বিশেষ খবর

সুচিন্তা ও সুস্থ আচরণের মাধ্যমে বিশেষ মানুষ হয়ে সুস্থতা ও শতায়ুলাভ-৫২

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ নিবন্ধ

॥ পূর্ব প্রকাশিতের পর -৫২ ॥
৮। দায়িত্বশীল হওয়া এবং দেনা ও দায় মুক্ত থাকা
সুস্থ ও সবল মননের পূর্বশর্ত হচ্ছে অন্যের সকল পাওনা পরিশোধ এবং নিজের ওপর অর্পিত সকল দায়-দায়িত্ব পালন করা। এই দায়িত্ব পালনকে সংক্ষিপ্তরূপে বা সংকীর্ণমনে দেখলে চলবে না। এক্ষেত্রে দায়িত্ব বলতে মা-বাবা, সন্তান, স্বামী-স্ত্রী, ভাই-বোন, চাকর-চাকরানী, সহকর্মী (ঊর্ধ্বতন-অধস্তন), প্রতিবেশী অর্থাৎ পরিবার-অফিস-সমাজ-জাতি এবং স্রষ্টার ও সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বের কথা বোঝানো হয়েছে। দুঃখজনক যে কেবল মা-বাবা, সন্তান-সন্ততি এবং স্বামী বা স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব পালনকেই আমরা জীবনের লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করে থাকি এবং সেক্ষেত্রেও কতজন কতটা সক্ষম হই তা বিশ্লেষণের দাবি রাখে; স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি দায়িত্ব পালন পর্যন্ত পৌঁছানোতো অনেক দূরের কথা।
আমাদেরকে যেমনি পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালন করতে হবে, তেমনি সচেতন সুনাগরিক হিসেবে সমাজ, দেশ ও জাতির প্রতি দায়িত্ব পালন এবং স্রষ্টা ও সৃষ্টির প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দায়িত্বও পালন করতে হবে। অর্থাৎ ‘বাসা-অফিস-বাজার-বাসা’ এ সংকীর্ণ বৃত্তে আবর্তিত হওয়ার জন্যই যে আমরা পৃথিবীতে আসিনি, তা বোধে নেয়া খুবই জরুরি। ঘরে অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান যেমনি জরুরি, তেমনি ঘরের বাইরে থাকা মানুষ এমনকি গাছগাছালির প্রতি দৃষ্টি রাখা, যতœ নেয়া নিজ জীবনের সমৃদ্ধি ও সার্থকতার জন্য কম দরকারি নয়। এ প্রসঙ্গে আমার ছোটবেলার একটি ঘটনা বলছি। আমি গ্রামের স্কুলের ৬ষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র। আমাদের বাড়িতে একটি লিচু গাছ ছিল। স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে একদিন দেখলাম, সে লিচু গাছটির সব পাতা ঝরে গেছে; অর্থাৎ গাছটি মরে যাচ্ছে। গাছের তলায় দাঁড়িয়ে এর মরে যাবার কারণ বোঝার চেষ্টা করলাম। এরপর বাড়িতে ঢুকে বই-খাতা রেখেই মাকে গিয়ে বললাম এ লিচু গাছ থেকে আমি আবার লিচু বের করব; কিন্তু লিচুর অর্ধেক আপনার, অর্ধেক আমার। মা সানন্দে রাজি হলেন। যে কথা সেই কাজ এবং তা কাল থেকে নয়, আজ থেকেই। খন্তা-বালতি নিয়ে প্রথমে লিচু গাছের চতুর্দিকে মাটির বাঁধ তৈরি করলাম। শুকনো গোবর ও কচুরিপানা যোগাড় করে গাছের গোড়ায় দিলাম। প্রতিদিন স্কুল থেকে ফিরে ৭/৮ বালতি পানি ঢালতে থাকলাম। গ্রীষ্মের খরায় পানি উঠাতে হতো খুবই নিচু তথা গহীন কুয়া থেকে।
ক’দিন পরই গাছে পাতা আসতে শুরু করল। ক’মাস পর গাছে ফুল এলো, ফল এলো; থোকায় থোকায় লিচু ধরল। রাতে পড়ালেখা করতাম আর লিচুখেকো বাদুড় তাড়াতাম। দিনে স্কুলশেষে লিচু বিক্রি করে পয়সা জমাতাম। ছোটবেলায় শুনতাম, আমাদের বাড়ির মাটি কাঁঠাল গাছ জন্মানোর অনুপযোগী প্রকৃতির ওপর এ দোষারোপ আমি মেনে নিতে পারিনি। তাই ৪টি জায়গায় মাটি উপড়ে ফেলে তদস্থলে গোবর মিশ্রিত মাটি দিয়ে কাঁঠাল বীচি রোপণ করি। ৪টি জায়গা থেকেই অঙ্কুর হয়, গাছ হয়, ফুল হয়, ফল হয় আজ অবধি। সুদীর্ঘ ৪ দশক পর এখনও ঐসব গাছের কাঁঠাল কেউ ঢাকায় নিয়ে এলে কিশোর মনের সেসব শক্তি ও দৃঢ় বিশ্বাসের নস্টালজিয়া পেয়ে বসে আমাকে।
জীবনে বজ্রকঠিন শপথের সেইতো বীজ বপন; সুদৃঢ় আত্মবিশ্বাসের সেইতো আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন; যার পথ ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই এ বিশ্বাস দৃঢ়মূল হয় ওসঢ়ড়ংংরনষব রং ধ ড়িৎফ, ও ফড়হ’ঃ নবষরবাব; অসম্ভব বলে কোনো শব্দ আমার চিন্তার অভিধানে নেই; পৃথিবীতে এমন কোনো সমস্যা নেই, যার সমাধান নেই। এরপর মায়ের কাছ থেকে আরও বড় কন্ট্রাক্ট নিলাম। সব নারিকেল ও সুপারি গাছের গোড়ায় অনুরূপ ব্যবস্থা নিলাম এবং চুরি হওয়া থেকে নারিকেল-সুপারি রক্ষার জন্য গাছে কাঁটাতার লাগিয়ে দু’তিন গুণ ফল ফলিয়ে তা বিক্রি করে ছোটবেলাতেই আমি বড়লোক। সেই থেকে অদ্যাবধি কোনো ছোটলোকী মনোভাব রইল না আমার মধ্যে। সৃষ্টির সেবা ও সাধনার ফল যে মেলেই মেলে এ পরীক্ষার ফলাফল আমার জীবনে বিরাট আত্মবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে।
এতো গেল দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে হাতে হাতে ফল পাওয়ার উদাহরণ। আর দেনা? দেনার ক্ষেত্রে এখন এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে আমার নিকট কারুর কোনো পাওনা থাকেই না। সংশ্লিষ্টদেরকে বলা আছে, কেউ যদি যৌক্তিক দাবি প্রতিষ্ঠা করতে পারে যে বিনা কারণে আমার কাছে কারুর পাওনা বাকি পড়ে আছে, তাহলে তার সব পাওনা পূরণসহ তাকে অন্তত ১০,০০০ টাকা পুরস্কার হিসেবে প্রদান করা হবে। সর্বপ্রকার দেনা ও দায় মুক্তির এরূপ নিশ্চয়তা নিজের প্রতি আস্থার ভিতকে মজবুত করে দেয়। দ্বিধাহীন, সংশয়হীন যাপিত জীবনের ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমানের সংকট কাটানো সহজ হয়ে যায়। আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান মন সম্মুখে চলার উদ্যম বাড়িয়ে দেয়; রাখে না পিছুটানের কোনো সুযোগ; তৈরি হয় সৃজনশীল মন। অসুখ-বিসুখ, বিপদ-আপদের পরীক্ষার বৈতরণী পার হওয়া সহজ হয়ে যায়। স্রষ্টার কৃপা চাওয়ার ক্ষেত্রে অতীতের সুকীর্তি চড়রহঃ ড়ভ ৎবভবৎবহপব হিসেবে কাজ করে, এরূপ আত্মবিশ্বাসী মানুষের সামনে কোনো বাধা এসে ভর করতে বা টিকতে পারে না। উচ্ছল-উজ্জ্বল-আলোকিত মনের আলোকচ্ছটায় এরা উদ্দাম গতিতে ছুটে চলে সম্মুখে। চড়বিৎ ড়ভ ঢ়ড়ংরঃরাব ঃযরহশরহম এর আনন্দ সরোবরের এ জীবন ইহকাল ও পরকালের জন্য বড়ই আরাধ্য। প্রিয় পাঠক, সর্বক্ষেত্রে দায় ও দেনামুক্ত থাকার এ সুস্থ ও মহানন্দের জগতে সবাইকে স্বাগতম। আসুন, অন্তত এই একটি নীতি দিয়েই আমরা নতুন সভ্যতা এবং ন্যায় ও শান্তির বিশ্ব গড়ে তুলি।
৯। সুস্থতা ও সুন্দরের চর্চায় গণতন্ত্রের অনুশীলন করুন; অন্যের অধিকারের প্রতি সচেতন থাকুন
নিজের অধিকার সচেতনতার পাশাপাশি অন্যের অধিকারের প্রতি সদাসচেতন এবং সদাজাগ্রত থাকা সুশিক্ষা ও সভ্যতার পরিচায়ক। অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের স্বার্থত্যাগ এমনকি আত্মবলিদানেও পিছপা হন না মানবতাবাদী আধুনিক মানুষরা। তিনিই আধুনিক ও যুক্তিবাদী মানুষ, যিনি নিজের মতের পক্ষে যুক্তি প্রদর্শনের পাশাপাশি প্রতিপক্ষের অভিমতের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকেন। শিক্ষা, সভ্যতা ও জ্ঞানের আলোর এ স্তরে পৌঁছার চেতনা বা সৌভাগ্য হয় খুব কম মানুষেরই। আমরা সবাই যদি অন্যের অধিকারের প্রতি সচেতন এবং প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চায় অভ্যস্ত হতাম, তাহলে সমাজে-জাতিতে ও বিশ্ব পরিসরে থাকত না কোনো দ্বন্দ্ব বা অনাচার। গণতন্ত্রের মূল কথা হচ্ছে ব্যক্তিস্বাধীনতা। মানুষ স্বাধীন; প্রত্যেক মানুষকে তার স্বাধীনতা দিতেই হবে। আবার ঐ মানুষটিকেও এমনভাবে স্বাধীনতার চর্চা করতে হবে, যাতে তার স্বাধীনতা ভোগের কারণে অন্য কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। তিনি ততটুকুন পর্যন্তই স্বাধীন, যতটুকু পর্যন্ত তার দ্বারা অন্যের কোনো অসুবিধা না হয়। নিজ স্বাধীনতার চর্চায় অন্যের অধিকার ক্ষুণœ হলেই ব্যাহত হবে গণতন্ত্র। অর্থাৎ গণতন্ত্রকামী মানুষটি তার হাত ততটা পর্যন্ত নাড়াতে পারবেন, যতটা পর্যন্ত নাড়ালে অন্যের গায়ে না লাগে। অন্যের গায়ে হাত লাগলেই কিন্তু ব্যাহত হয় গণতন্ত্র এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুরু হয়ে যায় একশন-রিএকশন। আমার অভিজ্ঞতায় দেখেছি বাঙালি গণতন্ত্র চাইতে জানে, গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করে প্রাণ দিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। কিন্তু ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক জীবনে কখনো চর্চা করেনি গণতন্ত্রের। গণতন্ত্র না বুঝে, চর্চা না করে গণতন্ত্রের জন্য মায়াকান্না করা ও বুলি আওড়ানোর অসততার কারণেই এখানকার এ দৈন্যদশা। এ বিষয়ে বিস্তারিত বলেছি উন্নত জাতির আধুনিক বাংলাদেশ এবং অত্যাধুনিক বিশ্বের রূপরেখা বইয়ে।
গণতন্ত্রের চর্চা মানে শৃঙ্খলা, সভ্যতা, সুস্থতা ও সুন্দরের চর্চা। আমরা প্রত্যেকে অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সচেতন থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই নিজের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তাই নিজের সুস্থতা বা শান্তির জন্যও অন্যের অধিকার প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। অন্যের অধিকার নিশ্চিত করলেই নিজের স্বস্তি, সুস্বাস্থ্য, শান্তি ও সফলতা নিশ্চিত হয়। তা নাহলে তাদের হাহাকার, রোনাজারি, আন্দোলন-বিদ্রোহ-বিপ্লব গড়ে উঠলে নিজের সুখ-শান্তি টিকে থাকবে না; সফলতাতো সুদূরপরাহত। তাই অন্যের অধিকারের প্রতি সচেতন থেকে গণতন্ত্রের চর্চা ও অনুশীলন আপন স্বার্থ সুনিশ্চিতের জন্যই জরুরি।
চলবে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ