বিশেষ খবর

সুচিন্তা ও সুস্থ আচরণের মাধ্যমে বিশেষ মানুষ হয়ে সুস্থতা ও শতায়ুলাভ-৪৭

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ নিবন্ধ

॥ পর্ব ৩॥
ভালো চিন্তা ও কাজের সুফল

সর্বক্ষেত্রে ভালোর চর্চা এবং ধৈর্য ও ঈমান মজবুত রাখার মাধ্যমে সুস্থতালাভ
সর্বক্ষেত্রে ভালোকে ‘হ্যাঁ’ এবং মন্দকে ‘না’ বলার মাধ্যমে চিন্তা ও মননে উৎকর্ষলাভ করা যায়; হওয়া যায় বিশেষ মানুষ বা উন্নততর মানুষ। ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ জীবনে এরূপ নীতি বা আদর্শের লালন এবং আশপাশের মানুষকে অনুরূপ বিষয়ে উদ্বুদ্ধকরণের মাধ্যমে যে কেউ নিজের শারীরিক, মানসিক, আত্মিক উৎকর্ষসাধন তথা সুস্থতালাভ করতে পারে; সেই সাথে অবদান রাখতে পারে পারিপার্শ্বিক বা সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও। এরূপ বজ্রকঠিন শপথের প্রোএকটিভ ও পজিটিভ চিন্তার বিশেষ মানুষরা কেবল শারীরিক সুস্থতাই লাভ করেন না, এঁরা মহাবিশ্বের মহাবিস্ময়রূপেও আবির্ভূত হয়ে থাকেন।
অন্যদিকে যারা ‘হ্যাঁ’কে না এবং ‘না’কে হ্যাঁ বলতে অভ্যস্ত, তারা মানসিক চাপে থাকেন। নেতিবাচক জগতের মানুষ বিধায় এরা সত্যের অনুসন্ধানে বা সত্যাশ্রয়ে বেশিদূর এগুতে পারেন না। তাই এরা মানসিক অশান্তিতে ভোগেন এবং নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য অন্যের ওপর চাপাতে থাকেন। আশরাফুল মাখলুকাত তথা সৃষ্টি জগতের সেরা জীবের দাবিদার হতে হলে নিজের বিবেক ও বুদ্ধির কাছে নিশ্চিত করতে হবে সকল ভালোত্ব। অন্য প্রাণির তুলনায় শ্রেষ্ঠ গুণ ধারণ করতে না পারলে সৃষ্টির সেরা জীবের দাবিদার হওয়া কতটুকুন যৌক্তিক, তা সংশয়ের ঊর্ধ্বে নয়। আরও সংশয় যে- চোর-ডাকাত-খুনি-মিথ্যাচারী-প্রতিহিংসাপরায়ণ, প্রতিক্রিয়াশীল বা পরশ্রীকাতররা কি আশরাফুল মাখলুকাত? এরূপ ব্যক্তি অনেক ক্ষেত্রে বিত্ত-বৈভব ও ক্ষমতার অধিকারী হয়ে আপাত সুখের জীবন ভোগ করছে বলে বাইরে থেকে মনে হতে পারে। এদের উপরিভাগ ভালো কাপড় পরা ফিটফাট, আর অন্তর্জগতে সদরঘাট। একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে যে- ভেতরে বা অন্তর্জগতে এরা ভালো নেই, এদের জীবনের চূড়ান্ত পরিণতি সুখের হয় না; এমনকি বংশপরম্পরায়ও চলতে থাকে দুর্ভোগ-দুর্গতি।
অন্যদিকে প্রকৃত আশরাফুল মাখলুকাত এবং স্রষ্টার নৈকট্যলাভে সক্ষমদের জন্য রোগ-শোক-জরা-ব্যাধি অনেকক্ষেত্রে ঈমানের পরীক্ষারূপে এসে থাকে। এরূপ মানুষদের ধৈর্য ও ঈমানের প্রচন্ড জোরের প্রমাণসাপেক্ষে যেকোনো রোগবালাই থেকে মুক্তি এবং বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধারের দায়িত্ব নিয়ে থাকেন স্বয়ং স্রষ্টা।
তাই খাদ্যগ্রহণ থেকে শুরু করে জীবনযাপনের প্রতিপদে তথা সর্বক্ষেত্রে সর্ববিষয়ে ইতিবাচক বা পজিটিভ ধ্যান-ধারণা লালন ও উন্মেষের নিশ্চয়তার মাধ্যমে সেই আপাত পরীক্ষায় চূড়ান্ত বিজয় অর্জনের পথে এগুতে হয়; অপেক্ষা করতে হয়, বিশ্বাস রাখতে হয়, ধৈর্য ধারণ করতে হয়। সুস্থতা ও শতায়ু লাভের জন্য সর্বক্ষেত্রে সর্বদা ভালোকে আঁকড়ে ধরা এবং মন্দকে বর্জনের অভ্যাস ও সংস্কৃতি তৈরি করা অত্যাবশ্যক। তাতে আত্মসুখ, আত্মবিশ্বাস, জনপ্রিয়তা ও সমৃদ্ধি বাড়বেই। ভালো-মন্দের শুধু সমর্থন বা বিরোধিতাই নয়, এ দর্শন ও সংস্কৃতির আদর্শে আত্মনিবেদিত ও উৎসর্গীকৃত হতে হবে। সর্ব আচার-আচরণে ভালোর চর্চার পাশাপাশি তা মুখেও বলতে বা আওড়াতে হবে; অর্থাৎ ইতিবাচক ও ভালো কথা মুখে বলে নিজ কানে শুনতে হবে এবং অন্যকেও শোনাতে হবে; তবে ঝগড়ার সুরে নয়, প্রোএকটিভ ও পজিটিভ এটিচিউডে। যেমন- কেউ আপনার সামনে মিথ্যা কথা বললে, হয়রানি করলে কিংবা গালমন্দ বা কটুক্তি করলে, অমানবিক আচরণ করলে তাকে বলবেন যে- আপনার এ কথা বলা বা এরূপ আচরণ করা ঠিক হয়নি; এটি আমি পছন্দ করিনি; আপনার ঝড়ৎৎু বলা উচিত। তেমনিভাবে কারুর ভালো আচরণ দেখলে তাকে ঞযধহশং দেবেন, প্রশংসা বা অঢ়ঢ়ৎবপরধঃব করবেন। এককথায়- ভালো ও মন্দের ব্যবধান করে পুরস্কার ও তিরস্কারের ব্যবস্থা যত বেশি নেবেন, সমাজে তত বেশি কল্যাণ ও মঙ্গল সাধিত হবে, মানবতা উজ্জীবিত হবে; জীবন হবে সুখময়, বিশ্বে আসবে শান্তি ও সমৃদ্ধি।
ভালো-মন্দের অন্তর্দ্বন্দ্ব দূর এবং বিশেষ মানুষ হয়ে সুস্থতা লাভের উপায়
প্রিয় পাঠক, এ পর্বে একটু কঠিন বিষয়ে আলোচনা এবং কঠিন পরীক্ষা। চলুন, খতিয়ে দেখি- দৈনন্দিন কাজকর্মের শতকরা কতভাগ স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিকভাবে করে আমরা সুখ ও সুস্থতার পথে এগুচ্ছি; আর কতভাগ অস্বাভাবিক ও অপ্রাকৃতিক কাজ করে মানসিক যন্ত্রণা, অসুস্থতা ও আয়ুক্ষয়ের দিকে এগুচ্ছি।
আমরা যদি সৃষ্টির সেরা জীব তথা প্রকৃত মান+হুঁশ হয়ে থাকি, তাহলেতো যেকোনো ভালো বিষয়কে গ্রহণ ও মন্দকে বর্জন করার কথা এবং তা-ই স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক। সুস্থ ও স্বাভাবিক চিন্তা বা কাজ যত বেশি করব, ততই আমরা সুস্থ থাকব। অন্যদিকে অস্বাভাবিক ও কৃত্রিম কাজ যত বেশি করব, ততই যে অসুখী ও অসুস্থ হব বা দুঃখ-কষ্ট পাব এবং আয়ুক্ষয় করব -সে বিষয়টিও স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক। সৎকর্মের সুফল এবং মন্দকর্মের ঘৃণ্য পরিণতি মানুষকেতো পেতেই হবে। মানুষের শুভকর্ম ও অপকর্মের পরিণতি প্রাপ্তিই মহাজাগতিক শৃঙ্খলা তথা ইনসাফের শেষ কথা। এ থেকে নিস্তারের কোনোই পথ নেই।
জ্ঞান বা বুদ্ধির স্বল্পতার কারণে আমরা অনেক ভালো বিষয়কে গ্রহণ করি না, ভালোত্বের প্রতি দৃঢ়তা রাখি না অর্থাৎ ভালোত্ব থেকে দূরে থাকি; ফলে বঞ্চিত হই সত্য, সুন্দর ও সমৃদ্ধি থেকে। আবার জ্ঞান-বুদ্ধি থাকা সত্ত্বেও অনেক খারাপ বিষয় গ্রহণ করে ফেলি। না বুঝে অথবা খেয়ালের ভুলে খারাপ বিষয় গ্রহণ করার ফলে দুর্ভোগ বা অসুখে যতটা পড়তে হয়, তারচে’ ঢের বেশি অসুস্থতা তৈরি হয় জেনেশুনে খারাপী করার ফলে।
তথাপি শিক্ষিতরাও জেনেশুনে প্রতিপদে অনেক অনেক খারাপ কাজ করে চলেছি, যার ইয়ত্তা নেই। ব্যক্তিভেদে এই ভালো ও মন্দ কাজের তালিকা বিভিন্ন রকমের। আমার ধারণায়, আমাদের সমাজে ১০০% ভালো কাজের তালিকাভুক্ত ব্যক্তি কোটিতেও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ। তবে ৮০% ভালো কাজের তালিকার ব্যক্তি লক্ষের ঘরে পাওয়া যেতে পারে। আর ৫০% ভালো কাজের তালিকাসম্পন্ন মানুষ পাওয়া যেতে পারে শ’তে একজন।
সুধী পাঠক, এসব অপ্রিয় সত্য কথায় আমার ওপর চটে যাবেন না, প্লিজ। নিজের এবং আশপাশের মানুষের চিন্তা ও কর্ম গভীর দৃষ্টিতে অবলোকন করে তারপর যদি আমার এ মতের সাথে দ্বিমত পোষণ করেন, তাহলেতো এ অধমের ঠিকানা থাকছেই। তবে অনুরোধ- না বুঝে, চিন্তা না করে এবং অন্তর্চক্ষু দিয়ে না দেখে কেবল এ লেখা পড়েই যদি কেউ ক্ষেপে যান বা রিএকটিভ হয়ে পড়েন, তাহলে সেটা আরেক অস্বাভাবিকতা ও অসুস্থতা নয় কি? চরম হতাশা, মানসিক বিপর্যয় ও হীনম্মন্যতা থেকে সৃষ্ট এমন সব অমানবিক ও পাশবিক আচরণ দেখা যায় মানুষের মধ্যে, যা শৈশব-কৈশোরে জন্ম নিয়ে সুপ্ত অবস্থায় থাকে এবং সময়ে সুযোগে বহিঃপ্রকাশ ঘটে। যেসব কারণে বুদ্ধিমান বা সচেতনরা অনেক খারাপ বিষয়কে জেনেশুনেও গ্রহণ করে ফেলেন, তন্মধ্যে বিশেষ ক’টি নিম্নরূপ।
ক) মন্দের প্রতিক্রিয়া ও পরিণতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা বা জ্ঞানের অভাবঃ নেতিবাচক বা খারাপ বিষয়াদি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা প্রায় সবারই থাকে; কিন্তু যথেষ্ট জ্ঞান ও বিশ্লেষণী উপলব্ধি থাকে না অনেকেরই। তাই খারাপ কাজের পাপ ও প্রায়শ্চিত্তের প্রক্রিয়া-প্রভাব ও পরিণাম বা ঊহফ ৎবংঁষঃ মালুম করতে না পারার কারণে অর্থাৎ ভুল, মিথ্যা ও নেতিবাচক কর্মের ঊহমরহববৎরহম বভভবপঃ সম্পর্কে স্বচ্ছ ও সঠিক ধারণার অভাবে মানুষ জেনেশুনেও খারাপ কাজ করে ফেলে এবং তা যেমনি আচার-আচরণে, তেমনি খাদ্যদ্রব্য গ্রহণেও। উদাহরণস্বরূপ- আমরা সবাই জানি মিথ্যা বলা মহাপাপ। তথাপি প্রায়শই মিথ্যা বলে পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অথবা আপাত সুবিধালাভে সচেষ্ট হই। অথচ আমরা খেয়াল করি না- যে মিথ্যা কথা আমরা মুখে বলি, তা সৃজন হয় আমাদেরই মস্তিষ্ক থেকে। সেই মিথ্যা অন্যের মস্তিষ্কে ভালো বা মন্দ যেভাবেই গৃহীত হোক না কেন, আমাদের মস্তিষ্ক থেকে উত্থিত মিথ্যার প্রক্রিয়া-প্রমাণ-পরিণাম সবই আমাদের মস্তিষ্ক থেকে আমাদেরই দেহমনে দীর্ঘমেয়াদে সঞ্চারিত হবেই হবে। আলোকিত বিশেষ মানুষগণ সেই মিথ্যার ভয়াবহ কালিমা বা অন্ধকার রূপ ভালোভাবে বোঝেন বলে তারা পরিস্থিতিজনিত কারণে এরূপ মিথ্যার বেসাতিতে কদাচিৎ পড়লেও যথাশীঘ্র বিবেক ও স্রষ্টার কাছে তওবা করে এবং সংশ্লিষ্টদের নিকট ক্ষমা চেয়ে আত্মশুদ্ধিতে উজ্জীবিত হন; মুছে ফেলেন পাপের কালিমা। কিন্তু হতভাগা সাধারণ মানুষ তার দেহাভ্যন্তরের ঝড়ভঃধিৎব বহমরহববৎরহম এর এসব সূক্ষ্মতা, গভীরতা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা করতে না পারার কারণে পদে পদে মিথ্যা, অস্বচ্ছতা, মেকি ও কৃত্রিমতাকে আঁকড়িয়ে জীবন-যৌবন ও সুখ-শান্তি বিনষ্ট করে চলছেন।
এতো গেল আচরণগত খারাপের উদাহরণ। খাবারের ক্ষেত্রে এ খারাপীর উদাহরণ আরও বেশি। যেমন-
আমরা অনেকেই বিভিন্ন খাবারের ক্ষতিকর প্রভাবের কথা সাধারণভাবে শুনে থাকি। কিন্তু কোন্্ খাবারে ক্ষতি কতটা, কীরূপ, কীভাবে এবং কতদূর -সে সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবে মুখরোচক অথচ ক্ষতিকর খাবার খেয়ে চলছি হরদম। এর ক্ষতিকর প্রভাব হয়ত আপাত উপলব্ধ হয় না, কিন্তু যখন ভয়াবহ ক্যান্সার বা পাথুরে রোগের মতো মারাত্মক অসুখে পড়ি -তখন নিজেতো শেষ, ডাক্তারবাবুও বোকা বনে যান। তা সত্ত্বেও সবাই ক্যান্সারের আধাররূপী বিভিন্ন অখাদ্য খেয়ে চলেছি। যার ফলে কোক-ফান্টা বা সাদা চিনির মতো কৃত্রিম, রঙিন ও রাসায়নিক খাদ্যোৎসব এবং রমরমা বাণিজ্য বেড়েই চলছে।
খ) প্রবৃত্তিগত কারণ বা খাসলতের দোষঃ অশিক্ষিত বা অসচেতন মানুষ মানে আঁধারের বাসিন্দা। কিন্তু শিক্ষিত ও সচেতন কিছু কিছু মানুষ আলোর জগতে ঢুকেও Belief system বা প্রবৃত্তিগত কারণে অন্ধকারের পাপিষ্ঠ জীবনযাপন করেন। খেয়ালের ভুলে ও খাসলতের দোষে দুষ্ট এরূপ মানুষ কিছুতেই ভালোত্ব, কল্যাণ ও ঈমানের পথে আসতে বা সেপথে স্থায়ী হতে সক্ষম হন না। এরা যা বুঝছেন বা বুঝেছেন, তা-ই। প্রবৃত্তি ও খাসলতের পোকা তাদের মাথামুন্ডু এমনিভাবে দখল করে নেয় বা তাদেরকে পর্যুদস্ত করে ফেলে এবং ঐ প্রবৃত্তি ও খাসলত দ্বারা তাদের সমগ্র দেহ-মন এমনই চৎড়মৎধসসবফ হয়ে যায় যে- এর বাইরে এসে বিজ্ঞানসম্মত মঙ্গল ও ভালোত্বকে গ্রহণ করতে গেলেই অন্তর্জ্বালা, অন্তর্দ্বন্দ্ব তথা অন্তর্যুদ্ধ শুরু হয়ে যায় এবং সেক্ষেত্রেও তারা অশান্তিবোধ করতে থাকে।
প্রবৃত্তিগত এসব কারণে জেনেশুনেও আমরা অনেকেই অনেক মিথ্যা ও অসুন্দরকে বর্জন করতে বারংবার ব্যর্থ হই। এরূপ নেতিবাচক কু-কর্মযজ্ঞ যেমনি চলছে খাবারের ক্ষেত্রে, তেমনি চলছে আচার-আচরণেও। ফলে স্বাস্থ্য ও সুখের অবস্থা কত যে বেহাল, তা সহজেই অনুমেয়।
নিজ শরীরে নিজেরই সৃষ্ট ক্যান্সার বা পাথুরে রোগ সম্পর্কে প্রদত্ত উদাহরণ এক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে। অধিকাংশ মানুষ না জেনে অখাদ্য খাবার খেয়ে থাকে; আবার কিছু মানুষ জেনেশুনেও বিষপান করে। অর্থাৎ অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে এবং অসদাচরণ ও অন্যায় করে তারা নিজের জীবনকে যে অপবিত্র, পঙ্কিল ও অসুখী করে ফেলে -তা বদভ্যাস ও খাসলতের বশেই করে থাকে। তাই কুপ্রবৃত্তি পরিবর্তনের মাধ্যমেও রোগ-শোক এবং পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্তিলাভ সম্ভব।
কুপ্রবৃত্তি বা বদভ্যাস পরিবর্তন কঠিন কিছু নয়, চাইলেই তা সম্ভব। সেই টেকনিক জানতে এবং উন্নততর মানুষ হওয়ার গুণ ও কৌশল শিখতে বা চর্চা করতে চাইলে প্রতি শনিবার বিকালে ক্যাম্পাস কার্যালয়ে আসতে পারেন। গ) লোভ-লালসা, হিংসা-বিদ্বেষ, অধৈর্য ও ক্ষমাহীন মানসিকতার প্রভাবঃ শিক্ষিতজনরাও জেনেশুনে অনেক খারাপ বিষয়কে গ্রহণ করে ফেলেন এবং ভালোত্ব ও সুখ-সমৃদ্ধি থেকে বঞ্চিত হন। কোন্্টি ভালো, কোন্টি মন্দ -তা জানা থাকা সত্ত্বেও দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা বা মানসিক সংকীর্ণতার কারণে তারা শিক্ষা-দীক্ষা নিয়েও সর্বক্ষেত্রে ভালোকে গ্রহণ এবং মন্দকে বর্জন করতে পারেন না।
নিজের মধ্যে মানসিক উদারতা তৈরি করতে না পারলে ভালোত্বের স্বাদ আস্বাদন বড়ই দুরূহ। বাইরের শিক্ষার পাশাপাশি মানসিক উৎকর্ষ সাধন করতে না পারলে নিজের মধ্যে জ্ঞানের আলো তৈরি হয় না তথা প্রতিভা বিকশিত হয় না। ফলে অশিক্ষিতদের সমস্যাতো রয়েছেই; অন্যদিকে একাডেমিক বা পুঁথিগত শিক্ষা-দীক্ষা থাকা সত্ত্বেও জ্ঞানের আলো বঞ্চিত হয়ে শিক্ষিতরাও অসুন্দর ও অসত্যকে আলিঙ্গন করতে থাকে এবং ইহকাল ও পরকাল সবই হারায়। তাই যারা পুঁথিগত শিক্ষায় অথবা আত্ম-উপলব্ধিতে নিজের মানসিক উৎকর্ষ সাধন বিশেষত নির্লোভ, নিরহংকার, অহিংসা, ধৈর্য ও ক্ষমার মানসিকতা লালন ও পালন করতে পারেন -তারাই কেবল নিজের ভুবনে ঔদার্য-আনন্দের কারণে অনেক অসুখ-বিসুখ যেমনি জয় করে ফেলেন, তেমনি অন্য মানুষদের কাছেও বরণীয়-স্মরণীয় বিশেষ মানুষরূপে জীবনকে সার্থক ও সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হন।
তাই প্রাকৃতিকভাবে সুস্থতালাভের জন্য নিজের ভুবনে জ্ঞানের আলো তৈরি করা অত্যাবশ্যক। সেই জ্ঞানের আলোয় মনোরাজ্যের সকল অন্ধকার বিদূরিত করতে পারলে হতাশা-দুঃখ-যন্ত্রণা কিংবা রোগ-শোক জয় করা একেবারেই সহজ। তাই মানসিক উৎকর্ষ ও আত্মশুদ্ধির অবিরাম চর্চার মাধ্যমে আত্মোপলব্ধি ও আত্মার সুখ বিনির্মাণে সচেষ্ট হওয়া সবার জন্যই জরুরি। এক্ষেত্রে ধৈর্য ধরে এরূপ চর্চা করতে অনেকেই পারেন না, আবার কেউ কেউ পারেন বলেই তারা অনেক মানুষের মাঝে বিশেষ ও উন্নততর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হন।
অন্যকে সাহায্য করতে থাকুন, আপনার রোগ-শোক-সমস্যা চলে যাবে
নিজের মধ্যে আনন্দ ও সুখ তৈরির অন্যতম উপায় হচ্ছে অন্যের মঙ্গল ও কল্যাণে সর্বদা কাজ করে যাওয়া; কারণ পরার্থে আত্মোৎসর্গ করা মানুষের শ্রেষ্ঠ গুণ। তাই অধিক ভালো আর কিছুর চর্চা করতে না পারলেও অন্তত একটি কাজে নিজকে সর্বক্ষণ নিবিষ্ট রাখুন; সেটি হচ্ছে- অন্যকে সাহায্য করতে থাকা। অন্যকে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করতে করতে করতে করতে দেখবেন- আপনার মধ্যে এমন আনন্দের জোয়ার বইছে, যে আনন্দের ফল্গুধারায় আপনার সকল সমস্যা কেটে যাচ্ছে; আপনি সুস্থ-সবল, দীর্ঘায়ুসহ ভালো সবকিছু পেয়ে যাচ্ছেন।
অপরের মঙ্গল চিন্তা তথা পরার্থে চিন্তা করার লাভ শতগুণ। অন্যের মঙ্গল চিন্তা বেশি বেশি করা মানে নিজের মধ্যে বেশি বেশি মঙ্গল প্রদীপ জ্বালানো। প্রদীপ বা চুলা জ্বালানোর উদ্দেশ্যে দিয়াশলাইয়ের বারুদ জ্বলে ওঠার মতো। এতে চুলা বা প্রদীপ জ্বলুক আর নাই জ্বলুক, দিয়াশলাইয়ের বারুদ ঠিকই জ্বলে ওঠে। তেমনি অন্যের মঙ্গল কামনা করতে গেলে নিজের ভেতরে মঙ্গল-আলোক জ্বলে উঠবেই; যে আলোক-আনন্দের আতিশয্যে নিজের ভেতরের সকল দুঃখ, হতাশা, গ্লানি কিংবা নেগেটিভ চিন্তা বা ধারণা দূরীভূত হয়ে সবকিছুই শুভ ও মঙ্গলময় হয়ে উঠবে। নিত্য-নব সৃজনশীলতায় দেহ-মন ভরে উঠবে। সুস্থ-সবল ও নবপল্লবে বিকশিত হবে নবজীবন।
সুধী পাঠক, আত্মোন্নয়নে মহাকল্যাণকর এরূপ দর্শন থেকে নিজকে বঞ্চিত করে হতভাগা ও ছন্নছাড়া জীবনে আর না যাই, বরং এরূপ সহজ-সরল পথে আত্মনিবেদিত হয়ে নিজের সমৃদ্ধির পাশাপাশি দেশ ও জাতির উন্নয়নে এগিয়ে আসি। কারণ- আমাদের ৫ জনের নিকট থাকা ৫টি প্রদীপ দিয়ে আমরা যদি ৫ লক্ষ প্রদীপ জ্বালাই অথবা ৫ মাথার ৫টি চিন্তার আলোয় যদি ৫ লক্ষ মানুষকে আলোকিত করি, তাহলে সামাজিক বা জাতীয় আলোর পরিমাণ এত বেশি হবে যে, আমাদের ৫ জনের মধ্যে কোনো একজনের প্রদীপ কখনো নিভে গেলেও তাতে ক্ষতি নেই। আমরা সবাই সামাজিক আলোয় থাকব আলোকিত এবং সেই আলো হবে অফুরন্ত, দীর্ঘস্থায়ী ও অনির্বাণ।
এভাবে অন্যের সাহায্যে এগিয়ে এলে তাতে অন্যের উপকার যতটুকুই হোক না কেন, নিজের পূর্ণ সাহায্য হয়ে যায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে। অর্থাৎ প্রকৃতি ও স্রষ্টা তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন সরাসরি। তাই প্রাকৃতিক শক্তি (চড়বিৎ ড়ভ হধঃঁৎব) এর সাথে নিজকে অষরমহ বা যুক্ত করার পথ হচ্ছে অন্যকে সাহায্য করা। সকল ধর্মেই এ দর্শন রয়েছে যে, মানবজাতি একে অপরের ভাই-বোন। তাই আমাদেরকে পরস্পরের সাহায্যে নিবেদিত হতে হবে। মানুষকে সাহায্য করলেই স্রষ্টার আনুকূল্য পাওয়া যায়। তাই স্রষ্টার সন্তুষ্টি ও সাহায্য লাভ করতে চাইলে মানুষ ও মানবতার সাহায্যে এগিয়ে আসতেই হবে।
‘পরার্থে করিব বিশ্বে সর্ব বিসর্জন’ -ছোটবেলায় সুর করে পড়া এ কথাটির বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো এখন খুবই জরুরি। মন উন্নত হয়ে লাভ কী, যদি সে মন অন্য মনকে উন্নত করতে না পারে। জগতের সঙ্গে সম্পর্কশূন্য এরূপ উন্নত মন দিয়ে পৃথিবীর উপকার হয় না। অন্যের মঙ্গল প্রদীপ জ্বালালে বা অন্যের কল্যাণে কাজ করলে তাতে প্রকারান্তরে নিজেরই মঙ্গল হয়ে যায় এবং সন্তান-সন্ততি তথা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত হয়। নিজের শারীরিক ও মানসিক সুখ-সুস্বাস্থ্য হয় সুনিশ্চিত।
এ প্রসঙ্গে বিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী পিলে’র একটি ঘটনা উল্লেখ করছি। একটি স্টেশনে অপেক্ষা করাকালীন পিলে দেখল- হুইল চেয়ারে বসে দু’ব্যক্তি পরবর্তী যানের জন্য অপেক্ষা করছে। তন্মধ্যে এক ব্যক্তির চেয়ার শিকলে আটকে যাওয়ায় সে তা ছাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং অন্যজন বসে বসে সেই তামাশা দেখছে। এ অবস্থায় ২য় জনের কাছে গিয়ে পিলে বলল- তুমি ওকে সাহায্য করো, তাতে তোমার নিজের অসুবিধাও কেটে যাবে। পিলে’র পরামর্শমতো ঐ ব্যক্তি ১ম জনকে শিকলের ফাঁস থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে এবং হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে পিলেকে বলল, ‘সাহায্য করা ভালো’ -এ কথা শুনেছি, কিন্তু অন্যকে সাহায্য করলে যে নিজের মধ্যে এত আনন্দ তৈরি হয়, তা এর পূর্বে কখনো বুঝিনি। উভয়ের মধ্যে স্বস্তির অনুভূতি দেখে পারস্পরিক ধন্যবাদ বিনিময়ের পর পিলে চলে গেল।
কয়েক মাস পর ঐ ২য় ব্যক্তির সাথে পিলে’র আবার দেখা। এবার হুইল চেয়ারে নয়, পায়ে হেঁটে...। পিলে তাকে জিজ্ঞেস করল, আরে! তোমার হুইল চেয়ার কই? লোকটি উত্তর দিল- মি. পিলে, তুমি আমাকে যে পথ দেখিয়ে দিয়েছ ‘অন্যকে সাহায্য করার’, সে পথে যেতে যেতে এবং অন্যের অসুবিধা দূর করতে করতে নিজের মধ্যে এত যে আনন্দের জোয়ার বইছে, সে জোয়ারে আমার শারীরিক ও মানসিক সকল অসুস্থতা ও অসুবিধাই চলে গেছে।
প্রিয় পাঠক, আসুন- আমরা এখনো আপন থেকে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়াই। পরার্থে আত্মোৎসর্গ করি। অন্যের সাহায্য-সুখে আত্মনিবেদনের মাধ্যমে সর্বক্ষণ আনন্দ সরোবরে অবগাহন করি এবং প্রকৃত ও প্রাকৃত সুখ-সুস্বাস্থ্য ও সমৃদ্ধির স্থায়ী বন্দোবস্ত করে ফেলি এ উন্মুক্ত জীবনে, এ সুন্দর ভুবনে।
-চলবে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ