বিশেষ খবর

শিক্ষক নিয়োগে আইন মানছে না বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো

ক্যাম্পাস ডেস্ক প্রতিবেদন

শিক্ষক নিয়োগে আইন মানছে না বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। খন্ডকালীন শিক্ষক-নির্ভর হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষাব্যবস্থা। ইচ্ছামতো চলছে নিয়োগপ্রক্রিয়া। কর্তৃপক্ষ অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক ও সহকারী অধ্যাপক নিয়োগে খন্ডকালীন শিক্ষকের প্রতিই বেশি আগ্রহী। কারণ অল্প টাকায় খন্ডকালীন শিক্ষক পাওয়া যায়। ব্যতিক্রম কেবল প্রভাষকের ক্ষেত্রে। কারণ এই পদে কম টাকায় শিক্ষক মেলে। মূলত তাঁরাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশির ভাগ ক্লাস নেন। নতুন এসব শিক্ষকের কাছ থেকে পাঠ গ্রহণ করে শিক্ষার্থীদেরও অপূর্ণতা থেকে যাচ্ছে। আবার খন্ডকালীন শিক্ষকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বল্প সময় অবস্থান করায় ক্লাস-পরবর্তী কোনো সমস্যায় পড়লে সেটা সমাধান করতে পারে না শিক্ষার্থীরা।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদ্য প্রকাশিত ৪১তম বার্ষিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মোট শিক্ষক ১৪ হাজার ২১৯ জন। এর মধ্যে পূর্ণকালীন ৯ হাজার ৪২৭ ওখন্ডকালীন চার হাজার ৭৯২ জন। পূর্ণকালীন শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক ৭১৬, সহযোগী অধ্যাপক ৫১৬, সহকারী অধ্যাপক এক হাজার ৮৪০ ও লেকচারার ছয় হাজার ১২৪ জন। অন্যদিকে খন্ডকালীন শিক্ষকদের মধ্যে অধ্যাপক এক হাজার ২৯৯ জন, সহযোগী অধ্যাপক ৬৯৭, সহকারী অধ্যাপক ৯২৭ ও লেকচারার এক হাজার ৪৭২ জন।
অথচ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০-এর ধারা ৩৫(৩) অনুযায়ী, ‘কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিটি বিভাগ বা প্রোগ্রামের খ-কালীন শিক্ষক সংখ্যা পূর্ণকালীন শিক্ষক সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি হবে না।’ অথচ খন্ডকালীন অধ্যাপকের সংখ্যা পূর্ণকালীনের চেয়েও ৫৮৩ জন বেশি। খন্ডকালীন সহযোগী অধ্যাপকের সংখ্যা ১৮১ জন বেশি। তবে পূর্ণকালীন সহকারী অধ্যাপক ও লেকচারারের সংখ্যা খন্ডকালীন চেয়ে বেশি থাকলেও তা আইন অনুযায়ী নেই।
জানতে চাইলে ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পূর্ণকালীন প্রভাষকের সংকট নেই। তবে অধ্যাপকের সংকট রয়েছে। এ থেকে উত্তরণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেয়া হবে। আশা করছি, তারাও উচ্চশিক্ষার মান নিশ্চিতে এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেবে।
ইউজিসি’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই নামমাত্র অধ্যাপক ও সহযোগী অধ্যাপক দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। শিক্ষা কার্যক্রমে থাকা ৭৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে দুজন স্থায়ী অধ্যাপক নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে এমন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০। একজনও পূর্ণকালীন অধ্যাপক নেই ফেনী ইউনিভার্সিটিতে। বাকিগুলোর মধ্যে গ্রীন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, চিটাগাং ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি ও রণদা প্রসাদ সাহা ইউনিভার্সিটিতে পূর্ণকালীন অধ্যাপক রয়েছেন দুজন করে। এ ছাড়া সেন্ট্রাল উইমেন্স ইউনিভার্সিটি, বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি, নর্থ ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশে এই সংখ্যা একজন করে। এক থেকে পাঁচজন পূর্ণকালীন অধ্যাপক রয়েছেন এমন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ২৯টি।
নামি-দামি পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া প্রতিটিতেই অধ্যাপক, সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপকের তীব্র সংকট রয়েছে। মূলত খ-কালীন এবং লেকচারারদের কাঁধে ভর করেই পরিচালিত হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চশিক্ষা। গত বছর শিক্ষা কার্যক্রম চলা ৭৫টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩০২টি অনুষদ রয়েছে। আর এতে ৭৫২টি বিভাগের মাধ্যমে এক হাজার ৩১৮টি কোর্স পড়ানো হয়।
ইউজিসি সূত্র জানায়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিটি বিভাগ পরিচালনার জন্য ন্যূনতম একজন অধ্যাপক, তিনজন সহযোগী ও সহকারী অধ্যাপক এবং চারজন লেকচারার প্রয়োজন। অথচ এর কোনোটিই পূরণ করেনি প্রতিষ্ঠানগুলো।
প্রতিবেদন থেকে আরো জানা যায়, চারটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো রকম সভা হয়নি। এগুলো হচ্ছে ফরিদপুরের টাইমস ইউনিভার্সিটি, শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ইউনিভার্সিটি, গ্লোবাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ এবং জেডএইচ সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের কোনো সভা হয়নি। এ ছাড়া ১৫টিতে সিন্ডিকেট সভা, ১৪টিতে একাডেমিক সভা ও ১২টিতে অর্থ কমিটির কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১০ অনুযায়ী, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিবছর বাজেটের নির্দিষ্ট পরিমাণ একটি অংশ গবেষণা খাতের জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। কিন্তু বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও এ আইন মানছে না বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা খাতের জন্য গত বছর এক টাকাও বরাদ্দ করেনি। মোট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে শতকরা হিসাবে এই হার ৩৩ দশমিক ৭৫। অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় নামমাত্র বরাদ্দ রাখলেও তাদের কোনো প্রকাশনা ছিল না। আবার কোনো কোনোটি পুরো বছরে দু-চারটি সাময়িকী প্রকাশ করেই দায়িত্ব শেষ করেছে।
ইউজিসি তাদের পর্যবেক্ষণে বলেছে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা প্রাথমিক বিষয় হলেও নানা কারণে গবেষণাক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারছে না বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। শিক্ষকদের পদোন্নতির জন্য গবেষণাকে মানদ- হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু পদোন্নতিতে গবেষণার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনাকে অগ্রাধিকার দেয়াসহ নানা কারণে গবেষণা ও প্রকাশনা অনেকটাই নিষ্প্রভ থেকে যাচ্ছে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ