ জাতীয় চিনি। খেজুর খাওয়ামাত্র প্রাণপ্রাচুর্য, শক্তি ও উদ্যম দেখা দেয় শরীরে। কোলেস্টেরল কমানো, কোষ্ঠকাঠিন্য রোধেও এর ভূমিকা অনবদ্য। ভিটামিন এ সমৃদ্ধ ফলটি দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি, ত্বক ও ফুসফুসের সুরক্ষার পাশাপাশি মুখগহ্বরের ক্যান্সার রোধে দারুণ উপকারী।
অমৃত ফল আমলকী
নিয়মিত খেলে অনেক রোগের হাত থেকে বাঁচা যায়, এমন ফল আমলকী। সব ফলের চেয়ে দ্বিগুণ থেকে একশ’ গুণ বেশি ভিটামিন সি রয়েছে এতে। চিকিৎসকদের মতে, কোনো ব্যক্তি প্রতিদিন ১ বা ২টি তাজা আমলকী খেলে তার ভিটামিন সি’র চাহিদা মিটবে।
ভেষজ গুণেও আমলকীর জুড়ি নেই। এটি মুখের রুচি ও হজমশক্তি বৃদ্ধি এবং বমিভাব দূর করে। এছাড়া পেটের পীড়া, সর্দি-কাশি, রক্তশূন্যতা দূরীকরণসহ আরও নানা রোগের মহৌষধ আমলকী। এটি শরীর ঠান্ডা রাখে, রক্ত-মাংস-হাড় গঠনে ভূমিকা রাখে। লিভার ও জন্ডিস রোগে এটি উপকারী পথ্য। শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, পায়খানা স্বাভাবিক রাখা ও পুরুষের দেহে বীর্যবর্ধক হিসেবে কাজ করে এটি। চোখের জন্যও আমলকী বিশেষ উপকারী।
শুকনো আধাচূর্ণ ৫-৬ গ্রাম আমলকী ১ কাপ পানিতে ১ ঘন্টা ভিজিয়ে রেখে তা কচলিয়ে প্রতিদিন ৩/৪ বার সেই পানি পান করলে হজমশক্তি বৃদ্ধি পায় এবং বমিভাব দূর হয়। আমলকী বেটে তাতে একটু মাখন মিশিয়ে মাথায় লাগালে ভালো ঘুম হয়। আমলকীর রস প্রতিদিন মাথায় মেখে ২-৩ ঘন্টা রাখলে এবং এভাবে ১ মাস ব্যবহার করলে চুলের গোড়া শক্ত হয়; চুল পড়া এবং অকালে পাকাও বন্ধ হয়। ফলের পাশাপাশি আমলকীর পাতাও উপকারী। পাতার রস আমাশয় প্রতিরোধ করে। পরিচর্যায় মায়ের মতো উপকারী বলে আমলকীকে ধাত্রীফলও বলা হয়।
ক্যান্সার রোধে জলপাই
জলপাই এবং মাছের তেলে এমন যৌগ উপাদান আছে, যা অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখে। যুক্তরাষ্ট্রের গ্রানাডা ফিজিওলজি ডিপার্টমেন্ট পরিচালিত গবেষণায় এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের মানুষ রান্নায় সচরাচর জলপাইয়ের তেল ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া এ অঞ্চলের মানুষ প্রচুর পরিমাণে সামুদ্রিক মাছ খেয়ে থাকে। গবেষকরা বলেন, জলপাই এবং মাছের তেলে ওলেইক এবং হাইড্রোক্সিটাই রোসল নামক যৌগ উপাদান থাকে, যা দেহের কোষের ক্ষয়রোধ এবং অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সার প্রতিরোধ করে।
দেহের অভ্যন্তরে চর্বি বৃদ্ধি এবং কোষের ক্ষয়রোধ নিয়ে দীর্ঘ গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জলপাই এবং মাছের তেলকে আদর্শ হিসেবে বিবেচনা করেন। এ জাতীয় খাদ্য নিয়মিত গ্রহণ করলে কোলেস্টেরল কমানো বা প্রতিরোধ করা সম্ভব। বিশেষ করে অগ্ন্যাশয়ের ক্যান্সারের মহৌষধ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এ দু’ধরনের খাদ্য-তেলকে।
স্ট্রোক ঠেকাতে জলপাই তেল
স্ট্রোক প্রতিরোধে জলপাই তেল সহায়ক ভূমিকা পালন করে। বিশেষত ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এর কার্যকারিতা বেশি। সম্প্রতি ফ্রান্সের বোরদোঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক এ তথ্য প্রকাশ করেছেন। গবেষকরা ফ্রান্সের তিনটি শহরে ৬৫ বছরের বেশি বয়স এমন ৭ হাজার লোকের ওপর ৫ বছর ধরে গবেষণা চালিয়ে এ মত দেন।
জলপাই তেল রহস্যের উদ্ভাবক ও প্রধান গবেষক ডাঃ সিসিলিয়া সামিরি জানান, বয়স্কদের জন্য স্ট্রোক একটি সাধারণ ব্যাপার। এক্ষেত্রে যারা রান্না ও অন্যান্য কাজে জলপাইয়ের তেল ব্যবহার করে, তারা স্ট্রোকের ঝুঁকিতে কম থাকে।
গবেষকদলের অন্যতম স্নায়ুবিদ শার্লিন আহমেদ জানান একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর যাদের উচ্চমাত্রার কোলেস্টেরল, রক্তচাপ ও হৃদরোগে আক্রান্ত হতে দেখা যায়, তাদের জন্য জলপাই তেলের ব্যবহার কার্যকর ভূমিকা রাখবে। এ তেল তাদের স্ট্রোকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
হৃদরোগ কমায় গোলাপ ফল
গোলাপ ফুলের রূপ-গুণ-সৌন্দর্যের কথাতো প্রায় সবারই জানা। কিন্তু গোলাপ ফলের রূপ-গুণ সম্পর্কে ক’জনইবা জানেন। গবেষকরা জানিয়েছেন, বুনো গোলাপ ফলের রস পান করলে হৃদরোগের ঝুঁকি কমে।
সুইডেনের লুনড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা জানান যেসব মানুষের দেহ অত্যধিক স্থূলকায়, সাধারণত তাদের দেহে উচ্চ রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের পরিমাণ বেশি থাকে। এসব মানুষ যদি গোলাপ ফলের রসে হারবাল প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত জুস মাত্র ছয় সপ্তাহ দৈনিক পান করে, তাহলে তাদের রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের স্তর অনেক নিচে নেমে আসবে। গোলাপ ফোটার মৌসুমের শেষে জন্ম নেয় গোলাপ ফল। কয়েকশ’ বছর ধরে জনশ্রুতি রয়েছে, ক্ষুদ্র রসালো এ ফল খেলে গেঁটে বাতের ব্যথা নিরাময় হয়। এ ফলে ভিটামিন সি এবং প্রদাহ প্রতিরোধক উপাদান রয়েছে। ২০০৭ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, শরীরের বিভিন্ন অংশের ব্যথানাশের ক্ষেত্রে গোলাপ ফলে তৈরি ক্যাপসুল বেশ উপকারী। দৈনিক এ ক্যাপসুল খেলে ব্যথার মাত্রা ৪০ শতাংশ কমে যায়।
কতবেলের কত কদর
নাম বললেই জিভে পানি আসে এমন ফলের মধ্যে কতবেল অন্যতম। এতে আছে অসাধারণ স্বাদ। জ্যাম, জেলি, চাটনি, আচারসহ নানা উপায়ে কতবেল খাওয়া যায়। কতবেলে রয়েছে ট্যানিন, পেকটিন, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, লৌহ; আরও আছে ভিটামিন এ, বি এবং সি।
কতবেলের উপকারিতা বলে শেষ করার নয়। ক্রনিক ডায়রিয়া ও ডিসেন্ট্রিতে কতবেল বেশ উপকারী। হিক্কায় বা হেঁচকি ওঠায় কতবেল ঔষধের মতো কাজ করে। গলার ক্ষত ও মাড়ির অসুস্থতায় বিশেষ কার্যকর ভূমিকা রাখে। অতিরিক্ত শ্বাসকষ্টে পাকা কতবেল কষ্ট লাঘব করে। মুখের ব্রণ ও মেছতায় কাঁচা কতবেলের রস বেশ কিছুদিন লাগালে উপকার পাওয়া যায়।
চেরির রসে ঘুম আসে
বিছানায় শুয়ে ছটফট করছেন, চোখে ঘুম আসছে না এর চেয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি আর কী হতে পারে? সম্প্রতি এ সমস্যারও সমাধান খুঁজে পেয়েছেন যুক্তরাজ্যের নর্দামবিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা। তাদের উপদেশ শোয়ার আগে একগ্লাস চেরি ফলের রস পান করুন; এতে অনিদ্রা দূর হবে, কাটবে পরিশ্রমের ক্লান্তি।
স্বাস্থ্যবিজ্ঞানী ড. গ্লাইন হোয়াটসন বলেন, মানুষের শরীরে মেলাটোনিনের পরিমাণ বা নিঃসরণ বাড়লে ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে। এ মেলাটোনিন শরীরে ঢুকতে পারে উত্তেজক পানীয় (চা, কফি ও কোকো) থেকে। আবার দুশ্চিন্তা বা মানসিক চাপের কারণেও মানুষের শরীরে মেলাটোনিন উৎপন্ন হতে পারে।
চেরি ফলের রসে উঁচুমাত্রার এন্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে, যা শরীরের মেলাটোনিন হ্রাস করে। ফলে অনিদ্রায় আক্রান্তদের জন্য চেরির রস উপকারী। চেরির রস শরীরের ক্ষয়পূরণ এবং ক্লান্তি দূর করে।
হরীতকীর অনেক গুণ
প্রকৃতিতে থাকা অন্য দশটি গাছের মতোই বেড়ে ওঠে হরীতকী। কিন্তু গুণের কথা বিবেচনায় আনলে সবার আগে উঠে আসবে হরীতকীর নাম। এটি এমন একটি ঔষধি গাছ, যার ফল-বীজ-পাতা সবই উপকারে আসে। এ গাছকে এককথায় বলা যায় সর্বরোগের মহৌষধ। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক ড. শেখ বখতিয়ার উদ্দিন বলেন মানুষের রোগ প্রতিরোধে প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করা যে ক’টি ঔষধি গাছ আছে, তার মধ্যে এগিয়ে আছে হরীতকী। এ গাছের পাতা যেমন উপকারে আসে, তেমনি উপকারে আসে এর ফলও। হৃদরোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে হরীতকীর ফল। আবার ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসজনিত রোগের বিরুদ্ধে কাজ করে হরীতকী গাছের পাতা।
হরীতকীর ফল ২ থেকে ৩ মাস গাছে থাকার পর পরিপক্ক হয়। তখনই এ ফল ব্যবহার করলে উপকার হয় সবচেয়ে বেশি। হরীতকীর শুকনো ফল সাত-আট ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে তারপর সেই পানি পান করতে হয়।
হরীতকী গাছের ফল পেট ব্যথা, এজমা, মুখে ঘা, শ্বেতী রোগ, কোষ্ঠকাঠিন্য, আমাশয় ও বাতজনিত রোগের ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে। এটি জ্বর, মূত্রবিষয়ক ও গ্যাস্ট্রিকজনিত সমস্যার প্রতিষেধক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। শক্তি ও রুচিবর্ধক হিসেবে ব্যবহার করা যায় হরীতকীর ফল। কারও যকৃত বড় হয়ে গেলে সে সমস্যার সমাধানও হতে পারে হরীতকী ফল দিয়ে।
অন্ধত্ব ঠেকাতে গাঁদা ফুল
বয়সের ভারে ক্ষীণ হয়ে যায় দৃষ্টিশক্তি। সে দৃষ্টি ধরে রাখতে কতই-না প্রাণান্তকর প্রয়াস! এবার এসেছে প্রাকৃতিক চর্চায় এর সহজ সমাধান। গাঁদা ফুলের নির্যাসেই তীক্ষè দৃষ্টিশক্তি ধরে রাখা সম্ভব। গাঁদা ফুলের নির্যাস থেকে তৈরি একটি বড়ি প্রতিদিন খেয়ে অসংখ্য মানুষ বার্ধক্যজনিত অন্ধত্ব থেকে রক্ষা পেতে পারে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, চোখের সুস্থতা ধরে রাখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ৩ ধরনের এন্টিঅক্সিডেন্ট রয়েছে গাঁদা ফুলে। সাধারণ খাবারে একসঙ্গে এ ৩ ধরনের এন্টিঅক্সিডেন্ট পাওয়া যায় না। যুক্তরাজ্যের কভেন্ট্রি নগরীর চক্ষু বিশেষজ্ঞ সুসান বোয়ার্স বলেন, গাঁদা ফুলের নির্যাস থেকে তৈরি ম্যাকুশিল্ড নামের বড়ি খেয়ে তার কয়েকশ’ রোগীর দৃষ্টিশক্তি বেড়েছে। তার মতে, এ বড়ি মানুষকে বার্ধক্যজনিত অন্ধত্ব থেকেও বাঁচাবে।
চোখের সুস্বাস্থ্যে পরামর্শ
দৃষ্টিশক্তি ও চোখের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখতে কিছু জীবনাচরণ পদ্ধতি বেশ কাজে আসে। গবেষকরা বলেছেন চোখের সুস্বাস্থ্যের জন্য খাদ্যের ভূমিকার পাশাপাশি দৈনন্দিন কিছু অভ্যাসেরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে।
চচোখের জন্য ভিটামিন এ ছাড়াও ভিটামিন সি, জিংক এবং ওমেগা-৩ খুবই উপকারী। রঙিন শাক-সব্জি; পাতাযুক্ত সব্জি যেমন বাঁধাকপি, পালংশাক; টক ফল যেমন লেবু, কমলা, মাল্টা এসবে থাকে চোখের উপকারী ভিটামিন। ওমেগা-৩ রয়েছে তেলযুক্ত মাছে। নিয়মিত এসব খাবার কর্নিয়ার সমস্যা ও ছানিরোধে ভূমিকা রাখে।
চধূমপান চোখের স্নায়ু ও ম্যাকুলার ক্ষতি করে। তাই ধূমপানকে না বলুন।
চসূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি চোখের ক্ষতি করে। সূর্যালোকে বের হতে সানগ্লাস পরুন। চারদিক ঢাকা সানগ্লাস হলে ভালো। চখেলাধুলা বা কারখানায় বৈদ্যুতিক কাজে সম্পৃক্ত থাকলে শিল্ড বা গগলস ব্যবহার করুন।
চদীর্ঘসময় কম্পিউটার ব্যবহার করলে মাঝেমধ্যে বিরতি নিন এবং কম্পিউটারের স্ক্রীন চোখ থেকে নির্দিষ্ট দূরত্বে ও উচ্চতায় রাখুন।
-চলবে।
সুস্থতা ও শতায়ুলাভে
প্রাকৃতিক চর্চা ও চিকিৎসা Be your own Doctor -এ বইটির
পৃষ্ঠা সংখ্যা ঃ ৩৪৬, মূল্যঃ ৩৫০ টাকা
প্রাপ্তিস্থানঃ ক্যাম্পাস পত্রিকা অফিস
৩৩ তোপখানা রোড, ১৩ তলা, ঢাকা।
ফোনঃ ৯৫৫০০৫৫, ৯৫৬০২২৫


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ