বিশেষ খবর

৩৪ বছর পর বদলে গেল ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালনায় নয়া নেতৃত্ব

ক্যাম্পাস ডেস্ক প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

টানা ৩৪ বছর জামায়াতের নিয়ন্ত্রণে থাকার পর বদলে গেল ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। ব্যবস্থাপনায় এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকের বিদেশী অংশীদারিত্বেও পরিবর্তন এসেছে। যা কিছু হয়েছে ব্যাংকটির শেয়ারহোল্ডার ও ইসলামিক ডেভেলেপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) চাপেই হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বর্তমানে প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকার আমানত এবং ৫৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ থাকা ইসলামী ব্যাংকের লভ্যাংশ এতদিন কোথায় গেছে, কিভাবে খরচ হয়েছে তা খতিয়ে দেখার কথা ভাবছে সরকার। অন্যদিকে পর্ষদ পরিবর্তন হলেও আপাতত কর্মকর্তা ছাঁটাই করার পরিকল্পনা নেই ব্যাংকটির।
জানা যায়, নতুন চেয়ারম্যান আরাস্তু খান এর নেতৃত্বে এগিয়ে যাবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। সাবেক সচিব আরাস্তু খান এর আগে বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন। সেখানে তিনি সফলতা দেখিয়েছেন। ইসলামী ব্যাংকেও তিনি সফল হবেন-কর্মী, গ্রাহক ও সংশ্লিষ্ট অন্য ব্যক্তিরা এমন আশাই করছেন।
আরাস্তু খান পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএসএস ও যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ইন পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এমপিএ) ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৬ সালে মানিকগঞ্জ জেলার গড়পাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি।
এ ছাড়া ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক সচিব সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম। সম্প্রতি রাজধানীর র‌্যাডিসন হোটেলে অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের সভায় আরাস্তু খানকে ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলামকে ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়।
সৈয়দ মঞ্জুরুল ইসলাম স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব ছিলেন। তিনি বাখরাবাদ গ্যাস সিস্টেমস লিমিটেড, যমুনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড ও স্ট্যান্ডার্ড এশিয়াটিক অয়েল কোম্পানির চেয়ারম্যান ছিলেন। বাংলাদেশ শিল্প ব্যাংক (বর্তমানে বিডিবিএল), আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল হাউজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স লিমিটেড, বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, বিটিসিএল, ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রমোশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট কোম্পানিসহ সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিন্যান্স বিভাগ থেকে স্নাতক ও আইবিএ থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৫৬ সালে মাদারীপুরের রাজৈর উপজেলায় জন্মগ্রহণ করেন তিনি। ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, ব্যাংকটির শীর্ষপর্যায়ে একাধিক সাবেক সচিব রয়েছেন। দেশ-বিদেশের সেরা বিদ্যাপীঠ থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে সফলভাবে সরকারি দায়িত্ব পালন করেছেন এই দুই কর্মকর্তা। তাঁরা এখন এই ব্যাংকের দায়িত্ব পালন করবেন। আগামী দিনে ব্যাংকটি আরো ভালো করবে বলে আশা করছেন তাঁরা।
ব্যাংকের কোম্পানি সচিব হিসেবে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংকের কোম্পানি সচিব জাহিদুল কুদ্দুস মোহাম্মদ হাবিবুল্লাহকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি আজিজুল হক ভাইস চেয়ারম্যানের পদ ত্যাগ করায় সৈয়দ আহসানুল আলমকে ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত করা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংকটিতে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে আছেন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শামীম মোহাম্মদ আফজাল, পূবালী ব্যাংকের সাবেক এমডি হেলাল আহমেদ চৌধুরী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের সাবেক এমডি জিল্লুর রহমান, পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আবদুল মাবুদ, আইনজীবী বোরহান উদ্দিন আহমেদ এবং বেক্সিমকো গ্রুপের শাইনপুকুর সিরামিক ও নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান নির্বাহী মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির। শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে পরিচালনা পর্ষদে আছেন তিনটি দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা।
এদিকে পরিচালনা পর্ষদের এই আমূল পরিবর্তনে দেশি ব্যবসায়ীদের মালিকানা বাড়ছে ইসলামী ব্যাংকে। পাশাপাশি বিদেশিদের অংশীদারিত্ব কমছে। মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক উদ্যোক্তাদের একটা অংশ ইসলামী ব্যাংক থেকে নিজেদের শেয়ার বিক্রি করে দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠার সময়ে ইসলামী ব্যাংকে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক দেশগুলোর বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ ছিল ৭০ শতাংশ। বর্তমানে তা ৫২ শতাংশে নেমেছে। এসব কিনে নিয়েছেন দেশি ব্যবসায়ীরা। ইসলামী ব্যাংকের ওয়েবসাইট থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, জর্ডান ইসলামিক ব্যাংক, কাতারের ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট এ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কর্পোরেশন, দুবাই ইসলামিক ব্যাংক এবং বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংক উদ্যোক্তা হিসেবে ব্যাংকটি প্রতিষ্ঠাকালে বিনিয়োগ করেছিল। তবে এখন ইসলামী ব্যাংকে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর কোন শেয়ার নেই। এর মধ্যে দুবাই ইসলামিক ব্যাংক এবং বাহরাইন ইসলামিক ব্যাংক ২০১৪ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে শেয়ারবাজারের মাধ্যমে নিজেদের পুরো শেয়ার বিক্রি করেছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার বিক্রির তথ্য পাওয়া যায়নি। এদিকে কুয়েতের সরকারি ব্যাংক কুয়েত ফাইন্যান্স হাউসও নিজের প্রায় সাড়ে ৮ কোটি ৪৫ লাখ ৬৩ হাজার ৭৮২টি শেয়ার বিক্রির উদ্যোগ নিয়েছে, যা ইসলামী ব্যাংকের মোট শেয়ারের সোয়া ৫ শতাংশেরও বেশি।
ইসলামী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে প্রায় ৬৭ হাজার কোটি টাকার আমানত এবং ৫৫ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে। বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য অংশ কৃষি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে। দেশের মোট রেমিটেন্সের এক-তৃতীয়াংশ আসছে ৩১২টি শাখার এ ব্যাংকের মাধ্যমে। আমদানি ও রফতানি বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশও হচ্ছে এ ব্যাংকের মাধ্যমে। অন্য ব্যাংকের তুলনায় মুনাফায়ও এ ব্যাংক এগিয়ে আছে। সচিবালয়ে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স এ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির নবনির্বাচিত (এমসিসিআই) কমিটির সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ব্যবসার দিক দিয়ে ইসলামী ব্যাংক এক নম্বর ব্যাংক। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মুহিত বলেন, ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে সাম্প্রতিক যে পরিবর্তন তা ব্যাংকটির জন্য ভাল হয়েছে। ‘ইয়েস, ইট লুকস গুড...।’ তবে তাদের মুনাফা আসলে কোথায় যায়, এটা নিয়ে একটা প্রশ্ন তো ছিলই। ইসলামী ব্যাংকের ফরেনার পার্টনার চেঞ্জ হয়েছে। তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের মূল বিনিয়োগকারী ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (আইডিবি) চেয়েছে বলেই ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন এসেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ব্যাংকটিতে অনেক সমস্যা ছিল। এর মালিকানাতেও পরিবর্তন এসেছে। কমনসেন্স বলে ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে আরও পরিবর্তন আসবে। তবে নতুন পরিচালনা পর্ষদে যারা এসেছেন, তাদের আমার কাছে ভাল মনে হয়েছে। তাদের দুজন আমার পরিচিত। নতুন নেতৃত্বে আসায় ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন হলেও ব্যাংক আগের নিয়মেই পরিচালিত হবে জানিয়ে আরাস্তু খান বলেন, এ ব্যাংকে যারা নিচের পদে কর্মরত তাদের কারও চাকরি যাবে না। এ কারণে এ ব্যাংকের প্রতি দেশের জনগণের আস্থাও অটুট থাকবে।
পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) মাধ্যমে সরকারের বড় বড় প্রকল্পে ইসলামী ব্যাংক অর্থায়ন করবে। চেয়ারম্যান বলেন, ইসলামী ব্যাংকের সম্পদের পরিমাণ অনেক। এ ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারের বড় বড় প্রকল্পে অর্থায়ন হবে। কারণ সরকার কখনও ঋণখেলাপী হয় না। তাই মুনাফা কম হলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এসব প্রকল্পে অর্থায়ন হবে। তিনি বলেন, পরিবর্তন দেশে হয়, সমাজে হয়। তেমনিভাবে ইসলামী ব্যাংকের ম্যানেজমেন্টেও পরিবর্তন হয়েছে। তবে এটি শরিয়াহসম্মতভাবে চলবে। এর আইনকানুন কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে।
ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আহসানুল আলম বলেন, সিএসআরের একটি টাকাও আর চোখ বুজে ব্যয় করা হবে না। অপব্যবহার রোধে আরও উদ্যোগ নেয়া হবে। এখন থেকে দেশের কল্যাণে সিএসআরের অর্থ ব্যয় করা হবে। তবে তিনি আট মাস আগে ব্যাংকে যোগ দেয়ার পর তদন্ত করে সিএসআরের কোনো অর্থই অপব্যবহার হয়নি বলে দাবি করেন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সৈয়দ আহসানুল আলম বলেন, কোনো অবস্থাতেই এ ব্যাংকের নাম পরিবর্তন করা হবে না। ইসলামী ব্যাংক পরিচালনার ক্ষেত্রে দর্শন বা মৌলিক নীতির কোন পরিবর্তন করা হবে না। এ ব্যাংককে গরিব মানুষের ব্যাংক বলা হলেও মাত্র ৪ শতাংশ অসহায়-গরিব মানুষ এ ব্যাংক থেকে ঋণ পেয়েছেন। এখন থেকে ১০ শতাংশ গরিব মানুষ এ ব্যাংক থেকে ঋণ পাবেন। তিনি বলেন, ১০ লাখ নারী উদ্যোক্তাকে এসএমই ঋণ দেয়া হবে।
যেভাবে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এর যাত্রা শুরু ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ধারার পথিকৃৎ। এটি ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক পরিচালিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম ইসলামী ব্যাংক। ব্যাংকটি ১৯৮৩ সালের ১৩ই মার্চ কোম্পানি আইন, ১৯১৩-এর অধীনে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। মোট ৩০৬টি শাখা নিয়ে এই ব্যাংকটি দেশের বেসরকারি ব্যাংকগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ ব্যাংকে পরিণত হয়েছে। এটি ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ লিমিটেড-এর তালিকাভূক্ত কোম্পানী যার অনুমোদিত মূলধন ২০,০০০ মিলিয়ন টাকা এবং পরিশোধিত মূলধন ১৪,৬৩৬.২৮ মিলিয়ন টাকা।
ইতিহাস
সুদমুক্ত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা বাংলাদেশের মানুষের বহু পুরনো প্রত্যাশা। বিশ শতকের ষাটের দশকে মিসরের মিটগামারে প্রথম সুদমুক্ত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে বাংলাদেশেও এরূপ একটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সক্রিয় হয়। ১৯৭৪ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক বা আইডিবি’র চার্টার স্বাক্ষর করে। ১৯৭৬ সালে প্রখ্যাত ইসলামি চিন্তানায়ক মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীমের নেতৃত্বে ঢাকায় ইসলামী অর্থনীতি গবেষণা ব্যুরো প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৭৯ সালে নভেম্বরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ মহসিন দুবাই ইসলামি ব্যাংকের অনুরূপ বাংলাদেশে একটি ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য পররাষ্ট্র সচিবের কাছে লেখা এক চিঠিতে সুপারিশ করেন। এর পরপরই ডিসেম্বর মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং উইং বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের অভিমত জানতে চায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি হিসেবে তৎকালীন গবেষণা পরিচালক এ এস এম ফখরুল আহসান ১৯৮০ সালে ইসলামি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার জন্য দুবাই ইসলামি ব্যাংক, মিসরের ফয়সাল ইসলামি ব্যাংক, নাসের সোশ্যাল ব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংক সমিতির কায়রো অফিস পরিদর্শন করেন। ১৯৮১ সালে তিনি বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করে একটি প্রতিবেদন পেশ করেন।
১৯৮০ সালের ১৫-১৭ ডিসেম্বর ইসলামী অর্থনীতি গবেষণা ব্যুরোর উদ্যোগে ঢাকায় ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ওপর একটি আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৮১ সালের মার্চে ওআইসিভূক্ত দেশগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরদের সম্মেলন সুদানের খার্তুমে অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে পেশকৃত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর জানান, বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইতিবাচক সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। ১৯৮১ সালে এপ্রিল মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে লেখা এক পত্রে পাকিস্তানের অনুরূপ বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর শাখাগুলোতেও পরীক্ষামূলকভাবে পৃথক ইসলামি ব্যাংকিং কাউন্টার চালু করে এ জন্য পৃথক লেজার রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। ১৯৮১ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে সোনালী ব্যাংক স্টাফ কলেজে ইসলামি ব্যাংকিংয়ের ওপর এক মাস স্থায়ী সার্বক্ষণিক আবাসিক প্রশিক্ষণ কোর্স অনুষ্ঠিত হয়। এ কোর্সে বাংলাদেশ ব্যাংক, সব রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, বিআইবিএম ও প্রস্তাবিত ঢাকা আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (বর্তমানে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড)-এর ৩৭ কর্মকর্তা অংশ নেন।
১৯৮২ সালে নভেম্বর মাসে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করেন। এ সময় তারা বাংলাদেশে বেসরকারি খাতে যৌথ উদ্যোগে একটি ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় আইডিবি’র অংশগ্রহণের আগ্রহ প্রকাশ করেন। বাংলাদেশে ইসলামি ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার ব্যাপারে ‘ইসলামী অর্থনীতি গবেষণা ব্যুরো’ (আইইআরবি) এবং বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংক সমিতি (বিবা) অগ্রণী ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বহুমাত্রিক চেষ্টার ফলস্বরূপ ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ ঢাকা আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড নামে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম সুদমুক্ত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৮৩ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত ঢাকা আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড নামে বাংলাদেশের প্রথম ইসলামী ব্যাংকের প্রস্তুতিমূলক কাজ করা হয় এবং এ নামেই তখন পর্যন্ত ব্যাংকের সাইনবোর্ড ও প্রচার-পুস্তিকা ব্যবহার করা হয়। আলহাজ্ব মফিজুর রহমান ২৯ মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন। এরপর ৩০ মার্চ থেকে এ ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড নামে কার্যক্রম শুরু করে। ব্যাংকের মনোগ্রাম তৈরি করেন শিল্পী ও ক্যালিগ্রাফার সবিহউল আলম। এক্ষেত্রে ১৯জন বাংলাদেশি ব্যক্তিত্ব, ৪টি বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান এবং আইডিবিসহ মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপের ১১টি ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থা এবং সৌদি আরবের দু’জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠায় উদ্যোক্তারূপে এগিয়ে আসেন।
বিশ্বের শীর্ষ ১০০০ ব্যাংকের তালিকায় ইসলামী ব্যাংক
যুক্তরাজ্য ভিত্তিক শতাব্দী পুরাতন অর্থনীতি বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘দ্য ব্যাংকার’ তাদের জুলাই ২০১২ সালে প্রকাশিত সংখ্যায় এই ব্যাংকটিকে বিশ্বের ১০০০ শীর্ষ ব্যাংকের তালিকায় প্রথম ও একমাত্র বাংলাদেশী ব্যাংক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে।
সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রম
ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। বৃহৎ পরিসরে সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যাংকটি ৩৮ মিলিয়ন টাকা ফান্ডের ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন নামে পৃথক একটি ফাউন্ডেশন গঠন করেছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড-এর পক্ষে ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশন সামাজিক কল্যাণ, শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।
ইসলামী ব্যাংক ফাউন্ডেশনের সামাজিক কল্যাণমূলক কার্যক্রমসমূহ মধ্যে রয়েছে- ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল, ইসলামী ব্যাংক মেডিক্যাল কলেজ, রাজশাহী; কমিউনিটি হাসপাতাল, মনোরোমঃ ইসলামী ব্যাংক নৈপুণ্য ও ফ্যাশন ঘর, ইসলামী ব্যাংক প্রযুক্তি ইন্সটিটিউট, ইসলামী ব্যাংক আন্তর্জাতিক স্কুল ও কলেজ, ইসলামী ব্যাংক ফিজিওথেরাপী ও পক্ষাঘাত পূনর্বাসন কেন্দ্র, উন্নয়ন আলোচনা কেন্দ্র, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ