বিশেষ খবর

সুস্থতা ও শতায়ুলাভে প্রাকৃতিক চর্চা - ৬

ক্যাম্পাস ডেস্ক বিশেষ নিবন্ধ

॥ পূর্ব প্রকাশিতের পর -৬ ॥

সুশৃঙ্খল ও স্বাস্থ্যসম্মত দৈনন্দিন কার্যক্রমের ধরন
সুস্থতা ও শতায়ু লাভের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্যাভ্যাস তৈরির পাশাপাশি সুশৃঙ্খল ও সুউন্নত জীবনযাপনের অভ্যাসও গড়ে তোলা প্রয়োজন। এরূপ উন্নততর জীবনের সুঅভ্যাস তৈরির কিছু টিপস বা উদাহরণ নিম্নরূপ।
১। রাতে ঘুমানোর পূর্বে দাঁত-মুখ পরিষ্কার করা এবং ডানে কাত হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস।
২। মেডিটেশন করে ঘুমানো উন্নততর মনন ও সৃজনশীল চেতনা সৃষ্টির সহায়ক। ঘুমানোর পূর্বে স্রষ্টাকে স্মরণ করা এবং নিজের সাথে নিজেই কিছু পজিটিভ কথা বলা উচিত। কোনো অসুবিধা বা সমস্যায় থাকলে এবং তার কোনো সমাধান জানা না থাকলে রাতে ঘুমানোর পূর্বে ব্রেনকে বলুন আমি এ সমস্যার সমাধান স্বপ্নে দেখতে চাই এবং আমি এও চাই যে, আমার এ সমস্যা কেটে যাচ্ছে। এরপর নিজের মধ্যে এমন অনুভূতি তৈরি করুন যেন সমস্যাটি আপনি সমাধান করে ফেলেছেন, আপনি সফল হয়েছেন। এরূপ পজিটিভ বা ইতিবাচক অনুভূতি নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ুন।
এরপর রাতে অনুরূপ স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে জেগে গেলে যে স্বপ্নটি দেখেছেন, তা তক্ষুনি কাগজে লিখে রাখুন। কারণ স্বপ্নে দেখা বিষয় সকালে আপনি স্মরণ করতে সক্ষম নাও হতে পারেন। এমনকি আপনি যে স্বপ্ন দেখেছেন, তাও হয়ত খেয়ালে আসবে না। তাই স্বপ্নে এরূপ সাফল্য দেখার নিয়ত করলে ঘুমানোর পূর্বে বিছানার পাশে কাগজ-কলম রেখে ঘুমাবেন।
সকালে ক’টায় উঠতে হবে তা ফিজিক্যাল ডায়মেনশনে ঘড়ির কাঁটায় দেখে, মনস্থির করে, ব্রেনকে জানিয়ে যদি ঘুমানো যায়, তাহলে ঘড়ির কাঁটা ঐ নির্ধারিত ঘরে পৌঁছাতেই আপনার ব্রেন আপনাকে জাগিয়ে তুলবে। দেহঘড়ি সচল বা কার্যকর করে এবং ব্রেন প্রোগ্রামিং করে সকালে একই সময়ে বা একই নিয়মে ঘুম থেকে জাগার অভ্যাস তৈরি করা সহজসাধ্য।
৩। সাধারণভাবে দৈনিক ৬ থেকে ৮ ঘন্টা ঘুমানো উচিত। ৬ ঘন্টার কম এবং ৮ ঘন্টার বেশি ঘুমানো স্বাস্থ্যসম্মত নয়। ঘুমের এই কমবেশির কারণে বিভিন্ন শারীরিক অসুবিধা যেমন অলসতা, ক্ষুধামান্দ্য, বদহজম, রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ বা অনুরূপ অসুস্থতা সৃষ্টি হতে পারে; এমনকি অকাল মৃত্যুও ঘটতে পারে। গণিতবিজ্ঞানী ও কবি ওমর খৈয়াম বলেছেন - ঘুম-মৃত্যু যমজ ভ্রাতা, তার সাথে ভাব করিসনে, ঘুম দিতে ঢের পাবি সময়, কবরে তোর জনমভর।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইতালির গবেষকগণ অকাল মৃত্যুর সঙ্গে দৈনিক ৬ ঘন্টার কম এবং ৮ ঘন্টার বেশি ঘুমের সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন ফ্যাকাল্টির গবেষকগণ তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে বলেছেন যারা দৈনিক ৫ ঘন্টার কম অথবা ৭ ঘন্টার বেশি ঘুমান, তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি বেশি; ৯ ঘন্টার বেশি ঘুমানোদের হৃদরোগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি ৭ ঘন্টা ঘুমানোদের চেয়ে দেড়গুণ বেশি। অন্য গবেষকগণ বলছেন, ৬ থেকে ৮ ঘণ্টার ‘আদর্শ’ ঘুমের চেয়ে কম ঘুম কিংবা বেশি ঘুমে সম্ভাবনা রয়েছে অকাল মৃত্যুর।
সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের ৬ ঘন্টার কম ঘুম কিংবা ৮ ঘন্টার বেশি ঘুম দু’টোই শরীরের জন্য বিভিন্নভাবে ক্ষতিকর। ঘুম কম হলে সুস্বাস্থ্যের জন্য প্রয়োজনীয় কয়েকশ’ জিনের ক্ষতি হয়; যেগুলো শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, বিপাক প্রক্রিয়া, ঘুম ও জেগে ওঠার চক্র, মানসিক চাপে শারীরিক প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনযাপনের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। এমনকি কম ঘুম যে পুরুষত্বহীনতা এনে দেয়, তা অনেকেরই জানা ছিল না এতদিন। সম্প্রতি জার্নাল অব আমেরিকান মেডিক্যাল এসোসিয়েশন প্রকাশিত গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, কম ঘুমালে পুরুষের শরীরে টেস্টোসটেরনের মাত্রা কমে যায়। পুরুষের সুঠাম দেহের জন্য দরকার টেস্টোসটেরন হরমোন। এ হরমোনই পুরুষের পুরুষত্বের ধারক-বাহক। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে এর মাত্রা শরীরে কমতে থাকে। ফলে ঝুলে পড়ে চামড়া, দেখা দেয় বলিরেখা। শরীরে শক্তি কমে যেতে থাকে, কাজে মনোযোগ দেয়া কষ্টকর হয়; হাঁপিয়ে পড়ে একটুতেই। শুধু তাই নয়, এ হরমোনের মাত্রা কমে যৌন ক্ষমতা হ্রাস পায়।
স্বাভাবিক পুরুষত্বের জন্য গবেষকরা তাই নিয়মিত ৭/৮ঘণ্টা ঘুমাতে বলেছেন। তবে যারা মেডিটেশন করেন, তাদের ক্ষেত্রে এ রুটিন আলাদা। কারণ মেডিটেশন চর্চায় থাকলে ৬ ঘন্টার কম ঘুমালে এমনকি না ঘুমালেও ক্ষতি নেই।
৪। রাত ১০টা থেকে ১২টার মধ্যে ঘুমিয়ে ভোর ৫টা থেকে ৭টার মধ্যে জেগে ওঠা এবং সকালের স্বচ্ছ-সুশীতল আলো-বাতাসের সান্নিধ্য গ্রহণ স্বাস্থ্যসম্মত। বেশি রাত জাগা এবং সকাল ৭টার পর ঘুমিয়ে থাকা অস্বাস্থ্যকর। এতে গ্যাস্ট্রিক, ক্ষুধামান্দ্য, হতাশা, মানসিক রোগ, রক্তচাপ, হৃদরোগ, স্ট্রোকসহ নানা ব্যাধি জন্ম নিতে পারে।
মনোবিজ্ঞানী গ্রেগ জ্যাকবস বলেন মানুষ যখন কর্মব্যস্ততার কারণে বিশ্রাম-বিনোদন এবং ঘুমের জন্য সময় কম পায়, তখন সেই মানসিক চাপ মোকাবেলার সমতা অর্জন করে। প্রবচন আছে, Early to bed and early to rise; makes a man healthy, wealthy & wise এটি শুধু কথার কথা নয়, এ নিয়ে গবেষণাও হয়েছে। মানুষের শরীরে এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে চিকিৎসকরা গবেষণা চালিয়ে দেখেছেন যারা দেরিতে ঘুমানোর অভ্যাস করে, তারা বিছানাও ছাড়ে দেরিতে এবং স্বভাবতই দিনের কাজকর্ম সারতে তাদের আলস্যভাব থাকে, মন-মেজাজ প্রফুল্ল থাকে না। শুধু তাই নয়, যেসব শিশু রাতে দেরিতে ঘুমায় তাদের মোটা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৫। রাতে ঘুমানোর পূর্বে এবং সকালে ঘুম থেকে ওঠার ঘন্টাখানেক পর কিছু যোগাসন বা হালকা ব্যায়াম এবং আকুপ্রেশার বা রিফেক্সোলজি চর্চা উন্নত স্বাস্থ্য লাভের সহজ উপায়।
৬। সকালে খালি পেটে কুসুম গরম পানি যত বেশি সম্ভব খাওয়া উচিত। রাতে ঘুমানোর পূর্বে দাঁত ব্রাশ করা থাকলে সকালে মুখ না ধুয়েই পানি খাওয়া যায়; এতে গ্যাস্ট্রিকসহ বিভিন্ন সমস্যা কেটে যাবে।
৭। সকালে নাস্তার পূর্বে মধু দিয়ে কাঁচা হলুদের রস, আদার রস, কালোজিরার তেল বা নির্যাস এবং গাজরের জুস খাওয়ার অভ্যাস সুউন্নত স্বাস্থ্য সচেতনতার পরিচায়ক। খালি পেটে পানি খাওয়ার খানিক পর অথবা নাস্তা করার কিছু পূর্বে আনারস বা অনুরূপ ঔষধি গুণসম্পন্ন ফল খাওয়া ভালো।
এসব খাবার যে একেবারে ডাইনিং টেবিলে বসে বা আয়োজন করে দীর্ঘসময় নিয়ে খেতে হবে, তা নয়। খবরের কাগজ পড়তে পড়তে বা সকালের কাজ করতে করতে অন্যকথায় অফিসে যাবার প্রস্তুতি নিতে নিতেও এসব পথ্যজাতীয় খাবার গ্রহণ করা যায়।
৮। সকালের নাস্তার সাথে কাঁচা রসুন ও পেঁয়াজ খাওয়া উচিত; তাছাড়া মধু, কালোজিরাও থাকতে পারে। নাস্তায় ঘরে পাতা প্রাকৃতিক দই (Natural yogurt) খুবই উপকারী। দই অসংখ্য ব্যাকটেরিয়াসম্পন্ন খাবার; তাই তা শরীরে থাকা ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার সাথে পাল্লা দিতে সাহায্য করে। তাছাড়া যাদের দুধ খেতে অসুবিধা, তারা অনায়াসে এরূপ ঘরে পাতা প্রাকৃতিক দই খেতে পারেন। দোকানের মিষ্টি দই কিন্তু প্রাকৃতিক নয়; তা মিষ্টান্ন বা মজাদার হলেও স্বাস্থ্যকর নয়।
সকালে এক গাদা রুটি বা ভাত খেলাম কিনা, সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং ততোধিক গুরুত্ববহ হচ্ছে, শরীরের প্রয়োজনীয় খাদ্য উপাদান গ্রহণ করেছি কিনা। সাধারণদের ন্যায় এক গাদা রুটি বা ভাত না খেয়ে বরং দু’গাদা সব্জি খাওয়া শ্রেয়। রুটি বা ভাতের চেয়ে কচু, কুমড়া, গাজর, কপি, আলু বা অনুরূপ সুলভ মূল্যের মৌসুমী সব্জি বাটি ভর্তি করে খাওয়া যায়। তবে সচ্ছল বা বিত্তবানরা এসবের সাথে ফল এবং আঁশজাতীয় খাবার, যেমন কাঁটাসহ প্রচুর ছোট মাছ, সজিনা, করলা ও বরবটি খেতে পারেন।
তাছাড়া খাবারের স্বাদ বা টেস্ট পরখ করার পূর্বে নিশ্চিত হতে হবে যে ঐ খাবার পুষ্টিকর এবং স্বাস্থ্যসম্মত হয়েছে কিনা। কারণ আমরা বাঁচার জন্য খাই, খাওয়ার জন্য বাঁচি না।
ভাত প্রসঙ্গে এটুকু না বললেই নয় যে আমাদের শহুরে জীবনে গাঁয়ের সেই ঢেঁকিছাঁটা চালের স্থান নেই। গ্রামেও এখন ঢেঁকিছাঁটা লাল চাল উধাও করে দিচ্ছে সরু লম্বা কাট-ছাঁটের সাদা চাল। আর বিপত্তিটা এখানেই। এই সাদা চাল খাওয়ার কারণে মানুষের দেহে ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়ছে সমানতালে। সম্প্রতি আমেরিকা, চীন, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার গবেষকরা বলেছেন মানুষ যত সাদা চাল খাবে, তাদের ডায়াবেটিসের ঝুঁকি তত বাড়বে। অথচ সাদা চালের চেয়ে লাল চাল অনেক বেশি পুষ্টিকর। ওজন বৃদ্ধির প্রবণতাসহ ডায়াবেটিস, হার্টের অসুখ, ক্যান্সার ও পেটের পীড়ার ক্ষেত্রে সহজ সমাধান হতে পারে এই লাল চাল। অন্যদিকে সুগন্ধি কালো চালের ভাতের উপকারিতা সম্পর্কে পুষ্টিবিজ্ঞানীরা বলছেন সাদা ভাতের তুলনায় এর পুষ্টিগুণ ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। বিশেষ করে ক্যান্সার প্রতিরোধে কালো ভাত যথেষ্ট সহায়ক বলে বিজ্ঞানীদের দাবি। কালো চালে রয়েছে এন্থোসায়ানিন, যা ক্যান্সার ঠেকাতে ভূমিকা রাখে। বার্ধক্য, স্নায়ুরোগ, ডায়াবেটিস এমনকি ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণও প্রতিহত করতে সক্ষম এন্থোসায়ানিন। এ চালে আয়রন ও ফাইবার বেশি অথচ শর্করা কম।
যে অঞ্চলের মানুষের জন্য যে খাবার যে মৌসুমে প্রয়োজন, সে এলাকায় সে ঋতুতে সে ফলই ফলে এমনই কারিশমা স্রষ্টার। তাই আমাদের উচিত প্রকৃতির এসব দানের দিকে খেয়াল রাখা এবং প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে চলা। যেমন কাঁঠালের মৌসুমে সকালের মূল নাস্তা কাঁঠালের সাথে মুড়ি বা চিড়াও হতে পারে।
৯। ‘সকালের খাবার রাজার হালে, দুপুরের খাবার মধ্যবিত্তের হালে এবং সন্ধ্যার খাবার গরিবের হালে’ খাওয়ার সুঅভ্যাস তৈরি বহুবিধ কারণেই প্রয়োজন। অথচ দুঃখজনক যে, আমরা বাঙালিরা সকালে সামান্য খেয়ে দিনের কাজে নেমে পড়ি; আর রাতে ভূরিভোজ বা জম্পেশ খাবার খেয়ে ঘুমাই। এমনিভাবে কতদিক থেকে যে আমরা উল্টো পথে চলি, তার হিসাব কে রাখে!
১০। সন্ধ্যার মধ্যে বিশেষত ঘুমানোর ৫/৬ ঘন্টা পূর্বে ডিনার সেরে নেয়া উচিত, যাতে ঘুমানোর পূর্বেই খাবার হজম হয়ে যায়। সন্ধ্যার মধ্যে ডিনার সেরে রাতে ১ গ্লাস দুধ বা জুস অথবা সামান্য ফল খাওয়া যায়। তবে রাতে বেশি না খাওয়া ভালো। ইউরোপীয়রা সন্ধ্যার পরে তথা রাতে ভূরিভোজ করাকে বিষ খাওয়া বলে মনে করে। এজন্যই তারা ৬টার মধ্যে ডিনার সেরে ফেলে, রাতে ড্রিঙ্কস জাতীয় সামান্য কিছু খায়।
উল্লেখ্য, জুস অর্থাৎ ফলের রস পান করা স্বাস্থ্যসম্মত এ নিয়ে দ্বিমত নেই। তবে প্রতিদিন ৩ গ্লাসের অতিরিক্ত জুস পান করলে অন্ত্র ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। কেননা কারখানায় প্রস্তুত ফলের রস প্যাকেট বা টিনজাত করার সময় যে প্রিজারবেটিভ ব্যবহার করা হয়, তাতে জুসে সুগারের পরিমাণ বেড়ে যায়। কিন্তু তাজা ফলে সুগারের মাত্রা ক্ষতিকর পর্যায়ে থাকে না। তাই বাজার থেকে কেনা জুস অতিরিক্ত পান না করাই ভালো। অন্যদিকে যারা আপেল, ফুল বা পাতা কপি, গাজর, শালগম বা অন্যান্য আঁশজাতীয় সব্জি বা ফলমূল নিয়মিত খেয়ে থাকেন, তাদের দেহে ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে যায়। ফলের মধ্যে টকজাতীয় ফল খাওয়াই উত্তম। কারণ টকজাতীয় ফলে থাকে প্রচুর ভিটামিন সি এবং ভিটামিন এ।
১১। খাবার সর্বদাই পরিমিত হওয়া উচিত। খাবার কম হলে তা যেমনি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় ক্যালরির যোগান দিতে পারে না, তেমনি বেশি খাওয়ার ফলে শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমে গিয়ে নানা বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও অসুবিধা সৃষ্টি করে। অতিরিক্ত ক্যালরি ক্ষয় (Burn) করতে না পারলে তা চর্বি আকারে শরীরে জমা হতে থাকে এবং উচ্চ কোলেস্টেরল বা উচ্চ রক্তচাপসহ নানা অসুবিধা সৃষ্টি করে। তাই অতিরিক্ত খাবার সর্বদাই ক্ষতিকর এবং পরিত্যাজ্য। মানুষ না খেয়ে যতটা না মরে, খেয়ে মরে তার চেয়ে ঢের বেশি। এভাবে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণ একদিকে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, অন্যদিকে তা খাদ্যের অপচয় ঘটায় এবং অন্যদের খাদ্যের অভাব সৃষ্টি করে। আমার মতে, পৃথিবীতে খাদ্যাভাবের ৩টি কারণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে খাদ্যের অপচয়। বাকি দু’টি কারণ খাদ্যাভ্যাস ও খাদ্য ব্যবস্থাপনাজনিত ত্রুটি।
স্রষ্টা মানুষকে পৃথিবীতে পাঠানোর সময়ে তার রিজিক বরাদ্দ দিয়েই পাঠিয়েছেন। কিন্তু আমরা ভাগ্যবানরা খাদ্যের অপচয় ঘটিয়ে কৃত্রিম খাদ্যসংকট তৈরি করছি; যার ফলে প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ না খেয়ে থাকছে। খাবার নষ্টকালীন ভাববেন যে জিনিস আমি তৈরি করতে পারি না, তার অপচয়-অপব্যবহার বা ধ্বংস করার অধিকারও আমার নেই। একটি ভাত বা রুটি নষ্ট করার সময়ে ভাববেন কৃষকরা কষ্ট করে ফসল ফলিয়ে ধান উৎপাদন ও বাজারজাত করে; চাতাল ব্যবসায়ী ধান থেকে চাল তৈরির পর আড়তদার-পাইকার-খুচরা ব্যবসায়ীর মাধ্যমে কত হাত ঘুরে কত শ্রমে রান্না হয়ে তারপর খাবার হিসেবে তা আমার সামনে এসেছে! এতজনের শ্রম ও নিষ্ঠার ফসল ভাতটিকে আমি ফেলে দেই কীভাবে? শুনেছি রাসুলুল্লাহ (সঃ) একটি খাদ্যকণা পড়ে গেলে তাও উঠিয়ে ধুয়ে খেয়ে ফেলতেন।
জাতিসংঘ বলছে, প্রতিবছর বিশ্বে ১৩০ কোটি টন খাবার নষ্ট হয়। বর্তমানে ৯০ কোটি মানুষ অপুষ্টির শিকার। অন্যদিকে অপরিমিত খাওয়ার কারণে ১০০ কোটি মানুষ নানা রোগে ভুগছে। তাই যেকোনো খাবার অপচয়ের সময় ভাববেন পৃথিবীতে প্রতিদিন গড়ে ১০০ কোটি মানুষ না খেয়ে থাকে, শুধু বাংলাদেশেই প্রতিদিন না খেয়ে থাকে ৭৫ লক্ষ মানুষ।
খাবারে আজকের অপচয়ের কারণে প্রকৃতির প্রতিশোধ হিসেবে আগামীতে খাবারের অভাব ঘটা অস্বাভাবিক নয়। প্রবাদ রয়েছে Waste not, want not; অপচয় করো না, অভাবে পড়ো না; আল কোরআনে বলা হয়েছে অপচয়কারী শয়তানের ভাই। আমাদের দেশে বিবাহ বা অনুরূপ সামাজিক অনুষ্ঠানে খাদ্যের অপচয়ের বিষয়টি অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিক, অমানবিক ও হৃদয় বিদারক বলে আমার মনে হয়। এসব অনুষ্ঠানে যে পরিমাণ খাদ্যের অপচয় ও ধ্বংসলীলা চলে, তা রোধ করা গেলে না খেয়ে থাকা এক তৃতীয়াংশ মানুষের জঠর জ্বালা মেটানো সম্ভব হতো। খাদ্য বন্টনের এ ভারসাম্যহীনতা একদিকে আমাদের সক্ষমদের নিষ্ঠুরতা ও অন্যদিকে অব্যবস্থাপনার সাক্ষ্য বহন করে।
১২। ক্ষুধা না লাগলে খাওয়ার ইচ্ছাকে প্রশ্রয় দেবেন না। পেটে ক্ষুধা না থাকলেও অনেক সময় খাওয়ার উদ্রেক বা ইচ্ছা জাগতে পারে। এটি শারীরিক তথা পেটের ক্ষুধা নয়, মানসিক ক্ষুধা। এজন্যই পেট ভরা থাকা সত্ত্বেও কোনো কোনো সময়ে খাই খাই ভাব জাগে। এ সময়ে যা খাওয়া হয়, তা শরীরের জন্য উপযোগী নয় বরং ক্ষতিকর। এরূপ খাওয়ার ইচ্ছা দমন করতে হয় মন নিয়ন্ত্রণ করে, খাবার খেয়ে নয়। এ সময়ে নিজকে বলবেন শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় খাবার আমার পেটে আছে; আমার আর খাবারের প্রয়োজন নেই; অধিক খাবার শরীরের জন্য ক্ষতিকর, তাই এখন আমি আর খেতে চাই না...। এরূপ অটোসাজেশন দিলে দেখবেন, সত্যি সত্যি আপনার অতিরিক্ত খাওয়ার ইচ্ছা চলে যাবে। অটোসাজেশন না দিতে পারলে মাইন্ড ডাইভার্ট করে ফেলার চেষ্টা করবেন। মনকে খাবারের ওপর থেকে সরিয়ে অন্য কোনো কাজে বা বিষয়ে নিয়োজিত করার চেষ্টা করবেন। অর্থাৎ খাদ্য-লোভাতুর মনকে অন্য চিন্তা বা কাজে নিবিষ্ট করে ফেলবেন।
১৩। স্বাস্থ্যসম্মত ইফতার ও বুদ্ধিমান রোজাদারঃ ইফতারের নামে বাঙালির খাদ্যোৎসব রমজানের সংযমকে ম্লান করে দেয়। সারাদিন রোজা রেখে আমরা যেভাবে ইফতার সাবাড় করি এবং ইফতারে যে ধরনের খাবার খাই, তা রুচি ও শিক্ষা-সংস্কৃতির দৃষ্টিতে অশোভন। ইফতারে ভাজা-পোড়া না খেয়ে বরং সেদ্ধ ও কাঁচা উদ্ভিদজাতীয় জিনিস খাওয়া উচিত। ইফতারে পেঁপে-আনারস-গাজর-শশা-তরমুজ ইত্যাকার মৌসুমী ফল ও সব্জি জুস বানিয়ে ও সøাইস করে বেশি বেশি খাওয়া উচিত। পেঁপে পাকা-কাঁচা-সেদ্ধ-রান্না সব রকমেই খাওয়া আবশ্যক। বিশেষত কাঁচা পেঁপে লবণ ও কাঁচা মরিচের পানিতে সেদ্ধ করে বা ভাঁপে দিয়ে খাওয়া যায়; তাছাড়া স্লাইস করে কাঁচা পেঁপে ইফতারের প্লেটে দিয়ে দিলে দু’চার পিস করে খেয়ে ফেলা যতটা না অমুখরোচক তারচে’ ঢের বেশি উপকারী। তবে পেঁপে কাটার পর ধোয়া উচিত নয়, তাতে কাঁচা পেঁপের কষ ও পুষ্টিগুণ অক্ষুন্ন থাকে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে সব্জি ও ফল কাটার পর সাধারণত ধোয়া উচিত নয়, তাতে পুষ্টিগুণ কমে যায়। তাই প্রায় সবক্ষেত্রেই কাটার পূর্বে সব্জি ও ফল ধুয়ে নিতে হবে, কাটার পরে নয়।
চড়াদামে ভাজা-পোড়া ইফতার খাওয়ার লালসা ত্যাগ করে স্যুপ বানিয়ে এবং সেদ্ধ করে শাক-সব্জি খাওয়া সুস্থ চিন্তা ও সচেতন মননের পরিচায়ক। খাদ্য-অখাদ্যের বহু উপাদানে তৈরি দোকান-রেস্তোরাঁর হালিমের ওপর ‘রেডক্রস’ দেয়া উচিত স্বাস্থ্য সচেতন সকলের। এমনকি বাসায় তৈরি হালিমের পরিবর্তেও ভেজিটেবল স্যুপ খাওয়া শ্রেয়। পেঁয়াজু-বেগুনি-চপ বা অনুরূপ ভাজা-পোড়া খাদ্যদ্রব্য রোজাদারের খালি পেটের জন্য ক্ষতিকর। ছোলা-ডাল-বুট তেলে না ভেজে সেদ্ধ করে খাওয়া উচিত। তাছাড়া লবণ, পেঁয়াজ, ধনিয়া, আদা, পুদিনা ও সরিষার তেল দিয়ে মাখানো কাঁচা ছোলা যত বেশি খাওয়া যায়, ততই উপকারী। এককথায় বেশি বেশি পানীয়, জুস, স্যুপ, ফল, সব্জি স্বাস্থ্য-সচেতন রোজাদারের জন্য আদর্শ ইফতার হিসেবে গণ্য। ইফতারে পেট ভর্তি করে খেয়ে আবার ঘুমানোর পূর্বে জম্পেশ ডিনার স্বাস্থ্যসম্মত নয়। পেটভর্তি ইফতারের পর রাতে দুধ, স্যুপ বা সামান্য ফল খাওয়া যায় যা সেহরীর পূর্বে অবশ্যই নিঃশেষ হয়ে যাবে।
আসলে বাঙালির খাদ্যাভ্যাস সমস্যার কারণেই এদেশে পুষ্টিসমস্যা ক্রমবর্ধমান। যেমন অতিরিক্ত পানিতে ভাত রান্না করে মাড় ফেলে দেয়ায় প্রায় ১৮ রকমের পুষ্টি উপাদান ও শর্করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে মানুষ। অতিরিক্ত পানিতে রান্নার কারণে চালের গুণাগুণ ও উপকারিতা ১৩ থেকে ১৬ শতাংশ কমে যায়। ফলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমছে এবং এনিমিয়া রোগ বাড়ছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডাঃ খুরশীদ জাহান বলেন চাল অধিক সময় ধরে ঘষে ধোয়া এবং অতিরিক্ত পানিতে রান্না করে মাড় ফেললে উভয় পর্যায়ে যথেষ্ট পরিমাণ প্রোটিন, ফ্যাট, ভিটামিন, মিনারেলস হারিয়ে যায়। চাল সতর্কভাবে কম ঘষে ধুয়ে পরিমিত পানিতে বসাভাত রান্না করলে ভাতের পুষ্টিগুণ সুরক্ষা সম্ভব। এতে কার্বোহাইড্রেট অপচয়ও কমে। - চলবে।

সুস্থতা ও শতায়ুলাভে
প্রাকৃতিক চর্চা ও চিকিৎসা
Be your own Doctor -এ বইটির
পৃষ্ঠা সংখ্যা ঃ ৩৪৬, মূল্যঃ ৩৫০ টাকা
প্রাপ্তিস্থানঃ ক্যাম্পাস পত্রিকা অফিস
৩৩ তোপখানা রোড, ১৩ তলা, ঢাকা।
ফোনঃ ৯৫৫০০৫৫, ৯৫৬০২২৫


আরো সংবাদ

শিশু ক্যাম্পাস

বিশেষ সংখ্যা

img img img

আর্কাইভ