প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জাতীয় সংসদকে জাতীয় কর্মকা-ের কেন্দ্রবিন্দু না করে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকার অকার্যকর করে ফেলেছিল। আমরা এই মহান জাতীয় সংসদকে সকল যুক্তি-তর্ক আর জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চাই। ১২ মার্চ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের শুরুতেই সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বৈঠকের সভাপতির নাম প্রস্তাব করতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো সংসদে বক্তব্য রাখেন। পরে তিনি সংসদের প্রথম বৈঠকের সভাপতি হিসেবে খন্দকার মোশাররফ হোসেনর নাম প্রস্তাব করেন। দেশে আবারও কাক্সিক্ষত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সমৃদ্ধ নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সকলের সহযোগিতা চেয়েছেন। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আমি দল, মত, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছি। আমার রাজনীতি দেশ এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষা করার রাজনীতি। এই লক্ষ্য অর্জনে আমি গণতান্ত্রিক জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা চাই। এই মহান জাতীয় সংসদে সকল দলের নির্বাচিত প্রত্যেক সংসদ সদস্যের সমর্থন ও সহযোগিতা চাই। সংসদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, আমাদের দল কিংবা মত কিংবা কর্মসূচি ভিন্ন হতে পারে। কিন্তু তাবেদার মুক্ত, ফ্যাসিবাদ মুক্ত একটি স্বাধীন, সার্বভৌম, নিরাপদ, স্বনির্ভর বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আমাদের মধ্যে কোনো বিরোধ থাকতে পারে না; বিরোধ নেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের নির্মমতার শিকার অসংখ্য মানুষের কান্না, আর হাজারো প্রাণের আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে অবশেষে আজ থেকে পুনরায় যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে জনপ্রতিধিত্বশীল জাতীয় সংসদ। আমরা একটি ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করতে পেরেছি। তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধসহ এ পর্যন্ত দেশে গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে যারা শহীদ হয়েছেন, সংসদ শুরুর এই যাত্রালগ্নে তাদেরকে স্মরণ করছি। এই আন্দোলনে আহত মানুষকে তাদের স্বাচ্ছন্দের জীবন হারাতে হয়েছে। যেসব মানুষ নির্যাতন, নিপীড়ন, রাজনৈতিক হয়রানি কিংবা মিথ্যা মামলা শিকার হয়ে সর্বস্ব হারিয়েছেন -তাদের স্মরণ করছি। বিগত আওয়ামী লীগ শাসনামলে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন- সব শ্রেণিপেশার মানুষ, যাদেরকে গুম-খুন-হত্যা, নির্যাতন-নিপীড়ন, মিথ্যা হামলা-মামলা কিংবা জীবন্ত মানুষের কবরস্থান তুল্য বন্দিশালা আয়নাঘর কোনো কিছু দিয়েই যাদের গণতান্ত্রিক আকাক্সক্ষাকে রুখে দেয়া যায়নি; যাদের সাহসী ভূমিকায় দেশে পুনরায় গণতন্ত্র ফিরে এসেছে, জাতীয় সংসদের এই যাত্রালগ্নে দেশের স্বাধীনতা প্রিয় গণতন্ত্রকামী সেই বীর ছাত্রজনতাকে জানাই অভিনন্দন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে স্মরণ করে তারেক রহমান বলেন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় খালেদা জিয়া সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছিলেন। সেই গণতন্ত্রকে প্রহসনের রূপ দিয়ে জাতীয় সংসদকে হাস্যরসের খোরাকে পরিণত করা হয়েছিল। তাবেদারি শাসন-শোষণ কায়েম করা হয়েছিল। দেশের সংসদীয় গণতন্ত্র এবং জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করেছেন। জীবনে কখনও স্বৈরাচার কিংবা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে আপস করেননি। দেশে আজ থেকে আবারও সেই কাক্সিক্ষত সংসদীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হলো। সংসদীয় রাজনীতির প্রতিষ্ঠাতা খালেদা জিয়া দেশ ও জনগণের সাফল্যে এই শুভ মুহূর্তটি দেখে যেতে পারেননি। আজ তাই এই জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে আমরা দেশ এবং জনগণের স্বার্থে আপসসীন নেতৃত্ব ব্যক্তিত্ব স্মরণীয়-বরণীয়-অনুকরণীয় রাজনীতিবিদকে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। রাষ্ট্রপতি প্রয়াত জিয়াউর রহমানকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা উল্লেখ করে তাঁর উক্তি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিনি বলেছিলেন জনগণই যদি রাজনৈতিক দল হয়, তাহলে আমি সেই দলেরই আছি। অর্থাৎ ব্যক্তি কিংবা দলের স্বার্থ নয়, জনগণের স্বার্থই সবচাইতে বড়। এটাই বিএনপির রাজনীতি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি’র রাজনীতি জনগণের জীবনমান উন্নয়ন এবং স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার রাজনীতি। প্রতিটি পরিবার স্বনির্ভর করাই আমাদের রাজনীতির লক্ষ্য। প্রতিটি পরিবারকে স্বনির্ভর করার মাধ্যমেই বিএনপি একটি স্বনির্ভর, সমৃদ্ধ, নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এই লক্ষ্য অর্জনে আমি গণতান্ত্রিক জনগণের সমর্থন ও সহযোগিতা চাইছি। এই মহান জাতীয় সংসদে সকল দলের নির্বাচিত প্রতিজন সংসদ সদস্যের সমর্থন এবং সহযোগিতা আশা করছি। নতুন সরকার যাত্রার শুরুতে স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকার উপস্থিত না থাকার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেনÑ পতিত, পরাজিত, বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকারের জনবিরোধী এবং গণবিরোধী কর্মকা-ের ফলে যে জনরোষ তৈরি হয়েছে বা জনরোষ তৈরি হয়েছিল, তাতে এই মহান সংসদের সাবেক স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের কেউ কারাগারে, কেউ নিখোঁজ কিংবা কেউ পলাতক। দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী এবং তাঁবেদারি শাসন-শোষণের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে আজ আমাদের এক বিশেষ পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। সংসদের কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, সংসদের প্রথম অধিবেশনের সভাপতিত্ব করার জন্য প্রবীণ রাজনীতিবিদ খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের সংসদীয় রীতিনীতির ইতিহাসে এই ধরনের পরিপ্রেক্ষিত নজিরবিহীন নয়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মরহুম শেখ মুজিবুর রহমান ওই সংসদের সদস্য মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগিশের নাম প্রস্তাব করেছিলেন।