বিশেষ খবর

পয়সার অভাবে কেউ চিকিৎসা-বঞ্চিত হয়ে ফিরে যাবে না -ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান

ক্যাম্পাস ডেস্ক প্রচ্ছদ প্রতিবেদন
img

সারাজীবন তিনি কল্যাণের ছায়ায় লালিত। কল্যাণকামী চিকিৎসক বলে কোনোদিনই রোগীদের কাছ থেকে কোনো ফিস নেননি। কর্মজীবনের শুরু চাকরি দিয়ে হলেও আল-রাজী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে চিকিৎসা প্রশাসক হিসেবে নিজের দক্ষতার পরিচয় দেন। এরপর থেকে আর পিছু তাকাতে হয়নি। দীর্ঘ ৪ দশক থেকে চিকিৎসা সেবার উন্নয়নে যিনি কাজ করে যাচ্ছেন, তিনি হলেন মানবদরদী, সেবাপরায়ণ ও সৃজনশীল চিকিৎসক-ব্যক্তিত্ব ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান; গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ফাউন্ডার-এমডি। তাঁর সাথে সম্প্রতি ক্যাম্পাস পত্রিকার প্রতিনিধি গিয়াস উদ্দিন আহমেদ একান্ত আলাপচারিতায় মিলিত হন। তাঁদের সেই আলাপচারিতার উল্লেখযোগ্য অংশ মোহাম্মদ মোস্তফার অনুলিখনে এখানে সন্নিবেশিত হলো।



গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল কেমন চলছে এমন প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় নিবেদিত প্রবীণ চিকিৎসক ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, আমাদের এখানে দূর-দূরান্ত থেকে যারা পড়তে আসে; তারা কষ্ট করেই পড়ালেখা চালিয়ে যায়, সুদিনের আশায়। আর আমরা এ প্রতিষ্ঠানটিকে চালিয়ে যাচ্ছি মেডিকেল শিক্ষার্থী আর স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণেচ্ছু মানুষের কল্যাণে। ব্যাংক-ঋণের বোঝাও আমাদের কাঁধে আছে, তবু সেবা ও সৃষ্টিশীলতার আনন্দে ঋণের চাপও সামলে নিচ্ছি। আমাদের মেডিকেল কলেজে ১২০ জন শিক্ষক আছেন, এদের কয়েকজন Very much specialized, Highly qualified.

গ্রীন লাইফে চিকিৎসাব্যয় সম্পর্কে এক প্রশ্নের জবাবে সুবিবেচক চিকিৎসাবিদ ডাঃ মোঃ মঈনুল আহসান বলেন, এখানে চিকিৎসাব্যয় তুলনামূলকভাবে কম। আমরা সব ধরনের রোগীর সেবা দিয়ে থাকি। ধনী, মধ্যবিত্ত, গরিব সব ধরনের রোগী আমাদের এখানে আসেন। গরিব রোগীদের চিকিৎসায় আমরা কুন্ঠিত হই না। পয়সার অভাবে কেউ চিকিৎসাসেবা বঞ্চিত থাকবে, আমরা এ নীতিতে বিশ্বাস করি না। সব ধরনের রোগীকে সমান যতেœ চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। আর্থিকক্ষমতা খুব সীমিত এমন রোগীকে চিকিৎসা না দিয়ে ফিরিয়ে দেয়া হয় না।

কী লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করলেন এমন জিজ্ঞাসার জবাবে কল্যাণকামী চিকিৎসাবিদ ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, আমি এ কলেজের অন্যতম উদ্যোক্তা; কিন্তু আমার সাথে আরও কয়েকজন রয়েছেন, যাঁদেরও উল্লেখযোগ্য অবদান রয়েছে। তবে প্রথমে অনেকেই রাজি হননি; তাঁরা বলতে চেয়েছিলেন, বয়স হয়েছে; এ বয়সে এত বড় দায়িত্ব নিয়ে লাভ কী হবে। আমি তাঁদের বুঝালাম আমরা কেউ চিরকাল বেঁচে থাকব না, একদিন আমাদেরকে পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। কিন্তু পৃথিবীতে আমরা কি রেখে যাব! আমরা যদি এমন কিছু করে যেতে পারি, তাহলে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে তা বেঁচে থাকবে। মানুষের কল্যাণে আমরা যদি কিছু গড়ে তুলতে পারি, তাহলে আমাদের জন্ম সার্থক হবে। সে চিন্তা-চেতনা থেকে আমরা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেছি সেখানে রোগীরা এসে চিকিৎসা নিচ্ছে, আমাদের জন্য দোয়া করছে। তাদের সেবা করতে পেরে আমরা পরিতৃপ্ত। হাসপাতাল-সেবা দিয়েই আমরা আমাদের দায়িত্ব শেষ করিনি। স্বাস্থ্যশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চিন্তা আমাদের মাথায় আসল। আমরা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করব সেখানে তরুণ প্রজন্মের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ভর্তি হবে, মেডিকেল শিক্ষায় তারা পরিপূর্ণতালাভ করবে, চিকিৎসা সেবার মহান আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে তারা আদর্শ ডাক্তার হিসেবে এখান থেকে বেরিয়ে গিয়ে বৃহত্তর কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করবে।

বেসরকারি উদ্যোগে আপনারা যে প্রতিষ্ঠানটি গড়ে তুলেছেন, তা প্রতিষ্ঠা করতে আপনারা কোনো অসুবিধা বা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিলেন কি এমন প্রশ্নে আত্মবিশ্বাসী চিকিৎসা-শিক্ষক ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, আমাদের মনে সাহস ও আত্মবিশ্বাস ছিল যে, আমরা করতে পারব। এজন্য প্রথমে অগ্রণী ব্যাংক থেকে বেশ বড় অংকের ঋণ নিতে হয়েছে। কোনো বিরাট বাধার সম্মুখীন হইনি। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। শিক্ষার্থীরাও তাদের নিজেদের স্বার্থে কলেজ ও হাসপাতালে সুন্দর পরিবেশ বজায় রেখেছে। সব মিলিয়ে গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজে গড়ে উঠেছে শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ, যা একটি প্রতিষ্ঠানের এগিয়ে যাওয়ার জন্য সহায়ক। অবশ্য সরকারের অনুমোদন, নিবন্ধন এবং মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমতি পেতে আমাদেরকে অনেক বেগ পেতে হয়েছে। আমরা সব ধরনের বাধা অতিক্রম করে একসময় আমাদের স্বপ্নের মেডিকেল কলেজের বাস্তব রূপদানে সক্ষম হয়েছি। 
আপনাদের প্রতিষ্ঠানে আধুনিক চিকিৎসার কী কী ব্যবস্থা আপনারা এরইমধ্যে করতে পেরেছেন এমন প্রশ্নের জবাবে দৃঢ়প্রত্যয়ী চিকিৎসক-ব্যক্তিত্ব ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, কার্ডিয়াক-সার্জারী ছাড়া বাকি সব চিকিৎসা দক্ষ চিকিৎসক দিয়ে আমরা এখানে সম্পন্ন করে থাকি। দেশের বিশিষ্ট চিকিৎসকদের সহযোগিতা আমরা পাচ্ছি; আন্তর্জাতিকমানের চিকিৎসকও আমাদের এ প্রতিষ্ঠানে সহযোগিতা করেন। তিনি বলেন, আমাদের দেশে চিকিৎসা-শিক্ষা কিংবা স্বাস্থ্যসেবা এখনও তত উন্নতমানের হয়নি; এখনও আমাদের দেশের অনেক রোগী দেশের বাইরে চিকিৎসা করাতে যান, বিষয়টি আমাদের জন্য গৌরবের নয়। শুধু মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয়ের দিক থেকে নয় মান-সম্মান, ভাবমূর্তির দিক থেকেও একে দেখতে হবে। আমরা মানোন্নত চিকিৎসা-শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে সচেতনভাবে কাজ করছি।

আপনাদের হাসপাতালে কার্ডিয়াক সার্জারির ব্যবস্থা কখন করতে পারবেন, বাংলাদেশের অন্যান্য মেডিকেল কলেজে কি কার্ডিয়াক সার্জারির ব্যবস্থা আছে এমন প্রশ্নের জবাবে স্বপ্নচারী চিকিৎসাবিদ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, আমাদের স্থান সংকুলান সমস্যার জন্য আমরা এখনও এ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে হাত দিতে পারিনি। তবে বিষয়টি আমাদের মাথায় আছে। প্রশস্ত স্থানের ব্যবস্থা করতে পারলে আমরা কার্ডিয়াক বিভাগ খুলতে পারব। এ বিষয়ে ডিগ্রি নেয়ার আগ্রহ অনেক শিক্ষার্থীর আছে, কিন্তু আমরা তাদের চাহিদা পূরণ করতে এখনও পারিনি। তবে আমরা আশাবাদী হাসপাতাল থেকে যখন মেডিকেল কলেজ করতে পেরেছি, তখন ইনশাল্লাহ অদূর ভবিষ্যতে কার্ডিয়াকসহ একটি সর্বাঙ্গসুন্দর, নির্ভরতা প্রদানকারী মেডিকেল কলেজ হিসেবে গ্রীন লাইফ মেডিকেল কলেজকে গড়ে তুলব। আমাদের এ কলেজ হবে আধুনিক চিকিৎসা-শিক্ষা এবং উন্নতমানের বিশেষায়িত হাসপাতালের স্বাস্থ্যসেবাদান কেন্দ্র।



বিত্তশালী রোগীরা প্রায়ই দেশের বাইরে চিকিৎসার জন্য যান, এতে বাংলাদেশের মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। এর কারণ কী, দেশে কি তাদের চিকিৎসার উপযুক্ত হাসপাতাল নেই? চিকিৎসার বহির্গমন স্রোত নিরুৎসাহিত করতে পরোক্ষভাবে কী করা যেতে পারে এমন প্রশ্নের জবাবে সুদূরপ্রসারী চিন্তার অধিকারী চিকিৎসাবিদ ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, আমাদের দেশের ডাক্তাররা রোগীদের জন্য যে সময়টুকু দেয়া দরকার, তা দিতে পারেন না; তারা চিকিৎসা নিয়ে রোগীর অভিভাবকের সাথে কাউন্সিলিং করার উদ্যোগ নেন না। এজন্য সঠিক ও নির্ভরশীল পরামর্শও রোগী ডাক্তারের কাছ থেকে পান না। এতে তারা হতাশ হয়ে, ঝুঁকি না নিয়ে ভারত, সিঙ্গাপুর, ব্যাংকক প্রভৃতি দেশে রোগী নিয়ে যান। অন্যদিকে আমাদের মন-মানসিকতাও দৃঢ়ভিত্তির ওপর এখনও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। স্বাদেশিকতার মনোভাব জাগিয়ে তুলতে পারলে আমাদের কিছু কষ্ট ও অসুবিধা হলেও তারা দেশের ভালো হাসপাতালে, ভালো ডাক্তারের শরণাপন্ন হবে এতে সন্দেহ নেই। তিনি বলেন শুধু সার্টিফিকেটধারী হলেই হবে না, আমাদেরকে মানবিক মূল্যবোধের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। কথায় আছে ডাক্তারের ব্যবহারের গুণেই রোগীর অর্ধেক রোগ সেরে যায়; আমাদের দেশে গড়ে তুলতে হবে সে মানের ডাক্তার, যাঁরা হবেন মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন বিশেষ মানুষ। যাঁরা অর্থের জন্য নয়, সেবাই হবে তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। আমাদের ডাক্তারদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে, রোগীদের সাথে আন্তরিকভাবে আলাপ করতে হবে, তাদেরকে দিতে হবে আশা ও ভরসা। তা না হলে রোগীর বহির্গমন রোধ করা কঠিন হবে।

কোনো কোনো চিকিৎসক চিকিৎসাসেবাকে বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন, এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে এমন প্রশ্নে মানবিক গুণসম্পন্ন সচেতন চিকিৎসক ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, আপনার এ অভিযোগ আংশিক সত্য; সব ডাক্তার এ ধারায় চলেন না, ভালো ডাক্তারেরও অভাব নেই। তবে চিকিৎসক সমাজের এ ত্রুটির কথা স্বীকার করতে আমার দ্বিধা নেই। বেশ কিছু ডাক্তার আছেন, যারা ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের হাসপাতাল-ক্লিনিক বা চেম্বার পরিচালনা করেন। তারা প্রয়োজন না থাকলেও টেস্টের জন্য প্রেসক্রাইব করেন; রোগীর আর্থিক সংগতির কথা বিবেচনা করেন না। কিন্তু আমাদের হাসপাতালে রোগীদের অহেতুক হয়রানি করতে ডাক্তারদের নিরুৎসাহিত করি। তাছাড়া অপারেশনের ক্ষেত্রে আমাদের ডাক্তারদের আলাদা কমিশন দেয়ার রেওয়াজ নেই। আমরা মনে করি যেসব ডাক্তার প্রয়োজন না থাকলেও অপারেশনের পরামর্শ দেন, তারা নীতি-নৈতিকতা বিরোধী কাজ করছেন।

কিছু কিছু কনসালটেন্ট আছেন, যাদের কাছে রোগীর বেশ ভিড় দেখা যায়; অন্যদিকে অনেক কনসালটেন্ট রোগীশূন্য, এমন অবস্থা কেন হয় এ প্রশ্নের জবাবে দূরদর্শী চিকিৎসক-ব্যক্তিত্ব ডাঃ মোঃ মঈনুল আহসান বলেন, কথাটা মিথ্যা নয়। যাদের ওখানে প্রচন্ড ভিড়, তারা কিন্তু সর্বেসর্বা নন; যাদের ওখানে রোগীর সংখ্যা কম, তারা কিন্তু অদক্ষ নন; সমান স্ট্যান্ডার্ড এর ডাক্তার। যেকোনো কারণে হোক, একজন ডাক্তারের যশ-সুনাম বেড়ে গেলে নতুন রোগীরা সাধারণত তার চেম্বারে যায়; এতে কম রোগীর চিকিৎসাদানকারী ডাক্তারের চিন্তার কোনো কারণ নেই। তিনি রোগীদের সাথে যোগাযোগের সহজ রাস্তা বের করে নেবেন নিজের কৌশলগুণে, নিজের উপস্থিত বুদ্ধিতে। তিনি যদি রোগীদের সাথে আলাপ করেন, তাদেরকে কিছু সময় দেন, অপ্রয়োজনীয় খরচ না করান, অন্য ডাক্তারের বদনাম বা নিন্দা না করেন তাহলে রোগীরা ধীরে ধীরে তার চেম্বারে আসতে থাকবে।

ছাত্র-রাজনীতির অপব্যবহার সম্পর্কে দেশপ্রেমী শিক্ষাবিদ ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সন বলেন, ছাত্র-রাজনীতি কোনো জাতীয় রাজনীতি নয়। জাতীয় ইস্যু নিয়ে পেশাদার রাজনীতিকরাই মাতামাতি করবেন। ছাত্র-সমাজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় হলে, মেডিকেল ছাত্রদের কোনো বিশেষ সমস্যা দেখা দিলে তখন ছাত্ররা সংঘবদ্ধ হয়ে তা আদায়ের জন্য আন্দোলন-সংগ্রাম করবে এতে তাদের দাবিও যেমন আদায় হবে, তেমনি তাদের পড়ালেখা বিঘিœত হবে না। যেই মুহুর্তে ছাত্ররা রাজনীতিকদের তালে তালে জাতীয় ইস্যু নিয়ে মেতে উঠবে, তখন তাদের পড়ালেখা ক্ষতিগ্রস্ত হবে; সুষ্ঠুভাবে কোর্স কমপ্লিট হবে না, পড়ালেখা অপূর্ণ থেকে যাবে। রাজনীতিবিদরা তাদের স্বার্থে ছাত্রদেরকে ব্যবহার করছে এটা ছাত্র-সমাজ যত তাড়াতাড়ি বুঝবে, ততই মঙ্গল।

নিজ প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, একাত্তরের আগে সব গণআন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছি, কিন্তু দেশ স্বাধীনের পর রাজনীতি-অঙ্গনে পদচারণা বন্ধ করে দিয়েছি। স্বাধীনতার পর আমাকে অনেক ডাকাডাকি হয়েছে, উত্তরে আমি বলেছিলাম দেশের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছি, দেশ স্বাধীন হয়েছে এখন দেশগড়ার পালা। আমি দেশ গড়ার কর্মযজ্ঞে নিজেকে জড়িত রাখতে চাই। স্বাধীনতা সংগ্রামে, মুক্তিযুদ্ধে অনেক ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে; সে ধ্বংসের মাঝে গড়ে তুলতে হবে সৃষ্টি-বৈচিত্রের নন্দিত দেশ।

ছাত্র-আন্দোলনে তাঁর ভূমিকার কথা জানতে চাইলে গণতান্ত্রিক রাজনীতির অনুসারী ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, সে সময়কার চট্টগ্রাম ছাত্রলীগ সংগঠনের সর্বোচ্চ পদে থেকে ছাত্র-আন্দোলনে যুক্ত থেকেছি। 
মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রটি সর্বপ্রথম আমরা ৫ জনে মিলে চালু করি। চালুর পর হঠাৎ একদিন মেজর জিয়াউর রহমান আমার সাথে ফোনে যোগাযোগ করেন। কিন্তু তিনি ভাঙা বাংলা ও ইংরেজিতে কথা বলায় আমার বুঝতে অসুবিধা হচ্ছিল তিনি আমাদের পক্ষের না বিপক্ষের। তিনি আমাদের জানান, তারা বেতার কেন্দ্রে আসছেন। তখন আমরা শংকিত হই এবং দ্রুত মেডিকেল কলেজের কন্ট্রোল রুমে ফিরে যাই। এর কিছুক্ষণ পরেই রেডিওর মাধ্যমে মেজর জিয়া স্বাধীনতার পক্ষে ঘোষণা দিলে আমরা নিশ্চিত হই তিনি আমাদের পক্ষের লোক। তখনই আমরা টেলিফোনে পুনরায় তার সাথে যোগাযোগ করি এবং বেতার কেন্দ্রটি বন্ধ না করার অনুরোধ জানাই। তখন তিনি গোপন কোড ০০৯ আমাদের প্রদান করেন। সেসময় আমি তাকে যুদ্ধের জন্যে আমাদের সংগ্রহে থাকা অস্ত্র ও গোলাবারুদের কথা জানাই। তখন তিনি সেগুলো তার কাছে পাঠিয়ে দেয়ার অনুরোধ করেন। তিনি এও বলেন, রাতের বেলা জীপের সামনে ছেড়া লুঙ্গি বা গামছা বেধে তাঁর কাছে যেতে। তাঁর কথামতো আমাদের সংগ্রহে থাকা অস্ত্র ও গোলাবারুদ আমি নিজে তাঁর কাছে নিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে আসি।

এরমধ্যে পুরো চট্টগ্রাম মহানগরী পাকিস্তানি সেনাদের কবজায় চলে যায়। কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র তখনও চালু থাকে। বেতারকেন্দ্র স্তব্ধ করে দেয়ার জন্য পাকিস্তানি জঙ্গিবিমান এর ওপর বিমান হামলা চালায়। আমরা পার্বত্য চট্টগ্রামের রামগড়ের দিকে সরে গেলাম। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পরবর্তী ধাপের দিকে অগ্রসর হলাম।

একজন চিকিৎসকের বড় দায়িত্ব বা বড় গুণ কী হওয়া উচিত এমন প্রশ্নের জবাবে মানবপ্রেমী চিকিৎসক ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, একজন চিকিৎসকের বড় গুণ হলো সেবার মনোবৃত্তি। এই মানবিক গুণই তাঁকে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করে। আমরা প্রত্যেকে যার যার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে সমাজে আর সমস্যা থাকবে না। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করলে দেশ আর পিছিয়ে থাকবে না।
ডাক্তাররা গ্রামে যেতে চান না, এজন্য মফস্বলের স্বাস্থ্য সেবাকেন্দ্রগুলো সঠিকভাবে চলছে না, জনগণ স্বাস্থ্যসেবা বঞ্চিত হচ্ছে -এর প্রতিকার সম্পর্কে  চিকিৎসাসেবায় নিবেদিত মানবপ্রেমী প্রবীণ চিকিৎসক ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র গড়ে উঠেছে। কিন্তু সেখানে ডাক্তার-নার্স ও অন্যান্য সেবাকর্মীর অভাব রয়েছে। শহরের তুলনায় মফস্বলে সুযোগ-সুবিধা অনেক কম। ডাক্তার আর নার্সরা শুধু কাজ করবে না, তাদের থাকার ভালো ব্যবস্থা থাকতে হবে। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় ডাক্তার-নার্সদের থাকার ভালো যায়গা নেই, বিনোদনের ব্যবস্থা নেই। এসব কারণে ডাক্তাররা মফস্বলে পোস্টিং হলে যেতে চান না, তারা তদ্বির করে রাজধানী বা বিভাগীয় শহরে থেকে যেতে চান। মফস্বল এখনও তাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠেনি। এ ব্যাপারগুলো সরকারকে গুরুত্বসহকারে ভাবতে হবে। তবে কিছু কিছু স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভালো মানের, অবকাঠামো ভালো, যোগাযোগ ব্যবস্থা অপেক্ষাকৃত উন্নত এসব স্থানেও পোস্টিং হলে কোনো কোনো ডাক্তার যোগদান করতে অনীহা প্রকাশ করেন কিংবা যোগদান করলেও তাড়াতাড়ি ফিরে আসার জন্য তদ্বির শুরু করে দেন। এ ধরনের মন-মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।

জেলা সদর হাসপাতালগুলোর আশেপাশে অনেক প্রাইভেট ক্লিনিক গড়ে ওঠে, সেখানে সরকারি হাসপাতালের ডাক্তাররা রোগী দেখেন -এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করার উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রবীণ চিকিৎসাবিদ ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, যে সেবার মনোবৃত্তি নিয়ে ছাত্র-তরুণরা চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করছেন, তা থেকে তারা অনেকটা সরে গেছেন; তাদেরকে টাকার নেশায় পেয়ে বসেছে। এ মনোভাব পরিবর্তনে প্রশাসনিক ব্যবস্থার পাশাপাশি তাদের সাংস্কৃতিক চেতনাকে উদ্দীপ্ত করতে হবে। আশা করা যায়, এ অবস্থার পরিবর্তন হবে। নিজ প্রসঙ্গ টেনে ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, আমার ৪৪ বছরের চিকিৎসা পেশাজীবনে আমি কোনো রোগীর কাছ থেকে পয়সা নেইনি। আমি যখন রোগী দেখার সময় পাই না, তখন আমি আমার সহকর্মীদের কাছে সিøপের মাধ্যমে পাঠিয়ে দিই; মন্তব্য থাকে ফ্রি চিকিৎসা। তারা প্রয়োজনীয় কাজ সম্পন্ন করে ওই সিøপের ওপর সই-সিল দিয়ে আমার কাছে আবার পাঠিয়ে দেন। এভাবে আমি অনিয়ম রোধের পদ্ধতি বের করেছি। আমি আমার ক্লিনিকে এমন রোগীকেও অপারেশনসহ চিকিৎসাসেবা দিয়েছি, যার প্রয়োজনীয় টাকা-পয়সা ছিল না। পয়সার অভাবে রোগী চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাবে এটা আমি মেনে নিতে পারি না। আমার ক্লিনিক থেকে বিগত ৪২ বছরে কোনো রোগী মনোকষ্ট নিয়ে, মুখভার করে ফিরে যায়নি। টাকা-পয়সার দিকে তাকাইনি, কারণ মানবতার সেবাই ছিল মূল লক্ষ্য।

বাংলাদেশে নার্সের সংখ্যা ডাক্তারের থেকে কম বলে জানা যায়। নার্স-স্বল্পতার জন্য হাসপাতাল-ক্লিনিকে স্বাস্থ্যসেবা ব্যাহত হচ্ছে। এ সমস্যা সমাধানে কী ব্যবস্থা নেয়া যায় এমন প্রশ্নের জবাবে কল্যাণকামী চিকিৎসক-ব্যক্তিত্ব ডাঃ মোঃ মঈনুল আহসান বলেন, নার্সের সংখ্যা কম হওয়ার অনেক কারণ আছে। আমাদের সমাজে নার্সের সঠিক মূল্যায়ন হয় না; নার্সিং পেশাকে মর্যাদাবান বলে মনে করা হয় না। অথচ তাদের প্রয়োজনীয়তা কত বেশি এবং অপরিহার্য এটি আমরা ভেবে দেখি না। এজন্য মেয়েরা নার্সিং এ ভর্তি না হয়ে সাধারণ শিক্ষার দিকে চলে যায় এবং পাস করে বেকার জীবনযাপন করে; বিয়ে করে সংসার জীবনে জড়িয়ে পড়ে। নার্সিং পেশায় আসার জন্য তরুণ-তরুণীদের উদ্বুদ্ধ করতে হবে। নার্সের এই ক্রাইসিস থেকে আমাদেরকে উদ্ধার পেতে হলে সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিতে হবে। আমরাও ধাপে ধাপে অগ্রসর হয়েছি। প্রথমে হাসপাতাল-ক্লিনিক করেছি, পরে স্থাপন করেছি নার্সিং ইনস্টিটিউট এবং আরও পরে করেছি মেডিকেল কলেজ। ডেন্টাল কলেজ প্রতিষ্ঠাও আমাদের পরিকল্পনায় রয়েছে।

দেশের স্বাস্থ্যশিক্ষায় নিয়োজিত ছাত্র-ছাত্রী এবং স্বাস্থ্যসেবায় নিযুক্ত স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের উদ্দেশ্যে মূল্যবান পরামর্শ প্রদান প্রসঙ্গে ছাত্রবৎসল, জনকল্যাণে নিবেদিত চিকিৎসক ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, শিক্ষার্থীরা তাদের মূল লক্ষ্য পড়ালেখায় নিবিষ্ট মনে অংশ নেবে, কোর্স কমপ্লিট করবে, কোনো ফাঁক থাকবে না। তারা পেশাগত রাজনীতি তথা ছাত্র-রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করবে, কোনোভাবেই জাতীয় রাজনৈতিক ইস্যুতে জড়াবে না। বিভিন্ন মিটিং-সমাবেশ-কনফারেন্স একটার পর একটা অনুষ্ঠিত হচ্ছে; এগুলোতে অংশগ্রহণ করতে থাকলে ডাক্তারি পড়া কখন পড়বে, কখন প্র্যাকটিকেল ক্লাসে যোগ দেবে, সে ব্যাপারে তাদেরকে সতর্ক থাকতে হবে। ছাত্ররা তাদের নিজেদের স্বার্থে জ্ঞান আহরণে সচেষ্ট থাকবে।

গ্রীন লাইফ হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজকে ঘিরে তাঁর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা ব্যক্ত করে চিকিৎসা তথা মানবসেবায় নিবেদিত শিক্ষক ডাঃ মোঃ মঈনুল আহ্সান বলেন, আমি দেখতে চাই এ কলেজ একটি আদর্শ কলেজে পরিণত হয়েছে। যারা শিক্ষা প্রদান করবে, তারা হবেন আদর্শ ডাক্তার। তাঁদেরকে দেখেইত’ ছাত্র-ছাত্রীরা শিখবে, নিজেদের জীবন গড়ে তুলবে। শিক্ষার্থীরা আদর্শ ছাত্র হিসেবে গড়ে উঠে এ প্রতিষ্ঠান থেকে আদর্শ ডাক্তার হিসেবে বেরিয়ে যাবে। তাদেরকে শুধু ভালো ডাক্তার নয়, ভালো মানুষও হতে হবে।


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ